বীরেন ভট্টের অমরত্ব

৮১৭পঠিত ...০১:৫৬, জুন ০২, ২০১৭

ঝাঁক-ঝাঁক টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তথ্যমন্ত্রী বললেন—'বীরু আমার ছোটবেলার বন্ধু। আমরা একই মাটিতে বড় হয়েছি, একই ইশকুলে পড়েছি। ভীষণ দুষ্টু আর ডানপিটে ছিল বীরু। বীরু আজ মৃত্যুপথযাত্রী। ওর আগে কেন আমার মরণ হলো না? এত বড় একজন কবিকে হারাবার শোক কী করে বইবে দেশ?' ইত্যাদি-ইত্যাদি বলতে-বলতে মন্ত্রীর ডান চোখ থেকে একফোঁটা, বাঁ চোখ থেকে আধফোঁটা—সাকুল্যে দেড়ফোঁটা অশ্রু মহাসমারোহে ঝরে পড়ল। অশ্রুর ছবি মুহূর্তে বন্দি হলো শত-শত ক্যামেরায়। গণমাধ্যমে মন্ত্রীর এই দেড়ফোঁটা অশ্রুর মূল্য এই মুহূর্তে দেড় কেজি হীরের চেয়ে বেশি। এই অশ্রুকে যে সাংবাদিক যত শৈল্পিকভাবে ধারণ করতে পেরেছেন, তার পদোন্নতির প্রাবল্য তত বেশি।

মন্ত্রী মহোদয়ের স্লট শেষ। প্রতিবেদক এবার বুম তাক করলেন 'দৈনিক পালের গোদা'র সাহিত্য সম্পাদক মৃন্ময় মোতাহারের দিকে—'বীরেন দা একজন অমর কিংবদন্তি। প্রোলেতারিয়েত কাব্যে-কাব্যে তিনি চপেটাঘাত করেছেন বুর্জোয়াদের মুখে; বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেছেন নব্য সাম্রাজ্যবাদ আর ঔপনিবেশিকতার দিকে। শ্রেণিসংগ্রামের ভেতর দিয়ে তিনি লড়াই করেছেন ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্যে, ক-খ-গ-ঘ-ঙ প্রতিষ্ঠার জন্যে। তিনি আজীবন কলম ধরেছেন চ-ছ-জ-ঝ-ঞ-এর মুক্তির জন্যে' ইত্যাদি বলতে-বলতে সম্পাদকের চোখ থেকেও আড়াই ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ল। তার বক্তব্যে পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তবতা, ডিসকোর্স, হেজিমনি, এস্টাবলিশমেন্ট, এনলাইটেনমেন্ট ইত্যাদি শব্দ ঘুরে-ফিরে তিন-চারবার করে এসেছে। শব্দগুলো উচ্চারণকালে তার মুখে ছিল রাজ্যের রোশনাই, চোখে ছিল জবরদস্ত জেল্লা।

বীরেন ভট্ট ষাটোর্ধ্ব কবি। চিকিৎসার কিছু টাকার জন্য তিনি মন্ত্রীবন্ধুর কাছে গিয়েছিলেন গত বছর, টাকাটা এখন মন্ত্রণালয়ের অর্থছাড়সংক্রান্ত সংসদীয় উপ-কমিটির ভারপ্রাপ্ত সহ-সভাপতির অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে, আর কয়েকটা মাস বাদেই টাকাটা ছাড় পাবে। আর পালের গোদা পত্রিকার সম্পাদক বীরেনের কবিতা গত ছ-মাসে আঠারোটি ছেপেও এখনও সম্মানীর টাকা দেননি। কবিদের সম্মানী নিয়ে একটু-আধটু লুকোচুরি খেললেও দৈনিক পালের গোদা কবিদের সম্মান রক্ষায় বদ্ধপরিকর। কবিদেরকে ডেকে এনে পালের গোদার অফিসে প্রায়শই চা খাওয়ানো হয়। কোনো কবি চাইলে তাকে কফিও খাওয়ানো হয়, চাইলে চিনি এমনকি দু চামচের পরিবর্তের আড়াই চামচও দেওয়া হয়। পুরো আধচামচ চিনি বাড়িয়ে দিয়ে পালের গোদা কবিদেরকে সম্মানিত করে চলছে দশকের পর দশক ধরে। পালের গোদা বিশ্বাস করে—কবির সম্মানটাই মুখ্য, সম্মানী হাতের ময়লা। মন্ত্রী ও সম্পাদক সাহেব বীরেন ভট্টের জন্যে ইতোমধ্যে যৌথভাবে যে চারফোঁটা অশ্রু ঝরিয়ে ফেলেছেন, তা অমূল্য। এই অশ্রুই বীরেনের অমোঘ ঔষধ হিশেবে কাজ করবে।

বীরেন ভট্ট ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি। সামাজিক সংগঠনগুলো ফুলের তোড়া নিয়ে এসেছে। আইসিইউতে ঢুকতে না পেরে তোড়াগুলো তারা বারান্দায় ফেলে রেখেছেন। প্রতিটি তোড়ায় বিরাট ফন্টে সংগঠনগুলোর নাম লেখা আছে। যে যার তোড়ার ছবি তুলে নিয়ে গেছে এবং টিভি ক্যামেরাগুলো তোড়াগুলোর শট নিয়ে গেছে। বারান্দায় পড়ে-থাকা তোড়াগুলোর মূল্য একত্র করে কবির হাতে আগে তুলে দিলে এত দিনে তার চিকিৎসাটা দিব্বি হয়ে যেত।

ওদিকে ফেসবুকে বয়ে যাচ্ছে আটাশির বন্যা। কবি বীরেন ভট্টের আসন্ন মৃত্যুতে কাঁদতে-কাঁদতে ভেঙে পড়েছে ফেসবুক—'না না, বীরেন দা! আপনি এখনই যেতে পারেন না', 'রেস্ট ইন পিস, বীরেন ভট্ট' ইত্যাদিতে ফেসবুকে যানজট ও জানজট লেগেছে। আগে যাদের পোস্টে তিনহাজার লাইক পড়ত, তাদের আজকের বীরেনসংক্রান্ত পোস্টে ছ-হাজার লাইক পড়েছে; যার পোস্টে একটি লাইকও পড়ত না, তার পোস্টেও আজ ষোলোটি লাইক পড়েছে। বীরেনের আসন্ন মৃত্যু যেন ফেসবুক স্টক এক্সচেঞ্জের মন্দাক্রান্ত লাইকবাজারের মূল্যসূচক একলাফে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। বীরেন অবশ্য এখনও মরেননি। ফেসবুকের শোকবাণী মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে না। ফেসবুকজনতা মানুষের মৃত্যুর আগেই মৃত্যুশোকে কাতর হয়ে পড়ে।

প্রবীণ কবি বীরেনকে নিয়ে এমন লাইকবাণিজ্যে ক্ষুব্ধ তরুণ কবি রুদ্র খয়ের। রুদ্র খয়েরের পিতৃপ্রদত্ত নাম মো. আবুল খয়ের মিয়া। এই জামানায় 'আবুল' কিংবা 'মিয়া' অচল বিধায় তিনি ঐ শব্দ দুটো ছেঁটে দিয়ে 'রুদ্র' যোগ করেছেন। অবশ্য রুদ্রের বদলে অনিন্দ্য, আদিত্য, অনিরুদ্ধ বা ব্রাত্যও যোগ করা যেত। বর্তমান কাব্যজগৎ ও মিডিয়াজগতে আকিকাবিহীন নামের ক্ষেত্রে আদিত্য-অনিন্দ্য-রুদ্র-ব্রাত্যের জয়জয়কারই বেশি।

হাসপাতাল থেকে মন্ত্রী-মিডিয়া চলে গেছে। বীরেন ভট্টকেও আইসিইউ থেকে বের করা হয়েছে। ক্ষুব্ধ কবি খয়ের হাসপাতালের এ-মাথা ও-মাথা পায়চারি করছেন। মাঝে-মাঝে তিনি ইন্টার্ন ডাক্তারদের কাছে খোঁজখবর নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে একাধিক ইন্টার্ন বলেছেন বীরেন ভট্টের না বাঁচার সম্ভাবনাই বেশি।

মধ্যরাত। ঢাকা মেডিকেলে সর্বদা জন্মমৃত্যুর যৌথ মিছিল। সেখানে এই কক্ষ থেকে সদ্যোজাত শিশুর চিৎকার ভেসে আসে, ঐ কক্ষ থেকে সদ্যমৃতের স্বজনদের আর্তনাদ ভেসে আসে। জন্মমৃত্যুর যৌথ চিৎকারে ঢাকা মেডিকেল কখনও ঘুমোয় না। এই এলাকা অতন্দ্র, এই এলাকা বিনিদ্র। তরুণ কবি রুদ্র খয়ের মেডিকেল গেটে লাগাতার চা খেয়ে যাচ্ছেন, টেনে যাচ্ছেন উপর্যুপরি সিগ্রেট। তার পাকস্থলি ঘাঁটলে এই মুহূর্তে সিগ্রেটের ধোঁয়ামিশ্রিত চায়ের কালো জল ছাড়া আর কিছু মিলবে না। বীরেন হাসপাতালে ভর্তি হবার পর থেকেই সর্বশেষ আপডেট জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে চলছেন তিনি। তার পোস্টে গড়ে কুড়িটি করে লাইক পড়ায় জাকারবার্গের ওপর তিনি কম ক্ষুব্ধ নন। ডিউটি ডাক্তার খয়েরের পরিচিত। ডাক্তার সাহেব চা খেতে এলেন মেডিকেল গেটে।

—বীরেন দার এখন কী অবস্থা, ভাই?

: তিনি এখন বিপদমুক্ত। কাল বিকেলেই তাকে বাসায় নেয়া যাবে।

—বলেন কী, ভাই? বেঁচেই যাবে!

: হ্যাঁ!

—সত্যিই বেঁচে যাবে?

: হ্যাঁ। কিন্তু আপনি এত বিচলিত হচ্ছেন কেন, খয়ের ভাই? মনে হচ্ছে বীরেন ভট্ট বেঁচে যাওয়ায় আপনি নাখোশ!

রুদ্র খয়ের 'কী যে বলেন' বলে অসংজ্ঞায়িত হাসি হেসে উঠলেন। নিকটস্থ একটি কুকুরও ঘেউঘেউ করে খয়েরের হাসির সাথে শরিক হলো। সিগ্রেটের একটি শলাকা থেকে তামাক ফেলে দিয়ে এর ভেতর কী যেন ভরে বেজায় আয়েশ করে টানতে লাগলেন খয়ের। এর গন্ধে নিকটস্থ মূত্রাগারের গন্ধ ম্লান হলো।

কবি রুদ্র খয়ের চানখাঁরপুল হয়ে নিরুদ্দেশ হাঁটা শুরু করলেন। তার ল্যাপটপে কবি বীরেন ভট্টের সাথে তোলা কিছু অতি-দুর্লভ ছবি ছিল। বিভিন্ন উৎসবে-উপলক্ষে বীরেনের পাশে দাঁড়িয়ে-বসে ছবিগুলো তোলা। 'আমাদের বীরেন দা', 'মৃত্যুশয্যায় বীরেন দাকে যেমনটা দেখেছি', 'অমর কবি বীরেন ভট্ট'—মেডিকেল গেটে উপর্যুপরি চা-সিগ্রেট খেতে খেতে কবি খয়ের ল্যাপটপে এই শিরোনামে কতগুলো লেখা লিখেছিলেন। বীরেন বাবুর মৃত্যুর পরে ছবিগুলো আপলোড করলে কবি খয়েরের নাম ফেসবুকময় ছড়িয়ে পড়ত। লেখাগুলো ছাপা হলে দৈনিক পালের গোদার প্রদায়ক থেকে খয়ের হয়তো সাহিত্যপাতার সহ-সম্পাদক হয়ে যেতেন। ঘাটের মড়া বীরেনটা এ যাত্রায়ও মরল না! রাগে-দুঃখে ল্যাপটপ থেকে সবগুলো লেখা ডিলিট করে ফেললেন কবি খয়ের। তরুণীদের সাথে বীরেনের যৌন কথোপকথনের কিছু স্ক্রিন শটও খয়েরের কাছে আছে। বিবিধ উপায়ে খয়ের এগুলো সংগ্রহ করে রেখে দিয়েছেন সন্তানের মতো পরম যতনে। স্ক্রিন শটের বিনিময়ে এক তরুণীকে নিয়ে খয়ের কবিতা লিখে দিয়েছিলেন, এক তরুণীকে খাইয়েছিলেন দামি রেস্তোরাঁয়, আরেক তরুণীকে আজিজ মার্কেট থেকে কিনে দিয়েছিলেন একজোড়া অন্তর্বাস—একটি গাঢ় নীল, আরেকটি হালকা গোলাপি। সব কিছু ডিলিট হলেও স্ক্রিন শটগুলো খয়েরের ডিলিটযজ্ঞ থেকে রেহাই পেল।

কবি বীরেন ভট্ট মারা গেলে কেউ টকশোতে আসতে পারতেন, কেউ ফেসবুকে ছবি দিয়ে পাঁচ কিলো লাইক কুড়োতে পারতেন, কেউ স্মৃতিকথা লিখে সাহিত্যপাতার সহ-সম্পাদক হতে পারতেন, কেউ ছাপতে পারতেন বীরেন ভট্টের অপ্রকাশিত রচনাবলি, কেউ ফেসবুকে স্ক্রিন শট ছেড়ে খুলে দিতে পারতেন বীরেন ভট্টের মুখোশ, দেখিয়ে দিতে পারতেন তার আসল চেহারা। তার মৃত্যু না ঘটায় সেসবের কিছুই হলো না। না মরে বীরেন কাজটি একেবারেই ঠিক করলেন না। পরেরবার অসুস্থ হলে তার উচিত হবে যেকোনো উপায়ে মরে যাওয়া।

মেডিকেল গেটে চা খাচ্ছেন চ্যানেল এক্সের প্রতিবেদক আদিত্য আলতাফ ও চ্যানেল ওয়াইয়ের প্রতিবেদক ব্রাত্য বশির। আদিত্য আলতাফ ব্রাত্য বশিরকে শুধোলেন, 'বাসায় যাবেন কখন যাবেন, বশির ভাই?' বশির ভাই ঢলো-ঢলো চোখে সিগ্রেট ধরালেন, ঊর্ধ্বাকাশে ধোঁয়া ছেড়ে শীতলকণ্ঠে বললেন, 'এই তো, যাব আর কী। বীরেন মরলে এক ঘণ্টার মধ্যে যেতে পারব, না মরলে তো আজ রাতে আর ফেরা হবে না। এখন চলে গেলে ঝাড়বে বস, না গেলে ঝাড়বে বউ। দেখি— শালা মরে কি না।'

ব্রাত্য বশিরের সিগ্রেটের উপর্যুপরি ধোঁয়া উড়ে-উড়ে নিমিষে মিশে গেল অন্ধকারের অতল তলে। যে কুকুরটি রুদ্র খয়েরের হাসির সাথে শরিক হয়েছিল, সেটির সেজো ছানাটিকে ব্রাত্য বশিরের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখা যাচ্ছে।

৮১৭পঠিত ...০১:৫৬, জুন ০২, ২০১৭

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
    আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

    আইডিয়া

    গল্প

    রম্য

    সঙবাদ

    সাক্ষাৎকারকি

    
    Top