সৈয়দ মুজতবা আলী ও একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামের গল্প (মুজতবার কণ্ঠে অসাধারণ রবীন্দ্র স্মৃতিচারনসহ)

১১৫২৬পঠিত ...০৯:৩৪, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৬

সিলেটের ছেলেটি কখনো ভাবেনি ভারতবর্ষ এমন বিখণ্ডিত হবে। স্কুলে পড়ার সময় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় মেধাবী এই কিশোরের। সুদর্শন-বাগ্মী কিশোরটির মনে শান্তিনিকেতনের মুক্ত ভাবনার উঠোনে পড়ালেখার স্বপ্ন জারিত করেন কবিগুরু।

তাই সে ১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনে ভর্তি হয়। সে ছিলো বিশ্বভারতীর প্রথম দিকের তুখোড় ছাত্র এক। কলকাতার চিন্তার জগতে অভিজাত মানুষেরা তাকে খুবই ভালোবাসতো। বহুভাষী এই তরুণের জানাশোনার ব্যপ্তি এতই বেশী আর এতো প্রাঞ্জল তার বাচনিক ততপরতা, এতো ঝরঝরে সরস লেখার হাত; ফলে কখনো তার মনে হয়নি সে সিলেট থেকে আসা একটি মুসলমান ছেলে। অবশ্য সংকীর্ণ চিন্তার হিন্দুদের কেউ কেউ সে কোন চেয়ারে বসে স্থান ত্যাগের মুহূর্তে তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে গঙ্গাজল ছিটাতো। তবে এগুলো তরুণটির নেহাত হাসির খোরাক ছিলো। এই অযথা হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের ছোটমনের উপমানব সমাজটি তাকে স্পর্শ করতে পারেনা। কারণ শিক্ষকেরা তাকে খুব স্নেহ করতেন। আর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কাছে অবাধ প্রবেশাধিকার যার; তার জন্য সমাজের পচা চিন্তার পচেন্দ্ররা কোন ব্যাপার ছিলো না। তার মাথার ওপর ছিলো রবির আলো।

কিন্তু তরুণটির পায়ের তলায় সর্ষে। এরপর সে পড়তে চলে যায় আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে। নানাভাষায় ব্যুতপত্তির কারণে আলীগড়ে শিল্প- সাহিত্যের অনুরাগী বন্ধু পেতে কোন অসুবিধা হয়নি।

এরপর তরুণটি আফঘানিস্তানের কাবুলে চলে যান অধ্যাপক হিসেবে। কাবুলে সুন্দর সম্পর্ক তৈরী হয় বিদ্যোতসাহী মহলে। এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অধিকার বঞ্চিত মানুষের সঙ্গে প্রাণখুলে মিশতে পারতেন তিনি। যেখানেই যেতেন; মানুষকে আপন করে নিতে জানতেন।

কাবুল থেকে তিনি উচ্চতর শিক্ষার জন্য জার্মানীতে চলে যান । দর্শনশাস্ত্রের ছাত্র হিসেবে তুলনামূলক ধর্মশাস্ত্র নিয়ে গবেষণা করে মানুষ আত্মপরিচয়ের শক্তি তিনি আরো বেশী করে টের পেতে থাকেন। দ্রুতই তিনি জার্মানীর বন শহরে একটা চমতকার বন্ধুবৃত্ত পেয়ে যান। এমন একজন তুমুল আড্ডাবাজ বিশ্বনাগরিক নিয়মিত জমিয়ে রাখতেন বন শহরের একটি রেস্তোরার সাঁঝ। আবার বাডগোডেসবার্গে যে এলাকায় উনি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন; সেখানকার কিশোরদের সঙ্গে মাঝে মাঝে ফুটবল খেলে জমিয়ে তুলতেন পাড়াটা।

কিন্তু ঐ যে পায়ের তলায় সর্ষে। বন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে তিনি চলে যান মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। কায়রোতেও অসুবিধা হয়নি সমমনা বন্ধু খুঁজে পেতে। আলো ঝলমলে ক্যাফে কায়রো তার হুল্লোড়ে মাতোয়ারা হয়ে উঠতো।

এরপর তিনি ফিরে আসেন বরোদার মহারাজের অনুরোধে বরোদা কলেজে অধ্যাপনা করতে। এরপর দিল্লীতে শিক্ষা দপ্তরে কাজ করার সময় ঘটে যায় সব্বোনেশে দেশ বিভাগ। মানুষের মনের মানচিত্র বদলাতে থাকে। উগ্র জাতীয়তাবাদ যুক্ত হয় আগের ধর্মীয় বিভাজনের বিষের উপরি হিসেবে।

১৯৪৯ সালে কোন কুক্ষণে আচরি উনি চলে আসেন বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়ে। এমন একজন পণ্ডিত মানুষকে হজম করার মতো সাংস্কৃতিক আলো ছিলো না সেসময়ের উগ্র পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদীদের। উগ্র জাতীয়তাবাদী শামছু- ছাইফুল- কামাল-শাব্বির-হাছিব-সুলতান মিয়ারা স্পেনের ম্যাটাডোরের বুনো ষাঁড়ের মতো তেড়ে-ফুঁড়ে আসে। চারদিকে এই পচা মুসলমানরা ছড়িয়ে দেয়, হুনছোনি হেতেনে ভারতের দালাল। অর্ধশিক্ষিত বুবুরাও মিশতে এসে কথা বুঝতে না পেরে শামছু-টামছুদের দাওয়াত করে খাওন বুবু হয়ে যায়। ক্রমাগতঃ উস্কানি দিতে থাকে ও গুজব ছড়াতে থাকে বিরল প্রতিভার অধিকারী অধ্যক্ষ সাহেবের বিরুদ্ধে। এইসব উপমানবের প্রতি বিরক্ত হয়ে তিনি কলকাতায় চলে যান।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে পড়াতে শুরু করেন। এই সময় বগুড়ার ঠিক উলটো আপদ এসে হাজির হয়। ভারতীয় উগ্রজাতীয়তাবাদী বলদা-হীরালাল-পালেরা স্পেনের ম্যাটাডোরের বুনো ষাঁড়ের মতো তেড়ে-ফুঁড়ে আসে। চারদিকে এই পচা হিন্দুরা ছড়িয়ে দেয়, জানেন মশাই, সে তো পাকিস্তানের দালাল। অর্ধশিক্ষিত দিদিরাও মিশতে এসে কথা বুঝতে না পেরে বলদা-হীরালালদের নেমতন্ন করে খাওন দিদি হয়ে যায়। ক্রমাগতঃ উস্কানি দিতে থাকে ও গুজব ছড়াতে থাকে বিরল প্রতিভার অধিকারী অধ্যাপক সাহেবের বিরুদ্ধে।

এসবকে পাত্তা না দিয়ে তিনি ব্যালকনিতে বসে হাসিহাসি মুখে দেখতেন স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামটিকে। এসময় তিনি আকাশবাণীর পরিচালক হিসেবে পাটনা, কটক, কলকাতা, দিল্লীতে কাজ করেন। এরপর তিনি আবার অধ্যাপনার কাজ নিয়ে ফিরে আসেন নিজের প্রিয় প্রতিষ্ঠান শান্তিনিকেতনে। ১৯৬৫ সালে অবসর নেন এই অনন্য পাণ্ডিত্যের অধিকারী মানুষটি।

এই বৈচিত্র্যময় জীবন ভ্রমণে আনন্দভুক এই লেখক কখনো লেখালেখি থামাননি। ভ্রমণকাহিনী, কলাম, ছোটগল্প, রসরচনা, উপন্যাস সব ক্ষেত্রেই তার অলরাউন্ডার কলম চলেছে। কখনো স্বনামে কখনোবা ছদ্মনামে লিখেছেন তিনি। কিন্তু উনার গদ্যের চৌম্বক আবেশ থেকে এটা বোঝা যেতো; সৈয়দ মুজতবা আলী ছাড়া এ আর কেউ নন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি ঢাকায় আসেন। ঢাকায় এতো সাহিত্য প্রতিভা থৈ থৈ করছিলো যে মুজতবা আলীর খোঁজ নেবার প্রয়োজন পড়েনি। উনিও এসবকে আর পাত্তা দেননি। ব্যালকনিতে বসে হাসি হাসি মুখে দেখতেন এই স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামখানিকে। ১৯৭৪ সালে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন বাংলা সাহিত্যের আনন্দযজ্ঞের অনন্য আয়োজক সৈয়দ মুজতবা আলী। অমরতার আয়োজন যখন হয়েই গেছে তখন বিদায় নিতে অসুবিধা কোথায়!

বোনাস: সৈয়দ মুজতবা আলীর কণ্ঠে অসাধারণ রবীন্দ্র স্মৃতিচারনা---

১১৫২৬পঠিত ...০৯:৩৪, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৬

আরও

 

পাঠকের মন্তব্য

 

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
    আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

    আইডিয়া

    গল্প

    রম্য

    সঙবাদ

    সাক্ষাৎকারকি

    
    Top