নারীশিক্ষার উন্নয়নে শফীর 'মেয়েদের স্কুল-কলেজে দেবেন না' তত্ত্বের ৯টি অনুসিদ্ধান্ত

২০৯৩ পঠিত ... ১৮:৪৯, জানুয়ারি ১২, ২০১৯

শিক্ষাবিদ এবং বিশেষত নারীশিক্ষা ও নারীদের আল্ট্রানবজাগরণ গবেষক শাহ আহমদ শফী নারীদের উন্নয়নে প্রায়ই নানান তত্ত্ব দিয়ে থাকেন। বলা হয়ে থাকে, বেগম রোকেয়ার পর নারীজাগরণের তিনিই অগ্রতেঁতুল। গত ১১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিলে তিনি দিয়েছেন নারীসমাজের আল্ট্রানবজাগরণের একটি নতুন তত্ত্ব। এই থিওরি নারীসমাজের উন্নয়নকে রকেটের গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশা করছেন শিক্ষাবিজ্ঞানী এবং নারীশিক্ষা গবেষকরা। নতুন এই ফর্মুলায় মেয়েদেরকে স্কুল-কলেজে পাঠাতে মানা করেছেন তিনি।

শাহ আহমদ শফী বলেন, 'আপনাদের মেয়েদের স্কুল-কলেজে দেবেন না। বেশি হলে ক্লাস ফোর বা ফাইভ পর্যন্ত পড়াতে পারবেন। বিয়ে দিলে স্বামীর টাকা পয়সা হিসেব করতে হবে। চিঠি লিখতে হবে স্বামীর কাছে। আর বেশি যদি পড়ান, পত্রপত্রিকায় দেখছেন আপনারা, মেয়েকে ক্লাস এইট, নাইন, টেন, এমএ, বিএ পর্যন্ত পড়ালে ওই মেয়ে আপনার মেয়ে থাকবে না। অন্য কেহ নিয়ে যাবে। পত্রপত্রিকায় এ রকম ঘটনা আছে কিনা? ওয়াদা করেন। বেশি পড়ালে মেয়ে আপনাদের থাকবে না। টানাটানি করে নিয়ে যাবে আরেকজন পুরুষ।'

কেন মেয়েদেরকে স্কুল-কলেজে পাঠানোর বিপক্ষে শফী? নারীরা কীভাবে উপকৃত হবে নতুন এই তত্ত্বের দ্বারা? মূলত সাংকেতিক অর্থে দেয়া এই তত্ত্বটি বিশ্লেষণ করলেই পাওয়া যায় বেশ কিছু অনুসিদ্ধান্ত। চলুন, শফীর এই থিওরিটি বিশ্লেষণ করা যাক।

১# শফী স্কুল-কলেজে না পড়ে মেয়েদের সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলছেন। স্কুল-কলেজে শুধু ব্যবহারিক সাক্ষরতার পার্ট শেষ করেই নারীদের উচিত জ্ঞান বিজ্ঞানের আকাশে ডানা মেলে উড়ে যাওয়া।

২# 'আর্টস অর্থাৎ মানবিক হচ্ছে মেয়েদের সাবজেক্ট' এমন ধারণা আমাদের দেশে খুব প্রচলিত। অথচ শফী বলেছেন বিএ (ব্যাচেলর ইন আর্টস), এমএ (মাস্টার্স ইন আর্টস) না পড়তে। অর্থাৎ মেয়েরা বিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন, প্রকৌশল ইত্যাদি বিষয়ে পড়বে।

৩# হেফাজতের তরফ থেকেই বলা হয়েছিল নারীদের চিকিৎসা করতে পারবে কেবলই নারী ডাক্তার। যেহেতু মেয়েরা আর ফোর ফাইভের বেশি পড়তে পারবে না, তাই ক্লাস ফাইভেই বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে এমবিবিএস ডিগ্রি নিশ্চিত করা যেতে পারে। মেয়েদের এত বছর ধরে কষ্ট করে ডাক্তারি পড়তে হবে না!

৪# শফী মেয়েদের কষ্ট করে স্কুল-কলেজ যেতে নিরুৎসাহিত করেছেন। বয়সে অনেক প্রবীণ হলেও তিনি মনে যথেষ্ট আধুনিক এবং ডিজিটাল। স্কুল-কলেজে মেয়েদের যেতে হবে না, স্কুল-কলেজই মেয়েদের কাছে এসে পড়বে ডিজিটালি। ঘরে বসেই মেয়েরা সব বিষয়ে আধুনিকতম পড়ালেখা করতে পারবে।

৫# এমনিতেই আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়। একবিংশ শতাব্দীর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা একেবারেই কার্যকর নয় বলে দাবি অনেক বুদ্ধিজীবীর। তাই শফী চান না মেয়েরা এমন শিক্ষাব্যবস্থায় বেশিদিন থাকুক। তিনি চান মেয়েরা যাতে এই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন এক শিক্ষা বিপ্লব শুরু করতে পারে।

৬# বাংলাদেশের প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী এ প্লাস পাচ্ছে। শহর, বন্দর, গ্রাম সবখানেই বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ। শহরে কোন কোন বিল্ডিংয়েই একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে বলে জানা যায়। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন পুরোদস্তর শিক্ষিত। অন্যদিকে ফ্রেঞ্চ সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেছিলেন ‘তোমরা আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দিব।’ তাই শিক্ষিত বাংলাদেশে নতুন করে শিক্ষিত মায়ের দরকার নেই। এ জন্যেই শফী বলেছেন মেয়েদের স্কুল-কলেজে না পাঠাতে।

৭# আমরা জানি, কৃষি সভ্যতার সূচনালগ্নে নারীদের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। আবার এখন আমাদের দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও কমে আসা কৃষিজমির কারণে তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তাই শফী চান না মেয়েরা স্কুল কলেজে যাক। স্কুল কলেজে না গিয়ে মেয়েরা সেই প্রাচীনকালের মতো করে আবারও কৃষি কাজে মন দিতে পারবে। শফীর নেতৃত্বে বাংলাদেশেই হয়ে যেতে পারে একবিংশ শতাব্দীর কৃষি বিপ্লব।

৮# শফী মেয়েদেরকে দ্রুত বিয়ে দেয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহী করেছেন। বিয়ে দিলে পাত্র যদি অনেক বড়লোক হয়, তাহলে মেয়েকে স্বামীর টাকা পয়সা হিসাব করতে হবে। যদি স্বামী বিদেশে থাকে, তাহলে স্বামীর কাছে চিঠি লিখতে হবে! কে নেয় এত প্যারা! তার চেয়ে মেয়েকে অনেকদূর পর্যন্ত পড়ালে অন্যরাই তাকে স্কলারশিপ দিয়ে নিয়ে যাবে, তাকে কোনো কষ্ট করতে হবে না! এতে মেয়েরা নিজের টাকা গুনেই কুল পাবে না!

৯# শফী চাচ্ছেন, মেয়েদের পড়ালেখার ব্যাপারে চাপাচাপি না করা হোক। মানে তারা যে বিষয়ে যা পড়তে চায়, তাই যেন পড়ার সুযোগ পায়। পড়াশোনার ব্যাপারে বেশি চাপাচাপি করলে মেয়ে যদি লেখাপড়ার উপর ফেডাপ হয়ে বিয়ে করে ফেলে, তাহলে তো মেয়ে অন্য কেউই নিয়ে যাবে, তাই না? সুতরাং, মেয়েকে নিজের পড়া নিজেকেই পড়তে দিন।

২০৯৩ পঠিত ... ১৮:৪৯, জানুয়ারি ১২, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top