হলিউড জুড়ে, বলিউড ঘুরে, #মিটু এলো দেশে

৯৩২ পঠিত ... ১৩:৩৯, নভেম্বর ০৮, ২০১৮

নারীর পুরুষের হাতে নিঃগৃহীত হবার না বলা কথাগুলো উচ্চারিত হতে হতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হ্যাশট্যাগ মি টু (#metoo) আন্দোলনটি পশ্চিমে শুরু হলে; হলিউডের কাস্টিং কাউচের বড় বড় সর্দাররা ধরা পড়তে শুরু করে। 

গোটা পৃথিবীর নারীরা মুখ খুলতে শুরু করে। কিন্তু ঢাকঢাক-গুড়গুড় উপমহাদেশের নারীরা মুখ খুলতে সাহস পায়না। তাদের দিদি-বুবু-খালা-পিসিরা "চুপ চুপ চুপ লোকে জানলে তোকেই খারাপ বলবে" এই শতবর্ষের নীরবতাদায়ী ধামাচাপা মন্ত্রে চুপ করিয়ে দেয়। এমনিতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোন মেয়ে একটা ছবি আপলোড করলেই হামলে পড়ে লালসার লালামাখা বীরপুরুষেরা। সেইখানে হাজির হয় "মেয়েদের পোশাক নির্ধারণী আদর্শ পুরুষ সমাজ"। 

--এইডা কী পরছেন! এমনেই কী কই; মাইয়াগো পোশাকের দোষেই তারা ধর্ষিত হয়। 

ওদিকে বাংলাদেশের এক ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতা তো দিয়ে দেন ধন্বন্তরী থিওরি, মেয়েরা হইলো তেঁতুলের মতোন; তাদের দেখলে পুরুষের লালা তো ঝরবেই। কাজেই ঢাইকা-ঢুইকা চলতে হবে। 

ভারত ও পাকিস্তানের দুই ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতা তো সহমত ভাই হয়ে গিয়ে সিদ্ধান্ত টানেন, মেয়েরা জিনস প্যান্ট পরার কারণেই ভূমিকম্প হয়। 

এতো গেলো ধর্ম-মামাদের ধমক; আরো আছে সংস্কৃতি মামারা; তারাও মেয়েদের আইটেম নাম্বার হিসেবে দেখতে পছন্দ করে। সে আইটেম নাম্বার হতে গেলেও সংস্কৃতি মামাদের অংকশায়িনী হতে হবে। আর টুঁ শব্দটি করা যাবে। ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়ার জন্য প্রাচীন লাল-বাতি এলাকার মোক্ষদা মাসিদের মতো কিছু সোশ্যালাইট আন্টিও রয়েছে সংস্কৃতি জগতে। 

ফলে মি টু-র পক্ষে ঢাকঢাক-গুড়গুড় উপমহাদেশে অভিঘাত তৈরি করা কঠিন হয়। তবুও হলিউডকে কপি করে করে যেহেতু বলিউড শিশুকাল থেকে বড় হয়েছে ; ফলে সেখানে শোবিজের কিছু নারী মুখ খোলে। চলচ্চিত্রে সাধুপুরুষের অভিনয় করা লোকেরা অনেকেই ধরা পড়ে যায়। 

পাকিস্তানের অন্ধকার সমাজে তো নারী কোন অভিযোগ করা দূরের কথা; সে কোথাও নিঃগৃহীত হয়েছে শুনলে তাকে উলটো হত্যা করে সম্মান বাঁচানোর চল। খুনী সমাজ গর্ব করে একে "অনার কিলিং" বলে। ফলে সেখানে বিরাজ করে নিঃগৃহীত নারীর সাইলেন্স টু। 

বাংলাদেশে ফেসবুকে যুবতী মেয়ে দেখলেই, মধ্যবয়েসি সেলিব্রেটি পুরুষ নারীর ইনবক্সে গিয়ে খুচুর-মুচুর করার একটা অভ্যাস ধরা পড়ে যায় ইনবক্স স্ক্রিনশটের মি 'টু'-তে। কিন্তু জমিদার সেলিব্রেটির যেহেতু অনেক কাজের ছেলে থাকে; ফলে ইনবক্সে খুচুর মুচুর-এর জন্য কেষ্টা বেটাই চোর হয়ে যায়। 

বাংলাদেশে মি টু বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে গেলে এগিয়ে আসে; আওয়ামি টু; তারা রীতিমত ২০১টি অত্যন্ত নারী অধিকার সচেতন স্বাক্ষর নিয়ে হাজির হয়ে যায়। আওয়ামি টু'র এক নারী সদস্যকে একটি আপত্তিজনক শব্দ বলার অভিযোগে; এক লোককে রীতিমত কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। 

কিন্তু খুব সাহস করে এগিয়ে আসা দু'টি তরুণীর মি'টু প্রতিবাদে ২০১টি অত্যন্ত অধিকার সচেতন নারীর স্বাক্ষর আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ আওয়ামি টু না হলে তারা অযথা প্রেসক্লাবে গিয়ে গলার রগ ফুলিয়ে নারী অধিকারের কথা আর বলবেন কেন!

জায়গা মতো চুপ করে থাকার এই ঐতিহ্য কওমি টু হিসেবে আগে থেকেই সমাজে প্রচলিত। লেখিকা তসলিমা নাসরিন নারীর প্রতিদিনের নিঃগৃহীত হবার কথা বলার অপরাধে 'সংশপ্তক' উপন্যাসের হুরমতীর মতো কপালে ছ্যাকা নিয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে দেশত্যাগী হলে; সংস্কৃতি মামারা চুপচাপ কওমি টু হয়ে থাকে। এক পর্যায়ে অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছায়, এই মেয়েটার প্রবলেম আছে। ভিকটিমের মধ্যেই প্রবলেম খুঁজে পাবার এই ভাটিয়ালী পদ্ধতিকেই কওমি টু বলা হয়। ভিকটিমের জন্য কিছু করার মুরোদ নেই; সুতরাং সে একটা প্রবলেম! 

সাহস করে প্রতিবাদে এগিয়ে আসা তরুণী দুটি তাই একা একা লড়ে যায়। উলটো তাদের মায়ের চরিত্র নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া শুরু করে অপরাধীদের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের কেয়ার অফ কলতলা সোসাইটি। বড় বড় পেডোফাইল শিল্পপতি বা সংবাদপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ; সুতরাং তাদের সাত খুন মাফ প্রকল্প সক্রিয় হয়ে ওঠে। 

ঢাকঢাক-গুড়গুড় উপমহাদেশের আরেক সমস্যা হচ্ছে ছেলে-মেয়েরা ছোটবেলা থেকে আলাদা স্কুলে পড়ে; একে অপরের জন্য নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষণ প্রয়োজনের চেয়ে বেশী হয়। ফলে তারা রেস্টুরেন্ট বা পার্কে দেখা করতে গেলে কওমি টু ম্যাজিস্ট্রেট আংকেল কিংবা ডিসি আন্টি তাদের গ্রেফতার করে নিয়ে আসে। এতে করে কেবলই নারী-পুরুষ না ভেবে নিজেদের পারসন হিসেবে ভাবার সহজ সংস্কৃতি নেই এতোদঞ্চলে। 

এরফলে আবার বিশাল একটি পুরুষ অংশ বিয়ের পর স্ত্রৈণ হয়ে যায়। নারীরাও নিজেদের মহার্ঘ বস্তু ভাবে। তাদের কাছে প্রেম বা বিয়ে মানেই যেন বিশ্বব্যাংকের কঠিন শর্তের ঋণ দেয়া। সারাজীবন ধরে এই ঋণ শোধ করতে হবে। এর ফলে বিপুল সংখ্যক নিপীড়িত অসহায় প্রেমিক-স্বামী সেই দেবদাসের আমল থেকেই এ সমাজে রয়েছে। প্রেমিকার প্রত্যাখ্যানে আত্মহত্যার সংখ্যা এতোদঞ্চলেই সর্বোচ্চ। স্ত্রী'র কাছে মুখ ঝামটা খেয়ে তার তিরিক্ষি চিতকারে সিন ক্রিয়েটের ভয়ে অনেক স্বামীই কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়ে। এই হি টু গোষ্ঠী চিন্তা করে পায় না; কোত্থেকে এতো মি টু আসে! এ কারণে নারীর কোন প্রতিবাদী মি টু দেখলেই; চুপ করে থাকে হি টু'র নিপীড়িত গোষ্ঠী। 

এই সুযোগে ধর্ম মামা ও সংস্কৃতি মামারা খুশবু ও পাউডার মেখে কন্যা শিশুদের নির্বিঘ্নে নিঃগৃহীত করে চলে। লোকে মন্দ বলবে এই ভয়ে অবলা থেকে যায় অধিকাংশ নিপীড়নের কথা। কারো কন্যা শিশুর সঙ্গে নিগ্রহের ঘটনা ঘটলে পাশের বাড়ির ভাবি জেনে ফেললে; ভাবির বিনোদনহীন জীবনে ফুসফাসের জোয়ার জাগে। খলবল করে হেসে হেসে অন্যভাবীদের সঙ্গে আনন্দে কুটিপাটি হয়; অথচ খেয়াল করে না; তার নিজের কন্যাশিশুই নিঃগৃহীত হয়েছে; কিন্তু ভয় পেয়ে কিছু বলেনি। 

এই শ্বাপদ সংকুল বনে বাচ্চাদের অতি আদরের নামের গাল টেপাটেপি-কান ধরে মুচড়ে দেয়া-চিমটি কাটা-কোলে নিয়ে আদিখ্যেতা করা আংকেল-সমাজকে থামাবে কে! 

যে সমাজে মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত নারীর মি টু প্রতিবাদকেই ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয় কওমি টু সমাজ; আর অবিশ্বাস্য ভেবে চুপ করে থাকে নিপীড়িত হি টু সমাজ; সেখানে নিম্নবিত্ত মা-মেয়েকে ধরে নিয়ে গিয়ে নৌকায় তুলে কিংবা ধানের শীষের ক্ষেতে নির্যাতনের খবর আর কে রাখে! নেহাত ভিডিও'তে ধরা না পড়লে অনাম্নী সাহসিকারা নির্যাতিত হয় পদে পদে; প্রতিদিন; প্রতিরাতে; যে কুরুক্ষেত্রের কথা লিখতে গেলে মি'টু মহাভারত হয়ে যাবে। 

৯৩২ পঠিত ... ১৩:৩৯, নভেম্বর ০৮, ২০১৮

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top