'সংলাপের মেন্যু দেখেই বোঝা যায় ইলেকশন ফেয়ার হবে কিনা'

১০৬৪ পঠিত ... ২০:৫৯, নভেম্বর ০৩, ২০১৮

চিফ রিপোর্টার ভাবছিলেন বসে, কাকে সংলাপের এসাইনমেন্টে পাঠানো যায়। চোখ রাখছিলেন সংলাপ নিয়ে সংবাদগুলোর দিকে। আর অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন সব জায়গায়ই রাজবাড়ির জিয়াফতের গল্প। কত পদের খাবার থাকবে; কোন খাবার কোন হোটেল থেকে আসবে; কোন শেফ বানাচ্ছেন কোন পদ তা নিয়ে বিস্তারিত মেনু সাংবাদিকতা চলছে। 

চিফ রিপোর্টার চোখ রাখেন ফেসবুকে। যে সরকারি সেবক সংঘ (সসেস) ও সরকারি সেবক জনতা (সসেজ) গত প্রায় দশটি বছর  চর্ব্য-চূষ্য-লেহ্য-পেয়তে মোটাতাজা হয়েছে; "সহমত ভাই" মুখে পেস্ট্রি তুলে দিচ্ছেন; এমন সেলফি তুলে কিংবা আজ "রহমত ভাই" পরম আদরে মেজবান দিলেন এমন ফেসবুক স্টেটাসে জুড়ে দিয়েছে টেবিল ভর্তি নানাপদের খাবার ছবি; তাদের অকস্মাত মনে হয়, খাওনের বসন্ত কী চইলা গেলো! যেইভাবে সবাই রাজবাড়িতে জিয়াফত নিতেছে; আমগো ভাগেরটা না আবার খাইয়া ফালায়। 

সসেস ও সসেজ-দের এই ফেসবুকের আকালের সন্ধানে'র "ওরে সব খাওন খাইয়া নিলি; মগর আমগোর লাইগা কিছুই রাখলি না হাহাকার দেখে চিফ রিপোর্টার বিস্মিত হন। আরেক মিডিয়া হাউজের চিফ রিপোর্টারকে ফোন করতেই সে বলে, আরে ভাই দেখছেন নি; রাজবাড়িতে দাওয়াত নিয়া খুচরা সব পার্টির লোকেরা সব খাওন খাইয়া নেওয়ার তাল করছে; মগর আমগো সুখি সাংবাদিক সমিতি (সুসাস)-এর দাওয়াত নাই; ভাল্লাগে না ভাই। 

চিফ রিপোর্টার 'সুসাস সদস্য' চিফ রিপোর্টারটিকে জিজ্ঞেস করেন, ভাই আপনারা এই সংলাপের জন্য কারে এসাইন করতেছেন; ঠিক করছেন কিছু। 

--পলিটিক্যাল বিটের রিপোর্টার বাদ দিয়া লাইফ-স্টাইল পেজের রেসিপি রিপোর্টারদের এসাইন করতেছি; মেনুগুলি চিনতে হবে; বুঝতে হবে; কোন মেনুর মধ্যে কোন ইঙ্গিত; সংলাপের মেন্যু দেখেই বোঝা যায় ইলেকশন ফেয়ার হবে কিনা। নাকি হাতে মুলা ধরাইয়া দিবো এইটা কিন্তু খাওনের মেনুতে ক্লিয়ার হইবো। 

চিফ রিপোর্টার ধপাস করে ফোন রেখে দেন। ফোন করেন একজন সেলিব্রেটি রেসিপি স্পেশালিস্টকে। 

--আপা এই যে সংলাপের যে খাওয়ার মেনু; এর মধ্যে পলিটিক্যাল এঙ্গেল আছে। আপনি যদি একটু কষ্ট করে আজ সন্ধ্যায় একটু স্টুডিওতে থাকেন; খুব হেলপ হয় আপা। 

--আপা বিরক্ত হয়ে বলেন, যে মেনুতে নুডলস নাই; সেইখানে রাজনৈতিক জট খোলার কোন ইচ্ছা আছে বলে মনে হয় না। 

চিফ রিপোর্টার বোঝান, কিন্তু আপা আপনি তো নানারকম খাবারের রেসিপি জানেন; সুতরাং মেন্যুতে যা আছে; তা থেকে নিশ্চয়ই সংলাপের সম্ভাবনা ও ফলাফল বের করতে পারবেন আপনি। 

সংলাপের ভোজসভা'র লাইভ কাভারেজে স্পট থেকে রিপোর্টিং-এর জন্য এসাইন করা হয় খাদ্যবিলাসী এক প্রতিবেদককে। 

লাইভ কাভারেজ শুরু হলে প্রতিবেদক বলতে শুরু করে, খাবো না বলেও ২০ পদের খাবার খেতে শুরু করেছেন সংলাপে আসা নেতারা। কমলা লেবু, আপেল ও তরমুজের শরবত সহযোগে চিপস চিবাইতেছেন তারা। খাবার তালিকায় আছে মোরগ পোলাও, সাদা ভাত, বাটার নান, মাটন রেজালা, রুই মাছের দো পেঁয়াজা, চিতল মাছের কোপতা, রান্না করা মুরগির মাংস, গরুর মাংসের কাবাব, সুপ, নুডলস, মিক্সড ভেজিটেবল। আছে কয়েক ধরনের সালাদ। 

স্টুডিওতে বসে সেলিব্রেটি রেসিপি স্পেশালিস্ট আপা বলেন, চিপসেই যদি ক্ষিদে মরে যায়, মোরগ পোলাও খাবে কীভাবে! মানে সংলাপের আনন্দে ক্ষিদে মরে গেলে ইলেকশানের ক্ষুধা তো আর থাকবে না! আর এতো খাওয়ারের মধ্যে নুডলস দেয়ায় কেউ সেটা খাবে না। ফলে ইলেকশনের জট খোলার সম্ভাবনা তেমন দেখিনা। 

টিভিতে কুড়ি পদের খাবারের বর্ণনা শুনেই সসেস, সসেজ ও সুসাস সদস্যদের জিভে পানি চলে আসে। ফেসবুকে শুরু হয় তাদের আকালের সন্ধানে শীর্ষক সেমিনার। 

--দেখতেছোস আগে কইছিলো জাস্ট চা খাইবো; অখন কুঁতকুঁতাইয়া খাইতেছে; লজ্জাও নাই। 

--লজ্জা থাকবো কেমনে; পতিত খাদকের দল। অন্যদিকে আমগো সহমত ভাইয়েরা দ্যাকছস একদম খাইতেছে না; তাগো কারো মুখ নড়তে দেখলাম না। 

--দশবছর খাইছে মাশাল্লাহ; অহন রুচি পাইতেছে না। 

--দেখছিস বুইড়ার দাঁতের মধ্যে বাটার নান আটকাইছে; কেউ অরে একটা টুথপিক দে। 

--দেখ ঐ বুইড়া খাইয়া আর নড়তে পারতে না; শরীর চলেনা; আসছে পুলিটিশ করতে। 

--পুলিটিশ নারে; পলিটিক্স। 

--ঐ হইলো; আর সহ্য হয়নারে; আমগো ভাগের খাওয়ার সব খেয়ে নিলো। 

টিভিতে খাদ্যালাপের এই জিভহর্ষক লাইভ কাভারেজ দেখে আরেক রাজনৈতিক দলের নেতা তার আসন্ন রাজবাড়ির খাদ্যালাপে সাদা ভাত, লাল আটার রু‌টি, ফুলক‌পি, সিম, আলু ভা‌জি, যেকো‌নও মা‌ছের ঝোল ও মসুর ডাল খাবার আগ্রহ প্রকাশ করেন। 

ফেসবুকের আকালের সন্ধানের কথক বলে, এই বুইড়া আবার দ্যাখ আমরা দশ বছর আগে যা খাইতাম; তা খাইতে চাইছে। ওরা কেন বোঝেনা; এইসব খাবার আর আমাগো "সহমত ভাই"-দের মুখে রুচে না। 

কুড়িপদের খাদ্যালাপে অংশগ্রহণকারী নেতাদের প্রেস ব্রিফিং-এ ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিবেদকেরা; তারা প্রতিবেদনাকর প্রশ্ন করে; এই সংলাপ থেকে আপনাদের প্রত্যাশা কি পূরণ হয়েছে? 

এক নেতা রেগে বলেন, তালগাছ তলায় সংলাপ; তাই একলাফে কী তালগাছে ওঠা যায়! আজকের খাদ্য ছিলো সন্তোষজনক, কিন্তু আলাপ নিয়ে আমি খুশি নই। 

প্রতিবেদক খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে একটা গরম হেডলাইন পাওয়ার আশায় প্রশ্ন করে, নির্বাচন কি আদৌ সুষ্ঠু হবে; নাকি রসনা বিলাসে তৃপ্ত হয়ে আবার আপনারা ঘুমিয়ে যাবেন পাঁচ বছরের জন্য! 

আরেক নেতা উত্তর দেন, আরও সংলাপ হবে; নিশ্চয়ই উভয়পক্ষের বোঝাপড়ার জায়গাটা তৈরি হবে। আমি আশাবাদী। 

ফেসবুকের আকালের সন্ধানে'র কথক বলে, ঈশ্বর পাকস্থলির মাধ্যমে বান্দার হৃদয় জয় করতে জানেন। এই নেতা খাইয়া মনে হইতেছে পল্টি মারার জন্য রেডি। 

আরেকজন বলে, বঙ্গস্থলি বলবি; পাকস্থলি বললে জয় শব্দটির অবমাননা হয় যে সোনা ভাই। 

--কিন্তু ভাই আমার বঙ্গস্থলি তো ক্ষিদায় মোচড়াইতাছে; আইজকাল তো সহমত বুবুরাও আর দাওয়াত দেয়নের টাইম পায়না। সবাই দৌড়াইতেছে নমিনেশানের লটারির পিছে। কী আর করুমরে ভাই; যাই খিঁচুড়ি চড়াইয়া দিই চুলায়; এমন দিন আইলোরে ভাই, রাজবাড়িতে শত্রুরা বইসা কুড়ি পদ খায়; আর আমার বঙ্গস্থলি শুকাইয়া যায়।

১০৬৪ পঠিত ... ২০:৫৯, নভেম্বর ০৩, ২০১৮

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top