ঠান্ডার রাজা এসি, জেলার রাজা ডিসি!

৫১৪৫পঠিত ...২১:০৩, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৭

অতিরিক্ত জেলা শাসক মহোদয় সকালের নাশতা করছিলেন। এমন সময় স্ত্রী তাড়া দেয়, একটু তাড়াতাড়ি করো; বাচ্চার স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে। একথা শুনেই গৃহকর্মী ড্রাইভারকে গিয়ে বলে, স্যার নামতেছেন। 

ড্রাইভার বাসার সামনে গিয়ে জোরে জোরে বলে, শাহী এলান; শাহী এলান; সবাই রাস্তা থেকে সরে যান; আমাদের অতিরিক্ত পরাক্রমশালী শাসক এখন নগর পরিভ্রমণে বের হবেন। 

দুটি শীর্ণকায়া কনস্টেবল বাঁশীতে ফুঁ দিয়ে রাস্তা থেকে পথিকদের ভেড়ার পালের মতো সরিয়ে দেয়। 

স্যার গাড়ীর বাম দিকের পেছনের সুনির্দিষ্ট আসনে বসে যাত্রা শুরু করেন। কোণাকুনি সামনের সিটে বসে ড্রাইভার। স্যারের বাচ্চাটা আবদার করে, আব্বু  আমি আজ তোমার সিটে বসে লোকজনের স্যালুট নেবো। 

স্যার গম্ভীরভাবে বলেন, অযথা আবদার করবে না। প্রোটোকল অনুযায়ী এ আসনে তুমি বসতে পারো না। 

বাচ্চাটা মন খারাপ করে গাল ফুলিয়ে বসে প্রশ্ন করে, আব্বু প্রটোকল মানে কী! 

ড্রাইভার কান খাড়া করে। তারো অনেকদিন ধরে প্রোটোকল অর্থ জানার আগ্রহ। সবাই বলে, তুমি প্রোটোকল ডিউটিতে আছো মিয়া! তোমার আবার ট্রাফিক আইন মানার দরকার কী! সে মনে মনে প্রোটোকল শব্দের একটা অর্থ বানিয়ে নিয়েছে। প্রোটোকল মানে "ভাব" মানে গম্ভীর হইয়া থাকা। এখন দেখা যাক স্যার কী বলেন! 

স্যার বাচ্চাকে বোঝান, এই জেলায় যতজন মানুষ আছে; তাদের মধ্যে জেলা শাসক মহোদয় সর্বোচ্চ অবস্থানে আছেন। আমি আছি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থানে। বাকী সবাই এর নীচে। বৃটিশ আমল থেকে এইজন্য আমাদের বড় লাট বলা হয়। 

বাচ্চা মাথা নেড়ে বলে, উঁহু আব্বু তুমি মেজো লাট; বড় লাট হতে পারোনি। 

স্যার খুবই বিরক্ত হন। ড্রাইভারকে তাড়া দেন। তাড়াতাড়ি একে স্কুলে নামিয়ে দাও। 

স্কুলের গেটে ঢোকার পথে স্যার দেখেন একটা গাড়ী স্কুলের গেটে ঢুকতে যাচ্ছে! 

স্যার ড্রাইভারকে ধমক দেন, তোমাকে বলেছিলাম রাস্তা খালি করতে; এইটা কার গাড়ী! 

--এইটা সিভিল সার্জন সাহেবের গাড়ী। 

--সে কী জানে না প্রোটোকল অনুযায়ী আমার গাড়ীর আগে সে স্কুলের গেটে ঢুকতে পারে না। যাও ডাক কইরা আনো! 

সিভিল সার্জন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে আসে, পাইছেন কী আপনি! একটু দেরি সয়না ক্যানো! 

স্যার উত্তেজিত হয়ে বলেন, মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ। প্রোটোকল মেনে চলুন। 

এরপর অতিরিক্ত শাসকের সঙ্গে সিভিল সার্জনের হাতাহাতি হয়ে যায়। অতিরিক্ত শাসক ফোন করে বড় লাটের অফিসে সিভিল সার্জনের অসদাচরণের অভিযোগ করেন। 

কতগুলো হৃষ্টপুষ্ট পুলিশ এসে সিভিল সার্জনকে অকুস্থল থেকে গ্রেফতার করে বড়লাটের দপ্তরে নিয়ে যায়। সেখানে পৃথিবীর দ্রুততম  সময়ের মধ্যে ভ্রাম্যমান আদালত বসে যায়। প্রবল আইনের শাসন বলে কথা। 

ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব গম্ভীরভাবে রায় দেন, অতিরিক্ত জেলা শাসকের সঙ্গে অসদাচরণের দায়ে অভিযুক্ত সিভিল সার্জনকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেয়া হলো। 

সাবেক ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন সালাহ উদ্দিন শরীফকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে!

সিভিল সার্জনের কারাদণ্ড হবার খবরটা গোটা এলাকায় উপকথার মতো ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আর বড়লাটের দপ্তরের কোন সভ্যের গাড়ী নিয়ে রাস্তায় বের হলে পুলিশের বাঁশী দেয়ার প্রয়োজন হয় না। এমনিতেই প্রজারা রাস্তা থেকে সরে যায়। রাস্তার পাশের গর্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে সারি সারি সালামের সমবেত সংগীত গেয়ে চলে প্রজারা। 

চায়ের স্টলে আলাপের প্রসঙ্গ একটাই। প্রশাসনের দাপট। এক তরুণ এক নবতিপর বৃদ্ধকে বলে, অতিরিক্ত শাসক স্যার বয়সে সিভিল সার্জনের চেয়ে অনেক কম; কিন্তু পাওয়ারে অনেক বেশি; ঠিকই জেলে ভইরা দিলো! দেখছেন নি চাচা। তা আমি তো আন্নের চেয়ে বয়সে কম হইলেও পাওয়ার বেশি; ওয়ার্ড কমিটিতে আছি; লন এককাপ চা খাওয়ান। 

একটা মদ্যপ খোয়াড়িতে কেঁপে কেঁপে তরুণটিকে ধমক দেয়, দোষটা ডাক্তারের। রাজার লগে টক্কর দিতে যাওয়ার কী কাম আছিলো! 

নবতিপর বৃদ্ধ মাথাটা স্প্রিং-এর মতো মাথা দুলিয়ে বলেন, বৃটিশ আমল আইয়া পড়ছে দেহি; তহন রাইতে ঘুমাইতে না চাইলে মা-খালা-ফুফুরা বলতো, ঘুমা শয়তান, ঐ যে বড়লাটের পুলিশ আইতাছে কইলাম। আর অমনি আমরা বাচ্চারা ভয়ে ঘুমাইয়া পড়তাম।

৫১৪৫পঠিত ...২১:০৩, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৭

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
    আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

    আইডিয়া

    গল্প

    রম্য

    সঙবাদ

    সাক্ষাৎকারকি

    
    Top