আমেরিকায় পড়তে গেলে সেখানকার সংস্কৃতির যে ৭টি ব্যাপার অবশ্যই খেয়াল রাখবেন

১৯৯১৫পঠিত ...১৭:৫১, নভেম্বর ০৪, ২০১৭

ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের এক যান্ত্রিক পাখিতে চড়ে ১৪ বছর আগে আমি আমেরিকাতে পিএইচডি করতে এসেছিলাম। আমার জন্য সেটা বহুদিক থেকেই নতুন ব্যাপার--জীবনে প্রথম প্লেনে চড়া, প্রথমবারের মতো মহাসাগর পেরিয়ে অন্য মহাদেশে যাওয়া। এখন শিক্ষকতার কারণে অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে আমিই আমার গ্রুপে নিয়ে আসি, আর প্রচুর বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ আছে। দেশের ছাড়াও অন্য দেশের শিক্ষার্থীদের পড়াই ক্লাসে। ভিনদেশ থেকে আমেরিকায় পড়তে আসা এই শিক্ষার্থীদের জন্য আমেরিকার সংস্কৃতি, রীতিনীতি এসব অনেক ক্ষেত্রেই পুরোপুরি নতুন। চিরচেনা সবকিছুর চাইতে আলাদা এই পরিবেশে খাপ খাওয়াতে গিয়ে অনেকেই বিশাল সমস্যায় পড়েন। গত এক যুগের বেশি সময় ধরে প্রথমে নিজে দেখে এবং পরে আমার শিক্ষার্থীদের দেখে এই কালচারাল শকগুলোকে ভালো করে দেখা ও জানা হয়েছে। এই লেখাটা আমেরিকায় আসা শিক্ষার্থীদের জন্য-- কীভাবে এখানকার জীবনে খাপ খাওয়াবেন, তা নিয়ে। এ নিয়ে মোটামুটি একটা বই লেখা সম্ভব, এখানে তবুও ৭টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

১) ধন্যবাদের সংস্কৃতি
মার্কিনীরা খুব মিশুক জাতি। পথে ঘাটে অপরিচিত কারো চোখে চোখ পড়লে হাসি দিয়ে বলবে 'সুপ্রভাত, কেমন আছেন? ভালো তো?' মনে করুন লিফটে উঠলেন, আপনার পরে যিনি ঢুকছেন তিনি আপনাকে দেখে এমন কুশলাদি ধরণের কথা বলবেন, আবার বেরোবার সময় 'হ্যাভ আ নাইস ডে' বলে বেরোবে। এছাড়াও সবকিছুতেই ধন্যবাদ দেয়ার চল। এই ব্যাপারগুলো আমাদের দেশের সংস্কৃতিতে খুব বেশি নেই। ফলে প্রথম প্রথম অবাক হতে পারেন যে অপরিচিত কেউ হাত নাড়ছে কেন, অথবা আগ বাড়িয়ে কথা বলতে আসছে কেন! আবার দোকানদার আপনার পয়সা দিয়ে কেনা জিনিস হাতে দিলে আপনি কেন থ্যাংক ইউ বলবেন, সেটা নিয়েও খাবি খেতে পারেন। সহজ সমাধান, প্রতিটি বাক্যেই প্লিজ বলার অভ্যাস করুন, আর কেউ কিছু দিলে, জানালে, তাকে অকুণ্ঠ্য ধন্যবাদ দিতে থাকুন থ্যাংক ইউ বলে। আর চলার পথে কারো চোখে চোখ পড়লে হাই বলার অভ্যাস করুন। কেউ এটা বলার মানে আবার ধরে নেবেন না সে খাতির জমাতে চায়। হোমওয়ার্ক বা পরীক্ষার চাপে ভর্তা হয়ে গেলেও গোমড়া মুখে প্যাঁচার মতো চেহারা করে না থেকে হাসিমুখ করে থাকার অভ্যাস করুন।

২) প্যাঁচানো বাদ দেয়া
কথাবার্তা সরাসরি বলুন ও লিখুন। ছোটবেলায় পিতার কাছে টাকা চাহিয়া পত্র লেখার যে ভনিতা অভ্যাস হয়ে গেছে, সে ধরণের অভ্যাসগুলো বাদ দেন। গেট টু দ্য পয়েন্ট। অতি বিনয় অতি ভনিতা করতে থাকলে মূল বিষয় বাদ পড়ে যায়। তার উপর জিআরই, টোফেল থেকে যেসব দুর্বোধ্য শব্দ শিখেছিলেন, সেগুলা দ্রুত ভুলে যান, ঐসব আমেরিকাতে কেউ কথ্য ভাষায় ব্যবহার করে না। ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করুন, কম্পাউন্ড বা কমপ্লেক্স বাক্য ব্যবহার করা কথায় বা লেখায় দুই ক্ষেত্রেই বাদ দেন।

৩) দরজা ধরে রাখার ভদ্রতা
দরজা ধরে রাখার ব্যাপারে আমেরিকার লোকজনের সৌজন্য রীতিমতো লিজেন্ডারি। ব্যাখ্যা করে বলি, ধরা যাক আপনি কোনো দোকানের দরজা খুলে ঢুকবেন। আপনার পেছনে একজন আসছে। এখানকার রীতি হলো, ভদ্রতা করে দরজাটা পেছনের লোকের জন্য খুলে ধরে রাখা। বড় শহরে হয়তো কেউ এটা কেয়ার করে না, কিন্তু অধিকাংশ কলেজ টাউন মানে ছোট শহরে দরজা ধরে রাখার ভদ্রতাটা সবাই আশা করে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আপনি নিজেই চাপে পড়বেন, আপনি হয়তো ১০০ ফুট দূরে, কিন্তু আপনার সামনের ভদ্রলোক দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে, আপনাকে তাই হন্তদন্ত হয়ে হবে যেতে। আর এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে ভুলবেন না।

৪) চোখে চোখ রাখা
কথা বলার সময়ে চোখে চোখ রেখে কথা বলাটা বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে একটা বিশাল ট্যাবু। 'কত্ত বড় বেয়াদব, চোখ তুলে কথা বলে' এই ব্যাপারটা ছোটবেলা থেকে আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয় বা ঢুকে যায়। ফলে মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে টিচারের বা বসের সঙ্গে কথা বলাটাই বাংলাদেশের রীতি। আমেরিকায় ব্যাপারটা পুরোপুরি উল্টা। কারো সঙ্গে কথা বলার সময় যদি চোখে চোখ রেখে কথা না বলেন, সবাই সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাবে, ধরে নেবে আপনার মাথায় কোনো সমস্যা আছে বা আপনি চরম লাজুক অসামাজিক রোগী। কাজেই চোখে চোখ রেখে মাথা উঁচু করে কথা বলুন, ওখানে সেটা বেয়াদবি ধরবে না কেউ। তবে এর আবার উল্টো দিকও আছে, কারো দিকে অদরকারে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকাটা সন্দেহজনক, সেটা ভুলেও করবেন না।

৫) মিশুক কাউকে ভুল বোঝা
এই পয়েন্টটা বিশেষ করে ছেলেদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আমেরিকায় বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যত্র কেউ হাসিমুখে আপনার সঙ্গে কথা বলছে বা হাই বলছে তার মানে কিন্তু এই না যে সে আপনার ব্যাপারে আগ্রহী। কাজেই কেউ আপনার সঙ্গে ভালো করে মিশলে তার ব্যাপারে রোমান্টিক চিন্তা শুরু করে দিলে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করলে বিশাল সমস্যায় পড়বেন। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের ব্যাপারে ছাড় দেয়া হবে না, ভুল বুঝে অফেন্সিভ উল্টাপাল্টা কিছু করে ফেললে জেলে যেতে হবে নিশ্চিত!

৬) স্টুডেন্টের সঙ্গে কখনো প্রেম নয়
বাংলাদেশে টিউশনির শিক্ষকেরা অহরহ ছাত্রীদের সাথে রোমান্টিক সম্পর্কে জড়ান, এই ব্যাপারটাকে ডাল ভাত ধরা হয়। হুমায়ুন আহমেদের গল্পে প্রায়ই গোবেচারা গৃহশিক্ষকের কিংবা কলেজের শিক্ষকদের দেখা যায় ছাত্রীর প্রেমে পড়তে। যারা উচ্চশিক্ষার্থে আমেরিকায় আসছেন বা আসবেন, তারা অনেকেই টিচিং অ্যাসিসটেন্ট হিসাবে আন্ডারগ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীদের ল্যাব কিংবা ক্লাসে পড়াবেন। সাবধান, ভুলেও দেশের মতো করে ক্লাসের শিক্ষার্থীদের দিকে রোমান্টিক নজর দেবেন না। শিক্ষার্থীর কাছ থেকে আগ্রহ আসলেও না। আমেরিকার শিক্ষাক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা প্রচন্ড রকমের আন-এথিকাল বা অনৈতিক ধরা হয়, এবং এটাকে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট ধরা হয়, এমনকি যদি দুই পক্ষের সম্মতি থাকেও! যতদিন পর্যন্ত আপনি কারো শিক্ষক থাকবেন, তার সঙ্গে এমন কোনো সম্পর্কে যাওয়া ওখানে বেআইনি। আবার কোনো কোনো স্টেটে এটা কঠিন রকমের অপরাধ-- যেমন অ্যালাবামা রাজ্যে ১৯ বছরের কমবয়সী কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে রোমান্টিক বা অন্য সম্পর্ক বেশিদূর গড়ালে দীর্ঘ মেয়াদী জেলের সুব্যবস্থা আছে। কাজেই টিচিং অ্যাসিসটেন্ট হিসাবে আপনার কাজ যেন কেবলই টিচিং হয়, সেটা খেয়াল রাখুন।

৭) এথিক্স
এথিক্স ব্যাপারটা আসলে কেবল বাংলাদেশের না, আমেরিকার বাইরে বিশেষ করে এশিয়ার প্রায় সব দেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেই সমস্যার সৃষ্টি করে। আমাদের দেশে কোর্সওয়ার্কে অ্যাসাইনমেন্ট কপি করা, একজনে লিখলে সেটাকে বাকি সবাই চোথা মেরে দেয়া, অথবা বই থেকে হুবুহু টুকে, ইন্টারনেট থেকে কপি-পেস্ট করে দেয়া, পরীক্ষার সময় পাশের জনের খাতায় উঁকি দেয়া, এগুলো যে চরম গর্হিত কাজ, সেটা খুব বেশি কেউ মনে হয় ভাবে না। সমস্যাটা হলো আমেরিকার শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ করে ইউনিভার্সিটিগুলাতে এসবের ক্ষেত্রে প্রচন্ড কড়া অনার কোড আছে। নকল করে এসাইনমেন্ট জমা দিলে ধরা খাবেন নিশ্চিত, কারণ নকল ধরার সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয় (যেমন Turnitin)। অধিকাংশ ইউনিভার্সিটিতে প্রথমবার ধরা খেলে ঐ অ্যাসাইনমেন্টে শূণ্য পাবেন, ওয়ার্নিং দেয়ার পরে আবারও যদি ধরা পড়েন একই কোর্সে, তাহলে কোর্সে সরাসরি এফ গ্রেড তো পাবেনই, তার উপরে এটা ডিনের কাছে রিপোর্ট হবে, বহিষ্কার হয়ে যাবার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এমনকি কোনো জায়গা থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিলে সূত্র উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক, আর কোন অংশ উদ্ধৃতি সেটা স্পষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে। যেকোনো কিছু ইন্টারনেট থেকে বা বই থেকে কপি না করে নিজের ভাষায় লিখতে হবে। আর যেসব অ্যাসাইনমেন্টে একা কাজ করার কথা, সেখানে নিজের হোমওয়ার্ক নিজেকেই করতে হবে।

অলংকরণ: রাকিব রাজ্জাক

১৯৯১৫পঠিত ...১৭:৫১, নভেম্বর ০৪, ২০১৭

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
    আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

    কৌতুক

    গল্প

    রম্য

    সঙবাদ

    সাক্ষাৎকারকি

    স্যাটায়ার

    evolution22
    
    Top