এখনকার পোলাপানের উপর আমি যে কারণে হতাশ

১১১৩ পঠিত ... ১৪:৩০, মার্চ ০৯, ২০১৯

এখনকার পোলাপান নিয়ে মাঝে মাঝেই আমি হতাশ হই। পোলাপান যা করে, হতাশ না হয়ে উপায় কী? আমরা যখন ছোটো ছিলাম, অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অন্যের বাসার কলিং বেল বাজিয়ে দৌড়ে পালাতাম। দীর্ঘ বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে কোনোদিনও বেল বাজিয়ে ধরা পড়ার রেকর্ড নেই আমার। মনে আছে, আমাদের যন্ত্রনায় অতিষ্ট হয়ে বিল্ডিংয়ের অনেকেই কলিং বেল খুলে ফেলেছিলো। তিনতলার বাবুল ভাইদের কলিং বেল তো বাজাতে বাজাতে জ্বালিয়েই ফেলেছিলাম। কিন্তু ধরা খাইনি কখনো।

অলংকরণ: ম্যাকবেথ নীল

কিন্তু এখনকার পোলাপান! কলিং বেল বাজিয়ে ঠিকমতো পালাতেও পারে না। এর চেয়ে হতাশাজনক আর কী হতে পারে? আরে ভাই, এই শিক্ষা তো প্রকৃতি থেকে নিতে হয়, এর জন্য কেউ কোচিং সেন্টার খুলবে না। ইউটিউবে দেবে না টিউটোরিয়াল। নিজেকেই শিখতে হবে। নিজের সৃজণশীলতা, আত্মবিশ্বাস কাজে লাগিয়ে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে আয়ত্ব করতে হবে এই অসামান্য প্রতিভা!

আসলে আমি কোনোদিনও ভাবিনি যে, কারও বাসার কলিং বেল বাজিয়ে পালিয়ে যাওয়া একটা প্রতিভা। এটা তো খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। প্রথমে একটা বাসা বেছে নিবা। আশেপাশে কেউ না থাকলে একটানা কয়েকবার কলিং বেল চেপে ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবা। এখন তো আরও সুবিধা, লিফট আছে। উপরে নিচে যেখানে ইচ্ছা নেমে যাও, কেউ টের পাবে না। সিঁড়ি দিয়ে নামলে আরও ভালো। নামতে নামতে একসঙ্গে চারতলা থেকে শুরু একেবারে একতলা পর্যন্ত কলিং বেল বাজানো যায়। এতে সব বাসা থেকে বের হয়ে আসে মানুষ। কিছুক্ষণ চিল্লাপাল্লা করার পর হয় কুশল বিনিময়-

আর বলেন না, পোলাপান এত দুষ্টু, কলিং বাজিয়ে পালাইছে!
হ্যাঁ! কী করবেন! তো আজকে কী কী আইটেম রান্না করলেন?
তেমন কিছু না, প্রতিদিন যা করি তাই। কিন্তু ছেলে আবার হালিম খেতে চাচ্ছে।

কী সুন্দর সম্পৃতি, সৌহার্দ- যা আজকাল দেখাই যায় না। দেখা যাবে কিভাবে? এখনকার পোলাপান তো ঠিকমতো কলিং বেল বাজানোই শিখলো না। এই তো দুদিন আগে, এমন এক পিচ্চিকে হাতেনাতে ধরলাম আমি। পিচ্চির বয়স ১০/১২। মনের আনন্দে কলিংবেল বাজাচ্ছিলো। আমি ঘরেই ছিলাম। কিছু না বলে চুপচাপ দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ১০-১৫ বার বেল বাজিয়ে পিচ্চি দিলো দৌড়। কী বোকা, দৌড় দিলে শব্দ হবে কেন? আমি দরজা খুললাম না, দাঁড়িয়েই রইলাম। কারণ, এটা অলিখিত নিয়ম যে, দরজা না খুললে পিচ্চি আবার আসবে। হলোও তাই। পিচ্চি আবার এসে মনের সুখে বেল বাজাতে লাগলো। আমি নি:শব্দে দরজা খুলে চুপচাপ ওর সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। বেল বাজানোতে পিচ্চি এতই ব্যস্ত ছিলো, আমি যে দাঁড়িয়ে আছি তা খেয়ালই করে নাই।

বাজানো শেষ করে ঘুরতেই আচমকা আমাকে দেখে এত ভয় পেল, চমকে দুই হাত দূরে সরে গেলো পিচ্চি। আমি নির্বিকার। পিচ্চি মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছে মেঝের দিকে। একবার ভাবলো চলে যাবে, আবার গেলোও না। আমি চুপচাপ চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকলাম। (এটা আমি স্কুলে থাকতে শিখেছিলাম, এখনও ভুলিনি দেখা যাচ্ছে)। পিচ্চি ভয়ে ভয়ে বলল,
- আর বেল টিপবো না।
- তুমি কোথায় পড়ো?
- এমআইটিতে।
- এমআইটি? বলো কী! কোন এমআইটি?
- মিরপুর ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়াল।
- কী কী শিখায় তোমাদের?
- সব। ইংলিশ, বাংলা, ম্যাথ।
- কলিং বেল বাজানো শিখায় না?
- জি না।
- তাইলে বেল বাজাচ্ছিলা যে?
- আর কোনোদিন বাজাবো না।
- এমনিতেই বাজাচ্ছিলা নাকি কোনো কারণ আছে? তোমার ভালো লাগলে আরও বাজাতে পারো। টুল এনে দেই?
- আর কোনোদিন বাজাবো না।
- ওই যে দেখ, ঘরে আংকেল ঘুমাচ্ছে, এভাবে বেল বাজালে ওনার ঘুম ভেঙে যাবে না?
- আর কোনোদিন বাজাবো না।
- ঠিক আছে, যাও গা।

পিচ্চি দেখি যায়ও না। নিচের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আগের মতোই। আমি আবার বললাম, 'যাও, কোনো সমস্যা নাই। আমরা বাসায় না থাকলে এসে বাজাইয়ো।' তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলো পিচ্চি।

এইটা গত রবিবারের ঘটনা, আজ রবিবার। এখনও পিচ্চি কলিং বেল বাজায় নাই। তো এই পোলাপান দেখে হতাশা তো আসবেই। আমি হইলে ওই রাতেই আবার বাজাইতাম। তারপর থেকে প্রতিদিন ভোরে। দুপুরে। রাতে। একবার। দুইবার। বারবার।

আসলেই এদের দিয়ে কিছু হবে না।

১১১৩ পঠিত ... ১৪:৩০, মার্চ ০৯, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top