নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের রম্যগল্প 'ইদু মিঞার মোরগা'

২৫৩ পঠিত ... ১৬:৫৮, জুন ২৩, ২০১৯


 

বৌ জোহরা প্রায়ই ঝগড়া করে:

ওটাকে এবার বিক্রি করে দাও না। দিব্যি তেল চুকচুকে হয়েছে, গোস্ত হয়েছে অনেক। এখন বেচলে কোন না চারটে টাকাও দাম পাওয়া যাবে ওর।


কিন্তু ইদু মিঞা কিছুতেই রাজি হয় না। বলে, এখন থাক।

: থাক? কেন থাকবে? খাসি মোরগ-গোস্ত খাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ তো লাগবে না। মিথ্যে পুষে লাভ কি?

: ওকে পুষতে তোমার কি খুব খরচ হয়েছে? ইদু মিঞা কান থেকে একটা বিড়ি নামায়: ঘরের খুদকুটো আর আদড়ে-পাঁদাড়ে যা পায় কুড়িয়ে খেয়ে বেড়ায়। ওর জন্যে তোমার চোখ টাটায় কেন? 

জোহরা বলে, এমন টাটায় না। আর ক-দিন পরে বুড়ো হয়ে যাবে, পোকা পড়বে গায়ে, শক্ত ছিবড়ে হয়ে যাবে মাংস। আট গন্ডা পয়সাও কেউ দেবে না তখন।


: দরকার নেই । ও যেমন আছে তেমনি থাক।

শুনে গা জ্বালা করে জোহরার।

: বেশ তো বেচে না তুমি। একদিন নিজেই আমি ওটাকে কেটে উনুনে চড়াব।

বিড়িটা ধরতে ধরতে শান্ত কঠিন গলায় ইদু মিঞা বলে ;তা হলে সেদিনই আমি পাড়া-পড়শি জড়ো করবো সমস্ত। তারপর সকলের সামনে চেঁচিয়ে তিনবার বলবো; তালাক- তালাক- তালাক। 

: এতবড়ো কথা তুমি বলতে পারলে আমাকে! আমার চাইতে ওই খাসি মোরগটাই বড়ো হল তোমার কাছে! -জোহরার চোখে জল আসে: বেশ তাই হোক। আমাকে তুমি তালাকই দাও। 

 

জোহরার চোখের জল অনেকবারই অনেক অঘটন ঘটিয়েছে ইদু মিঞার জীবনে। ডাইনে চলতে গিয়ে অনেকবার বাঁয় ঘুরেছে-যাদের সঙ্গে দাঙ্গা করতে চেয়েছিল আপস করে নিতে হয়েছে তাদের সঙ্গে। কিন্তু এই একটি মাত্র ক্ষেত্রে ইদু মিঞা কিছুতেই বশ মানতে রাজি নয়। কি যে টান তার পড়েছে ওই মোরগটার ওপর, নিজেও খাবে না, কাউকে বিক্রিও করবে না। 

খরিদ্দার এসে হয়তো বলে, কাল দাওয়াত আছে, তোমার খাসি মোরগটা হলে বেশ কুলিয়ে যায়। 

: খাসি মোরগটা না হলেও তোমার কুলিয়ে যাবে মিঞা। আরো দশটা তো রয়েছে, যেটা খুশি বেছে নাও না। ওটা আমি বেচবো না।

: বেচবে না? কেন বেচবে না? তিন টাকা দিচ্ছি- 

: দশ টাকাতেও বেচবো না ।

: হঠাৎ এত দরদ কেন? ধর্মব্যাটা নাকি তোমার? 

: আমার যাই হোক, তোমার কি? -ইদু মিঞা চটে ওঠে: আমি ওটা বেচবো না। এই আমার পাকা  কথা ব্যাস।

লোক জানাজানি হয়ে গেছে এখন খাসি মোরগটা ইদু মিঞার ধর্মব্যাটা! শুধু গজগজ করে জোহরা।

: এত হাঁস-মোরগী শেয়ালে-ভামে খেয়ে যায়, ওটাকে তো ছোঁয়ও না! ওটা যমের অরুচি!

ইদু মিঞা বিষ্ণণ্ণ হয়ে বসে থাকে। একটা কথা গলার কাছে এসে থমকে দাঁড়ায়, কিন্তু কোনো মতেই বলতে পারে না সেটা। কেমন সঙ্কোচ আসে- কেমন মনে হয় কেউ তাকে বুঝবে না।

সে নিজেই কি বোঝে কেন এমনটা হল? 

জ্ঞান হওয়ার পর থেকে হাজার হাজার মুরগি জবাই দিয়েছে সে। আজও দিতে হয়। কিন্তু মাত্র দু’বছর আগে-

বাড়িতে কুটুম এসেছিন। মুরগি কাটতে হবে। প্রথমেই ইদুর নজর পড়ে ছিল ওটার দিকে। দিনের বেলা মুরগি ধরা সহজ নয়।

পাঁচ-ছ’জন মিলে ওটার পিছনে ছোটাছুটি শুরু করে দিলে। সারা উঠোনময় দৌড়ঝাঁপ চলতে লাগালো। ইদু উঠোনের পেয়ারাতলায় বসে দেখছিল ব্যাপারটা। মোরগাটা হয়তো টের পেয়েছিল-যেমন করে সমস্ত প্রাণীই টের পায়। যে কারনে কসাই এসে দড়ি ধরলে গোরু কিছুতেই নড়তে চায় না। যে কারনে ছুরি আনবার আগেই পাঁঠা ব্যা ব্যা করতে থাকে। সেই কারনেই ওটা কিছুতেই ধরা দিতে চাইছিল না। তারপর যখন দেখল আর আত্মরক্ষার আশাই নেই, তখন পাগলের মতো ছুটতে ছটতে একেবারে ইদু মিঞার কোলের মধ্যে এসে পড়ল।  

ইদু তৎক্ষণাৎ ওরা গলা টিপে ধরতে যাচ্ছিল, কিন্তু থমকে গেল হঠাৎ। থর থর করে একটা অদ্ভুত ভয়ে কাঁপছে মোরগটা। বিচিত্র কাতর প্রার্থনায় তাকাচ্ছে তার দিকে, আর ভয়ার্ত শিশুর মত আশ্রয় খুঁজছে তার ভেতরে।

একটা আশ্চর্য করুণায় ইদুর সমস্ত মন ভরে উঠলো। মোরগটা বুকে জড়িয়ে ধরে সে উঠে দাঁড়াল, বলল, এটা থাক- অন্য মুরগি জবাই হবে আজ।

সেই থেকেই ওটা গোকুলে বাড়ছে। মধ্যে মধ্যে চূড়ান্ত বিরক্তিতে ইদুর মনে হয়, সংসারে কি একরাশ লকলকে জিভ ছাড়া কিছুই নেই আর? মানুষ যা দেখে তাই খেতে ইচ্ছে করে তার? একটু স্নেহ নেই,একটু করুণা নেই-একবিন্দু সহানুভুতি নেই কোথাও? 

বাইরে থেকে কঁক কঁক আওয়াজ উঠল একটা। তারপরেই ক্যাঁ ক্যাঁ করে কয়েকটা তীব্র আর্তনাদ,সন্দেহ নেই-ওই খাসি মোরগটারই গলা।

ইদু দাঁড়িয়ে উঠল তড়াক করে। একটা অঘটন ঘটেছে নিশ্চয় । শেয়াল এসে ধরল নাকি দিনের বেলাতেই? তারপরেই মুরগির ক্যাঁ ক্যাঁ একটানা আওয়াজ ছাপিয়ে দরাজ গলার হাঁক উঠলো ইদু শেখ আছ নাকি-ও ইদু শেখ?

একটা তীব্র সন্দেহে এক লাফে ইদু মিঞা বেরিয়ে এল বাইরে।

অনুমান নির্ভল। বাইরে দাঁড়িয়ে আছি দবিরুদ্দিন দফাদার। হাঁড়েলের মতো প্রকান্ড মুখে চরিতার্থ হাসি। তার হাতের ভেতরে মোরগটা প্রাণপণে ছটফট করছে আর চিৎকার জুড়ে দিয়েছে তারস্বরে।একটা দড়ি দিয়ে শক্ত করে দবিরুদ্দিন বাঁধছে মোরগের পা দুটো।

ইদু আর্তস্বরে বললে, ওটা ধরেছ কেন দফাদার সাহেব?ছেড়ে দাও ওকে। 

দৈত্যর মতো চেহারার দবিরুদ্দিন কাঠচেরার মতো খরখরে আওয়াজ করে হাসল।  :

বড়ো জবরদস্ত মোরগা মিঞা, এমনটি সহজে দেখা যায় না। ধরেছি যখন আর ছাড়ছি না। কত দাম চাও-বলো।

: খোদার কসম-আমি ওটা বেচব না। 

দবিরুদ্দিন কথা বাড়াবার দরকার বোধ করল না। খাকি রঙের সরকারী জামাটার পকেটে হাত দিয়ে দুটো রুপোর টাকা বার করে আনল। তারপর ঠন ঠন করে ইদুর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে ব্ললে, দেড় টাকার বেশি দাম হয় না-এই নাও,পুরো দুটো টাকাই দিলাম।

ইদু প্রায় হাহাকার করে উঠল।

: ওকে ছেড়ে দাও দফাদার সাহেব, আল্লার দোহাই- ছেড়ে দাও ওকে। আমি কিছুতেই প্রাণে ধরে ওটাকে কাটতে দিতে পারবো না। 

: শেষে মোরগার ওপর দরদ উথলে উঠেছে নাকি? সোভান আল্লা!-আবার কাঠচেরার মত করকরে আওয়াজ তুলে হাসলো দফাদার। তারপর হাঁটতে শুরু করল গজেন্দ্র- গমন-মোরগটার কাতর আর্তনাদ যেন ছুরির পোঁছের মতো ইদুর বুকে এসে বিঁধতে লাগল।

ইদু মিঞা শেষবার অসহায় গলায় ডাকল: দফাদার সাহেব! 

দফাদার জবাব দিল না। দরকারই বোধ করল না আর।

 কয়েক মুহূর্ত ইদু দাঁড়িয়ে রইল পাথর হয়ে। তারপর চুপ করে বসে পড়ল ধুলোর ওপর। চোখের জলে দু’-চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। মোরগের কাতর মিনতি এখনো কানে ভেসে আসছে তার।

ছুটে এলো জোহরা! আশ্চর্য, মুরগির ওপরের সমস্ত ক্রোধটা তখন তার দফাদারের ওপর গিয়ে পড়েছে।-জোর করে কেড়ে নিয়ে এ কি জুলুমবাজি।

আকাশের দিকে হাত তুলে জোহরা বললে, ওই মোরগ কখনো ও খেতে পারবে না। খোদা আছেন। তিনিই বিচার করবেন। 

গরীবের প্রার্থনা খোদা কখনো শুনতে পান না। তিনি হাইকোর্টের জজের মতো। উকিল-ব্যারিস্টারকে বিস্তর টাকা খাওয়াতে পারলে অর্থাৎ মোল্লা-মৌলবীদের যুতমতো ভোট যোগাতে পারলে তবেই আরজি পেশ করা যায় তাঁর দরবারে। সবাই এ কথা জানে, দবিরুদ্দিন দফাদারও জানত। কিন্তু আজ বোধহয় তিনি বোগদাদের বাদশা হারুন-আল-রশিদের মতো ছদ্মবেশে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন। তাই জোহরার প্রার্থনা তিনি শুনতে পেলেন। মোরগটা সত্যিই দবিরুদ্দিনের ভোগে লাগল না।

খানিক দূরে হাঁটতেই দেখা হয়ে গেল দীন মহম্মদ দারোগার সাঙ্গে। একটা সাইকেলে করে থানার দিকে ফিরছিলেন। অভ্যাস বশে দাঁড়িয়ে পড়ল দফাদার-সজোর সেলাম ঠুকলো একটা ।  

দারোগা পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, ঝাঁ করে নেমে পড়লেন হঠাৎ। তাঁর চোখ মোরগের দিকে গিয়ে পড়েছে।

: খাসা মোরগটা তো দফাদার। কিনলে নাকি?

মুহূর্তে দফাদার বুক শুকিয়ে গেল। 

: জী হুজুর, কিনলাম বৈকি। বিনে পয়সায় আমাদের আর কে দিচ্ছে এসব?

: বড়ো ভালো চিজ, আজকাল এমনটি আর দেখাই যায় না।

দারোগা ঠোঁট চাটলেন।

:জী হ্যাঁ।

সন্ত্রস্ত গলায় দফাদার জবাব দিলে। 

দারোগা আর একবার মোরগটার দিকে তাকালেন, তাকিয়ে দেখলেন মোটা মোটা পা দুটোর দিকে। সঙ্গে সঙ্গে ওটা হাঁড়ি-কাবাবে পরিণত হয়ে গেল; রসুন ঘি আর মসলা-জর্জরিত বাদামী রঙের হাঁড়ি-কাবাবটি যেন একবারে দারোগার নাকের সামনেই দুলতে লাগল। আর ওই সঙ্গে যদি পোলাও হয়-এর পরে আর চক্ষুলজ্জার আবরণ না দারোগা। 

: দাও হে দফাদার, ওটা আমার সাইকেলেই বেঁধে দাও।

দবিরুদ্দিন মুখ কালো করে বললো, কিন্তু হুজুর-

দারোগা সংক্ষেপে বললেন, ঠিক আছে, তুমি আর একটা কিনে নিও। কত দিতে হবে দাম?

ক্রোধে হতাশায় দবিরুদ্দিনের চোখ ধক ধক করে উঠল। মুখের গ্রাস যখন কেড়ে খাবেই, তখন কিসের এত খাতির?

দবিরুদ্দিন শুকনো গলায় বললে, তিন টাকা দেবেন হুজুর। 

: তিন টাকা? চোখ কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন দারোগা। তিনটে টাকার জন্যে নয়-আশ্চর্য হয়ে গেলেন দবিরুদ্দিনের দুঃসাহসিকতা দেখে। কুড়ি বছরের চাকরি জীবনে এ অভিজ্ঞতা তাঁর প্রথম। তাঁরই দফাদার একটা মুরগির দাম দাবি করে তাঁর কাছ থেকে। 

পকেট থেকে তিনটি টাকা বের করে দারোগা ছড়িয়ে দিলেন রাস্তার ওপর। দবিরুদ্দিন ইদু মিঞা নয়। সঙ্গে সঙ্গে টাকা তিনটে কুড়িয়ে নিল সে।

দারোগা মনে মনে বললেন, আচ্ছা থাকো। এই তিন টাকার শোধ আমি তুলে নেব। 

 সাইকেলে মোরগটা ঝুলিয়ে দারোগা চললেন। সেই অবস্থাতেই একবার টিপে দেখলেন মোরগটা, একেবারে সীসের মতো ঠাসা। মোরগ আবার ক্যাঁক ক্যাঁক শব্দে আর্তনাদ তুলল, দারোগার কানে শব্দটা যেন মধু বর্ষণ করতে লাগল।  

অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে প্যাডল করে চললেন দারোগা। বড়ো বিবি খানদানি ঘরের মেয়ে-ওদের কোনো পূর্বপুরুষের গুণপনা বড়ো বিবির মধ্যে এসেও বর্তেছে। চমৎকার রান্নার হাত বড়ো বিবির। খেতেও হয় না, সে রান্নার খোশবুতেই মেজাজ খোস হয়ে যায়। 

 

যেন অদৃশ্য সুতোয় বাধা হাঁড়ি-কাবাবটা নাকের সামনে দুলছে এখনো! দারোগা গুন গুন করে ‘মোহব্বত -এ দিল’ ছবির একখানা গান গাইতে শুরু করে দিলেন। কিন্তু থানার কম্পাউন্ডে ঢুকেই  চক্ষুস্থির। বারান্দায় একখানা চেয়ার টেনে বসে আছেন ইন্সপেকটর ইমতিয়াজ চৌধুরী। জমাদার জামান মিঞা পাশে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর ইন্সপেক্টরে আর্দালি আব্দুল প্রায় কাঁদি খানেক ডাব নিয়ে কাটতে বসেছে। 

দারোগা দীন মহম্মদ ট্যারা হয়ে গেলেন। ইন্সপেক্টর ইমতিয়াজ চৌধুরী অত্যন্ত প্যাঁচালো লোক, মহকুমার একটি দারোগাও তাঁর জ্বালায় স্বস্তিতে থাকতে পারে না। তার ওপর দীন মহম্মদকে তিনি মোটেই নেক-নজরে দেখেন না। ছিদ্র খুঁজে বেড়াচ্ছেন রাতদিন। 

 

 বারান্দায় সাইকেলটা হেলিয়ে রেখে শশব্যস্ত দারোগা ওপরে উঠে এলেন।

: আদাব স্যার, কতক্ষণ এসেছেন? 


ইন্সপেক্টর তখন কুঁজোর মতো প্রকান্ড একটা ডাব ধরেছেন মুখের কাছে। গলার ভেতর থেকে আওয়াজ উঠছে গর গর করে। ডাবটা নিঃশেষে করে ইন্সপেক্টর  সেটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন, মুখ মুছলেন রুমালে।একটা ঢেঁকুর তুললেন, তারপর গোটা কয়েক নিশ্বাস ফেললেন বড়ো বড়ো। নাক থেকে কোঁত কোঁত করে কেমন যেন শব্দ বেরিয়ে এল খানিকটা।  

ইন্সপেক্টর বললেন, এই কিছুক্ষন হল এসেছি। সাপুইহাটির ডাকাতি কেসটা নিয়ে একটু দরকারি আলোচনা আছো আপনার সঙ্গে। তা ছাড়া ইন্সপেকশনও করব।

 

মনে মনে একটা অশ্রাব্য গালাগালি উচ্চারণ করলেন দারোগা। 

 

ইন্সপেক্টর বললেন, আমার সময় বেশিক্ষণ নেই। জিপ নিয়ে এসেছি। একটু পরেই আমি সদরে ফিরে যাব। অন্য জায়গায় গিয়েছিলাম। ভাবলাম আপনার এখানেও ঘুরে যাই। 

 

কৃতার্থ ভঙ্গিতে দীন মহম্মদ বললেন, বেশ করেছেন স্যার, ভালোই করেছেন। তাহলে আমার ওখানে খানাপিনার একটু বন্দোবস্ত করি? মনে মনে বললেন ,তুমি না সরে পড়া পর্যন্ত মোরগটা আমি জবাই করছি না। তোমার খাওয়া তো আমি জানি, আমাদের জন্য হাড় কখানাও পড়ে থাকবে না তা হলে। চিবিয়ে তাও তুমি ছিবড়ে করে দেবে।

 

ইন্সপেক্টর বললেন, না না,আমি খেয়েই এসেছি। আমার জন্যে ভাববেন না।

দারোগা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। কিন্তু যেখানে বাঘের ভয়-সেইখানে সন্ধ্যে হবে এ তো জানা কথা!

 অতএব পরক্ষণেই ইমতিয়াজ চৌধুরী চোখ গিয়ে পড়ল সাইকেলে বাঁধা মোরগাটার দিকে। আর সঙ্গে সঙ্গেই শেয়ালের চোখের মতো জ্বল জ্বল করে উঠলো তাঁর দষ্টি।

 

: বাঃ-বাঃ দিব্যি চিজটি তো! কোথায় পেলেন? 


দারোগার হৃৎপিণ্ড ধড়াস করে লাফিয়ে উঠলো। বিরস মনে বললেন, কিসের কথা বলছেন স্যার?

: ওহ মোরগটা। বহুদিন এমন জিনিস চোখেও দেখিনি। 


দারোগা আর্ত হয়ে উঠলেন।

: ও বিশেষ কিছু নয় স্যার। ওর চাইতে ঢের ভালো মোরগা শহরে পাওয়া যায়। 

 

: ক্ষেপেছেন আপনি?- ইন্সপেক্টর উবু হয়ে বসলেন: শহরের মোরগায় কি আর বস্তু আছে নাকি? খালি হাড় আর হাড়, মনে হয় যেন মাছের কাঁটা চিবুচ্ছি। এসব জিনিস শুধু পাড়াগাঁয়েই পাওয়া যায়। তাজা জল হাওয়ায় তেলে-মাংসে জবজবে হয়ে ওঠে।  

ইন্সপেক্টরের জিভে সুড়ুৎ করে শব্দ হল একটা; খানিক লালা টানলেন খুব সম্ভব। 

দারোগা কাষ্ঠ হাসি হাসলেন: বেশ তো স্যার - পরে দু’-চারটে পাঠিয়ে দেব আপনাকে। 

ইন্সপেক্টর আর মোরগাটার দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারলেন না।

: পরের কথা পরে হবে!  এটার লোভ আমি সামলাতে পারছি না। আব্দুল, যা তো মোরগাটা জিপে তুলে নে।   

 

চড়াৎ করে বুকের যেন একটা শিরা ছিঁড়ে গেল দারোগার।  

: আমি বলছিলাম কি স্যার -

: আর মিঞা সায়েব, আপনার পাড়া থাকেন, ও রকম মোরগা বিস্তর পাবেন । আব্দুল, যা ওটাকে জিপে তুলে দে চটপট। ভালো কথা, কত দিয়ে কিনেছেন মোরগা?

 

শেষ কথাটা বলবার জন্যেই বলেছিলেন ইন্সপেক্টর। নিতান্ত সৌজন্যের খাতিরেই বলা। নইলে একটা মুরগি দিয়ে দারোগা ইন্সপেক্টরের কাছ থেকে দাম নিতে পারে। কে কল্পনা করবে সে  কথা?

 মনে মনে দাড়ি ছিঁড়তে ইচ্ছা করছিল দারোগার। নিজের নয় ইন্সপেক্টরের। সদয় ইন্সপেক্টর আবার বললেন, কত দাম ওটার?-এই বলে পকেটে তিনি হাত ঢোকালেন সেখানে টাকা ছিল না।

 

কিন্তু বজ্রাঘাত হল বিনা মেঘেই। নিরুপায় ক্রোধে জর্জরিত হয়ে কালো মুখে দারোগা বললেন, তা হলে চারটে টাকাই দেবেন স্যার।

কিছুক্ষন সব স্তব্ধ। জমাদার জামান খাঁ নড়ে উঠলেন, ডাব কাটতে গিয়ে ডাবের  কোপটা আর একটু হলে প্রায় আব্দুলের হাতে গিয়েই পড়ত। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না কেউ। 

দারোগা মরিয়া হয়ে বললেন, দাম একটু বেশিই স্যার। পুরো দেড় সের গোস্ত হবে। দু’-এক ছটাক বেশি বই তো কম নয়।

অদ্ভুত প্রশান্ত হাসি হাসলেন ইমতিয়াজ চৌধুরী।

: তা বটে। ভালো জিনিস হলে দাম একটু চড়াই হয় । এই নিন-এবার একটা পকেট থেকে দুখানা দু’-টাকার নোট বের করে টেবিলে রাখলেন: এই নিন।

 

আব্দুল মোরগাটা খুলে নিলে সাইকেল থেকে। আর একবার কঁক- কঁক-ক্যাঁ শব্দে ক্ষীণ প্রতিবাদ শোনা গেলে একটা। দারোগা মুখ ফিরিয়ে রইলেন।

ইন্সপেক্টর বললেন, তাহলে এবার আপনার ডাইরি-টাইরিগুলো নিয়ে আসুন দারোগা সাহেব । হাতের কাজ গুলো শেষ করে ফেলা যাক।

: আব্দুল চেঁচিয়ে উঠল, ভাগতা হ্যায় হুজুর, ভাগ যা-তা-

কিন্তু চেঁচিয়ে উঠেও রাখা গেল না। আব্দুলের প্রসারিত হাতে গোটাকয়েক নখের আঁচড় দিয়ে পাখা ঝাপটে চলন্ত জিপ থেকে বাইরে উরে পড়ল মোরগটা আলগা। ফাঁস কখন খুলে গিয়েছিল কে জানে।  

: থামা, গাড়ি থামা!-ইমতিয়াজ চৌধুরী চেঁচিয়ে উঠলেন। 

গাড়ি হঠাৎ করে  থেমে গেল। ছরাৎ ছরাৎ করে একরাশ কাদা ছিটকে পড়ল চারিদিকে।

মোরগ তখন উর্ধ্‌বশ্বাসে ক্যাঁক-ক্যাঁক করে একটা কচুবনের দিকে ছুটছে। 

‘পাকড়ো-পাকড়ো’ বলে উত্তেজনায় ইন্সপেক্টর নিজেই লাফিয়ে পড়লেন নিচে।

কিন্তু পায়ের নিচে এঁটেল মাটির কাঁদা। লাফিয়ে নামবার সঙ্গে সঙ্গেই সড়াক করে হাত তিনেক পিছলে গেলেন ইন্সপেক্টর, তারপর নাচের ভঙ্গিতে বোঁ করে একটা পাক খেলেন, তারও পরে একখানা মোক্ষম আছাড়-একেবারে সোজা চলে গেলেন লাটাবনের ভেতরে।  

আব্দুল আর ড্রাইভার ছুটেছিল মোরগের পেছনে। দৌড়ে ফিরে এল তারা। ইন্সপেক্টর তখন আর উঠতে পারছেন না। একটা হাঁটুতে বোধহয় ফ্রাকচার হয়ে গেছে। লাটাবনের কাঁটায় গাল-কপাল ক্ষত-বিক্ষত! 

ইন্সপেক্টরকে যখন জিপে তোলা হল, তখন আর পলাতক মোরগটাকে খুঁজে বের করবার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। খোঁজখবর করার মতো কারো মনের অবস্থাও নয়।

সন্ধ্যা নামছিল আস্তে আস্তে। ঘরের দাওয়ায় চুপ করে বসেছিল ইদু মিঞা। মোরগার শোক এখনও তার বুকে পুত্র-শোকের কাঁটার মতো বিঁধছে। হঠাৎ যেন শূন্য থেকে শোনা গেলে:কঁরর -কোঁকোর-কোঁ।  

ইদু মিঞা চমকে উঠল। সেই ডাক! ভুল শুনছে না তো? নাকি মোরগটার প্রেতাত্মা মায়ার টানে শূন্য থেকে জানান দিয়ে গেল? 

আবার সেই ডাক। কঁক-কঁক-কোঁক্রো কোঁ-ওঁ-ওঁ-

উঠোন থেকে চেচিয়ে উঠল জোহরা, সাহেব তোমার মোরগে ফিরে এসেছে। বসে আছে চালের ওপর !

ইদু লাফিয়ে নেমে পড়ল উঠানে। সত্যিই ফিরে এসেছে। গাঁয়ের মোরগ-বহুদূর পর্যন্ত চড়ে বেড়ায়-মাইল খানেক রাস্তা চিনে আস্তে খুব অসুবিধে হয়নি তার।

চালের ওপর বসে তৃতীয় বার মোরগ জয়ধ্‌বনি করল। তারপর ঝটপট করে উড়ে পড়ল উঠোনে। বিজয়ী সম্রাটের মতো মস্থর গতিতে এগিয়ে চলল নিজের খোয়াড়ের দিকে।  

আরও তিনটে ছোট ছোট ঘটনা তারপর। 

কর্তব্যে গুরুতর অবহেলার জন্য এক মাস পরে দারোগার রিপোর্টে দবিরুদ্দিন দফাদারের চাকরি গেল।

প্রায় দের মাস পর ভাঙা হাটুতে জোড়া লাগল ইন্সপেক্টর ইমতিয়াজ চৌধূরীর।   

আরো তিন মাস পর সাপুইহাটির ডাকাতির ব্যাপারে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে সাসপেন্ড হয়ে গেলেন দারোগা দীন মহম্মদ। 

২৫৩ পঠিত ... ১৬:৫৮, জুন ২৩, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top