একজন মা রাশিদা বেগমের মা দিবস যেভাবে কাটলো

১৫১ পঠিত ... ২০:২৯, মে ১২, ২০১৯

রাশিদা বেগমের ওপর আজ সকাল থেকেই ব্যাপক চাপ যাচ্ছে।

বাসায় সদস্য মোটে পাঁচজন। রাশিদা, তার স্বামী, দুই ছেলে আর এক মেয়ে। তাতেই ঘরের সব কাজ সামলাতে গিয়ে রাশিদা হিমশিম খান। তার মধ্যে শ্বশুরবাড়ি পক্ষের হোক কিংবা লতায় পাতায় সম্পর্ক ধরনের আত্মীয়ই হোক, ঘরে কোনো না কোনো মেহমান থাকবেই। আজ এ আসে তো কাল ও আসে। আর সেই আসা মানেও এমন আসা, যে ‘যাওয়া’টা ঠিক কবে ঘটবে সেটার অপেক্ষা করতে করতে আরও দুই পক্ষ চলে আসে!

অলংকরণ: মোরশেদ মিশু

তিনদিন আগে রাশিদার ননদ তার পুরো ‘আটাশ' গুষ্ঠি নিয়ে ঘুরে গেল। গতকাল এসেছে তার ননদের দেবরের ফুপাতো ভাইয়ের মেয়ে! ভয়াবহ সম্পর্ক! মেয়ে একা আসলেও হতো, মেয়ে এবং মেয়ের স্বামীসহ দুই ‘উচ্চাঙ্গ কান্না’ শিল্পে পারদর্শী শিশু! রাশিদা বেগমের অবশ্য এসবে খুব যে বিরক্ত বোধ হয়, তা না। সয়ে গেছে সব।

পঁচিশ বছর সহ্য করলে সব সয়ে যায়!

রাশিদা রান্নাঘরে কাজ করছেন। এতজন মানুষের নাস্তা বানিয়ে শেষ করতে হবে। স্বামী অফিসে যাবেন, ছেলেমেয়েরা কলেজ ভার্সিটিতে যাবে। আর মেহমানরা তো আছেই। তারাও কোথায় নাকি যাবে বললো। চিড়িয়াখানা বোধহয়। এত বছর হয়ে গেছে, তবু ঢাকার বাইরে থেকে আসলে চিড়িয়াখানায় যাওয়ার ব্যাপারেই এখনও সবার এত আগ্রহ কেন কে জানে! কত সুন্দর সুন্দর সব জায়গা হয়েছে ঢাকায়, সেসব জায়গায় যা। ছেলেরা বলে মাঝেমধ্যে, তিনি চুপচাপ শোনেন। তার সঙ্গে বলে, তাও না। নিজেদের মধ্যে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে বলে! মায়ের সঙ্গে এসব নিয়ে বলার সময় কই ছেলেদের! তারা বড় হয়েছে, তাদের আলাদা জীবন আছে, চিন্তাভাবনা আছে।

সবাই ব্যস্ত, খুব ব্যস্ত। রাশিদা বেগমই শুধু ব্যস্ত না। গৃহিণীর আবার ব্যস্ততা কিসের!

মেয়ের কাছে অবশ্য মাঝেমধ্যে অনেক কিছু শোনেন। সে মায়ের সঙ্গে অনেক কথা বলে। ওরও কথাবার্তা মানেই হতাশার কথা, কষ্টের কথা। কত অপ্রাপ্তি! কোথাও যাওয়ার আগে হাজার রকমের ফিরিস্তি দেয়া, কারণ দর্শানো। বড় কষ্টেসৃষ্টে কোথাও যাওয়ার আবেদনপত্র পাশ হলেও সন্ধ্যার আগে ফিরে আসো। কলেজে উঠেছে, তবু বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে বেশি মিশলে সমস্যা। ছেলেবন্ধু তো থাকাই যাবে না। ওর বাবা পছন্দ করেন না। বাবার ছেলেরাও দেখি বোনের বন্ধুবান্ধব এলে বিরক্ত হয়। অথচ ওদের বন্ধুবান্ধবের আনাগোনা তো লেগেই থাকে! পৃথিবী বড় অদ্ভুত জায়গা!

মেয়ের আছে শুধু ফেসবুক, ইন্টারনেট এসব। চার দেয়ালে তো আটকে থাকা যায় না, যে করেই হোক, দুনিয়া দেখতে হবে তো! ইন্টারনেটেই অনেক কিছু দেখে, মায়ের সঙ্গে গল্প করে। মেয়ের নাকি পরীক্ষা আজকে, সকালে উঠেই পড়তে বসেছে। চাপটা আজকে এজন্যই বেশি। ঘরের কাজ ভালোমত না পারুক, এটা ওটা এগিয়ে দিলেও তো অর্ধেক কাজ কমে যায়!

রাশিদা বেগমের বড় ছেলের হাঁক শোনা গেল, ‘মা, তোমাকে না চা দিতে বললাম এক কাপ? কত দেরি করবা? এসাইনমেন্ট করতেছি একটা, বললাম না? মগ ভর্তি করে চা না খাইলে কি মাথা কাজ করে নাকি!’

রাশিদা বললেন, ‘নাস্তাটা বানিয়ে শেষ করি। দিচ্ছি।’

‘তোমার মেয়ে কই? তার সমস্যা কী? তারে বলো না দিতে!’

‘ওর পরীক্ষা। ঘরে বসে পড়ছে।’

‘এক কাপ চা বানাইতে কি এমন সময় লাগে। পরীক্ষা হইলে কি কাজকাম করা লাগে না? কী এমন পরীক্ষা। হুদাই, ফালতু সব।’

রাশিদা বেগম কিছু বললেন না। চুলায় চা চড়ালেন। ঠিক সে সময় ছোট ছেলে রান্নাঘরে ঢুকে বললো, ‘মা, আমার ফ্রেন্ড আসছে, নাস্তাটা দ্রুত বানাও না! না খেয়ে যাবে নাকি?’

রাশিদা বেগম এবারও কিছু বললেন না। কিছু না বলার তার ঢের অভ্যাস আছে।

২.

রাশিদা বেগমের স্বামী মোরশেদ সাহেব রাগারাগি করে অফিসে চলে গেলেন। কাপড় চোপড় ঠিকঠাক গোছানো ছিল না। কোনোটা ধোয়া নেই, কোনোটা ধোয়া আছে, ইস্ত্রি নেই।

রাশিদা বেগম বোঝানোর চেষ্টা করলেন, দুইদিন ধরে বুয়া আসছে না। তিনি যতদূর সম্ভব করেছেন। ‘গৃহকর্তা’ এসব কথা কানে করলেন না। তিনি রাগ করে বের হয়ে যাওয়ার আগে জানালেন, এগুলা কী কোনো কাজ নাকি! এইসব কাজে কী বুয়া লাগে। সারাদিন বাসায় বসে রাশিদা ঠিক কী করেন তা তার বোধগম্য হয় না, এই মতামতও তিনি ব্যক্ত করলেন। মেয়ে তো আছে, পরীক্ষা চলছে বলে যেহেতু তার ক্লাস নেই, তাকে দিয়েও তো কিছু কাজ করানো যায়- এধরণের অভিযোগও ব্যক্ত করলেন। এইটুকু কাজও মেয়েমানুষকে দিয়ে হয় না, এরা আবার ঘরের বাইরে কাজ করতে চায়- এধরণের ক্ষোভও প্রকাশ করলেন।

রাশিদা বেগম মৌনব্রত ভাঙলেন না। ভাঙেনও না। এধরণের মতামত, অভিযোগ এবং ক্ষোভ তিনি পঁচিশ বছর ধরে শুনে আসছেন। মেহমানদের সামনে এইটুকু ঘটনা ঘটলো, আপাতত তিনি সে ব্যাপারে লজ্জিত।

মেহমানেরা চেচামেচি টের পেল কিনা তা অবশ্য বোঝা গেল না। তবে ‘ননদের দেবরের ফুপাতো ভাইয়ের মেয়ে’র দুই উচ্চাঙ্গ কান্না শিল্পে সুদক্ষ শিশু একযোগে কান্না শুরু করলো। রাশিদা বেগম সদ্য শেষ হওয়া স্বামীর চেচামেচির চেয়ে এই দুই শিশুর চেচামেচির ওপর আপাতত বেশি বিরক্ত বোধ করছেন!

‘অতিথি দেবতার’ যথাযথ ‘ভোগ’ অর্থাৎ যত্নআত্তি সম্পন্ন করে রাশিদা বেগম রান্নাঘরের যাবতীয় কাজ শেষ করলেন। এতেই দুপুর গড়ালো। বুয়া আজও বোধহয় আসবে না। কাপড় চোপড়ও ধুয়ে রাখতে হবে অনেক। রান্নাবান্না শুরু করতে হবে, ঘরে মেহমান। ঘরদোরের অবস্থাও বিশেষ ভালো না, মুছতে হবে। বাচ্চা দুটো তো নোংরা করেই চলেছে। অনেক কাজ সারাদিনে।

রাশিদা বেগমের সব কাজ শেষ করতে দুপুর বিকাল পেরিয়ে সন্ধ্যে গড়ালো।

সারাদিন বাসায় কেউ ছিল না। সন্ধ্যার পর সবাই ঘরে ফিরেছে।

ছোট ছেলে মা কে এসে জানিয়েছে, আজ মা দিবস! মা'কে শুভেচ্ছা জানাতে সে দুটো ফুল নিয়ে এসেছে। বড় ছেলে জানিয়েছে, মা দিবস উপলক্ষ্যে সে মা'কে নিয়ে ফেসবুকে বিরাট স্ট্যাটাস দিয়েছে। স্ট্যাটাস নাকি খুব ভাইরাল হয়েছে। সে ফেসবুক সেলিব্রেটি কিনা। দুইশর ওপর শেয়ার।

রাশিদা বেগম একবার ভাবলেন ছেলে কী লিখেছে পড়ে দেখবেন। পরে ঘড়ির দিকে তাকালেন, সাড়ে আটটা বাজে। রাতের রান্নাবান্না শুরু করতে হবে। এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই!

মেয়ে একবার এসে মায়ের সঙ্গে সেলফি তুলে গেল। মা দিবসে তাই নাকি নিয়ম। মায়ের সঙ্গে ছবি তুলে আপলোড করতে হয়। না হলে হয়ই না! রাশিদা বেগম এসব বোঝেন না। এগুলো বুঝতে কিছু সময় অবসর থাকা জরুরী। তাকে অনেক কাজ করতে হয়।  

১৫১ পঠিত ... ২০:২৯, মে ১২, ২০১৯

আরও

 
 

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top