চিঠি পাওয়ার পর হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা যে কারণে বাংলাদেশে এলেন

১৬৮ পঠিত ... ১৯:৫৬, মে ১০, ২০১৯

 

বাসে উঠতেই দেখলাম লোকটাকে। বাসের সবচেয়ে পেছনের সিটে কোনায় কোনোরকমে বসে আছে। অদ্ভুত ধরনের আলখেল্লা-টাইপের পোশাক, মাথায় লম্বাটে টুপি। ঢাকায় এ রকম পোশাকের লোক সচরাচর দেখা যায় না। তার পাশের সিটটা ফাঁকা পেয়েই বসে গেলাম। লোকটার ঝোলাভর্তি বাঁশি।

: আপনি বাঁশি বাজান নাকি?
: হ্যাঁ, আমি বাঁশিওয়ালা।
: আচ্ছা, আচ্ছা। ঢাকাতেই থাকেন?
: না, আমি জার্মানির হ্যামিলিন থেকে এসেছি।
: মানে, মানে আপনি হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা? সেই খারাপ লোকটা? যে মেয়রের কাছ থেকে ইনাম না পেয়ে শহরের শিশুদের বাঁশির সুরে ভুলিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল?
: হুম।
: ছি ছি ছি! আপনার লজ্জা করল না? এতগুলো শিশুকে, যাদের কোনো দোষই নেই, ভুলিয়ে-ভালিয়ে তাদের নিয়ে চলে যেতে!
: তোমাদের লজ্জা করে না?
: আমাদের? আমাদের আবার কিসের লজ্জা?
: তোমরা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর শিশুদের হত্যা করে চলেছ... তোমাদের লজ্জা করে না?

আমি একটু থতমত খেয়ে গেলাম। এ তো দেখি আমাদের দেশের খবর রাখে! হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা ঘাড় বাঁকিয়ে বলল, ‘তোমাদের নদী-পুকুরের তলায় মৃত শিশু, তোমাদের বস্তার ভেতর মৃত শিশু, তোমাদের পানির ট্যাংকে মৃত শিশু। তোমাদের ডাস্টবিনগুলোয় নোংরা-আবর্জনা কম, শিশুর লাশ বেশি। লজ্জা তো তোমাদের পাওয়ার কথা!’
: না, আমরা আসলে...
: পৃথিবীজুড়ে সবাই যখন শিশুদের অধিকারের কথা বলছে, শিশুকে আরও কীভাবে নিরাপদে রাখা যায়, বিকশিত করা যায়—তার কথা বলছে, তখন তোমরা শিশুদের গলা টিপে ধরছ, শিশুদের কুপিয়ে খুন করছ, কেটে টুকরো টুকরো করে ভাসিয়ে দিচ্ছ নদী-খাল-বিলে। আদিম যুগে যখন মানুষ এত কিছু জানত না তখনো তারা তাদের শিশুদের রক্ষা করত সব প্রতিকূলতা থেকে। তোমরা তো এখন আদিম যুগের থেকেও খারাপ হয়ে গেছ! তোমাদের শরীর মানুষের, কিন্তু ভেতরে-ভেতরে তোমরা হয়ে গেছ হায়েনা! না, হায়েনাও তার শিশুদের রক্ষা করে, তোমরা এমন পশু হয়ে উঠেছ যে কিছুদিনের মধ্যেই তোমাদের দাঁত বড় বড় হয়ে যাবে, কানগুলো লম্বা লম্বা সুচালো হয়ে যাবে আর একটা বিকট লেজ বেরিয়ে আসবে পেছন থেকে!
: না, না, কী যে বলো! আমরা মানুষই আছি... এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা...
: কোনো ঘটনাই বিচ্ছিন্ন নয়। কোনো হত্যাই বিচ্ছিন্ন নয়। কোনো শিশুহত্যাই বিচ্ছিন্ন নয়!

পরের স্টপেজে বাস থামে। হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা উঠে দাঁড়ায়।
: কোথায় যাচ্ছ তুমি?
: আমার কাজ করতে।
: কী কাজ তোমার?
বাঁশিওয়ালা তাকায়, কিছু বলে না। নেমে যায় বাস থেকে। আমার মনে গভীর সংশয় দানা বাঁধে। বাঁশিওয়ালা কোথায় যাচ্ছে? পাশের ফাঁকা সিটে, যেখানে একটু আগেই হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা বসে ছিল, সেখানে এক টুকরো ভাঁজ করা কাগজ পড়ে আছে। কাগজটা খুলতেই দেখি, একটা ছোট্ট চিঠি। দেখে মনে হলো, চিঠিটা লেখা হয়েছে হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালাকে।

প্রিয় হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা,
তুমি এখন কোথায় আছ? আমার বন্ধু রাফি বলেছে, তোমার নাম লিখে চিঠিটা বাক্সে ফেলে দিলেই নাকি তুমি চিঠিটা পেয়ে যাবে! আমরা সবাই মিলে তাই এই চিঠিটা লিখছি। আমরা তোমার গল্পটা পড়েছি। তুমি বাঁশির সুর তুলে শিশুদের দলবেঁধে নিয়ে যেতে পারো।
হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা, আমরা এখন এখানে কেউ নিরাপদ না। বড়রা আমাদের মেরে ফেলছে। আমাদের খুব ভয় লাগছে। তুমি প্লিজ চলে এসো। এসে, তোমার বাঁশি বাজিয়ে বাংলাদেশের সব শিশুকে নিয়ে যাও। আমরা অন্য কোথাও গিয়ে থাকব! তুমি কি আমাদের কথা শুনবে?
ইতি
রাতুল, মিতু, রিমঝিম আর রাফি

চিঠিটা শেষ হতেই, কানের ভুলও হতে পারে, আমি বাঁশির সুর শুনতে পেলাম। বাস থেকে নামতে চাইলাম আমি, কিন্তু তার আগেই বাসটা ছেড়ে দিল। আমি কান পেতে বাঁশির সুর শুনতে থাকলাম।

[চলতি মাসে প্রথম ৮ দিনে সারা দেশে ৪১ শিশু ধর্ষণ ও ৩ শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে (প্রথম আলো)। সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয়, যেদিন আমাদের দেশে আর কোনো শিশু থাকবে না।]

১৬৮ পঠিত ... ১৯:৫৬, মে ১০, ২০১৯

আরও

 
 

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top