যে কারণে ইদানিং টিউশনিতে আমি অনেক বেশি সময় থাকি

৫৪৯ পঠিত ... ১৩:৪৯, মে ০২, ২০১৯

আমার স্টুডেন্টরে একটা ম্যাথ করতে দিলাম। আজকে ফটাফট করে ফেলল। অন্যদিন হলে পা ঝোলায়, মাথা ঝাঁকায়, কলমের মাথা কামড়ায়, বইয়ের কোনায়-কানায় স্টার আঁকায়।

আবার আরেকটা ম্যাথ করতে দিলাম। এটা আরো তাড়াতাড়ি করে ফেলল। আগেরটা ফোর-জি গতি হলে এটা সেভেন-জি। 

অন্যদিন এই স্টুডেন্টরে একটা ম্যাথ করতে দিয়ে দুই-চারটা প্রেমিকার খোঁজখবর নেই। অনেকদিন ধরে টাকা পায় বলে যে বন্ধুর ফোন রিসিভ করি না, তারেও টুকটাক নক দেই। কিন্তু আজকে এমন কী হলো! স্টুডেন্ট যে গতিতে ম্যাথ করে যাচ্ছে ঠিকঠাক মতো একটা গ্যার্লফ্রেন্ডের সাথেই চ্যাট করতে পারছি না।

এর মধ্যে আন্টি এসে নাস্তা দিয়ে গেল। তৃপ্তি সহকারে খেলাম। বেলের শরবতটা যা ছিল না! আরেক গ্লাস চাইবো কি না বুঝতে পারছি না। না থাক, আরেক গ্লাস চাইতে গেলে কাল থেকে যদি আবার লেবুর শরবত দেয়া শুরু করে!

নাস্তা খাওয়া শেষ। কাজের মেয়েটা এসে প্লেট নিয়ে গেল। কাজের মেয়েটা এমন করে তাকাচ্ছে কেন? তাকানোর স্টাইল দেখে মনে হচ্ছে মনে মনে গালি দিচ্ছে, ‘শালা খবিশ, রাইক্ষস! আপেলর একটা টুকরাও রাখে নাই, প্লেটে একটু চানাচুরও নাই, গ্লাস ঝাঁকাইলেও এক ফোঁটা শরবত পড়বো না। তা গ্লাস-প্লেটগুলা ফেরত দিলি ক্যান! ঐগুলাও চাবাইয়া খাইতি।’

এইদিকে আমার স্টুডেন্ট এইট-জি গতিতে ম্যাথ করে যাচ্ছে, তাও নির্ভুল। একটু কারেকশনও করে দিতে বলছে না।

দেড় ঘন্টা হয়ে গেছে। অন্যদিন ঘড়ি ধরে পঞ্চাশ মিনিট পড়াই। স্টুডেন্ট বারবার তাকাচ্ছে। তাও আমি উঠছি না।

স্টুডেন্টের এক চ্যাপ্টার শেষ। আমি উঠে দাঁড়ালাম। আমি চলে যাচ্ছি ভেবে স্টুডেন্ট বইখাতা গুছাচ্ছে। কিন্তু না! আমি হাত-পা ঝাড়াঝাড়ি করে, খেলোয়াড়দের মতো একটু স্ট্রেচ করে নতুন আরেকটা চ্যাপ্টার করতে দিলাম।

ঘন্টাখানেক পর সেই চ্যাপ্টারও শেষ। আরেকটা দিলাম। এবার স্টুডেন্ট একটু বিরক্ত হয়ে বলেই বসলো, ‘ভাইয়া, আপনার আজকে আর টিউশনি নাই?’

আমি শুধু চোখ লাল করে কড়া গলায় বললাম, ‘ম্যাথ করো!’

সাড়ে তিন ঘণ্টা হয়ে গেছে স্টুডেন্ট ম্যাথ করছে। এর মধ্যে আন্টি এসে একবার ঘুরে গেল। বেতন লাগবে কি না জানতে চাইল। আমি শুধু লজ্জা মাখা হাসি দিয়ে বললাম, ‘কিছুদিন আগেই তো দিলেন আন্টি। বেতন লাগবে না।’

আন্টি একবার রাতে খেয়ে যেতেও বললেন। জোরাজোরি করবে ভেবে আমি ফর্মালিটি দেখিয়ে না করেছি। এখন মনে হচ্ছে ফর্মালিটি দেখানোটা বোকামি হয়েছে।

স্টুডেন্ট ম্যাথ করছে। ওকে জিজ্ঞেস করলাম অন্য কোনো সাবজেক্টে কোনো সমস্যা আছে কিনা। কিন্তু না, সে নাকি সব পারে।

এখন স্টুডেন্টকে জোর করে বাংলা সেকেন্ড পেপার পড়াচ্ছি। ভালো বিপদে পড়লাম। সমাস পড়াতে গিয়ে একটু পর দেখি নিজেই পারি না।

স্টুডেন্টরে একটা ঝাড়ি দিলাম, ‘কী গাধার গাধা! সামান্য সমাস পারো না! ধর্ম বইটা বের করো তো দেখি।’

স্টুডেন্ট ন্যাকা কান্নার অভিনয় করতে করতে ধর্ম বই খুঁজছে। বই খুঁজে পাচ্ছে না বলে আরেকটা ধমক দিতে যাবো তখুনি আবার আন্টি এলো।

- জি আন্টি, কিছু বলবেন?

- বাবা, আজকে মিতুকে একটু ছেড়ে দাও। তোমার আঙ্কেল ওকে নিয়ে একটু বাইরে যেতে চাইছে।

আমি ভীষণ হতাশ হলাম, আর হতাশায় মুখ দিয়ে শুধু একটা শব্দই উচ্চারণ করলাম, ‘ওহ্....’

মুখে শুধু ওহ্ বললেও মনে মনে বললাম ‘একটু নাহয় বসে বসে এসির বাতাসই খাচ্ছিলাম। তাই বলে এমন করতে হবে! এত হিংসে! এত কিপ্টেমি! আমি কী ব্যাগে বা পকেটে ভরে এসির হাওয়া মেসে নিয়ে যেতাম? নাকি এই এক্সট্রা আওয়ার পড়ানোর জন্য আমি এক্সট্রা টাকা চেয়েছি? নাকি এক্সট্রা নাস্তা চেয়েছি? আসলে মানুষের ভালো চাইতে নেই। মানুষের ছেলেমেয়ের তো কক্ষনোই না।’

লেখা: রাজিব দেবনাথ

 

৫৪৯ পঠিত ... ১৩:৪৯, মে ০২, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top