ঢাকার হাসান মিয়া প্রথম যেবার লস অ্যাঞ্জেলস দেখতে গেলো

১০৫৮ পঠিত ... ২১:৫২, মার্চ ২৮, ২০১৯

হাসান এর আগে কখনো বিদেশ যায়নি, এবারই প্রথম।

প্রথমবারেই একেবারে হলিউডের শহর লস অ্যাঞ্জেলসে! ছোটবেলায় তিন গোয়েন্দায় এই শহরের কথা সে অনেক পড়েছিল। তখন থেকেই স্বপ্ন ছিল, একদিন সুযোগ হলে সেও কিশোর-মুসা-রবিনের মতো ঘুরে বেড়াবে স্বপ্নের এই শহরে। প্লেন ল্যান্ড করার আগেই পাহাড়ের গায়ে হলিউডের সেই বিখ্যাত নামফলক দেখে বিস্মিত হয়ে পড়ল সে। নিজ চোখে এই দৃশ্য দেখতে পারবে এমনটা সে কখনোই ভাবেনি। তবে প্লেন থেকে নামার পর এমন অনেক কিছু হতে থাকলো, যা হাসান কখনোই ভাবেনি।

এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই শুরু হয়ে গেল তার ব্যাগ নিয়ে টানাটানি। একজন তো এসে তাকে প্রায় টেনে হিঁচড়েই নিয়ে যাওয়া শুরু করল। ‘ভাইজান নিশ্চয়ই হলিউড যাইবেন! আমার লগে আহেন। পরিচিত হোটেল আছে। কম দামে রুম পাইবেন। এসিও আছে।’ সে আবিষ্কার করল, তার সাথে ব্যাগ নাই। আরেক ট্যাক্সিতে চলে গেছে ব্যাগ। অগত্যা কিছু ডলার খরচ করে ব্যাগ উদ্ধার হল।  বিদেশ বিভূঁইয়ে এসেই এমন ধাক্কায় হাসান একেবারে ভেঙে পড়েছে।

ট্যাক্সি ছাড়ার পর এয়ারপোর্টের সামনের প্রশস্ত রাস্তা দেখে ততক্ষণে প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে হাসান। সে যাচ্ছে লং বিচের দিকে। এয়ারপোর্ট থেকে অনেক দূরে লং বিচ। অবশ্য আমেরিকায় নিশ্চয়ই ত্রিশ কিলোমিটার যেতে খুব একটা সময় লাগবে না। দেখতে দেখতেই চলে যাওয়া যাবে। এসব ভাবত ভাবতে আনমনা হয়ে গেছিল হাসান। হুট করেই হার্ডব্রেক এবং ড্রাইভারের গালাগালি শুনে ঘোর কেটে গেল। একটা লোকাল বাস ট্যাক্সির গা ঘেঁষে যেতে গিয়ে গাড়ির সাইড গ্লাস ভেঙে ফেলেছে। ট্যাক্সি ড্রাইভারও বাসের সামনে গাড়ি থামিয়ে সমানে গালাগাল করতে লাগলো। বাসের হেল্পার-ড্রাইভার ঐক্যজোট প্রত্যুত্তর দিয়ে যাচ্ছে সমানে। আশেপাশে উৎসুক জনতাও ভিড় করে ফেলেছে। পিছনে ততক্ষণে গাড়ির লম্বা লাইন, হর্ন এবং ড্রাইভারদের গালাগালি চলছেই।

তখন দূর থেকে এক ট্রাফিক পুলিশকে আসতে দেখে বাস এবং ট্যাক্সি উভয়েরই প্রস্থান ঘটে দৃশ্যপট থেকে। তবে হাসান বুঝতে পারছিল না সাইড গ্লাস ছাড়া গাড়ি রাস্তায় চলবে কী করে? এটা তো ঢাকা না! ড্রাইভার তাকে আশ্বস্ত করল ‘ভাই টেনশন নিয়েন না। আমার চালাইতে গ্লাস লাগে না। আমার গাড়ির হেডলাইটও ঠিক নাই। ক্যান্টনমেন্টের দিকে শুধু রাতের বেলা না গেলেই চলে।’ চোয়াল ঝুলে পড়ল হাসানের।

ভাষা হারিয়ে ফেলে চারপাশ দেখছিল সে। বিকাল হওয়ায় বোধহয় রাস্তায় এতো গাড়ি। তার গাড়ি ডানে বামে জিগজ্যাগ করে এগিয়ে যাচ্ছে, অনেকটা যেন ঢাকার লেগুনার মতো। গাড়ির এসি ঠিক করে কাজ করছিল না বলে জানালা খুলে দিল হাসান। চারপাশ আরও ভালো করে দেখতে লাগল। অনেক উঁচু উঁচু বিল্ডিং। সুউচ্চ দালানগুলো যেন একে অন্যের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তখনই যেন একরাশ ধুলা স্বাগতম জানাল হাসানকে। ড্রাইভার জানাল, ইদানিং লস এঞ্জেলসে প্রচুর ধুলা। অনেকগুলা ফ্লাইওভার হচ্ছে, মেট্রোরেল, পাতালরেল সব কিছুর কাজ চলছে চারদিকে! সে তাকে জ্যামের রোডে না নিয়ে অপেক্ষাকৃত খালি রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছে বলে নিজেই নিজেকে বাহবা দিয়ে যাচ্ছিল।

সময় কাটতে লাগল, কিন্তু ত্রিশ কিলোমিটার যেন আর শেষ হয় না। বিকালে গাড়িতে উঠে এখন সন্ধ্যা গড়িয়ে প্রায় রাত। এখনো দেখা নেই হোটেলের। এতো বড় জার্নির পর এমন হবে জানলে এয়ারপোর্টের পাশেই কোন হোটেল ঠিক করত হাসান। ড্রাইভার জানাল, কাছেই চলে এসেছে। তখনই অনেক সাইরেনের আওয়াজ শুনতে পাওয়া গেল। ফায়ার ব্রিগেডের একের পর এক গাড়ি ছুটে চলার চেষ্টা করছে। আর বারবার জ্যামে পড়ে আরও যেন আর্তচিৎকারে ফেটে পড়ছে। ছোট ট্যাক্সি তাও কোন একভাবে চলে যাচ্ছিল। হোটেলের কাছাকাছি এসে হাসান আবিষ্কার করল, আগুনটা লেগেছে হোটেলের বিল্ডিংয়েই। রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ। কোনভাবেই ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ঢুকতে পারছে না। প্রচুর টিভি ক্যামেরা, রিপোর্টারদের লাইভ। হাসান কানাঘুষা শুনতে পেল, হোটেলের আন্ডারগ্রাউন্ডে একটা কাপড়ের গোডাউন ছিল। সেখানেই আগুন লেগে গেছে। লোকজন কেউ বের হতে পারছে না। হাসানের মনের মাঝে তখন ভাসছিল চকবাজার আর নিমতলীর কথা।

তখনই হাসান সিদ্ধান্ত নেয়, ফিরে যেতে হবে। এখানে আর থাকা সম্ভব নয়। তখনই গাড়ি ঘুরিয়ে এয়ারপোর্ট যেতে বলে দিল। যত দ্রুত এ দেশ ছাড়া যায়। গরিবের লস অ্যাঞ্জেলস রোগ হলে যা হয় আর কি। নিজেই নিজেকে গালাগালি করতে করতে এয়ারপোর্টে টিকিটের খোঁজ নিতে লাগল। টিকেটও পেয়ে গেল। প্লেনে উঠেই লম্বা ঘুম। ট্রানজিটের সময়টুকুতেও অনেকটা ঘুমিয়েই ছিল। অবশেষে ঘুম যখন ঠিকমত ভাঙল তখন আকাশ থেকে দেখা যাচ্ছে প্রাণের শহর ঢাকা। তার মনে হতে লাগল, আরেহ লস এঞ্জেলসও তো এমনই ছিল। প্লেনে বসেই স্ট্যাটাস লিখে ফেলল ‘এলএ এলএ এলএ লোকে বলে এলএ, এলএ নয় অত খাটি। বলো যতো খাটি তার চেয়েও খাটি, আমার ঢাকার মাটি।’

১০৫৮ পঠিত ... ২১:৫২, মার্চ ২৮, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top