চকবাজারের আগুনে পুড়ে যাওয়া দম্পতির যে গল্পটি আমাদের জানা নেই

১৩৩০৯ পঠিত ... ১৮:৫৭, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৯

ইলাস্ট্রেশন কৃতজ্ঞতা: Ibtida Idris

 

অপলা ঠোঁট ফুলিয়ে বললো, 'আটিসিমি তোটামাফিকে বলিটা টিনাই?'

নাইম বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলো, 'আরে, এটিকসাটু বুসাটিঝো?'

অপলা তার উত্তর করলো না। নাইম একটু হেসে বললো, 'আমি না হয় অফিসে, সবার সামনে ঠিক মতো প্রেমময় কথা বলতে পারছি না। তুমি কোড দিয়ে কথা বলছো কেন, তোমার সামনে কে?'

অপলা নিজেও জানে না সে কেন কোড দিয়ে কথা বলছে। তাদের নিজেদের একটা কোড ভাষা আছে। অতি প্রেমময় কথা কিংবা ঝগড়া ঝাটির সময় তারা এই ভাষায় কথা বলে। এই মুহূর্তে চলছে ঝগড়া।
অপলা স্পষ্ট করে বললো, 'তোমার আজকে ছয়টার মধ্যে আসার কথা ছিল না? এখনো অফিসে কেন?' এতটুকু বলার পরেই সে বড় করে একটা দম নিলো। এখন খুব অল্পতেই সে ক্লান্ত হয়ে যায়। দুই কদম পা ফেললেই ক্লান্তি চলে আসে। শরীর ভারি হয়ে গেছে। ডাক্তার বলেছে আর দুই সপ্তাহ। দুই সপ্তাহ পরেই ফুটফুটে একজন পৃথিবীর মুখ দেখবে।

নাইম বললো, 'ঠিক আছে, তুমি চাইলে আমি এখনই উড়ে আসতে পারি। এক থেকে তিন গুণো।'

অপলা মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে। সুপারম্যান তিনি, উড়ে আসবেন যেন! নাইম আবার বলে, 'কই, গুণেই দেখো না?'

অপলা ভ্রু কুঁচকে উত্তর দেয়, 'তুমি কি দরজার কাছে দাড়িয়ে এতক্ষণ আমাকে রাগাতে ঢং করে মিথ্যা বলছিলে?'

নাইম হাসে। 'দরজাটা খুলতে বলো জামিলের মা কে?' ফোনের ওপাশ থেকে কণ্ঠ আসে।

অপলা ফোন রেখে নিজেই উঠে। জামিলের মা মরিচ কিনতে বাইরে গেছে। ঘরে না আছে লবণ, না আছে মরিচ। সেই যে গেছে, ফেরার নাম নেই। সে ভারি শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে এগোয়। দরজা খুলতেই নাইমের হাসিমুখ চোখে পড়লো তার। কী মিষ্টি করেই না হাসছে। সব ক্লান্তি কোথায় চলে যায় এই হাসিটা দেখলে।

নাইম বললো, 'রাগ কমাও। ফুল নাও।' অপলা ফুল নেয়। নাইম দরজা বন্ধ করতে করতে বলে, 'বাবুর আপডেট দাও। আজকে কয়টা কিক মেরেছে? সারাদিন কী করলো?'

তারা দুজন কথা বলতে শুরু করে।

বেশ কিছু সময় পর, তাদের আলাপনে বাঁধা পড়ে হইচই আওয়াজে। নাইম জানালার পর্দা সড়াতেই থমকে যায়। এমন দৃশ্য দেখার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। আশে পাশে কোথাও আগুন লেগেছে। মানুষজন ছোটাছুটি করছে। সবাই ভীত, বুঝতে পারছে আগুন নেভাতে হবে। কিন্তু ঠিক কী করতে হবে সেটা কেউ বুঝতে পারছে না। আগুন ভয়াবহভাবে ছড়াচ্ছে। এই মুহূর্তে বের হতে না পারলে সব শেষ!

অপলার দিকে তাকিয়ে নাইম উত্তেজিত হয়ে বলে, 'জলদি নিচে নামতে হবে। ভয়াবহ আগুন লেগেছে।' অপলা উঠার চেষ্টা করে। ভয়ে তার হাত পা কাঁপছে। মাথা ঘুরছে।

'নাইম, দাড়াতে পারছি না।' অপলা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জানায়।
'হাত ধরো। বাসা থেকে বের হতেই হবে।'

অপলা আবার চেষ্টা করে। জানালা দিয়ে তাকাতেই তার গা শিউরে ওঠে। দশ সেকেন্ডও হবে না, আগুন ভয়াবহভাবে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। কতবার নাইমের সাথে তার তর্ক হয়েছে বাসা বদলানো নিয়ে। এতগুলো ফ্যাক্টরির মধ্যেই কেন থাকতে হবে? সারাদিন বাতাসে কেমিকেলের উৎকট গন্ধ। কে শোনে কার কথা!

অপলা নাইমের হাত ধরে উঠে। এক পা এগুতেই তার মাথা ঘুরে উঠে। না, সে পারবে না। কেন নাইমকে অফিস থেকে আগে আসতে বলেছিল? নিজের উপর রাগ হয় তার। মেঝেতেই বসে পড়ে সে।

'তুমি নেমে যাও। আমি পারবো না।' অপলার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ে।

ইলাস্ট্রেশন: মোরশেদ মিশু

এক মুহূর্তেই যেন হাজার রকম চিন্তা ঘুরপাক খায় নাইমের মনে। অপলার ভারি শরীর, কোলে নেয়া সম্ভব না। বের হলেও কি কিছু হবে? এই গলিতে ঘেষাঘেষি করা সব বাড়ি। তার উপর কেমিকেলসমৃদ্ধ সব ফ্যাক্টরি। একটাতে লাগা মানেই সবগুলোতে ছড়িয়ে পড়া। অপলার কথা শুনে বাসা বদলানো উচিৎ ছিল তার।

নাইম আবার বলে, 'একটু চেষ্টা করো?' দরজায় দুম দুম আওয়াজ পড়ে, 'আগুউন। আগুন। বের হন সবাই।'

পায়ের হুটোপটি আওয়াজ আসছে। নাইম অপলার হাত ধরে বলে, 'পারবে?' তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।

অপলা কাঁদতে কাঁদতে উত্তর করে, 'প্লিজ তুমি অন্তত নেমে যাও। আমি পারছি না। আমার বাচ্চাটাকে বাঁচাতে পারবো না...' কান্নায় তার কথা অস্পষ্ট হয়ে আসতে থাকে। সে একটানা বলতে থাকে, 'নাইম, তুমি যাও।'

নাইম অপলাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। সে কীভাবে অপলা বা তার সন্তানকে ফেলে যাবে?

দুজনের চোখের সামনে তাদের টোনাটুনির বাসা পুড়তে শুরু করেছে। এই তো, বাবুর জন্য কেনা ছোট্টো মশারিটাও পুড়ে গেল। সারা শরীর আগুনের তাপে পুড়ে যাচ্ছে। কী কষ্ট, কী নির্মম যণ্ত্রণা!

অপলা কোনো শব্দ করছে না। জ্ঞান হারিয়েছে কি? নাইম কিছু ভাবতে পারছে না। আগুনটা দপ করে একবারে জ্বলে উঠল, নাইম শেষবারের মতো তার প্রিয় মুখটা দেখলো। কী নিষ্পাপ অপলার মুখ। তার কি এভাবে মৃত্যু হবার কথা ছিল?


[বুধবার রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একসঙ্গে দগ্ধ হয়ে নিহত হন রিফাত-রিয়া। রিয়া অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন। স্বজনরা জানান, আগুন লাগার সময় দু'জনই বাসায় ছিলেন। তারা বের হওয়ার চেষ্টাও করেন। কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা রিয়া শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় সিঁড়ি বেয়ে আর নামতে পারেননি। এতে রিফাতও স্ত্রীকে ছেড়ে নেমে আসেননি (দৈনিক সমকাল)। ভয়াল সেই রাতে এই দম্পতির সঙ্গে কী ঘটেছিল, আমাদের কারো জানা নেই, জানার সুযোগও নেই। রিফাত ও রিয়ার ঘটনাটির ছায়া অবলম্বনে রচিত হয়েছে এই দৃশ্যকল্প।]

১৩৩০৯ পঠিত ... ১৮:৫৭, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top