শার্লক হোমস যদি ২২১/বি বেকার স্ট্রিটের বদলে মিরপুর সাড়ে ১১তে থাকতেন

১৪৩২৯ পঠিত ... ১৬:৩৩, জানুয়ারি ০৬, ২০১৯

রুস্তম দরজায় দুবার নক করলো। হ্যাঁ, এটাই উনার বাসা। দরজার উপরে নামফলক দেখা যাচ্ছে-

শার্লক হোমস
পুরাতন ঠিকানা- ২২১বি বেকার স্ট্রিট
পরিবর্তিত ঠিকানা- ২২/১, মিরপুর সাড়ে এগারো
(বাস স্ট্যান্ড থেকে ২২ গজ উত্তরে)

দু মিনিটের মতো হয়েছে। রুস্তম এর মধ্যে মোট চারবার নক করেছে। পঞ্চমবার নক করতে যাওয়ার সময় দরজা খোলা হলো। দরজা খুলেছেন তিনিই, দ্য শার্লক হোমস! তিনি রুস্তমের দিকে না তাকিয়েই বললেন, 'আমি জানি আপনার তাড়া নেই, বসুন।'

রুস্তম সোফায় বসলো। শার্লক সামনাসামনি সোফাটায় বসে একটা চুরুট ধরিয়ে বললেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই অনেক দূর থেকে এসেছেন। বৃষ্টি-কাদাপানি পার করে এসেছেন, সুতরাং আপনার কেসটা বেশ প্রয়োজনীয় হওয়ার কথা। আপনি বলুন, আমি শুনছি।'

অলংকরণ: আদিব রেজা রঙ্গন

রুস্তম বললো, ‘আপনি কী করে জানেন স্যার আমি অনেক দূর থেকে এসেছি এবং বৃষ্টি ছিল?’

শার্লক চুরুটে একটা টান দিয়ে সামান্য হাসলেন, যেই হাসির অর্থ, ‘এইগুলা কোনো ব্যাপার হইলো’! বললেন, ‘আপনার জুতা দেখলাম। বের হওয়ার আগে আপনি জুতা মুছেছেন, কারণ জুতার কিছু অংশ দেখে মনে হচ্ছে সদ্যই পরিষ্কার করা হয়েছে। অথচ জুতায় বেশ কাদা লেগে আছে। এর মানে যেখান থেকে এসেছেন, বৃষ্টি ছিল। তবে এইমাত্রই যে বৃষ্টি হয়েছে তেমন মনে হচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষণ আগে হয়েছে, জুতায় লেগে থাকা কাদা শুকিয়েও গেছে। আর আপনার এলোমেলো চুল, চুল এবং পোশাকে থাকা ধুলাময়লা এবং বেশ হয়রান ভাব দেখে মনে হয়েছে আপনি অনেকক্ষণ যাবৎ রাস্তায় ছিলেন, দীর্ঘ ভ্রমণ করেছেন। মোটামুটি আড়াই তিন ঘন্টা রাস্তায় ছিলেন সম্ভবত। সুতরাং দূর থেকে আসছেন, এমনটাই হওয়ার কথা।’

রুস্তম চমকালো না, শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলো, ‘হয়রান ভাব কেন মনে হলো?’

‘আপনি দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন এক মিনিট বায়ান্ন সেকেন্ড। এর মধ্যেই আপনি নক করেছেন প্রায় পাঁচবার, চারবার নক দেয়ার পর আরেকবার দিতেই যাচ্ছিলেন। সেখান থেকেই বুঝলাম।’

রুস্তম মুগ্ধ হয়ে বললো, ‘মিস্টার হোমস, আপনি সত্যিই অসাধারণ। আপনার পর্যবেক্ষণশক্তি অপূর্ব।’

শার্লক আরো একবার ‘এগুলো কোনো ব্যাপার হইলো’ টাইপ একটা হাসি দিয়ে চুরুটে টান দিলেন। বললেন, ‘আপনি যেহেতু আমাকে প্রথমেই স্যার সম্বোধন করেছেন, বোঝা যাচ্ছে আপনি কোনো বিপদে আছেন এবং সেই বিপদাক্রান্ত অবস্থাই আপনাকে এমন বিনয়ী করে তুলেছে। বলুন, আপনার কেসটা কী?’

রুস্তম গলা খাকারি দিয়ে বললো, ‘হ্যাঁ, কেস নিয়েই এসেছি। কেসটা পাঠিয়েছেন আপনার বন্ধু ওয়াটসন।’

শার্লক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। ‘ওয়াটসন আপনাকে আমার কাছে পাঠিয়েছে?’

‘হ্যাঁ, আপনি কেসটা দেখুন, দেখে এই কাগজে একটা সাইন করুন।’

বলতে বলতে রুস্তম শার্লকের হাতে একটা কেস (বাক্স) ধরিয়ে দিলো।

‘এই যে, এই কেসটা আপনার বন্ধু পাঠিয়েছেন। দেখে এই কাগজে সাইন করে বুঝে নিন।’

শার্লকের ভ্রু কিছুটা কুঞ্চিত হলো। কেস হাতে নিয়ে তিনি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করলেন ভেতরে কী আছে। এর মধ্যে কোনো বোমা বা বিস্ফোরক থাকার সম্ভাবনা আছে কিনা, সেটাও ভাবলেন।

রুস্তম বললো, ‘আমি সুন্দরবন কুরিয়ারে কাজ করি স্যার। শেওড়াপাড়া থেকে আসছি। রাস্তায় এমন জ্যাম, কোনো গাড়ি নড়েই না। আসতেই দুই আড়াই ঘন্টা লাগলো। রাস্তায় যে ঝাঁকি, চুল তো চুল পুরা মাথা এলোমেলো হয়ে গেছে। পরে এগারো নাম্বার নেমে হাঁটা দিলাম। মেট্রোরেলের কাজের কারণে রাস্তায় ধুলা, কাদাপানি সব মিশে একাকার। এইজন্য জুতার এই অবস্থা।’

শার্লক চুরুট ফেলে বিরক্ত মুখে কেসটা খুললেন। ভেতরে কিছু সার্জিকাল মাস্ক আর একটা চিঠি। ওয়াটসন লিখেছে-

শার্লক,
তুমি মিরপুর বাসা নিয়েছো তা জানতে পেরে এই মাস্কগুলো পাঠালাম। বাইরে যাওয়ার আগে মাস্ক ছাড়া বের হয়ো না, প্রচুর ধুলাবালি। ওভারকোটের দুই পকেটে দুটা করে চারটা রেখে দেবে। হ্যাভ এ গ্রেট মিরপুর লাইফ, হা হা হা...

ইতি তোমার সমব্যথী বন্ধু, ওয়াটসন

শার্লক কাগজে সাইন করলেন। রুস্তম থ্যাংক ইউ বলে বের হয়েই যাচ্ছিল, যাওয়ার আগে বললো, ‘স্যার কি ডিডাকশন বেলাইনে যাওয়ায় মন খারাপ করলেন?’

শার্লক কিছু বললেন না। রুস্তম বললো, ‘মিরপুরে এইগুলা কোনো ব্যাপার না স্যার। অবজার্ভেশন, ডিসিশন, ডিডাকশন সবকিছুই এইখানে ভুল হয়। দিস প্লেস ইজ সো আনপ্রেডিক্টেবল। আসি স্যার।’

শার্লক দরজা বন্ধ করলেন। তিনি মাস্কগুলো নিয়ে ভাবছেন। গোয়েন্দাগিরির জন্য অবশ্য মুখে মাস্ক লাগিয়ে ঘোরাটা খুব একটা খারাপ না।

১৪৩২৯ পঠিত ... ১৬:৩৩, জানুয়ারি ০৬, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top