ঢাকার এয়ারপোর্টে নেমে জেমস বন্ডের যে অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা হলো

১৯৫৬ পঠিত ... ১৯:৩২, মার্চ ০৯, ২০১৯

নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশগামী বিমানে চেপে বসলেন জেমস বন্ড।

বিমানের 'উইন্ডো সিটে' বসে বন্ড বারবার নিচের দিকে তাকিয়ে দেখছেন। পাহাড়-পর্বত-নদী সবকিছু চোখের নিমিষে পেছনে চলে যাচ্ছে। বিমানের জানালা থেকে এই দৃশ্য অসংখ্যবার দেখেছেন বন্ড। আজ তিনি তাকিয়ে আছেন স্নায়ুচাপ কাটিয়ে ওঠার জন্য। অত্যন্ত জটিল একটি মিশনে অপরিচিত একটি দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছেন তিনি। সিক্রেট ইন্টিলিজেন্স সার্ভিসের চিফ এম ছাড়া আর কেউই এই মিশনের কথা জানে না। গতকালই তাকে এম একটি এনক্রিপ্টেড ম্যাসেজ পাঠিয়ে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের দক্ষিণে মিয়ানমারের সীমান্তে তাদেরই এক এজেন্ট বিপদে পড়েছেন এক পিতৃতুল্য মাদকসম্রাটের হাতে। তাকে উদ্ধার করতে একদম গোপনে বাংলাদেশে আসতে হচ্ছে বন্ডকে।

জেমসের স্নায়ুচাপের কারণ একটা সামান্য পিস্তল। এই পিস্তল নিয়ে ঢাকা বিমানবন্দরে যদি ধরা পড়ে যান! দুই একবার বড় বড় কয়েকটা দুর্ঘটনার পর দেশটির নাম শুনেছিলেন, এর বেশি কিছু না। কিন্তু জেমস বন্ড কতবারই চলে গিয়েছেন কতো অজানা দেশে কতো শত ভয়ংকর অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে মিশনে। এই ঝানু এজেন্টের আবার স্নায়ুচাপ কেন?

টার্কিশ এয়ারলাইন্সের প্লেনটি ইস্তাম্বুল থেকে ট্রানজিট নিয়ে যখন ঢাকার উদ্দেশ্যে উড়াল দিচ্ছে, তখন এজেন্সির এক লোক পিস্তলটি তার সিটে রেখে গিয়েছে। এই বিশেষ পিস্তলটি সিক্রেট সার্ভিসের রিসার্চার কিউ সম্প্রতি বানিয়েছেন। বাংলাদেশ মিশনে এই পিস্তলটি খুব দরকারি। কিন্তু ঐ দেশের কাউকেই জানানো হয়নি তার আগমনের খবর। কী করে এই পিস্তল নিয়ে পাড়ি দেবেন বিমানবন্দরের চেকিং? বন্ডের কপালে ফুটে ওঠে দুশ্চিন্তার রেখা।

পিস্তল নিয়ে চেকিং পার হওয়ার পরিকল্পনা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লেন বন্ড। স্বপ্নে পুরনো সব মিশনের ছবি ভেসে উঠল। রাশিয়া, জার্মানি, ইতালি, ইন্ডিয়া এসব দেশে যে ঝুঁকি মোকাবেলা করে সফল হয়েছেন, সেসব মনে করে ঘুমের ভিতরেই মুচকি হাসছিলেন এই সুপুরুষ। রাশিয়ার এক এয়ারপোর্টে পিস্তল নিয়ে ঢুকতে গিয়ে কী ধরাটাই না খেয়ে গিয়েছিলেন!

তখনই ঢাকা পৌঁছানোর ঘোষণায় ঘুম ভেঙে যায় বন্ডের। আবারও চিন্তায় পড়ে যান। সময় তো এসে গেছে। এখন কী করবেন? প্লেন ল্যান্ড করার পর দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলেন বাংলাদেশি লোকজন দরজায় ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। একটু অবাক হলেও নিজে আস্তে ধীরে হ্যান্ডব্যাগটা নামালেন। এই ব্যাগেই পিস্তলটা। দরজা খুলে গেলে ভিড়ের শেষে নেমে গেলেন।

টার্মিনালের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ভয়টা বাড়ছিল। ততক্ষণে প্রথম স্ক্যানারের লাইনে এসে পড়েছেন, খেয়ালই করেননি। সামনের কয়েকজনের পরই আসল তার পালা। দুরু দুরু বুকে সামনে এগিয়ে গেলেন। ব্যাগটা দিলেন। নিজে পার হলেন। ব্যাগ ঘুরে তার হাতে চলে আসল, কেউই কিছু বলল না!

হতবাক বন্ড বুঝে উঠতে পারলেন না হচ্ছেটা কী? একটু ভেবে বুঝতে পারলেন, হেডকোয়ার্টার থেকে খবর না দিলে কী হবে, বাংলাদেশের চৌকস নিরাপত্তা বাহিনী তাকে দেখেই চিনে ফেলেছে। আর বন্ডের কাছে যদি পিস্তল না থাকে তো থাকবেই বা কার কাছে?

তখনই বন্ড তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ভুলটা করলেন...

বাংলাদেশের হাওয়ায় নেমেই তার মনে এক্সট্রা খাতির পাবার একটা আকাঙ্খা জাগ্রত হয়ে যায়। বন্ড ভাবলেন, যদি এয়ারপোর্টের লোকজনকে তিনি নিজের পরিচয় দেন, তাহলে নিশ্চয়ই তারা তাকে কক্সবাজার যাওয়ার সব বন্দোবস্ত করে দিবে। এই ভেবেই একজন অফিসার গোছের মানুষকে দেখে এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন সেই চিরায়ত বাক্যটি, ‘মাই নেম ইজ বন্ড, জেমস বন্ড!’ লোকটা তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে পাশেই আরেকজনকে ডেকে বললেন, ‘এই দেখো তো, বন্ড জেমস বন্ড নামের এক ব্যাটা আসছে। কী বলে শোনো তো!’ বিস্মিত বন্ডের দিকে এগিয়ে আসলেন আরেক নিরাপত্তা কর্মী ‘ভাই এদিকে আসেন। বলেন কী হইছে?’

‘আপনারা নিশ্চয়ই আমাকে চিনতে পেরেছেন। আমি ব্রিটিশ সিক্রেট ইন্টিলিজেন্স সার্ভিসের এজেন্ট জেমস বন্ড।’

‘আচ্ছা। কিন্তু আপনাকে আমরা চিনি নাই। আপনি কী চান? ট্যাক্সি ঠিক করে দিতে হবে? একটা নাম্বার নিয়া যান। এইটায় কল করলেই ট্যাক্সি, হোটেল, ঐসব যেটা ইচ্ছা সেটাই পাবেন!’ বলেই একটা চোখ টিপলো লোকটি।

‘না মানে, আমি বলতে চেয়েছিলাম যে আমার ব্যাগে একটা পিস্তল আছে। আপনারা সেটা স্ক্যানিংয়ে...’ হতভম্ব বন্ড কথাটি শেষ করতে পারলেন না তখনই ‘পিস্তল!’ বলে চিৎকার করে উঠলেন লোকটি। হুট করে যেন চারপাশের সবকিছু বদলে গেল। চারপাশ থেকে অস্ত্র বের করে সবাই পজিশনে। দুধ চা খাছিলেন এমন একজন আদেশের সুরে বললেন ‘হ্যান্ডস আপ! কোন চালাকি করার চেষ্টা করলে গুলি করে দিব।’ দুই হাত উপরে তুলে ফেলতে হলো বন্ডকে। একজন এসে শরীরে চেক করে জানালেন, কিছু নেই। আরেকজন তখন ব্যাগ খুলে দেখলেন। বেরিয়ে আসল অত্যাধুনিক অস্ত্রটি। সেটি দেখার সাথে সাথেই চারপাশের সবাই হাসাহাসি শুরু করল। তাক করে থাকা সব বন্দুকও নেমে গেল। বন্ড বুঝতে পারছিলেন না, এসব কী হচ্ছে?

‘এইটা তো খেলনা পিস্তল!’ হাসতে হাসতে বলে উঠলেন এক কর্মকর্তা। তখন যেন মাথায় রক্ত উঠে গেল বন্ডের। ‘ফাইজলামি নাকি? এইটা এম বানায়া দিছে। এইটা অত্যাধুনিক অস্ত্র!’ রাগী গলায় বললেন বন্ড। সেই কর্মকর্তা আবার বললেন ‘ধুরু মিয়া! ফাইজলামি পাইছ নাকি? আসল পিস্তল এতো হালকা হয়!’

‘স্যার, লোকটার ব্যাগটা সার্চ কইরা দেখা দরকার কিন্তু। অন্য কোন বস্তু যদি থাকে!’ পিছন থেকে একজন এসে ফিসফিস করে বড় কর্তাকে বললেন।

‘হুম, ঠিক বলছ! এই ওর ব্যাগ ভালো মতো সার্চ করে দেখো!’ বলে উঠলেন অফিসার। দুইজন লেগে গেল ব্যাগ সার্চের কাজে। ততক্ষণে জেমস বন্ড মাথা ঠাণ্ডা করে ফেলেছেন। ভাবছিলেন, যত খুশি ব্যাগ দেখুক। কিচ্ছু পাবে না আর। পিস্তলটা যেহেতু বেঁচে গেছে, আর কিছুই হবে না।

এসব ভাবছিলেন, তখনই একজন চিৎকার করে উঠল ‘পাইছি!’ চমকে উঠলেন বন্ড। ব্যাগে তো আর কিছু থাকার কথা না। তাহলে ওরা পেলো কী? খুবই সিনেমাটিক সাসপেন্সের ভঙ্গিতে লোকটি ব্যাগের ভিতর থেকে বের করে আনল একটা রেজর। আবারও হাফ ছেড়ে বাঁচলেন বন্ড। কিন্তু তিনি বুঝতেই পারেননি, দুঃসময়ের শুরুটা এখানেই। সাথে সাথে আবার সবগুলো পিস্তল বন্দুক তাক হয়ে গেল তার দিকে। প্রচণ্ড শীতল গলায় বড় কর্তা বললেন ‘আপনি আমাদের সাথে ভিতরে চলুন!’

ভেতরে যাওয়ার পর তাকে একলা বসিয়ে রাখা হলো। কিন্তু সবার হুলস্থূল দৌড়াদৌড়ি দেখে বুঝতে পারছিলেন, বড় কিছু একটা হচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ পর দশাসই চেহারার দুইজন এসে নিজেদের সিকিউরিটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলে পরিচয় দিয়ে শুরু করলেন জিজ্ঞাসাবাদ।

‘আপনার সাথে যে ধারালো বস্তু আছে, সেটা আপনি কেন এনেছেন?’

‘ধারালো বস্তু? ঐটা তো একটা রেজর। শেভ করার জন্য আনছি! আপনারা রেজর আটকাচ্ছেন কেন?’

‘আপনার চোখে যেটা রেজর, সেটা আমাদের চোখে একটা পটেনশিয়াল কিলিং মেশিন। আপনি চাইলেই এটি দিয়ে মানুষ খুন করে ফেলতে পারবেন।’

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাওয়া বন্ড বুঝে উঠতে পারছিলেন না কিছুই। এর আগে কম কাস্টডির সম্মুখীন হননি তিনি। কিন্তু এমন বিদঘুটে অবস্থা এই প্রথম! আমতা আমতা করে বললেন ‘আপনারা নিশ্চয়ই প্র্যাংক করছেন। চারপাশে নিশ্চয়ই ক্যামেরায় লুকিয়ে ভিডিও করা হচ্ছে। তাই না?’

‘খামোশ!’ বলে টেবিলে থাবা দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন একজন। ‘আপনি কি আমাদের দুলাভাই লাগেন? আপনার সাথে প্র্যাংক করব কেন?’

জেমস বন্ড দ্রুত ভাবার চেষ্টা করলেন, কী করে এই সার্কাস থেকে বের হওয়া যায়। তখনই তার মনে পড়লো, নিরাপত্তাকর্মীরা তার রেজরটা নিয়ে নিলেও, পিস্তলটা নেয়নি! বন্ড পিস্তলটা হাতে নিয়ে উপরের দিকে তিনটা ফাঁকা গুলি চালালেন। নিরাপত্তাকর্মীরা হাসতে শুরু করলো, ‘আরে এই খেলনা পিস্তল দিয়ে দেখি গুলিও করা যায়… হা হা হা…’

বন্ড দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বাংলাদেশের এয়ারপোর্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে তিনি যতটা ভয়াবহ ভেবেছিলেন, এটা তার চাইতেও ভয়াবহ। এমন এয়ারপোর্ট পৃথিবীর কোনো দেশে নেই।

১৯৫৬ পঠিত ... ১৯:৩২, মার্চ ০৯, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top