মোটিভেশনাল ভাই-বুবু-আপাদের রেজাল্ট পরবর্তী তৎপরতা

১০৬৬ পঠিত ... ১৯:২৯, মে ০৮, ২০১৮

এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে। চারিদিকে আনন্দের বান ডেকেছে। অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থী  ফেল করায় কোথাও কোথাও বাতাস চাপা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে। আনন্দ-বেদনার মিশ্র সাগরে ফেসবুক সেলিব্রেটিরা সুপারম্যানের মতো নেমে আসেন সদ্য এসএসসি পাশ ও ফেল করা শিক্ষার্থীদের কিছু হিতোপদেশ দিতে। সমকালে একে মোটিভেশনাল স্পিচ বলা হয়।

একজন মোটিভেশনাল স্পিকার লেখেন, 'অভিনন্দন তাদের যারা জিপিএ ফাইভ পেয়েছো। আরো বেশি অভিনন্দন তাদের যারা ফেল করেছো। আমার স্কুলটি ছিলো বাড়ি থেকে তিন ক্রোশ দূরে। কখনো রোদ কখনো বৃষ্টি ঠেলে স্কুলে যেতাম। যেদিন এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল দিলো; স্কুলে গিয়ে দেখি আমার রোল নম্বর নেই তাতে। প্রধান শিক্ষক তাচ্ছিল্য করে বললেন, তুই তো ফেল করেছিসরে ক্যাবলা। এরপর মনের দুঃখে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হঠাত ক্যাবলা শব্দটি মনের মধ্যে ঝনঝন করে ওঠে। মায়ের গয়না বেচে ডিস এন্টেনা কিনে শুরু করি ক্যাবল (কেইবল) ব্যবসা। এরপর তৈরি করি কিছু কিছু মিউজিক ভিডিও। এরপর আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। লোকে এখন আমাকে 'হিরো' নামেই চেনে। তোমরাও পারবে। শুধু দরকার আমার মতো আত্মবিশ্বাস।'

অলংকরণ: সালমান সাকিব শাহরিয়ার

আরেকজন মোটিভেশনাল স্পিকার তার ফ্যান পেজের এডমিনকে দিয়ে লেখান, 'এসএসসি পরীক্ষায় কৃতকার্যদের অভিনন্দন। যদিও আমি জানি না মানুষ কেন লেখাপড়া করে! আসল ব্যাপার হচ্ছে টাকা-পয়সা। টাকা পয়সা থাকলে ইউনিভার্সিটি বাসা বয়ে এসে পিএইচডি ডিগ্রি দিয়ে যায়। মিডিয়া লাইসেন্স দিয়ে যায়। বেতন দিয়ে পোষা যায় শিক্ষিত বানর। শিক্ষিতদের বানর খেলার ব্যবসা জমিয়ে তুলতে আমাকে পড়ালেখা করতে হয়নি। তোমরা কেন সময় নষ্ট করছো জানি না। তোমরা কী জানো টাকা-পয়সা থাকলে গায়ক হিসেবেও খ্যাতি পাওয়া যায়। বড় বড় সংগীত পরিচালক এনে মিউজিক ভিডিও বানানো যায়। আমার গানের ভক্ত আজ অনেকেই। এমনি করে গড়তে হবে জীবন। মরণে কাঁদবে তুমি; হাসবে ভুবন।'

একজন হাসিমুখ মোটিভেশনাল স্পিকার গাড়ি চালাতে চালাতে ফেসবুক লাইভ করেন- 'ডিয়ার ফ্রেন্ডস তোমরা যারা খারাপ রেজাল্ট করছো তারা মন খারাপ কইরো না। এই আমারে দ্যাখো; আমি সিক্স ডিজিটের স্যালারি পাই; বিদেশে গিয়া বাঞ্জি জাম্প করি। অথচ স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে আমার জীবন ছিলো, ফেইল সবি ফেইল। আর এখন দেখো মন্ত্রীরা আমাকে হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যায় তোমাদের মতো তরুণদের মোটিভেট করতে। আমার একটাই অনুরোধ তোমরা স্মার্ট হইবা; স্মার্ট ড্রেস আপ করবা; জীবনের লক্ষ্য স্থির করো, আমার মতো গাড়ি চালাইবা; মোটিভেশন ভাইয়া ক্যামেরা ঘুরিয়ে গাড়ির ভেতরটা দেখায়। তারপর বলে, থিংক বিগ; গুল্লি মারো পড়ালেখা।

এক মোটিভেশনাল আপা লেখেন, 'তোমাদের অভিনন্দন যারা জিপিএ ফাইভ পেয়েছো। আজ এই দিনে বড্ড স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠে মন। তোমরা বিশ্বাস করবে না, আমি আমার এসএসসির ফলাফল জানতে স্কুলেও যাইনি। আড্ডা দিচ্ছিলাম মনের সুখে। হঠাতই কে একজন দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বললো, আমি নাকি সম্মিলিত মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছি। আমি বললাম, দূরো কী যে বলিস; আমি তো পড়ালেখাই করি না। এরপর হার্ভাডে পড়েছি। কিন্তু ধর্ম-কর্মটা ঠিকঠাক করেছি। আমি তো বস্টনের অনেক খ্রিস্টানকে মোটিভেট করে প্রায় মুসলমান বানিয়ে ফেলেছি। আল্লাহর পথে থাকবা; জীবনের সব রেজাল্টই ভালো আসবে।'

অলংকরণ: সালমান সাকিব শাহরিয়ার

আপার এই মোটিভেশনাল স্ট্যাটাসে ক্ষুব্ধ হয়ে আরেক মোটিভেশনাল বুবু এসে বলে, 'তাইলে এবার আমার এস এসসির রেজাল্টের গল্প শোনো। আমিও ক্লাস করতাম না। কিন্তু বই পুস্তকের দিকে তাকালেই অক্ষরগুলো চৌম্বক আকর্ষণে আমার ব্রেণে আটকে যেতো। ফলে আমিও ক্লাসে কখনো দ্বিতীয় হইনি। এম আই টিতে পড়েছি। এখানে ধর্মের কোন কেরামতি নাই; পুরাটাই বিজ্ঞানের কেরামতি। ঐ যে বললাম; চৌম্বক আকর্ষণের কথা। বিজ্ঞানের কেরামতিতে বিশ্বাসী হও; সাফল্য তোমার চৌম্বক আকর্ষণে পায়ে এসে লুটিয়ে পড়বে।'

এবার এক পাকা মোটিভেশনাল স্পিকার এসে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়, 'আমি তো এস এস সি পরীক্ষার ধার ধারি নাই; এখন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ম্যাজিস্ট্রেট-সাংবাদিক-শিক্ষকদের চড়াই। সে কারণেই সবাই আমাকে চড় বাবা বলে ডাকে। আমার এলাকায় আমার যে জনপ্রিয়তা; তাতে উচ্চশিক্ষিত বারাক ওবামা বা জাস্টিন ট্রুডো এসে আমার বিরুদ্ধে নির্বাচন করলেও জামানত হারাবে। সুতরাং বাবা হও; চড় বাবা হয়ে ওঠো।'

১০৬৬ পঠিত ... ১৯:২৯, মে ০৮, ২০১৮

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top