এমন দিনে ঢাকায় বজরা লইয়া ঘোরা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায় : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

৫৫৪ পঠিত ... ২১:৪৮, এপ্রিল ০৯, ২০১৯

বসন্ত এখনো বিদায় নেয়নি, বর্ষার তো আরও অনেক দেরি। অথচ এই প্রাক-গ্রীষ্মকালীন দুদিনের বর্ষণেই তলিয়ে গেছে ঢাকা শহর। শহরের রাজপথের জলস্রোতের ধারা যেন তেজস্বী স্রোতস্বিনীকেও ছাড়িয়ে গেছে। বৃষ্টি নিয়ে চিরকালীন সব রাবীন্দ্রিক রোমান্টিসিজম রাজপথে হাটুপানির (পড়ুন গলাপানি) সঙ্গে লড়াই করে ঘরে ফিরতে গিয়েই হারিয়ে ফেলছে ঢাকাবাসীরা।

বৃষ্টি নিয়ে যার এত সৃষ্টি, এত গান-কবিতা, সেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কী ভাবছেন ঢাকার বৃষ্টি ও পথঘাটে গড়ে ওঠা অস্থায়ী সমুদ্র নিয়ে? জানতে আমরা মিরপুরের কালSea সমুদ্রসৈকত থেকে জাহাজে উঠে সরাসরি গিয়ে পৌঁছাই কলকাতার জোড়াসাঁকোতে। ঠাকুরবাড়িতে ঢুকে যেই না কবিকে খুঁজতে আরম্ভ করেছি, তখনই ফেসবুকে কবির ফেক আইডি থেকে পোস্ট করা একটি ছবিতে আমাদের চোখ পড়ে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ঢাকার বসুন্ধরায় সৃষ্ট মনোরম সড়কনদীতে বজরা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর!

যার খোঁজে আমরা কলকাতা এলুম, তিনিই কিনা ঢাকার পথে বজরায় ভেসে বেড়াচ্ছেন? অগত্যা মেসেঞ্জারেই কল করতে হলো... প্রথমে কল কেটে দিলেও একটু পর কবি নিজেই ব্যাক করলেন।

: ফোনে সড়ক-জলধারার একখানা ভিডিও তুলিতেছিলাম। ফেসবুকে পোস্ট করিতে চাই। বৃষ্টি বাদলার দিনে শতবর্ষ পূর্বে গান-কবিতা চলিতো। এখন সড়ক-জলধারার ছবি-ভিডিও চলে ভালো...

: কবি ঢাকায় নাকি? ছবি দেখলাম ফেসবুকে... আমরা তো কলকাতায় আইসা বইসা আছি মিয়া...

: ছবি যেহেতু ঢাকারই দেখিয়াছো, আলবৎ আমি ঢাকায়। এই কারণেই তোমাকে বলিয়াছি, আগে মেসেঞ্জারে নক করিয়া লইবে।

: বাদ দেন। ঢাকার বৃষ্টি কেমন লাগছে কবি?

: অতি মনোহর। ফেসবুকে আমি দুদিন ধরিয়াই ঢাকার নানান নদী-নালার ছবি-ভিডিও দেখিয়াছি। যান্ত্রিক এই পৃথিবীতে যেথায় নগরগুলো যন্ত্রের পিঠে উড়িয়া চলিয়াছে, সেথায় ঢাকায় জল-স্থলের এমন অনুপম সহাবস্থানে আমি মুগ্ধ হইয়াছি। ঢাকার বৃষ্টি যেইভাবে আমার চোখে ধরা পড়িয়াছে, অন্য কোথাও এইভাবে নয়। তাই অপরূপ এই জল-শহরে বজরা-বিলাসের লোভ সংবরণ করিতে পারিলাম না...

ঢাকার বৃষ্টিতে একটি বিষয় আমি পাইয়াছি, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও নাই। এই শহরে বৃষ্টি হয় অতি অল্প সময়, কিন্তু শহর জুড়িয়া তাহার রেশ যেন রইয়া যায় গোটা দুইদিন। ঢাকার বৃষ্টি যেন ছোটগল্পের মতো, শেষ হইয়াও হইলো না শেষ...

: বজরায় করে বসুন্ধরায় ঘুরছেন নাকি?

: ধনধান্য বসুন্ধরা শব্দযুগলের গুরুত্ব এখন উপলব্ধি করিতেছি। বসুন্ধরার জলসৌন্দর্যে আমার মনে বিস্ময় জাগাইয়াছে। ইট-সুরকির রাজপথ, অথচ কি বিপুল জলধারা বইতেছে পুরো এলাকা জুড়ে। এমন স্রোত দেখিয়াছিলাম ইংল্যান্ডের টেমস নদীর ধারে, তাহার পর আর দেখি নাই।

এতটুকু বলে কবি আপন মনেই গাইতে থাকেন, 'এসো নীপ বনে ছায়াবীথি তলে, এসো কর স্নান বসুন্ধরা জলে...'

: পানিতে জলকেলি করতে নামার ইচ্ছা হয়নি কবি?

: হইয়াছে বটে। তবে এই বয়সে এত গভীর পানিতে সাঁতরানোর ঝুঁকি নেয়ার সাহস করিতে পারি নাই। দূর হতে আমি তারে চাহিবো... নিকটে গেলে নিশ্চিত ডুবিয়া যাইব!

: ঢাকার পানিতে নাকানিচুবানি খেয়ে অনেকেই বলেছে, এই শহরের বৃষ্টিকে নাকি এখন আর রাবীন্দ্রিক বৃষ্টি বলা যায় না। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

: শোনো বাছা, প্রকৃত রাবীন্দ্রিক বৃষ্টি আমি, রবি ঠাকুর স্বয়ং ঢাকাতেই দেখিয়াছি। ঢাকায় বসিয়াই কিন্তু আমি লিখিয়াছিলাম, 'শাওন শহরে ঘোর ঘনঘটা, পানিত আমি রে/ কোন পথে, সখি, কৈসে যাওব মিরপুরগামীরে।’ লাইনখানা অবশ্য পরে কপি-পেস্ট হইয়া নানানভাবে ছড়াইয়া বদলাইয়া গিয়াছে...

: ঢাকায় বজরা তো নিয়েই এলেন, এই চান্সে সবগুলো এলাকাই ঘুরে যেতে পারেন তো! কোথায় কোথায় ঘুরতে চান?

: শেষবার ঢাকায় আসিয়া মালিবাগে ডিঙ্গি নৌকা চড়েছি। এবার ওদিকে বজরা নিয়া না যাইতে পারিয়া হতাশ হইলাম। তবে বসুন্ধরা, শেওড়াপাড়া, ধানমন্ডি ২৭ এইসব স্থানে সুন্দর তটিনীর মতো জলধারা দেখিয়াছি, ঘুরিয়া আসার ইচ্ছা রইয়াছে।

এই পর্যায়ে কবিকে খুবই ফ্রেন্ডলিভাবে 'মিরপুরের দিকে যাবেন না?' প্রশ্ন করলে তিনি হুট করে লাইন কেটে দেন।

৫৫৪ পঠিত ... ২১:৪৮, এপ্রিল ০৯, ২০১৯

Top