রিকশা বৃত্তান্ত : দ্য জার্নি অফ রিকশা

৯২ পঠিত ... ১৪:০১, জুলাই ১০, ২০১৯

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য বাহন রিকশা আমাদের কাছে এতটাই পরিচিত, দেখে যেন মনে হয় কায়িক পরিশ্রমে চালিত এই বাহন বাংলাদেশে সেই আদিকাল থেকেই আছে। ব্যাকরণ বইতে বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের উদাহারণ পড়তে গিয়েই সম্ভবত আমরা সবাই প্রথমবারের মতো জানতে পারি, রিকশা শব্দটা জাপানি। বাংলা বইয়ের এই তথ্যটাও যেন আমরা খুব একটা মনে রাখতে পারি না সব সময়। আমাদের কথায়, সাহিত্যে, গানে, লেখায়, সর্বোপরি আমাদের যাপনে রিকশা এমনভাবেই উপস্থিত হয়, একে বিদেশি কিছু ভেবে নিতে আমরা একেবারেই পারি না।

গত ২৮ নভেম্বর, ২০১৮ তারিখে contextbd.com-এ রিকশা বিষয়ক একটি লেখা প্রকাশিত হয়। রিকশার ইতিহাস উৎপত্তি এবং নকশা নিয়ে চমৎকার এই গবেষণা প্রবন্ধটি লিখেছেন সাইমুম কবির। তিনি পেশায় একজন স্থপতি এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন স্কুল অফ ডিজাইনে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। ইংরেজি এই প্রবন্ধে পাওয়া যায় রিকশা সম্পর্কে চমকপ্রদ কিছু জানা-অজানা তথ্য। eআরকির যেসব পাঠকরা রিকশায় ওঠেন, রিকশায় উঠতেন কিংবা অদূর ভবিষ্যতে রিকশায় উঠবেন, রিকশায় কখনো ওঠেননি কিংবা রিকশায় আগে উঠতেন কিন্তু এখন ওঠেন না, সব ধরনের পাঠকরাই জেনে নিতে পারেন এই রিকশা-বৃত্তান্ত!

ঠিক দেড়শ বছর আগে ১৮৬৮ সালে জাপানের টোকিওতে জিনরিকিশার উদ্ভাবন হয় ইজুমি ইয়োসুকে, সুজুকি তোকুজিরো এবং তাকায়ামা কোসুকের হাত ধরে। জাপানি ভাষায় ‘জিন’ অর্থ মানুষ, ‘রিকি’ অর্থ শক্তিচালিত এবং ‘শা’-এর মানে হচ্ছে বাহন। ঐ জিনরিকিশা অবশ্য আমাদের দেশের রিকশার মতো ছিল না। দুই চাকার এই বাহনে দুইজন যাত্রী বসতে পারত এবং ‘কুলি’ টেনে নিয়ে যেত। অনেকটা এখনো পশ্চিমবঙ্গে যে টানা রিকশা দেখা যায়, তার মতো। শুরুতেই বেশ জনপ্রিয়তা পাওয়া এই বাহন খুব দ্রুতই জাপান ছাড়িয়ে সাংহাই, হংকং, সিঙ্গাপুর আর ভিয়েতনামে।

আমাদের উপমহাদেশে রিকশার আগমন শুরুর দিকেই। ১৮৮০ সালে উত্তর ভারতীয় ছোট্ট পাহাড়ি শহর সিমলায় আগমন ঘটে রিকশার। রাজধানী কিংবা বড় শহর ছেড়ে প্রথম কোন ছোট শহরে রিকশার দেখা পাওয়া গেল। এছাড়াও শুরুর বেশ অনেকদিন রিকশা ব্যবহৃত হত ব্যক্তিগত বাহন হিসেবে। কিন্তু উনিশ শতকের শেষ দিকে এসে রিকশা গণপরিবহনের কাতারে চলে আসে।  

বিশ শতকের একেবারে শুরুতে ভারতবর্ষের তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় আগমন ঘটে রিকশার। পূর্ব বাংলা পর্যন্ত পৌঁছাতে রিকশার লেগে যায় প্রায় চার দশক। ধীর গতির বাহন বলে কথা! ১৯৩৮ সালে কিছু ইউরোপিয়ান পাট ব্যবসায়ীর সঙ্গী হয়ে কিছু রিকশা আসে নারায়ণগঞ্জ এবং নেত্রকোণায়। সেগুলোও ছিল ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্যই। ঢাকায় সাধারণ মানুষের বাহন হিসেবে রিকশার আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৪১ সালে। যদিও এই সময়ে এসে ঢাকায় রিকশার সংখ্যা পৃথিবীর যেকোনো এলাকার চাইতে বেশি, প্রথম বছরে ঢাকায় রিকশার সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৭টি। এতদিনে ঢাকা শহরে রিকশার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ লাখ।

ঢাকাসহ বাংলাদেশে আমরা যে রিকশা দেখি, সেটি আসলে সাইকেল রিকশা। সাইকেল রিকশার উদ্ভাবন কোন দেশে সেটি খুব একটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। থাইল্যান্ড, চীন, কম্বোডিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ এর উদ্ভাবক হিসেবে নিজেদের দাবি করে। দেশের ব্যাপারেই যেখানে নিশ্চিত হওয়া যায় না, উদ্ভাবকের নাম খুঁজে বের করার চেষ্টা প্রায় দুরাশাই। তবে সাইকেল রিকশার সবচেয়ে পুরনো নিদর্শনের প্রমাণ পাওয়া যায় সিঙ্গাপুরে, সেই ১৯১৫ সালে। তবে এই সাইকেল রিকশাও এশিয়ার সব স্থানে পুরোপুরি একরকম না। বাংলাদেশেই বিভিন্ন অঞ্চলের রিকশাগুলোর মাঝে কিছু দৃশ্যগত পার্থক্য চোখে পড়ে।

যাত্রী আর চালকের আসনের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে মোটা দাগে সাইকেল রিকশা তিন প্রকারে ভাগ করা সম্ভব। সাইকেল রিকশার একেবারে আদিরূপ, যেটা সিঙ্গাপুরে প্রথম দেখা গিয়েছিল তার নাম ট্রাইশ (Trishaw)। এই রিকশা দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের রিকশার মতোই। চালক সামনে বসেন আর যাত্রী দুজনের সিট পিছনে। তবে চালকের আসন মাঝামাঝি নয়, ডানদিকে এবং সিট যথেষ্ট নিচু। মিয়ানমার এবং ফিলিপাইনে এই রিকশা এখনো দেখা যায়।

 যাত্রী আর চালকের আসনের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে মোটা দাগে সাইকেল রিকশা তিন প্রকারে ভাগ করা সম্ভব...

আরেক রকমের সাইকেল রিকশা আছে যাতে যাত্রী দুজন বসে সামনে আর চালক বসে পিছনে। অনেকটা আমাদের দেখা আইসক্রিমের ভ্যানের মতো। এর নাম সাইক্লো। ফ্রেঞ্চ ডিজাইনার পিয়েরে কোপ্যু এটির ডিজাইন করেছিলেন। কম্বোডিয়ার নমপেনে সবার আগে সাইক্লোর নির্মাণ শুরু হলেও গণপরিবহন হিসেবে এই ব্যবহার শুরু হয় ইন্দোনেশিয়া আর ভিয়েতনামে।

আমাদের চিরপরিচিত রিকশা কোন দেশে উদ্ভাবন হয়েছিল সে বিষয়েও সঠিক কোন তথ্য নেই। তবে ধারণা করা হয় এই রিকশার শুরুটা থাইল্যান্ডে। পরবর্তীতে এটিই সাইকেল রিকশার সবচাইতে জনপ্রিয় ফরম্যাট হয়ে যায়। বাংলাদেশের বাইরেও ভারত, চীন এবং থাইল্যান্ডে এমন রিকশা খুঁজে পাবেন আপনি।

মিলিয়নের বেশি রিকশা থাকলেও নীতি নির্ধারকদের মাঝে রিকশা কখনোই কোন গুরুত্ব পায়নি। গত চার দশকে বেশ কয়েকবার রিকশার ডিজাইন আধুনিক করার প্রচেষ্টায় কাজ হয়েছে আলাদাভাবে। নতুন নকশা প্রণয়নও হয়েছে। কিন্তু কোনটিই তেমন একটা আলোর মুখ দেখেনি। বরং ব্যাটারিচালিত রিকশার মতো ঝুঁকিপূর্ণ একটি ভার্শন দেশের বেশ অনেক স্থানেই জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছে।

যদিও অনুন্নয়নের প্রতীক হিসেবেই রিকশাকে বিবেচনা করা হয় উপরমহলে, তারপরও রিকশা সংক্রান্ত কিছু তথ্য আপনার চোখ ছানাবড়া করে দিতে পারে। বাংলাদেশে সব রিকশা মিলে প্রতি বছর আয় করে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঘোষিত বাজেটের ৮ শতাংশের সমান। এদিক দিয়ে রিকশা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরিবহন মাধ্যম, বিমান কিংবা রেলসেবার চাইতেও বড়। প্রায় পনের লাখ রিকশাচালক এবং তাদের পরিবার সরাসরি নির্ভরশীল এই টাকার উপর। এছাড়াও রিকশার উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে আরও কয়েক মিলিয়ন রিকশামিস্ত্রী, আঁকিয়ে, খুচরা পার্টস বিক্রেতাসহ আরও অনেকে।

এই গবেষণায় সাইমুম কবিরের সহায়তায় ছিলেন শাবিপ্রবির মোহাইমিন আলী খান, এমআইএসটির রামিসা তাসনিম, এআইইউবির রাফি শাদমান ও আসিফ রহমান। স্থপতি সাইমুম কবির প্রবন্ধটিতে রিকশার ইতিহাস নিয়ে বলার পাশাপাশি বিশদভাবে আলোচনা করেছেন রিকশার নকশা নিয়ে, বলেছেন সম্ভাবনার কথাও। পুরো প্রবন্ধটি পড়তে পারবেন এখানে

৯২ পঠিত ... ১৪:০১, জুলাই ১০, ২০১৯

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top