'মেড ইন বাংলাদেশ' এবং বিজিএমইএর সভাপতি থাকাকালে মেয়র আতিকুল ইসলামের অভূতপূর্ব কাজ

১১০৫৬ পঠিত ... ২০:৩৫, মার্চ ২১, ২০১৯

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধ্বসের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্য আরও অসংখ্য ছবির পাশাপাশি একটি রক্তাক্ত প্রাইসট্যাগের ইলাস্ট্রেশনও দেখা যাচ্ছিল সবার হোমপেজে। কার্টুনিস্ট নাসরীন সুলতানা মিতুর আঁকা এই ইলাস্ট্রেশনটি বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের কালো দিকটা যেন একেবারে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছিল। এমন একটি প্রাইসট্যাগের সূত্র ধরেই কানাডিয়ান সাংবাদিক মার্ক কেলি এসেছিলেন বাংলাদেশে। প্রাইসট্যাগের সূত্র ধরেই দেখা করেছিলেন তৎকালীন বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলামের এবং সাক্ষী হয়েছিলেন এক বিস্ময়কর ঘটনার।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পরপরই পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের নজরে আসে তাদের যাপনের সাথে জড়িয়ে থাকা এক কালো অধ্যায়। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ফ্যাশনের যে সব জামাকাপড় তারা কম দামে কিনছেন, পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সেসব কাপড় কতটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট এক দেশে তৈরি হচ্ছে তা যেন তারা হুট করে আবিষ্কার করলেন। এসব প্রকাশ্যে আসার পর কানাডা-আমেরিকার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দায়সারা বিবৃতি দিয়েই শেষ করলেন। প্রতিজ্ঞা করলেন যে, কাজের এমন পরিবেশ আছে তেমন কোন ফ্যাক্টরির সাথেই তাদের কোন চুক্তি থাকবে না।

কিন্তু মার্ক কেলি যেতে চাইলেন আরও গভীরে। তিনি যোগাযোগ করলেন ওয়ালমার্ট কানাডার হয়ে কাজ করা ভারতীয় বংশোদ্ভূত ফ্যাশন ডিজাইনার সুজিতের সাথে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর তিনি ওয়ালমার্ট থেকে পদত্যাগ করেন। সুজিতকে নিয়েই তিনি আসেন বাংলাদেশে। ঘুরে দেখেন ২০১২ সালের নভেম্বরে ঘটে যাওয়া তাজরীন ফ্যাশন ট্র্যাজেডির ঘটনাস্থল। দেখা করেন পোশাক শ্রমিকদের সাথে। তারা নিয়ে এসেছিলেন ওয়ালমার্টের জন্য সুজিতের ডিজাইন করা একটি শার্ট। শিপিংয়ের কাগজ দেখে মার্ক গিয়েছিলেন ‘হাসান তানভির ফ্যাশন ওয়্যারস’-এর কারখানা দেখতে। সেখানকার কর্মকর্তারা তাকে ভিতরে ঢুকতে দেয়নি। কারণ, এই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির সাথে ওয়ালমার্টের কোন চুক্তি নেই। ওয়ালমার্ট কানাডার চুক্তি অন্য একটি বড় গার্মেন্টস গ্রুপের সাথে।

কার্টুন: নাসরীন সুলতানা মিতু

পরে মার্ক এবং সুজিত চলে গেলেন হাসান তানভির ফ্যাশনের নয়জন শ্রমিকের কাছে। পরিচয় লুকিয়ে তারা মনে করতে পারলেন এই শার্টটি তারাই বানিয়েছিলেন। স্পষ্ট করে একজন নারী শ্রমিক জানালেন যে, পঞ্চম তলায় এটির কাজ করেছিলেন তিনি। নিজের ডিজাইন করা কাপড় যারা বানায় তাদের সাথে পরিচিত হয়ে সুজিত বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন।

আর শার্টটি তৈরির স্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে মার্ক কেলি দেখা করতে গিয়েছিলেন তৎকালীন বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলামের সাথে। বিজিএমইএ ভবনের বাইরে তখন শ্রমিকদের প্রতিবাদ চলছে। আতিকুল ইসলামের কক্ষ থেকে দেখাও যাচ্ছিল সে সব। বাংলাদেশে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোয় শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের পরিবেশ নিয়ে মার্ক কেলির প্রশ্নের জবাবে আতিকুল ইসলাম বললেন যে, এটি একটি মুক্ত কর্মবাজার। প্রতিটি শ্রমিকেরই গার্মেন্টসের কাজ ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার স্বাধীনতা আছে।

শ্রমিকদের সমস্যার এমন ‘অভিনব’ সমাধান পেয়েই কি না মার্ক চলে গেলেন অন্য এক প্রসঙ্গে। বড় কোন গার্মেন্টস গ্রুপ বিদেশি অর্ডার নিয়ে অবৈধভাবে অন্যান্য গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি থেকে কাপড় বানিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি। আতিকুল ইসলাম পুরো বিষয়টিকে অস্বীকার করে বলেন যে, এগুলো বদলে গেছে। এখন আর কেউ এমন করে না। 

তখন এক পর্যায়ে মার্ক কেলি বের করলেন সুজিতের ডিজাইন করা সেই কালো শার্টটি। হাসান তানভির ফ্যাশন ওয়্যারস লিমিটেডের ফ্যাক্টরিতে ওয়ালমার্ট কানাডার জন্য বানানো শার্টটি দেখিয়ে জানতে চাইলেন, ওয়ালমার্ট কানাডার সাথে আতিকুল ইসলামের গার্মেন্টসের চুক্তি থাকলেও সেটি কিভাবে অন্য গার্মেন্টসে তৈরি হলো। শার্টটি হাতে নিয়ে আতিকুল ইসলাম বললেন যে, তার পক্ষে বলা কঠিন এই নির্দিষ্ট শার্ট তার গার্মেন্টস থেকেই তৈরি হয়েছে কি না। এবং তিনি আরও বলেন যে, কোনভাবেই তিনি এমনটা করতে পারেন না। তিনি এমনটা করেন না।

কথাবার্তার এই পর্যায়ে মার্ক কেলি শার্টটি নিয়ে উঠে যাওয়ার সময় আতিকুল ইসলাম আবারও সেটি চেয়ে নেন, কিছু একটা দেখবেন বলে। ক্যামেরায় দেখা যায় শার্টটি নিয়ে তিনি রুমের আরেক প্রান্তে টেবিলের ওপারে রাখা চেয়ারে বসলেন। হাতে একটা কলম নিয়ে শার্টটিতে কিছু একটা করলেন। পরে দেখা যায়, শার্টের ট্যাগে কলমের কালিতে বারকোড এবং কানাডিয়ান ইমপোর্ট নাম্বার মুছে দেওয়া হয়েছে। ফলে এই শার্ট যে আতিকুল ইসলামের ফ্যাক্টরিতে বানানোর কথা সেটি আর প্রমাণ করার সুযোগ থাকল না। পরবর্তী সময়ে মার্ক এই বিষয়ে জানতে চাইলে আতিকুল ইসলাম অন্য অনেক কিছুর মতো এই অভিযোগও অস্বীকার করেন।

বলা বাহুল্য, সে সময় বিজিএমইএর সভাপতি থাকা আতিকুল ইসলাম বর্তমানে উত্তর ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র।

দেশের বাইরে গিয়ে কোন পোশাকের লোগোতে যে কথাটি দেখে গর্ববোধ করে বাংলাদেশি মানুষেরা সেই 'মেড ইন বাংলাদেশ' কথাটিকেই নাম হিসেবে নেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সালে এমি পুরস্কার পাওয়া 'মেড ইন বাংলাদেশ' ডকুমেন্টারির পুরোটা দেখতে পারেন।  

১১০৫৬ পঠিত ... ২০:৩৫, মার্চ ২১, ২০১৯

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top