যেভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে আদিম মানব প্রজাতিরা, যেভাবে বিলুপ্ত হতে পারে হোমো স্যাপিয়েন্স

১০২১ পঠিত ... ১৯:০৯, মার্চ ১৫, ২০১৯

 

হোমো স্যাপিয়েন্স-এর আগে কাছাকাছি বৈশিষ্ট্যের অনেকগুলো প্রজাতির বিচরণ ছিলো পৃথিবীর বুকে। হোমো স্যাপিয়েন্স ছাড়া বাকি সবগুলো হোমিনিড প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রজাতিগুলো সম্পর্কে এবং তাদের বিলুপ্তির কারণ এখানে দেওয়া হলো। পাশাপাশি হোমো স্যাপিয়েন্সের সম্ভাব্য বিলুপ্তি কিভাবে ঘটতে পারে পড়ুন সেটিও।  

 

# হোমো ইরেক্টাস

সময়ের হিসাবে সবচেয়ে সফল হোমিনিড প্রজাতি হচ্ছে এই হোমো ইরেক্টাস। দেড় মিলিয়ন বছরের বেশি সময় এই প্রজাতির উপস্থিতি ছিল পৃথিবীতে। আনুমানিক ২ মিলিয়ন বছর থেকে শুরু করে ৪ লাখ বছর আগে পর্যন্ত পৃথিবীতে এদের পদচারণা ছিলো। উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার নির্মাণ ও সোজা হয়ে হাঁটতে পারা প্রথম প্রাইমেট  ছিলো হোমো ইরেক্টাস।

ছবি: স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি

 

বিলুপ্তির কারণ:

এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের অনেক অঞ্চল থেকে হোমো ইরেক্টাস বিলুপ্ত হয়েছে, যদিও ইউরোপে এদের কিছু অংশ হোমো হাইডেলবার্গেনসিসে বিবর্তিত হয়েছে। ধারণা করা হয়, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ– মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারার কারণে হোমো ইরেক্টাস বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

 

# হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস

 

হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস ৯৫০০০ থেকে ১৭০০০ বছর আগে বাস করত বর্তমান ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াতে।  উচ্চতায় এরা সাড়ে তিন ফিটের মতো ছিলো। এদের মস্তিষ্কের আকারও ছিলো ক্ষুদ্রাকৃতির, আধুনিক মানুষের মস্তিষ্কের আকারের তুলনায় তিন ভাগের এক। এরা পাথুরে হাতিয়ার বানিয়ে ছোট আকারের হাতি ও অন্যান্য প্রানী শিকার করতো। সম্ভবত ছোট শরীরের কারণে সীমিত সম্পদ নিয়েও তারা ছোট ছোট দ্বীপে টিকে থাকতে পেরেছিল।    

 ছবি: এনশিয়েন্ট হিস্ট্রি লিস্ট

 

বিলুপ্তির কারণ:

ধারণা করা হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষত আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে এরা খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি বলে বিলুপ্ত হয়ে যায়। সম্প্রতি কিছু গবেষণায় দেখা যায় এদের বিলুপ্তির সময়কাল এবং হোমো স্যাপিয়েন্সের  ফ্লোরেসিয়েনসিসের বাসস্থলের দিকে যাওয়ার সময়কাল কাছাকাছি সময়ের। তাই অনেক গবেষকের ধারণা, হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিসের বিলুপ্তির কারণ হোমো স্যাপিয়েন্স।

 

# হোমো হাবিলিস

হোমা হাবিলিস হোমিনিড গোত্রের আরেকটা প্রজাতি যারা আনুমানিক ২.৪ থেকে ১.৪ মিলিয়ন বছর আগ পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে টিকে ছিলো। কিছু শিম্পাঞ্জীদের মতো বৈশিষ্ট্য এদের ছিলো। যেমন, লম্বা বাহু, প্রগনেথিক চোয়াল ইত্যাদি। এদের মুখ ও দাঁত ছিলো তুলনামূলক ছোট।  তারা পাথুরে হাতিয়ার ব্যবহার করতে পারতো।

 ছবি: এনশিয়েন্ট হিস্ট্রি লিস্ট

 

বিলুপ্তির কারণ:

ধারণা করা হয়, আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে তারা খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি বলে অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে  বিলুপ্ত হয়ে গেছে হোমো হাবিলিস।

 

# হোমো হাইডেলবার্গেনসিস

আনুমানিক ৭  থেকে ৩ লক্ষ বছর আগে হোমো হাইডেলবার্গেনসিসরা পৃথিবীতে ছিলো। বর্তমান আফ্রিকা থেকে এদের উদ্ভব ঘটে। পরবর্তীতে এদের থেকে বিবর্তিত অনেকগুলো প্রজাতি এশিয়া ও ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।  তুলনামূলক শৈত্যপ্রধান আবহাওয়ায় মানিয়ে নেওয়া প্রথম মানব প্রজাতি হোমো হাইডেলবার্গেনসিস। এছাড়া তারাই প্রথম মানব প্রজাতি যারা নিজেদের ঘরবাড়ি নিজেরাই বানিয়েছিলো।

 ছবি: স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি

 

বিলুপ্তির কারণ:

গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে এটি আসলে বিলুপ্ত হয়েছে নাকি নিয়ান্ডারথালস বা ডেনিসোভানসে বিবর্তিত হয়েছিলো। অনেকের মতে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে এই প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছিলো।

 

# হোমো নিয়ান্ডারথাল

ধারণা করা হয় নিয়ান্ডারথালদের অস্তিত্ব ৬ লক্ষ বছর থেকে ৩৭ হাজার বছর পূর্ব পর্যন্ত পৃথিবীতে ছিল।  ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় ছিলো এদের পদচারণা। আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষ হোমো স্যাপিয়েন্সের সাথে সবচেয়ে বেশি মিল নিয়ান্ডারথালদের। আধুনিক মানুষের থেকে এদের ডিএনএ-এর পার্থক্য মাত্র ০.১২%।

শিকারের জন্য তারা নানান ধরনের হাতিয়ার ব্যবহার করত। তারা মৃতদের কবর দিতো এমনকি নিয়ানডারথালদের কবরে ফুলও দেওয়া হত। তারা নানা ধরনের অলঙ্কার পরতো। নিয়ান্ডারথালরা একটি নিজস্ব সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলো।  

 ছবি: স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি

 

বিলুপ্তির কারণ:

হোমো স্যাপিয়েন্সরা যেমন বারবার মাইগ্রেট করেছে নিয়ান্ডারথালদের ক্ষেত্রে তেমন হয়নি। নিয়ান্ডারথালরা ইউরেশিয়ার বাইরে কখনোই যায় নি। নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তির সম্ভাব্য কারণ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক আছে। একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরা হয়, হোমো স্যাপিয়েন্সদের সাথে যুদ্ধে পরাজয়। একই হোমিনিড গোত্রের নানা প্রজাতির মধ্যেকার যুদ্ধের প্রমাণ আছে গবেষকদের কাছে।

আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, হোমো স্যাপিয়েন্সেদের থেকে আসা প্যারাসাইট বা প্যাথোজেন নিয়ান্ডারথালদের শরীরে প্রবেশ করেছে। স্যাপিয়েন্সের মতো তুলনামূলক রোগ প্রতিরোধী ছিলো না নিয়ান্ডারথালরা। ফলে তারা প্রচুর সংখ্যায় অসুস্থ হয়ে মারা যায়।

আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তনও নিয়ান্ডার্থালদের বিলুপ্তির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরা হয়। আকস্মিক প্রচুর ঠান্ডার মুখোমুখি তারা  টিকে থাকতে পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা করতে পারেনি। নতুন আবহাওয়ায় শিকারে অক্ষমতা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

 

# হোমো স্যাপিয়েন্স

এখন পর্যন্ত হোমো স্যাপিয়েন্সের সবচেয়ে পুরনো যে ফসিল পাওয়া গেছে আফ্রিকায় সেটি ২ লক্ষ বছর আগের। দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়াতে ১ লক্ষ বছর আগে এবং ইউরোপে ৬০ থেকে ৪০ হাজার বছর আগে এদের বিচরণ ছিলো বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এখন আমরা মানুষ বলতে যা বুঝি, সেই হোমিনিড প্রজাতি হল এই হোমো স্যাপিয়েন্স।

হোমো স্যাপিয়েন্স ছাড়া অন্য যত হোমিনিড প্রজাতি ছিলো সবাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। দলবদ্ধ হয়ে বসবাস, বৈচিত্র্যময় উদ্ভিজ ও প্রাণিজ খাদ্যাভাস, আগুণের ব্যবহার এবং প্রতিকূল পরিবেশে প্রতিনিয়ত মানিয়ে নিয়ে নিজেদেরক বদলে নেওয়ার ক্ষমতা বিলুপ্তির পথ থেকে হোমো স্যাপিয়েন্সকে বাঁচিয়ে রেখেছে এই সময় পর্যন্ত। অপেক্ষাকৃত নতুন হোমিনিড প্রজাতি হলেও, হোমো স্যাপিয়েন্স যেভাবে পৃথিবীকে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে গত কয়েক হাজার বছরে সেটি করতে পারেনি আর কোন হোমিনিড প্রজাতি। আপাত দৃষ্টিতে চিরন্তন এই প্রজাতি কিন্তু বিলুপ্তির ঝুঁকি থেকে একদম বাইরে নেই। স্যাপিয়েন্সেরও বরণ করতে হতে পারে পূর্বপুরুষদের নিয়তি।

 ছবি: ইন্টারনেট

 

বিলুপ্তির (সম্ভাব্য) কারণ:

বিবর্তনের পরিক্রমায় নানা ধরনের প্রতিকূলতা অতিক্রম করলেও, বিগত কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস হোমো স্যাপিয়েন্সে ধ্বংসন্মোত্তার সাক্ষ্য দেয়।  

হোমো স্যাপিয়েন্সই একমাত্র প্রজাতি যারা নিজেরাই নিজেদের প্রজাতির সবচেয়ে বেশি  লোককে হত্যা করেছে। অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায় স্যাপিয়েন্সরা প্রথমবার পৌছেছিল যথাক্রমে ৫০ ও ২০ হাজার বছর আগে। এরপর পনেরো শতকের শেষদিকে ইউরোপিয়ানরা আমেরিকায় কলোনি স্থাপন করে আনুমানিক ১০০ মিলিয়ন লোকের মৃত্যু ঘটিয়েছে। তার কিছুদিন পর অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম ‘সভ্য’ ইউরোপিয়ানদের পদার্পণের পরও এমন ‘ম্যাস কিলিং’ হয়েছিল। ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধেই যথাক্রমে মারা গিয়েছে ৬২ ও ৭২ মিলিয়ন মানুষ। গত শতাব্দীতেই এই দুই বিশ্বযুদ্ধ ছাড়াও যুদ্ধ এবং গণহত্যায় মৃত্যুবরণ করেছে আরও কোটি কোটি মানুষ। আমাদের ছোট্ট দেশ বাংলাদেশে কেবলমাত্র ১৯৭১ সালেই পাকিস্তানি গণহত্যার শিকার হয়েছেন অন্তত ৩০ লক্ষ মানুষ। এমন আরও অসংখ্য ধ্বংসযজ্ঞের নমুনা আছে পৃথিবীর ইতিহাসে। ৯/১১-র পর থেকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই ৬ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে যুদ্ধের পেছনে। এই যুদ্ধগুলোতে মারা গেছে অন্তত ৫ লক্ষ মানুষ।

এছাড়া মানুষের সৃষ্ট আরেকটি গুরুতর বিপর্যয় যুদ্ধ-বিগ্রহ নয়, নিজেদের ‘উন্নয়ন’। এর আগে যেসব হোমিনিড প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছিল তাদের অধিকাংশের বিলুপ্তির কারণ হিসেবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই দায়ী ছিল। সামনের দিনগুলোতেও যে নতুন ধরনের প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় আসবে সেগুলোর পিছনেও আছে উন্নয়নের নামে অবিবেচকের মতো পরিবেশের ভারসাম্য ভয়ানকভাবে ধ্বংস করা।

গত কয়েক হাজার বছরের ‘সভ্য’ মানব ইতিহাস যে ইঙ্গিত দেয় তাতে ধারণা করা যায় যে, মানুষই হতে পারে মানুষের বিলুপ্তির প্রধান কারণ।

১০২১ পঠিত ... ১৯:০৯, মার্চ ১৫, ২০১৯

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top