আমাদের ৩২ জন 'সুপারগার্ল' যারা নারীদেরকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন

১৫১৫১ পঠিত ... ১৯:৩৪, মার্চ ০৮, ২০১৯

একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের নারীরা সফলতার সাথে কাজ করছেন। প্রতিনিয়ত সমাজের বাধা-বিপত্তি ঠেলে সরিয়ে সামনে আসছেন, অনুপ্রাণিত করছেন আরও অসংখ্য নারীকে। যদিও এখনো আমাদের দেশের বিরাট অংশের জনগণ নারী স্বাধীনতার বিষয়ে সংকীর্ণ ধারণা নিয়ে বসবাস করছেন, তবুও নানান ক্ষেত্রে সফল নারীদের দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন আরও নারী। প্রায় হাজার বছর আগে জ্যোতিষী ও কবি খনা থেকে শুরু হয়ে বিপ্লবী প্রীতিলতা হয়ে আজকের দিনের মাবিয়া আক্তার; প্রত্যেকেই নারী জাগরণের এই সুবিশাল স্থাপনায় অবদান রেখেছেন। শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি থেকে শুরু করে খেলাধুলায় বিভিন্ন সময়ে অবদান রেখেছেন বাংলার এমনই কয়েকজন নারীকে ‘সুপারগার্লস’ আখ্যা দিয়ে দুর্দান্ত একটি কাজ করেছে নারীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন 'হার স্টোরি' ফাউন্ডেশন। eআরকির পাঠকদের জন্যেও থাকছে এই ৩২ জন অসাধারণ নারীর জীবনের কথা।   

 

১# খনা

(৮০০-১২০০)

খনা ছিলেন নবম ও দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বাঙালি ইতিহাসের প্রথম মহিলা কবি, জ্যোতিষশাস্ত্রবিদ এবং গণিতবিদ। তার চৌকস কথাবার্তা ‘খনার বচন’ নামে সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এই জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে খনার শ্বশুর  রাজজ্যোতিষী বরাহ মিহির তার জিভ কেটে ফেলার নির্দেশ দেয়। তবু সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ে খনা তার জ্ঞানচর্চা ও পরামর্শের ধারা অব্যাহত রাখে। আজো খনার বচনগুলো পুরো ভারতবর্ষের মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত।

 

২# চন্দ্রাবতী

(১৫৫০-১৬০০)

পনের শতকে বাংলার সবচেয়ে অসাধারণ নারী হিসেবে চন্দ্রাবতী পরিচিত। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত হিন্দু ব্রাহ্মণ দ্বিজ বংশী দাসের কন্যা। বাবার কাছেই হয় তার পড়ালেখা ও কাব্যরীতির হাতেখড়ি। নিজেকে শুধুমাত্র একজন নারী হিসেবে না ভেবে একজন মানুষ হিসেবে ভাবতে শিখেছিলেন তিনি। তার সবচেয়ে দুর্দান্ত সাহিত্যিক সাফল্য ছিল একজন নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে রামায়ণের ব্যাখ্যা, যেখানে তিনি সীতাকে একজন অবলা নারী হিসেবে না দেখিয়ে প্রতিবাদী ও দৃঢ়মনা হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। এছাড়াও নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রচিত ‘সুন্দরী মলুয়া’, ‘দস্যু কেনারাম’সহ আরো বেশ কিছু রচনার জন্য তিনি প্রশংসিত।

 

৩# প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

(১৯১১-১৯৩২)

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন ব্রিটিশ নিপীড়ন ও ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেওয়া অন্যতম নারী। তিনি মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বিপ্লবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কলকাতায় পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি নন্দনকানন অপর্ণাচরণ উচ্চবিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং এক পর্যায়ে সেই বিদ্যালয়ের প্রথম নারী প্রধান শিক্ষক পদে উন্নীত হন। প্রথাগত সকল বিধিনিষেধ পেরিয়ে তিনি ছিলেন নির্ভীক, বিপ্লবী ও স্বাধীনতার প্রতি সোচ্চার। নিজ মাতৃভূমিতে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বাঁচতে তার ছিল ঘোর আপত্তি। পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবের দরজায় 'কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ' লেখা সাইনবোর্ডটি তার ভেতর অসহ্য ক্রোধ জাগিয়ে তুলত। চট্টগ্রামে বিপ্লবী গোষ্ঠীর সাথে তিনি এই ক্লাবে আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৩১ সালে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটে। প্রীতিলতা পুরুষের বেশে এই আক্রমণের নেতৃত্ব দেন এবং গুলিবিদ্ধ হন। বাকিদের পালানোর সুযোগ করে দিয়ে তিনি নিজে পটাশিয়াম সায়ানাইডের ক্যাপসুল খেয়ে মৃত্যুবরণ করেন, যেন তাকে নির্যাতন করে বিপ্লবীদের সম্পর্কে কোনো খবর জানা সম্ভব না হয়। মাত্র ২১ বছর বয়সে তার এই আত্মত্যাগ আজো অবিস্মরণীয়।    

 

৪# কামিনী রায়

(১৮৬৪-১৯৩৩)

বাঙালি নারীবাদের ইতিহাসে কামিনী রায় এক অন্যতম চরিত্র। যে সময়ে গৃহবধু হওয়া বাদে নারীদের ভাগ্যে বিশেষ কিছু জুটত না, সেই সময়ে তিনি ব্রিটিশ ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া প্রথম নারী ছিলেন। ধনী পরিবারে জন্ম নেওয়া সত্ত্বেও নারীদের প্রতি সকল বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিলেন সচেতন ও সোচ্চার। শৈশব না পেরোতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসার অপসংস্কৃতিকে তুচ্ছ করে তিনি বিয়ে করেছিলেন ৩০ বছর বয়েসে। কেবল একজন নারী পরিচয়ের উর্ধ্বে তিনি ছিলেন একজন লেখক, শিক্ষক ও সমাজকর্মী। নারীশিক্ষা, বিধবাদের অধিকার, হিন্দুধর্মের বর্ণবাদসহ নানা বিষয় নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। নির্মাল্য, পৌরাণিক, ধর্মপুত্র, গুঞ্জন ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য রচনা। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৯ সালে এই মহীয়সী নারীকে জগত্তারিনী পদক প্রদান করা হয়।

 

৫# আশালতা সেন

(১৮৯৪-১৯৮৬)

অঙ্কন: বিপ্লব

আশালতা সেন ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন বিপ্লবী, সক্রিয় কর্মী, কবি ও সমাজসেবক। ১৯০৪ সালে মাত্র দশ বছর বয়সে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে মাসিক পত্রিকা ‘অন্তঃপুর’ প্রকাশ করেন। তার জাতীয়তাবাদী কবিতা সুধীসমাজের কাছে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নানী নবশশী দেবীর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন। বাড়ি বাড়ি যেয়ে বিদেশী পণ্য বর্জনে মানুষকে উৎসাহিত করতেন। ব্রিটিশবিরোধী কার্যকলাপের কারণে তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেফতার ও নির্যাতিত হন। নারীদের অর্থনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির জন্য তিনি সারাজীবন কাজ করে গেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে তিনি বেশকিছু গানও রচনা করেছিলেন।

 

৬# লীলা নাগ

(১৯০০-১৯৭০)

লীলা নাগ একজন বাঙালি সাংবাদিক, জনহিতৈষী এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ব্যক্তি ছিলেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী এবং নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর সহকারী হিসেবে তিনি পরিচিত। তিনি একজন শিক্ষা সংস্কারক এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সত্যগ্রাহর অনুসারী ছিলেন। তার বিদ্রোহী সংগঠন দীপালি সংঘ পুরো ঢাকাজুড়ে নারীদের জন্য শিক্ষা ও যুদ্ধ প্রশিক্ষণের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়া তিনি ১২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিক্ষামন্দির ও শিক্ষাভবন স্থাপন করেন। গোপন বিপ্লবী গোষ্ঠী ও বাঙালি বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে তিনি সেতুবন্ধনের  মতো কাজ করেছেন। তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পার্টির সাপ্তাহিক মুখপাত্র ‘ফরোয়ার্ড ব্লক’এর সম্পাদক ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে যাবার পর তিনি ভারতীয় জাতীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৯৪৬ সালে বাংলার ভারতীয় সংবিধান পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ভারতীয় সংবিধানের খসড়া প্রণয়নে প্রধান ভূমিকা পালন করেন।

 

৭# রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন

(১৮৮০-১৯৩২)

তাকে আমরা বেগম রোকেয়া নামেই চিনি। তিনি ছিলেন বাঙালি চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক। তিনি বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' জরিপে ষষ্ঠ নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ও শ্লে­ষাত্মক রচনায় তিনি ছিলেন অনন্য। উদ্ভাবনা, যুক্তিবাদিতা এবং কৌতুকপ্রিয়তা তার রচনার সহজাত বৈশিষ্ট্য। ‘মতিচূর’ (১৯০৪) প্রবন্ধগ্রন্থে বেগম রোকেয়া নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠায় আহ্বান জানিয়েছেন। শিক্ষার অভাবকেই তিনি নারীদের পশ্চাৎপদতার কারণ হিসেবে দায়ী করতেন। বেগম রোকেয়া রচিত ‘সুলতানার স্বপ্ন’ (১৯০৫) নারীবাদী সাহিত্যের অন্যতম সেরা নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। ‘পদ্মরাগ’ (১৯২৪) তার রচিত উপন্যাস। ‘অবরোধবাসিনী’ (১৯৩১) গ্রন্থে তিনি অবরোধপ্রথাকে বিদ্রূপবাণে জর্জরিত করেছেন। তার স্মরণে ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবস হিসেবে পালিত হয়।

 

৮# সুফিয়া কামাল

(১৯১১-১৯৯৯)

বেগম সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কবি, লেখক, নারীবাদী ও আধুনিক বাংলাদেশের নারী প্রগতি আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব। শিশুকালে মায়ের কাছে বাংলা লিখতে পড়তে শেখেন তিনি। মাত্র তের বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যাবার পর স্বামীর সহায়তায় তিনি সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবায় মনোনিবেশ করেন। ১৯২৬ সালে তার প্রথম কবিতা 'বাসন্তী' সে সময়ের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘সওগাত’-এ প্রকাশিত হয়। মুসলিম নারীদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’-এ রোকেয়ার সঙ্গে সুফিয়া কামালের পরিচয় হয়। ভাষা আন্দোলনে তিনি নিজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং এতে অংশ নেওয়ার জন্য নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৫৬ সালে শিশুদের সংগঠন ‘কচিকাঁচার মেলা’ প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবী জানান। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শরিক হয়েছেন, কারফিউ উপেক্ষা করে নীরব শোভাযাত্রা বের করেছেন। মুক্তবুদ্ধির পক্ষে এবং সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিপক্ষে আমৃত্যু তিনি সংগ্রাম করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে নারীজাগরণ আর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি উজ্জ্বল ভূমিকা রেখে গেছেন।

 

৯# ড. জোহরা বেগম কাজী

(১৯১২-২০০৭)

জোহরা বেগম কাজী প্রথম আধুনিক বাঙালি মুসলিম মহিলা চিকিৎসক। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। ১৯৩৫ সালে দিল্লির হার্ডিঞ্জ মহিলা মেডিকেল কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে শীর্ষ স্থান অধিকার করে তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন এবং ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় পদকে ভূষিত হন। মহাত্মা গান্ধীর ‘সেবাশ্রম’এ তার চাকরিজীবন শুরু হয়। তার চেষ্টার ফলেই প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং পরে মিটফোর্ড হাসপাতালে স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগ খোলা হয়। তার কর্মকান্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে তমঘা-ই-পাকিস্তান (১৯৬৪), বেগম রোকেয়া পদক (২০০২) এবং মরণোত্তর একুশে পদক (২০০৮) প্রদান করা হয়।

 

১০# ইলা মিত্র

(১৯২৫-২০০২)

ইলা মিত্র একজন বাঙালি মহীয়সী নারী এবং সংগ্রামী কৃষক নেতা। বাংলার শোষিত-বঞ্চিত কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি সংগ্রাম করেছেন, ভোগ করেছেন অমানুষিক নির্যাতন। নারী আন্দোলনের কাজ করতে করতে তিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর নবাবগঞ্জ অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দান করেন তিনি। ‘হিরোশিমার মেয়ে’ বইটির জন্য তিনি 'সোভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু' পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ভারত সরকার তাকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে স্বতন্ত্র সৈনিক সম্মানে তাম্রপত্র পদকে ভূষিত করে। কবি গোলাম কুদ্দুস তাকে নিয়ে 'ইলা মিত্র' কবিতায় লিখেছিলেন ‘ইলা মিত্র স্তালিন নন্দিনী, ইলা মিত্র ফুচিকের বোন’।

 

১১# ফিরোজা বেগম

(১৯৩০-২০১৪)

ফিরোজা বেগম বাংলাদেশের অন্যতম নজরুলসঙ্গীত শিল্পী ছিলেন। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশেই তিনি নজরুল সঙ্গীতের জন্য বিখ্যাত। ভারতীয় উপমহাদেশে তিনি ‘কোকিলকন্ঠী’ বলে পরিচিত। দশ বছর বয়সে ফিরোজা বেগম কাজী নজরুলের সান্নিধ্যে আসেন এবং তার কাছ থেকে তালিম গ্রহণ করেন। নজরুলের গান নিয়ে প্রকাশিত তাঁর প্রথম রেকর্ড বের হয় ১৯৪৯ সালে। কাজী নজরুল অসুস্থ হওয়ার পর ফিরোজা বেগম নজরুলসঙ্গীতের শুদ্ধ স্বরলিপি ও সুর সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তিনি ৩৮০টির বেশি একক সঙ্গীতানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। নজরুলসঙ্গীত ছাড়াও আধুনিক গান, গজল, কাওয়ালি, ভজন, হামদ ও নাত-সহ বিভিন্ন ধরনের সঙ্গীতে কন্ঠ দিয়েছেন। জীবদ্দশায় তার ১২টি এলপি, ৪টি ইপি, ৬টি সিডি এবং ২০টিরও বেশি অডিও ক্যাসেট প্রকাশিত হয়েছে। শিল্পচর্চায় অসাধারণ অবদানের জন্য ফিরোজা বেগম স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, গোল্ড ডিস্কসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন।

 

১২# জাহানারা ইমাম

(১৯২৯-১৯৯৪)

জাহানারা ইমাম একজন বাংলাদেশি লেখিকা, শহীদ জননী, কথাসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং একাত্তরের ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী। তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ হল ‘একাত্তরের দিনগুলি’। একাত্তরে তার বড় ছেলে শফি ইমাম রুমী দেশের মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন এবং কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন এবং পরবর্তীতে নির্মমভাবে শহীদ হন। বিজয় লাভের পর রুমীর বন্ধুরা জাহানারা ইমামকে সকল মুক্তিযোদ্ধা মা হিসেবে বরণ করে নেন৷ রুমীর শহীদ হওয়ার সূত্রেই তিনি শহীদ জননীর মযার্দায় ভূষিত হন৷ ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি তার নেতৃত্বে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির আন্দোলন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যাপকতা লাভ করে।

 

১৩# নীলিমা ইব্রাহীম

(১৯২১-২০০২)

 

নীলিমা ইব্রাহিম ছিলেন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী। ১৯৪৫ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে বিহারীলাল মিত্র স্কলারশিপ লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৭২ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। ১৯৭৪-৭৫ সালে তিনি বাংলা একাডেমির অবৈতনিক মহাপরিচালক ছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের শিকার নারীদের নিয়ে তিনি 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' বইটি রচনা করেন। মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের সহায়তা ও পুনর্বাসনের জন্য তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সাথে কাজ করেন। তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, স্বাধীনতা পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন।

 

১৪# নভেরা আহমেদ

(১৯৩০-২০১৫)

নভেরা আহমেদ ছিলেন একজন ভাস্কর। তিনি বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যশিল্পের অন্যতম অগ্রদূত এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম বাংলাদেশি আধুনিক ভাস্কর। তার কাজের প্রধান বিষয়বস্তু ছিল নারী প্রতিমূর্তি। সমসাময়িক পুরুষ শিল্পীরা নারীদেহে একটি রোমান্টিক ইমেজ দেবার চেষ্ট করতেন; নারীকে মাতা, কন্যা, স্ত্রী ইত্যাদি হিসেবে দেখালেও নারীদের যথার্থ কর্মময় জীবন উহ্যই থাকত। নভেরা আহমেদ নারীকে দেখেছেন সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে, পুরুষ শিল্পীদের উপস্থাপনার বিপরীতে। তার কাজে নর-নারীর একটি ঐক্য দেখা যেত। তিনি তার কাজকে সরল, অর্থপূর্ণ, স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ করেছেন। উন্মোচন করেছেন সব ধরনের বিচলিত, আবেগমথিত, সত্যিকারের নারীরূপকে। ‘দ্য লং ওয়েট’ কাজটি তারই নমুনা। তার মায়েরা সুন্দরী নয়, কিন্তু শক্তিময়ী, জোড়ালো ও সংগ্রামী; তারা মানবিকতার ধ্রুপদী প্রতীক।

 

১৫# বদরুন্নেসা আহমেদ

(১৯২৪-১৯৭৪)

বদরুন্নেসা আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ। অল্প বয়স থেকেই তিনি রাজনীতিতে গভীর আগ্রহ দেখান। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের সদস্য হিসাবে তিনি নির্বাচনে জিতে একজন এমপি হয়েছিলেন। কুষ্টিয়ার মোহিনী মিলে শ্রমিক ইউনিয়ন কর্তৃক আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দিলে আইন ভাঙ্গার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং এক মাসের জন্য জেলে পাঠানো হয়। ১৯৫৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ কমিশনে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৫৯ সালে তিনি ইস্ট পাকিস্তান উইমেনস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। তিনি নারী বিভাগের সচিব, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহ-সভাপতি এবং বাংলাদেশ মহিলা সমিতির উপদেষ্টা পদে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সাথেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি ধর্ষণ এবং নির্যাতনের শিকার নারীদের পুনর্বাসন ও কল্যাণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে সহায়তা করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। দেশ ও মানুষের সেবায় অনন্য সাধারণ অবদানের জন্য ১৯৯৯ সালে তাকে সমাজসেবায় স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়।

 

১৬# রওশন জামিল

(১৯৩১-২০০২)

রওশন জামিল একজন বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ও টিভি অভিনেত্রী। ষাটের দশকে মুসলিম নারী সমাজের একটি বড় অংশ যখন বাড়ির চার দেয়ালে আবদ্ধ ছিল, সেই সময়ে জীবনের প্রতিটি ধাপে লড়াই করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। টিভিতে অভিনয় দিয়ে অভিনয়জীবন শুরু করলেও পরে চলচ্চিত্রেই তাকে বেশি দেখা গেছে। দীর্ঘ ৩৫ বছরের অভিনয়জীবনে প্রায় আড়াইশোরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এছাড়াও তিনি ছিলেন বাংলাদেশের একজন নামকরা নৃত্যশিল্পী। নৃত্যকলায় তার অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে।  

 

১৭# নূরজাহান মুর্শিদ

(১৯২৪-২০০৩)

 

নূরজাহান মুর্শিদ ছিলেন একজন সাংবাদিক, শিক্ষক ও মন্ত্রীসভার সদস্য। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। ধীরে ধীরে ঘোষক থেকে প্রযোজক পদে অধিষ্ঠিত হন। পরে তিনি বরিশালের সাইদুন্নেসা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হন। এরপর ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন যার মাঝে কামরুন্নেসা উচ্চবিদ্যালয়, ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও হলিক্রস কলেজ উল্লেখযোগ্য। তিনি যুক্তফ্রন্টের মনোনয়ন নিয়ে তিনি ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেন এবং পূর্ব বাংলার আইন পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আইন পরিষদ সচিব হিসেবে কাজ করেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে ভারতীয় বিধানসভার উভয় কক্ষের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দিয়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে ভারত সরকারের প্রতি আহবান জানান। এর ফলে তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তাকে নিরুদ্দেশ অবস্থাতেই ১৪ বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত করে। স্বাধীন বাংলাদেশে, ১৯৭২ সালে তিনি সরকারের স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ১৯৮৫ সালে তিনি ‘একাল’ নামে একটি বাংলা সাময়িকী প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলাদেশ মহিলা সমিতির প্রথম সভাপতি ছিলেন। এছাড়াও তিনি আজিমপুর লেডিস ক্লাবসহ নারীভিত্তিক বেশ কিছু সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সদস্য ছিলেন।

 

১৮# হেনা দাস

(১৯২৪-২০০৯)

হেনা দাস ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামসহ বাংলাদেশের সকল ক্রান্তিলগ্নে সক্রিয় ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনেরও অন্যতম সদস্য ছিলেন। কৃষক দাসত্ব ব্যবস্থার বিলুপ্তিতে তিনি অবদান রাখেন। তিনি মৌলভীবাজারে ভানুবিল সেল্ফ ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন গঠন করেন, যার লক্ষ্য ছিল নারীদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ানো। ১৯৪৮-১৯৪৯ সালে হেনা দাস সিলেটের নানক আন্দোলনে অংশ নেন, চা বাগান কর্মীদের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করেন। ১৯৫২ সালে তিনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রেসিডেন্ট  হিসাবে আট বছর দায়িত্ব পালন করেন। তার প্রকাশিত অনেক বই রয়েছে, যার ভেতর ‘আমার শিক্ষা ও শিক্ষকতা জীবন’, ‘চার পুরুষের কাহিনী’, ‘স্মৃতিময় একাত্তর’ ও ‘স্মৃতিময় দিনগুলো’ উল্লেখযোগ্য।

 

১৯# নূরজাহান বেগম

(১৯২৫-২০১৬)

নূরজাহান বেগম একজন সাহিত্যিক ও বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম নারী সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার সূচনালগ্ন থেকে এর সম্পাদনার কাজে জড়িত এবং দীর্ঘ ছয় দশক ধরে এই পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। নারীদের আঁকাআঁকি এবং লেখালেখিতে উৎসাহ দিতেন তিনি, যাতে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ে। যারা লেখা পাঠাত, তাদের ছবিও ছাপাতেন বেগম পত্রিকায়। প্রথমদিকে পুরুষরাও এতে লিখতেন, তবে পরবর্তী সময়ে শুধু নারীরাই লেখেন। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত 'বেগম ক্লাব' এর সেক্রেটারি ছিলেন নূরজাহান বেগম। ১৯৯৬ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ ব্যাক্তিত্ত্ব হিসেবে নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠ চক্রের সন্মাননা লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে রোকেয়া পদকে ভূষিত করে। এছাড়াও বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, চট্টগ্রাম লেডিজ ক্লাব, চট্টগ্রাম লেখিকা সংঘ, ঢাকা লেডিজ ক্লাব, ঋষিজ শিল্প গোষ্ঠী, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র প্রভৃতি সংগঠনের মাধ্যমে নূরজাহান বেগম সংবর্ধিত হয়েছেন।

 

২০# রোমেনা আফাজ

(১৯২৬-২০০৩)

রোমেনা আফাজ থ্রিলার লেখক হিসেবে বিখ্যাত। তার জনপ্রিয় রচনা ছিল ‘দস্যু বনহুর’। মাত্র নয় বছর বয়স থেকেই বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে তার লেখা প্রকাশ হওয়া শুরু হয়। তার লেখা বইয়ের সংখ্যা আড়াইশোরও বেশি। তিনি বাংলাদেশের সাহিত্যিক অঞ্চলে অসংখ্য নারীর পথ সুগম করে দিয়েছেন। তিনি সর্বমোট ৩৭টি সমাজ কল্যাণ মূলক সংস্থার সাথে বিভিন্ন সময়ে জড়িত ছিলেন। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য রোমেনা আফাজ ২০১০ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। তার সম্মানে বগুড়ার একটি রাস্তার নাম দেওয়া হয়েছে রোমেনা আফাজ সড়ক।

 

২১# সেলিনা পারভীন

(১৯৩১-১৯৭১)

সেলিনা পারভীন ছিলেন একজন সাংবাদিক, কবি ও বুদ্ধিজীবী। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে বাল্যবিবাহের শিকার হবার পর তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তবে তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। বাংলা ভাষার ওপর তার ভীষণ দক্ষতা ছিল। দৈনিক ইত্তেফাক, পূর্ব পাকিস্তানী, পূর্বদেশ, সাপ্তাহিক ললনা এবং বেগম পত্রিকায় তিনি লিখতেন। একাত্তরের যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে তিনি ললনা থেকে আয়কৃত অর্থ ব্যয় করেছিলেন। তার গভীর ও বিপ্লবী কথাবার্তা ছিল পাকিস্তান সরকারের জন্য হুমকিস্বরূপ। একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর রায়েরবাজারে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডে শহীদ হন তিনি। সেলিনা পারভীন চিন্তা, ভাষা ও অধিকারের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন। তার জীবনকাহিনী আমাদের স্বাধীনতার মূল্য সম্পর্কে শিক্ষা দেয়।

 

২২# সিদ্দিকা কবীর

(১৯৩১-২০১২)

সিদ্দিকা কবীর ছিলেন পুষ্টিবিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ। তার ‘রান্না খাদ্য পুষ্টি’ বইটির কথা সারা দেশের মানুষ এক নামে জানে। গণিতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ১৯৬৩ সালে ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে খাদ্য, পুষ্টি ও ইনস্টিটিউশনাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ওপর দ্বিতীয় মাস্টার্স ডিগ্রি গ্রহণ করেন। তার বইটির পাশাপাশি রান্না ও পুষ্টি বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘সিদ্দিকা কবির'স রেসিপি’ও ছিল ভীষণ জনপ্রিয়। যেকোনো খাবার একইসাথে পুষ্টিকর ও সুস্বাদু করার উপায় তিনি শিখিয়েছেন বছরের পর বছর ধরে। ইউটিউবের আগের জমানায় দেশি-বিদেশি রান্নার পরিমাণ, পুষ্টিমান ও উপকরণ জানতে হলে সিদ্দিকা কবীরই ছিলেন আমাদের ভরসা!   

 

২৩# সাইদা খানম

(১৯৩৭- )

সাইদা খানম বাংলাদেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী। ‘বেগম’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি আলোকচিত্র সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার তোলা ছবি ছাপা হয় দৈনিক অবজারভার, মর্নিং নিউজ, ইত্তেফাক, সংবাদসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে সাইদা খানম ঢাকার আজিমপুর এলাকায় অস্ত্র হাতে প্রশিক্ষণরত নারীদের ছবি তোলেন। ১৬ ডিসেম্বর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে পাকিস্তানি সেনারা গোলাগুলি শুরু করে, খবর পেয়ে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে সেখানকার ছবিও তুলতে যান তিনি। জার্মানির আন্তর্জাতিক সম্মাননা কোলন পুরস্কার পান তিনি। ভারত, জাপান, ফ্রান্স, সুইডেন, পাকিস্তান, সাইপ্রাস ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশে তার ছবির প্রদর্শনী হয়। আলোকচিত্রী হিসেবে দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিয়েছেন তিনি। সাইদা খানম বাংলা একাডেমি ও ইউএনএবি-র আজীবন সদস্য।

 

২৪# আঞ্জুমান আরা বেগম

(১৯৪২-২০০৪) 

এই উপমহাদেশে টেলিভিশন আসবার আগে রেডিওই ছিল মানুষের বিনোদনের ক্ষেত্র। আঞ্জুমান আরা বেগম রেডিওর মাধ্যমে তার কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ করে রেখেছিলেন পুরো জাতিকে। ষাটের দশকে তার জনপ্রিয়তা একদম শীর্ষে পৌঁছে যায়। তার কর্মজীবন ছিল প্রায় ৪০ বছরের। এখনও তাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল মহিলা কণ্ঠশিল্পীদের একজন হিসেবে ধরা হয়। তার সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলোর ভেতর রয়েছে ‘তুমি আসবে বলে’, ‘আকাশের হাতে’, ‘স্মরণের প্রান্তরে’, ‘খোকনসোনা’, ‘চাঁদনী ও সাথী রঙের’। নজরুলগীতি কিংবা গজল থেকে শুরু করে শাস্ত্রীয়সঙ্গীতেও ছিল আঞ্জুমান আরা বেগমের অবাধ বিচরণ। সঙ্গীতজগতে অবদান রাখার জন্য ২০০৩ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তাকে গুণীজন পুরস্কারে এবং বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে।

 

২৫# ফেরদৌসী মজুমদার

(১৯৪৩- )

ফেরদৌসী মজুমদার প্রতাপশালী বাংলাদেশি অভিনেত্রী। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ৪০ বছরেরও বেশিদিন ধরে তিনি টিভি ও মঞ্চে সমান সফলতার সাথে অভিনয় করে আসছেন। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘কোকিলারা’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘মেরাজ ফকিরের মা’ এবং ‘বারামখানা'র মত কালজয়ী মঞ্চনাটকে তিনি অভিনয় করেছেন। পরিচালনা করেছেন ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘তাহারা তখন’, ‘মেহেরজান আরেকবার’ এবং ‘মুকুট’সহ আরো অনেকগুলো মঞ্চনাটক।  এছাড়া ফেরদৌসী মজুমদার অভিনীত টিভি নাটকের ভেতর ‘বরফ গলা নদী’, ‘এখনো ক্রীতদাস’, ‘জীবিত ও মৃত’, ‘নিভৃত যতনে’, ‘তাহাদের যৌবনকাল’ এবং ‘শঙখনীল কারাগার’ উল্লেখযোগ্য। তবে তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলেন ধারাবাহিক নাটক ‘সংশপ্তক’-এর হুরমতী চরিত্রের মাধ্যমে। ২০১৫ সালে ফেরদৌসী মজুমদার ‘নাগরিক নাট্যগান’-এর পক্ষ থেকে তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার পান।

 

২৬# তারামন বিবি

(১৯৫৭-২০১৮)

তারামন বিবি ১৯৭১ সালে নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে যুদ্ধে নারীদের ভূমিকা কেবল নার্স বা সেবাযত্নকারীর নয়। তিনি কমান্ডার আবু তাহেরের নেতৃত্বে ১১ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেন। যোদ্ধাদের রাঁধুনী হিসেবে কাজ শুরু করলেও কিছুদিনের ভিতরেই তিনি গুপ্তচরবৃত্তি শুরু করেন। এরপর অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধেও অংশ নেন। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে বীর প্রতীক খেতাবে সম্মানিত করেন। তবে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তারামন বিবির অবস্থান অজানা ছিল। এরপর বিমলকান্তি নামক এক গবেষক তাকে খুঁজে পান এবং ঢাকায় নিয়ে আসেন। তারামন বিবি বাঙালি নারীদের সাহসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

 

২৭# মেরিনা তাবাসসুম

(১৯৬৮- )

মেরিনা তাবাসসুম বাংলাদেশের অন্যতম একজন স্থপতি। বাবার উৎসাহে তিনি গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে একজন নারী স্থপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বুয়েট থেকে নিজের ক্লাসে চতুর্থ হয়ে স্নাতক উত্তীর্ণ করার পর  স্থপতি উত্তম কুমার সাহার সাথে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি স্থপতি কাশেফ চৌধুরীর সাথে কাজ করেছেন। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মিত ভূগর্ভস্থ স্বাধীনতা জাদুঘরের দু’জন নকশাবিদের একজন হলেন মেরিনা তাবাসসুম। ২০১৬ সালে তিনি আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার পুরস্কার পেয়েছেন। ঢাকার উত্তরে দক্ষিণখান এলাকায় স্থাপিত বায়তুর রউফ মসজিদের স্থাপত্যের জন্য তিনি এই পুরস্কার পান।

 

২৮# কল্পনা চাকমা

কল্পনা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীবান্দী আন্দোলনে অসাধারণ অবদানের জন্য স্মরণীয়। এক দরিদ্র আদিবাসী পরিবারে জন্ম নিয়ে অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে এসএসসি সম্পন্ন করার পর কল্পনা চাকমা আদিবাসীদের ওপর অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পাহাড়ী নারীদের সংগঠন হিল ওমেন্স ফেডারেশনে (এইচডব্লিউএফ) যোগ দেন। ১৯৯৩ সালে বাঘাইছড়ি পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ এর নারী সম্পাদক হিসেবে তার রাজনৈতিক কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৯৫ সালে খাগড়াছড়ির প্রথম এইচডব্লিউএফ কেন্দ্রীয় সম্মেলনে কল্পনা চাকমা কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল, আজো তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

 

২৯# নিশাত মজুমদার

(১৯৮১- )

নিশাত মজুমদার হলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী এভারেস্টজয়ী। পেশায় একজন একাউন্ট্যান্ট হলেও ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন খেলাধুলায় ভীষণ উৎসাহী। প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে ‘ভাল মেয়ে’ তকমা বিসর্জন দেবার ভয়ে নিজের ইচ্ছাকে শুরুতে দমিয়ে রেখেছিলেন তিনি। অবশেষে ২০০৩ সালে পাহাড় দেখতে যেয়ে কেওক্রাডং জয় করার পর তিনি পর্বতারোহী হবার বাসনায় উঠে পড়ে লাগেন। ২০০৬ সালে তিনি এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পসহ আরো কিছু অভিযানে যান। ২০০৭ সালে হিমালায়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ লাভ করে নিজেকে আরো দক্ষ করে গড়ে তোলেন। সিঙ্গাচুলি শিখর, গঙ্গোত্রী-১, মাকালু ও চেকিগো জয় করার পর ২০১২ সালে নিশাত মজুমদার প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন। এরপর ২০১৬ সালে তিনি পাঁচ বাংলাদেশি ট্রেকারদের একটি দল পরিচালনা করে নিয়ে যান ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্বত এলব্রুসে।

 

৩০# নাঈমা হক ও তামান্না-ই-লুৎফি

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এই দুই নারী আক্ষরিক অর্থেই তাদের আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন, হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের প্রথম সামরিক নারী বৈমানিক। এই মাইলফলক অর্জনের পেছনে দুজনের পরিবারেই ছিল নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন। ২০০০ সালে মহিলা অফিসার হিসেবে নিয়োগ পেলেও  সামরিক বিমানের নানাবিধ ঝুঁকি থাকায় নাঈমা এবং তামান্না বেসামরিক বিমানই চালাতেন। পুরুষ সহকর্মীদের পাশাপাশি নিজেদের যোগ্য প্রমাণ করে অবশেষে ২০১৪ সালে দুজন গড়ে তোলেন ইতিহাস। তারা তাদের এই সাফল্যকে উৎসর্গ করেছেন বাংলাদেশের সকল নারীর উদ্দেশ্যে। এই প্রজন্মের নারীদের জন্য তারা এক অনন্য অনুপ্রেরণার নাম।

 

৩১# মাবিয়া আক্তার সীমান্ত

(১৯৯৯- )

মেয়েদের নাকি গায়ে জোর নেই! একথা একেবারে ভুল প্রমাণ করে ছেড়েছেন আমাদের কিশোরী মাবিয়া আক্তার। ২০১৬ সালে দক্ষিণ এশীয় গেমসে প্রমীলা ৬৩ কেজি শ্রেণীতে স্বর্ণপদক অর্জন করেন তিনি। কমনওয়েলথ ভারোত্তলন চ্যাম্পিয়নশিপেও মহিলা ৬৩ কেজি শ্রেণীতে অর্জন করেন দুটি রৌপ্যপদক। স্বর্ণপদক জিতবার জন্য মাবিয়া উত্তোলন করেছিলেন পাক্কা ১৭৬ কেজি! এরপরেও কি বলবেন, মেয়েদের গায়ে জোর নেই?

 

আরো পড়ুন:

১৫১৫১ পঠিত ... ১৯:৩৪, মার্চ ০৮, ২০১৯

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top