১৮১৪ সালের লন্ডন শহরে ঘটে যাওয়া প্রাণঘাতী এক অভাবনীয় 'বন্যা'

৪৬১ পঠিত ... ১৮:০৭, অক্টোবর ১৭, ২০১৮

মৃত্যুর কারণ হিসেবে এলকোহল বেশ উপরের দিকেই থাকবে। যাচ্ছেতাই রকম এলকোহল পানে প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ শতাধিক রোগে আক্রান্ত হয়। আর মৃত্যুও হয় কয়েক মিলিয়ন মানুষের। এমনিতে দুনিয়াব্যাপী যে অসংখ্য রকমের মদ পাওয়া যায়, সে সবের সাথে বিয়ার নামক পানীয়টিকে মেলাতে নারাজ অনেকেই। এলকোহলের পরিমাণ কম থাকায়, বিয়ার যেন সফট আর হার্ড ড্রিংকের মাঝামাঝি একটা বাফার জোন হিসেবেই কাজ করে অনেকের কাছে। এলকোহলিক মৃত্যুর বেলায় তাই বিয়ারকে দায়ী করার আগে বেশ খানিকটা ভাবনার অবকাশ আছে। কিন্তু এই বিয়ারই কখনো কখনো ভয়ানক ‘বিধ্বংসী’ তরলে রূপ নিতে পারে হুট করে। দুই শতাব্দী আগে লন্ডন শহর প্রত্যক্ষ করেছিল এমনই এক অভাবনীয় ঘটনার।

১৮১৪ সালের ১৭ অক্টোবর লন্ডনের সেন্ট জাইলসের এক বস্তি এলাকার মানুষজন রীতিমত বিয়ারের বন্যায় আক্ষরিক অর্থেই ভেসে যায়। গ্রেট রাসেল স্ট্রিট আর টটেনহাম কোর্ট রোডের সংযোগস্থলে ছিল ‘হর্স শু ব্রুয়ারি’ নামক এক ভাঁটিখানা। সেখানে ২২ ফুট উঁচু একটি বিশাল ফার্মেন্টেশন ট্যাঙ্কে ‘এইল’ (ale) নামের এক বিশেষ হালকা বাদামী রঙের বিয়ার প্রস্তুত করা হত। কিছু লোহার চাকতি ৬ লাখ ১০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই ট্যাঙ্কটির কাঠামো ধরে রাখত।

দিনটি ছিল সোমবার, বিকালবেলায় হুট করে একটি চাকতি ভেঙে যায়। আর ঘণ্টাখানেকের মাঝে পুরো ট্যাঙ্ক ভেঙে পড়ে উত্তপ্ত বিয়ারের স্রোত নেমে আসে রাস্তায়। সাধারণত ভাঁটিখানায় গাঁজন প্রক্রিয়ায় বিয়ার বানানোর সময় পানীয়টি বেশ উত্তপ্ত থাকে। আর এই উত্তপ্ত অবস্থায় ভাঁটিখানার আরও বেশ কয়েকটি গাঁজন ট্যাঙ্ক বিস্ফোরিত হয়। সব মিলিয়ে প্রায় পনের লাখ লিটার বিয়ারের স্রোত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

ভাঁটিখানার আশেপাশের প্রায় পুরোটাই ছিল বস্তি এলাকা। সেখানে বেশ অনেক মানুষের বাস ছিল বাড়ির বেজমেন্টে। প্রায় ১৫ ফুট উঁচু বিয়ারের ঢেউ সবেগে ঢুকে পড়ে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি বাড়ির বেজমেন্টে। কোনরকম কোন মেঘ বৃষ্টি ছাড়া, হঠাৎ এই বিয়ারের বন্যা নিশ্চয়ই কারো দূরতম কল্পনাতেও ছিল না। দুটো বাড়ি একেবারে ভেঙে পড়ে। বিকালের চা পান করতে থাকা মা-মেয়ে, মাত্র গতকাল বাড়ির ছোট্ট শিশুর মৃত্যু দেখে শোকার্ত এক পরিবারের চার সদস্য, পার্শ্ববর্তী এক পাবের এক তরুণী কর্মীসহ মৃত্যু হয় ৮ জনের। ভাঁটিখানার কয়েকজন কর্মীসহ গুরুতর আহত হন বেশ কয়েকজন। আর দুর্ঘটনার কিছুদিন পর বিয়ারের বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয় আরেকজন মানুষের।

বিয়ার ছড়িয়ে পড়েছিল আশেপাশের বেশ অনেকগুলো রাস্তায়। অসংখ্য মানুষ রাস্তায় নেমে আসে যার যা আছে তাই দিয়েই এই ‘ফ্রি’ বিয়ার ধরে রাখতে। নিহতদের কিছু আত্মীয় তাদের মৃতদেহের একরকম ‘এক্সিবিশন’ করেছিল টাকার জন্য। প্রচুর লোকের সমাগমে সেই সব মৃতদেহ নিয়ে পুরো ছাদ বেজমেন্টে ধ্বসে পড়ে। খুব গুরুতর হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও, সব ‘দর্শনার্থী’ নিজেদের কোমর সমান বিয়ারে আবিষ্কার করে।

আদালতে মামলা হলেও ‘বিধাতার লীলা’ বলে বিজ্ঞ আদালত রায় দেওয়ায় কারো কোন শাস্তি হয়নি সেবার। তবে বিয়ার কোম্পানিটি বেশ বড়সড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। অবশ্য পরে দাম বাড়িয়ে দিয়ে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যায় তারা। জানা যায়, প্রকৌশলগত ত্রুটিতেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল।  

বিয়ারের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ‘সুনামি’র রেশ ছিল অনেকদিন। কয়েক মাস পুরো এলাকায় বিয়ারের ‘সুঘ্রাণ’ থেকে মুক্তি পায়নি। দুর্ঘটনার এক শতাব্দী পর ১৯২২ সালে ভাঁটিখানাটি একেবারে বন্ধ করে দেয়া হয়। আর পরবর্তীতে গাঁজন ট্যাঙ্ক কাঠের বদলে কংক্রিট দিয়ে বানানোর নিয়ম করা হয়।

৪৬১ পঠিত ... ১৮:০৭, অক্টোবর ১৭, ২০১৮

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top