ভুল বানানের দরখাস্ত, শিক্ষাগুরু বরখাস্ত!

২৭৩৮ পঠিত ... ২১:২৫, আগস্ট ১৭, ২০১৭

জাতীয় শোকদিবসে কিছু ছাত্রের অনুরোধে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মাহবুবুল হক ভূঁইয়া শ্রেণিকক্ষে তাদেরকে পড়া বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং একে রাষ্ট্রদ্রোহ হিশেবে অভিহিত করে ঐ শিক্ষককে বহিষ্কার করার দাবি জানিয়েছে ছাত্রলীগের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। শোকদিবসে পড়া বুঝিয়ে দেওয়াটা রাষ্ট্রদ্রোহ কি না, সেই হিশেবে না গিয়ে একটু অন্য দিকে আলোকপাত করা যাক। উপাচার্যের কাছে কুবি ছাত্রলীগ যে দরখাস্তটি দাখিল করেছে, এর ভাষাগত দিকটি একটু পর্যালোচনা করা যাক।

১. কুবি ছাত্রলীগ দরখাস্তের চতুর্থ লাইনে 'গণযোগাযোগ' বানানে ভুল করেছে। তারা এখানে ণ ব্যবহার না করে ন ব্যবহার করেছে।

২. বহিষ্কার বানানে ভুল। 'বহিষ্কার' না লিখে কুবি ছাত্রলীগ এই দরখাস্তে একাধিকবার 'বহিস্কার' লিখেছে। পুরস্কার, তিরস্কার, মিথস্ক্রিয়া বানানে স হলেও পরিষ্কার, আবিষ্কার, বহিষ্কার বানানে ষ হয়।

৩. এককালে ঙ্গ-এর ওপর চন্দ্রবিন্দু ব্যবহারের প্রচলন থাকলেও এখন তা আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত। ফলে 'প্রসঙ্গেঁ' না হয়ে 'প্রসঙ্গে' হবে এবং 'বঙ্গঁবন্ধু' না হয়ে 'বঙ্গবন্ধু' হবে।

৪. সপ্তম লাইনে 'যথাবিহীত' লেখা হয়েছে। শুদ্ধ বানান হবে যথাবিহিত।

৫. এই দরখাস্তের অষ্টম লাইন-সহ একাধিক লাইনে 'আগস্ট'-কে কুবি ছাত্রলীগ 'আগষ্ট' লিখেছে। ষত্ব বিধান অনুযায়ী বিদেশী শব্দে ষ হবে না।

৬. নবম লাইনে 'রহমান কে' লেখা হয়েছে, যা 'রহমানকে' লেখা উচিত ছিল; রহমান আর কে-এর মাঝে স্পেস হবে না।

৭. একাদশ লাইনে 'বাঙ্গালি'-কে লেখা হয়েছে 'বাঙ্গাঁলী'।

৮. ত্রয়োদশ লাইনে 'দিবসটি' লিখে 'কে' লেখা হয়েছে চতুর্দশ লাইনে, যা একত্রে 'দিবসটিকে' লেখা উচিত ছিল।

৯. দ্বাবিংশ লাইনে লিখিত 'ক্ষুন্ন' শব্দটি ভুল, এটি 'ক্ষুণ্ন' হবে; ওপরেরটা হবে ণ, আর নিচেরটা ন।

১০. ণত্ব বিধান অনুযায়ী 'ঘণ্টা' বানানে ণ হবে, যা কুবি ছাত্রলীগ 'ঘন্টা' লিখেছে।

১১. বিদেশী শব্দে ঈ-কার না হওয়ায় এবং শব্দটি আরবি হওয়ায় 'দাবি' বানানে ই-কার হবে, যেখানে কুবি ছাত্রলীগ লিখেছে 'দাবী'।

১২. দরখাস্তের শেষ দিকে কুবি ছাত্রলীগ লিখেছে 'অতএব, উপাচার্যের নিকট অনুরোধ করছি, মাহবুবুল হক ভূঁইয়া (তারেক) কে ২৪ ঘন্টার মধ্যে বহিস্কার করার জন্য আপনার সু-দৃষ্টি কামনা করছি।' বাক্যটি হওয়া উচিত ছিল—'অতএব, উপাচার্যের নিকট অনুরোধ করছি মাহবুবুল হক ভুঁইয়া (তারেক)-কে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বহিষ্কার করার জন্য' অথবা 'অতএব, মাহবুবুল হক ভুঁইয়া (তারেক)-কে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বহিষ্কার করার জন্য আপনার সুদৃষ্টি কামনা করছি।' একই বাক্যে 'অনুরোধ করছি' এবং 'সুদৃষ্টি কামনা'র কোনো দরকার ছিল না।

১৩. কুবি ছাত্রলীগ দরখাস্তের শুরুর দিকে লিখেছে—'যথাবিহীত সম্মানপূর্বক আমরা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ।' বাক্যটি অসম্পূর্ণ, বাক্যটি হওয়া উচিত ছিল—'যথাবিহিত সম্মানপূর্বক নিবেদন এই যে, আমরা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ।' তারা যথাবিহিত সম্মানটা উপাচার্যকে না দিয়ে ভুল করে নিজেদেরকেই দিয়ে বসেছে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ। ইনসেটে শিক্ষক মাহবুবুল হক ভূঁইয়া। ছবি : এনটিভি

ছাত্রলীগ ছাত্রদের সংগঠন, লেখাপড়াই যাদের প্রধান কাজ। লেখাপড়া যাদের প্রধান কাজ, প্রাথমিক-মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে; তাদের অন্তত একটা দরখাস্ত শুদ্ধভাবে লিখতে পারার কথা। ছাত্রলীগ নিশ্চয়ই মেধাবীদের সংগঠন এবং এর একটা ইউনিটের সভাপতি-সম্পাদক নিশ্চয়ই ঐ ইউনিটের অন্য নেতা-কর্মীদের চেয়ে বেশি মেধাবী। একটা দরখাস্ত লিখতে তাদের এত ভুল হওয়ার কথা না। অথচ এক পৃষ্ঠার একটা দরখাস্তের ভেতরে-বাহিরে অন্তরে-অন্তরে যত ধরনের ভুল হওয়া সম্ভব, আলোচ্য দরখাস্তটিতে কুবি ছাত্রলীগ তত ধরনের ভুলই করেছে। শোকদিবসে পড়া-বুঝিয়ে-দেওয়া শিক্ষককে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে ভুল বাক্যে ভুল বানানে তার 'বহিস্কার' দাবি করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে শুদ্ধ বানানে একটা দরখাস্ত লিখতে শেখা, মাতৃভাষাকে সম্মান করতে শেখা। এই দরখাস্তটা বাংলাদেশ রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগের লিখিত হলে বানান বা ভাষা নিয়ে এত কথা বলার দরকার পড়ত না, সংগঠনটি ছাত্রদের বলেই এত কথার অবতারণা। তাই, শুদ্ধ বানানে দরখাস্ত লেখা শেখার জন্য কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগকে বিনীত পরামর্শ দিচ্ছি।

২৭৩৮ পঠিত ... ২১:২৫, আগস্ট ১৭, ২০১৭

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top