অঞ্জন ছিল একটা ফ্রড : বিবাহবার্ষিকীর বিশেষ সাক্ষাৎকারে মালা

৬৩৯ পঠিত ... ১১:৫৮, মে ১২, ২০১৯

মালা। বর্তমানে দুই বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেত্রী। মডেলিং দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই পা রাখেন টালিউডে। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে’, ‘অসময়’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’ এর মতো ব্লক বাস্টার হিট চলচ্চিত্র তাকে এনে দিয়েছে তুমুল তারকা খ্যাতি। ১২ই মে দর্শকপ্রিয় এই অভিনেত্রীর অষ্টম বিবাহবার্ষিকী। এ উপলক্ষে শ্যুটিং এর ব্যস্ত শিডিউলের মধ্য থেকে তিনি সময় দিয়েছেন eআরকিকে। eআরকির সাক্ষাৎকার টিমের সাহিব নিহাল সঙ্গে করে মাহতাব রশীদকে নিয়ে উড়ে গিয়েছিল কলকাতায়। মালার দমদমের পাশে প্রাসাদসম বাড়িতে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলেছেন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। এখন কেমন আছেন? কী করছেন তিনি? এখনো কি রোজ রাত্তিরে ঘুমের ঘোরে স্লিপ ওয়াক করেন?

অলংকরণ : মাহাতাব রশীদ

রাত পেরিয়ে ভোর হবে হবে করছে। বিমান থেকে একটু আগে আমরা নেমেছি কলকাতার মাটিতে । এয়ারপোর্টের কাস্টমসের ঝামেলা শেষে বের হয়ে ট্যাক্সিতে চড়ে বসলাম। গন্তব্য দমদমের পাশেই জনপ্রিয় অভিনেত্রীর প্রাসাদপোম সেই বাড়ি। মিনিট দশেকের মাঝেই পৌঁছে গেলাম সেখানে। গেট পেরিয়ে ভেতরে পা দিতেই কোথা থেকে একজন কেয়ার টেকার ছুটে এলো। ‘ম্যাডাম পেছনের লনে বসে আছেন। চলুন, নিয়ে যাই,’ বলে আমাদের নিয়ে গেলেন বাড়ির পেছনের সবুজ লনটায়।

লনের সবুজ ঘাসকে আলোকিত করে বসে আছেন মালা। পরনে তার সেই পুরোনো ট্রেডমার্ক জংলাপাড়ের ঢাকেশ্বরী শাড়ি। আমাদের দেখেই তিনি তাঁর বিখ্যাত ভুবনভুলানো হাসি দিয়ে কিশোরীর উচ্ছলতায় জানালেন, ‘হাউ ওয়ান্ডারফুল! আ’ভ অলওয়েজ লাভড বাংলাদেশ। আপনাদের দেশের লোকে আমার সিনেমা খুব পছন্দ করে। আমার তো মনে হয় এখানকার মানুষের চেয়েও বেশি।‘ এরপর কুশল বিনিময় করে মধুবালার ঢংয়ে বললেন, ‘একটু জলদি করবেন হ্যাঁ? আমার আবার একটা শ্যুট আছে। অল্প কয়েকটা প্রশ্ন নেবো আমি।‘

লনে একটা গ্রানাইট পাথরের টেবিলের ওপর একগাদা পত্রিকা রাখা। টাইমস, ভৌগ, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ছাড়িয়ে সবার ওপরে সানন্দা। বুঝলাম, সানন্দার প্রতি ভালোবাসা এখনো কমেনি। আমরা বেশি সময় না নিয়ে সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্বে চলে গেলাম, এখনো নিয়মিত সানন্দা পড়া হয়?

‘সানন্দা আর আগের মতো নেই। তবুও আগাগোড়া হানড্রেড পার্সেন্ট পড়ি, যত ব্যস্ততাই থাকুক, এটা পড়তে মিস হয় না। সানন্দা ইজ মাই চাইল্ডহুড লাভ। কিন্তু এখন অনেক বদলে গেছে। ছোটবেলায় সানন্দার পাতা ছিড়ে একটা স্ক্র্যাপবুক বানিয়ে স্কুলে পুরষ্কার পেয়েছিলাম। সেটাও খুঁজে পাচ্ছিনা। আই নিড টু ফাইন্ড দ্যাট ওয়ান!'

কফি-টেবিলের পাশে অনেকগুলো ফুলের তোড়া দেখা গেল। জানতে চাইলাম, বিবাহবার্ষিকীর ফুলগুলো কি এখনো ‘জন্মদিন’ থেকেই আসে?

‘এবারের গুলো কোত্থেকে আনা ঠিক বলতে পারছি না, তবে বিয়ের পর থেকে প্রতি অনুষ্ঠানে ফুল আমি জন্মদিন থেকেই আনাই। আই থিংক দ্যাটস দ্য অনলি প্লেস ইন ক্যালক্যাটা হোয়্যার ওয়ান কুড গেট কোয়ালিটি ফ্লাওয়ার্স। ফুটপাথের পাশের দোকানের ফুলগুলো তো নোংরা অ্যান্ড আনহাইজেনিক হয়। অবশ্য ওই দোকানটা নাকি ইদানিং বন্ধ হয়ে গেছে। নিউ মার্কেটের দিকে ভালো কী যেন একটা দোকান হয়েছে। অ্যাঁই রামলাল, ফিরবার সময় দাদাদের নতুন দোকানটা দেখিয়ে দেবে।'

‘আপনার বাড়িটা সত্যিই অনেক সুন্দর’, আমাদের সাক্ষাৎকার দলের এক সদস্য বলে উঠলো। মালা যেন এটারই অপেক্ষা করছিল। এক গাল হাসি নিয়ে তড়াক করে উঠে বললেন, চলুন, হাঁটতে হাঁটতে গল্প করি। আপনাদের পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখাই। বড্ড শখ করে বানিয়েছিলাম।‘

এ কথা সে কথার ফাঁকে খেয়াল করলাম সোফিয়া লরেনের হাটার সেই পুরোনো ভঙ্গিটাই মালা এখনো ধরে রেখেছেন। হাঁটতে হাঁটতে লনের আরেক পাশে সুইমিং পুলটা দেখিয়ে বললেন, ‘এখানে আগে নিয়মিত সাঁতার কাটতাম। এখন ব্যস্ততার কারণে পুলে নামাই হয় না। তবে প্রতি সামারে পুল পার্টির আয়োজন করি আমরা এখানে।‘

আমাদের মাথায় ততক্ষণে আলিয়াঁস ফ্রঁসের সুইমিং পুল ঘুরছে। জিজ্ঞেস করেই বসলাম, ‘শোনা যায় আপনি যখন সুইমিং শিখতেন, তখন ওবেরয় ভাইরা নাকি খুব ডিস্টার্ব করতো?‘

উত্তরে একটা দুষ্টু হাসি হেসে মালা বললেন, ‘আর বলবেন না! সুন্দরী মেয়ে দেখলে ওদের মাথা খারাপ হয়ে যেতো। দুই ভাইয়ের আবার সে কী মিল! একজনের আমাকে পছন্দ হয়েছে, তাই  আরেকজনেরও নাকি আমাকে পছন্দ হয়েছে। বলুন দেখি কী যন্ত্রনা! আমার আবার তখন বিয়ের কথা চলছে। সিনেমায় ভিলেনকে যেভাবে বলি, ঠিক ওভাবে তাদের মুখের ওপর না করে দিলাম। ওরাও বা কম যায় কীসে? বুম্বাদার মতো হাঁটু গেড়ে চিৎকার করে জানালো আমার জন্য নাকি চিরকাল ওদের দরজা খোলা থাকবে। হাউ সিলি! দুই ভাই একসাথে প্রপোজ করেছে জানতে পারলে আমার বিয়েটা না ভেঙে যায়। এই ভেবে কাউকে জানাতে পারিনি কথাটা। কিন্তু কে যেন পরে ফাঁস করে দেয় সে খবর। ভাগ্যিস ততক্ষণে বিয়েটা হয়ে গিয়েছিল। এখন অবশ্য সেসব কথা ভেবে হাসি পায়। কত ছোট ছিলাম। হাহাহা!’

‘ইমরান খানও নাকি আপনাকে পছন্দ করতো?’ প্রশ্ন করাতে সাথে সাথে তিনি বলে উঠলেন, ‘করতো মানে? এখনো তো করে। আমার বিয়ের পর তাঁর সাথে পরিচয়। কোলকাতায় নামলেই প্রথমে সে আমার বাসায় এসে এক কাপ কফি খেয়ে যায়। একবার তো দিল্লি যাওয়ার প্লেনই মিস করলো গল্প করতে গিয়ে। ভাবুকের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন একটা রোমান্টিক ডায়লগ দিচ্ছিল। এমন সময় দেখলো প্লেনটা চলে যাচ্ছে। তখন ওর মুখের করুণ দশা যদি আপনাদের দেখাতে পারতাম! হাহাহা! অবশ্য মায়াও হচ্ছিল তার জন্য।'

‘উনি বেশ হ্যান্ডসাম, সন্দেহ নেই। আমার তাকে ভালোই লাগতো। তবে ওই টাইপের ভালো লাগা না কিন্তু, এম্নিই ভালো লাগা। আমি তাকে ভাইয়ের চোখে দেখতাম। সে জানে এ কথা। এই কিছুদিন আগেও সে এইচবিও’র কোনো একটা সিরিয়ালের ক্যানিস্টার না ল্যানিস্টার কার জানি নাম বললো। টেল মি, হাউ উড আই নো এ ল্যানিস্টার ফ্রম এইচবিও? জি বাংলা-স্টার জলসার সিরিয়াল গুলো দেখেই কুলোতে পারিনা, হাউ কাম হি কনসিডার্স দ্যাট ওয়ান আজ এ সিরিয়াল?’

এরপর মালা আমাদের নিয়ে গেলেন তার স্টাডিতে, তার সংগ্রহশালা দেখাতে । বিভিন্ন সময়ে স্বামীর দেওয়া বিদেশি উপহারসহ বিভিন্ন জিনিস সেখানে সযত্নে সাজিয়ে রেখেছেন। দূরে একটা গয়নার শো-কেস মনে হলো। জানতে চাইলাম, আপনার সেই বিখ্যাত  পিসিচন্দ্রের ঝুমকো দুলজোড়া এখনো আছে নাকি হারিয়ে গেছে?'

মালার চেহারায় এবার খানিকটা বিষাদ লক্ষ্য করা গেল। বললেন, ‘আর বলবেন না। সেবারের শীতে বেড়াতে কাশ্মির গিয়েছিলাম। একটা কানের দুল কীভাবে যেন পড়ে গেল। তুষারের মধ্যে আর খুঁজেই পেলাম না। অন্যটা রেখে দিয়েছি, দেখুন।‘ তাকিয়ে দেখলাম আসলেই তাই।

কথা বলতে বলতে নাকে ভেসে আসছে সুমধুর গন্ধ। প্রশ্ন করতেই মালার গাল লাল হয়ে গেল। একটু লজ্জ্বার সাথেই বললেন, ‘বছরে দুয়েকবার প্যারিসে না গেলে আমার দম বন্ধ লাগে। সেখান থেকেই পারফিউম কিনি। আমার আবার পারফিউমের বাতিক আছে জানেন তো! আরেকটা ব্যাপার অবশ্য আছে। এখানে এতো গরম, আমার সহ্য হয় না। একটু পরপর ঘেমে যাই। তার ওপর বড় বড় রাস্তার পাশেই বস্তি। সেখান থেকে এত দুর্গন্ধ আসে, বোঝেনই তো। আই ওয়ান্ডার, হাউ ডু পিপল লিভ ইন সাচ আ সিটি! ইয়্যুউ! আপনাদের ঢাকার রাস্তা নিশ্চয়ই পরিষ্কার?

ঢাকার রাস্তার ব্যাপারে চেপে যাওয়াই উত্তম বলে আমরা ম্লান হেসে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলাম। তবে বস্তির প্রসঙ্গ যখন এলোই, সে সুযোগে বলে বসলাম, ‘কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করতাম। ইন্ডাস্ট্রিতে গুজব শোনা যায়, আপনি একসময় মৌলালির বস্তিতে থাকতেন । আসলেই তাই?’

প্রশ্ন করতেই মালা বিব্রত হয়ে গেলেন। পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘কে এসব কথাবার্তা ছড়ায় আমি ঠিক জানি না। বস্তিতে কেন থাকবো? চাইলে ছোটবেলার ছবি দেখাতে পারি। রামলাল, আমার ছোটবেলার অ্যালবামটা নিয়ে এসো তো। আমার ধারণা উঠতি তারকা বেলা বোসের কাজ এটা। বেলা আমাকে হিংসা করে। দরকারটা কী? ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা করতে হলে নিজের কোয়ালিটি দিয়ে জায়গা করতে হবে, এইসব মিডিয়া পলিটিক্সের কোনো মানে হয় না। আপনারা প্লিজ এসব ধাপ্পাবাজিতে কান দেবেন না।‘

হুট করেই কেন জানি প্রশ্নটা করে ফেললাম, ‘আপনার কি অঞ্জনকে মনে আছে মালা?’

মালা চোখ সরু করে একবার আমার দিকে তাকালেন। এরপর বললেন, ‘স্যরি? হুইচ অঞ্জন?’

জবাবে বললাম, ‘অঞ্জন দত্ত। এটা আসল নাম নাকি ছদ্মনাম তা অবশ্য জানি না। ঐ যে, বছর পাঁচেক আগে এই ১২ই মে-তে আপনাদের আনন্দবাজারে একটা খোলা চিঠি পাবলিশ হয়েছিলো। অঞ্জন দত্ত নামের এক লোক সেই চিঠিতে দাবি করেছিলো যে উনি আপনার এক সময়ের প্রেমিক, আপনি নাকি তাকে... ‘

এ জায়গায় মালা নিজেই আমাদের থামিয়ে বললেন, ‘দেখুন, আমি একজন ইন্টারন্যাশনালি রিকগনাইজড অ্যাকট্রেস। এসব সিলি ম্যাটার নিয়ে আমার মাথা ঘামানোর কিছু নেই। আর মনে হয় ঐ কাজটাও বেলা বোসই আমার নাম ছোট করার জন্যে করেয়েছিল। মানুষ যে কিভাবে এতো চিপ হয়, আই জাস্ট ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড।‘ একটানে বলে গেলেন তিনি। মুখে অস্বস্তির ছাপ তার স্পষ্ট।

অলংকরণ : মাহাতাব রশীদ

একটু থেমে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, 'তবে একবার এক অঞ্জনের সাথে আমার কিছুটা সখ্য হয়েছিল, জানেন! আমার মস্তো বড় ফ্যান ছিল সে। কালিম্পং থেকে কলকাতায় এসেছে কিছুদিন হলো মাত্র। পার্কের বেঞ্চিতে ঘুমানোর কারনে নাকি পুলিশ তাকে জেলে ঢুকিয়েছিল। বলুন দেখি কী কারবার! ...তার সাথে আমার সম্পর্কটা যখন একটু একটু করে গড়ে উঠছে তখন আমার এক বান্ধবী বললো, তুই এ কি করছিস মালা! এই লোক তো একটা ফ্রড! জানিস কী হয়েছে? কালিম্পংয়ে গিয়েছিলাম কিছুদিন আগে। শংকর নামে একটা হোটেলে ছিলাম। সন্ধ্যায় বাতি জ্বালাতে এলো যে মেয়েটা, সে কী মিষ্টি আর মায়াকাড়া চেহারা। আমি কলকাতা থেকে এসেছি শুনে বলল, জানেন দিদি আমার না বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে গিয়েছিল একজনের সাথে। দুজনে মিলে অনেক কত কিছু ভেবে রেখিছিলাম, কতো স্বপ্ন। বিয়েতে কেনাকাটা করতে হবে তাই কানের মাকরিটাও বেচে দিয়েছিলাম। কিন্তু সে সেই টাকা নিয়ে সে যে হাওয়া হয়ে গেল। কতদিকে কত খোঁজ করালাম। বস্তির ড্রাইভার চিগমী বলেছে, ও নাকি কলকাতা চলে গেছে। কলকাতা কত বড় দিদি? আমার ভালোবাসা থেকেও বড়? আপনার সাথে কখনো ওর দেখা হলে বলবেন দিদি, আমি ওকে অনেক অনেক ভালোবাসি দিদি।... চিগমি খুব জ্বালাচ্ছে, ও যেন দ্রুত ফিরে আসে!'

বলতে বলতে মালার চোখও চিকচিক করে উঠলো। আমরা আরও কিছু প্রশ্ন করতাম। তবে সে সুযোগ আর হলো না। মালা আবেগ সামলে নিয়ে বললেন, ‘ওমা, দেখুন কটা বেজে গেছে! সরি, আজ আর প্রশ্ন নিতে পারছিনা। একটু পরেই আমার হাজব্যান্ড চলে আসবে। আমাকেও গোছগাছ করতে হবে। দুপুরের ফ্লাইটে জেয়সালমির যাচ্ছি আজ। জানেন, ওখানকার বৃষ্টিটা এত সুন্দর!'

৬৩৯ পঠিত ... ১১:৫৮, মে ১২, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top