বাংলাদেশের খেলা নিয়ে ফেসবুকে যা লিখলে আপনি ক্রিকেটের মুরব্বি হতে পারবেন

১৮৮ পঠিত ... ১৬:০২, জুন ০৮, ২০১৯

বাংলাদেশের খেলা চলছে। ধরুন এই উপলক্ষে আপনি ফেসবুকে 'বেশি বুঝা মুরুব্বি' টাইপ ইমেজ নিতে চান। কী করবেন? কীভাবে স্ট্যাটাস দেবেন, কী কমেন্ট করবেন? কেমন হবে আপনার ইন-টোটাল ফেসবুক এক্টিভিটি? আশপাশ দেখে বেশ ক্রিকেট-মুরব্বির ভাব নেয়ার বেশ কিছু টেকনিক লিস্ট করেছেন আমাদের ক্রিকেট-ফেসবুক বিশেষজ্ঞরা। কোন টেকনিক বেশি কাজে দেয়, যাচাই করে দেখুন তো!

 

১# পরিসংখ‍্যানবিদ

ইন্টারনেট খুঁজে প্রয়োজনীয়, অর্ধ-প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় নানা ধরণের তথ্য জোগাড় করে দশমিকের পর ৩ ঘর পর্যন্ত প্রিসিশনসহ এভারেজ, মিডিয়ান, স্লোপ ইত্যাদি জোগাড় করতে হবে। এর সাথে ১৯২৩ সালের কোন ক্রিকেট খেলার কোন অপ্রয়োজনীয় ঘটনা যদি চিপা দিয়ে খুঁজে পান, হোক না তা আপনার বাবারও জন্মের আগের, সেটা যোগ করে দিতে পারেন। এতে অডিয়েন্স ভাববে আপনি ক্রিকেট নখদর্পণে জানেন এবং এই নিয়েই দিনরাত গবেষণা করেন। তারা আরও ভাববে, আবেগ নয় বরং আপনি তথ্য দিয়ে কথা বলেন। সুতরাং এই এলাকায় আপনিই মুরুব্বি।

 

২# পাগলা ফ্যান

খেলার মধ্যে আবেগে ‘কাইন্দা’ ফেলে অথবা ডিগবাজি খেয়ে কমেন্ট দিতে হবে। আবেগকে আপনি আপনার রক্তের কণায় কণায় নিয়ে যাবেন, প্রতিটা ক্রিকেটীয়-অক্রিকেটীয় বিষয়ে ‘ও মাই গড, বল যখন আকাশে আমি তো উত্তেজনায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলাম’, ‘আম্পায়ারের বউ, ম্যারি মি’, অথবা, ‘মুশফিককে এখনই ধরে মাহফুজুর রহমানের গান শোনানো হোক’ ইত্যাদি। এর মাধ্যমে লোকজন বুঝবে, ক্রিকেট আপনি শুধু দেখেনই না, আপনার জীবন-মরণ সব এর সাথে জড়িত। আপনার মত বাংলাদেশের ক্রিকেটকে কেউ এতটা জান দিয়ে ভালোবাসে নাই। এই ভালোবাসার দাবি থেকেই আপনি বস। যে কেউ কোন যুক্তি দিলেই আপনি বলবেন, ‘যুক্তির চেয়ে আবেগ বড়’, ‘বাংলাদেশের খেলার আবেগ কোনো যুক্তি মানে না’ ইত্যাদি।

 

৩# ক্রিকেট-পুলিশ

এই রোলে আপনার দায়িত্ব হলো আপামর ‘অবুঝ’ ফেসবুক জাতিকে ম্যাচুরিটি দান করা। মনে রাখবেন, কোনো রকম আবেগ না দেখানোই হলো ম্যাচুরিটি এবং আপনার চেয়ে ম্যাচু্উর আর কেউ নাই। যেমন আবেগী কোন ভাই যদি বলে অমুক খেলোয়াড়কে লাত্থি মেরে দল থেকে বের করে দিতে হবে, আপনি ঝাপিয়ে পড়ে বলবেন, ‘একদিন খারাপ খেললেই গালি দেবেন?’ কেউ যদি পরিসংখ‍্যান দেখিয়ে কোন যুক্তি দেয়, আপনি গিয়ে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলবেন, ‘অতীত দেখে যদি ভবিষ্যৎ বলা যেত, তাহলে আর নতুন খেলা কেন?’ ইত্যাদি। অথবা, আপনি নিজের প্রোফাইল থেকে স্ট্যাটাস প্রসব করতে পারেন যে, বাংলাদেশিরা (আপনি এবং আপনার লেভেলের গোটা কয়েকজন বাদে) দর্শক হিসাবে কতটা অপরিণত। স্ট্যাটাস শুরু হতে পারে ‘ভাই থামেন’ টাইপ ডায়লগ দিয়ে। মনে রাখবেন দল যাই করুক, তাদেরকে প্রশংসা করে যাবার মধ্যেই আপনার মুরুব্বিগিরি নিহিত। আর মূল খেলায় ভালো কিছু বলার না পেলে খেলার মধ্যে কোন খেলোয়াড় আরেক খেলোয়াড়ের জুতার ফিতা বেঁধে দিয়ে থাকলে সেটার প্রশংসা করে নিজেকে বিচক্ষণ এবং ম‍্যাচু্উর ক্রিকেটবোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করুন।

 

৪# ক্রিক-রাজনীতিবিদ

এই ভূমিকায় আপনাকে আসল খেলাকে পাশে সরিয়ে অন্য আলাপে চলে যেতে হবে। এই ধরুন আজকে হয়ত জিম্বাবুয়ের সাথে আফগানিস্তানের খেলা। এটা কি শুধুই ক্রিকেট খেলা? এর মধ্যে আরও কী কী লুকিয়ে আছে খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। জিম্বাবুয়ের কালো কালো মানুষের কষ্টের ইতিহাস আর মুগাম্বে সরকারের অত্যাচার নিপীড়ন এর বিপরীতে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত আফগানিস্তানের ক্রিকেটের মাধ্যমে সামনে এগোনোর গল্পে ফোকাস করুন। ভারত-শ্রীলঙ্কা খেলা হলে তামিল, বোমা-বিস্ফোরণ, ও মোদীকে নিয়ে কথা বলুন। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে উপনিবেশ আর আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হোন। সাউথ আফ্রিকার ম্যাচ হলেই বলুন বর্ণবাদ ও নেলসন ম্যান্ডেলার কথা। ইত্যাদি। এর মাধ্যমে লোকজন বুঝবে যে, আপনি অনেক বড় লেভেল মুরুব্বি। বিন্দুর মধ্যে সিন্ধু দেখার মত আপনি ক্রিকেট খেলার মধ্যে বিশ্ব ইতিহাস এবং রাজনীতি দেখতে পান। ক্রিকেট খেলা নিয়ে ঘোড়ার ডিমটা না বুঝলেও শুধু হিস্টরি, অর্থনীতি আর ভূ-রাজনৈতিক জ্ঞানের জোরেই আপনি অডিয়েন্সের কাছ থেকে সমীহ আদায় করে নিতে পারবেন।

সতর্কতা: জিম্বাবুয়ে এবার বিশ্বকাপে খেলছে না। স্ট্যাটাস দেবার আগে সতর্ক হোন।

 

৫# একটিভ ক্রিকেট-ফলোয়ার

এইজন্য আপনাকে ক্রিকেট খুব দৃঢ়চিত্তে ফলো করতে হবে এমন না। শুধু বাংলাদেশের খেলাগুলা ফলো করলেই চলে। তাও খেলে দেখে ফলো করার চাপও নাই, যারা ক্রিকেট নিয়ে প্রচুর আপডেট দেয় তাদেরকে ফেসবুকে ফলো মেরে রাখুন। লাইভ ক্রিকেট আপডেট হয় এমন সাইটের একটা ট্যাবও খুলে রাখতে পারেন, অথবা কোনো অ্যাপ। এরপর প্রতি বলে বলে স্ট্যাটাস দিন। ম্যাচের সিচুয়েশন বুঝে (অন্যান্যদের স্ট্যাটাস দেখে আন্দাজ করতে পারেন) সেটা নিয়ে মজার মজার স্ট্যাটাস দিতে থাকবেন। স্ট্যাটাসে সিরিয়াস হবেন না, কিন্তু কমেন্টে খুব সিরিয়াস কথা বলবেন, ম্যাচের রেফারেন্স দেবেন। যেমন, ‘ওই যে মুস্তাফিজের যে বলটা মিড অফ দিয়ে চার মারলো...’, ‘মাশরাফির ওই যে বলটায় কোনো রান হইলো না’ এমন সব কথা লিখলে মানুষ বুঝবে, আপনি ক্রিকেট দেখেন না, গেলেন। আপনি বিশাল ফ্যান। আউট হলে, ক্যাচ মিস হলে, সেঞ্চুরি হাফসেঞ্চুরি এসব নিয়ে দ্রুত স্ট্যাটাস দিতে ভুলবেন না। কিচ্ছু মাথায় না আসলে, ‘ভাই কি মিসটা হইলো,’ ‘আউট্টট্ট! ইয়েসসস!’ এসবই দিন না। তবে হ্যাঁ, খেলা শেষ হলে সেটা নিয়ে একটা ছোট কিন্তু সিরিয়াস স্ট্যাটাস দেবেন। লিখবেন কম, তবে দুয়েকটা টার্নিং পয়েন্ট রাখবেন। যেমন- 'প্রত্যাশা বেশি ছিল না, ম্যাচটা তো ওখানেই হেরে গেছি যখন...' অথবা 'যে যাই বলুক, আমার ম্যান অফ দ্য ম্যাচ মাহমুদুল্লাহ।' 

ওকে ফ্রান্স, এবার কমেন্টের মাধ্যমে জানিয়ে দিন কার কোন স্ট্রাটেজি বেশি ভাল লাগে। সবার জন্য অগ্রিম ধন্যবাদ রইল।

 

[টিপস: এই লেখাটাকেই আরেকটি স্ট্রাটেজি দাবি করে আমাদের আক্রমণ করার মাধ্যমে আপনার চকচকে শার্প বুদ্ধি বের করে দেখিয়ে দিন। কে জানে, এর মধ্য দিয়েই হয়তো আপনার এতদিনের আরাধ্য জনপ্রিয়তার দেখা পেতে পারেন। ]

লেখা: কল্লোল আহমেদ

১৮৮ পঠিত ... ১৬:০২, জুন ০৮, ২০১৯

Top