রোকেয়া হলে বান্ধবীর বিয়ে উপলক্ষে রুমমেটরা আয়োজন করলো 'গণ গায়ে হলুদ'

৮৪৬৭ পঠিত ... ১৯:১৫, জানুয়ারি ১৮, ২০১৯

'বিয়েশাদির খবর নাই। এদিকে গায়ে হলুদ করে সারা!' বলার পর হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছেন ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এমবিএর শিক্ষার্থী রীমা খাতুন। কেমি, নার্গিস, রীমা, তারিন, তামিমা, তনিমা, আয়েশা, মাসুরা ও রেশমি- এই নয়জন রুমমেট মিলে ৭ ডিসেম্বর আয়োজন করেছিল 'গণ গায়ে হলুদ'। নয়জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থী।

শীতের বিকেলে গাঁদাফুল হাতে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে হাজির হলাম তাদের গায়ে হলুদের গল্প শুনতে। গায়ে হলুদ সবার হলেও, বিয়ে কিন্তু সবার নয়... উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সদ্য সাবেক শিক্ষার্থী নার্গিস আক্তারের বিয়ে। রুমের এক বৈঠকী আলোচনায় একদিন এ খবর ফাঁস হয়ে গেল! আর যায় কোথায়! শুরু হয়ে গেল অভিনন্দন পর্ব। তারপর কথায় কথায় পালি এন্ড বুড্ডিস্ট স্টাডিজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শাকিলা তারিন একটা আইডিয়া প্রস্তাব করল। কখন কার বিয়ে হবে ঠিক নেই, সবার বিয়েতে হয়তো সবার উপস্থিত থাকাও সম্ভব হবে না। তাই, আপুর বিয়ে উপলক্ষে আমাদের রুমের সবার একসাথে একটা গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান হলে কেমন হয়! বাকি রুমমেটরা 'সেএএএই হবে' অভিধা দিয়ে তারিনের প্রস্তাবকে 'হ্যাঁ' ভোটে জয়যুক্ত করল। শুরু হলো এক ব্যতিক্রমী গণ গায়ে হলুদের প্রস্তুতি।

কথা বলার সময় তারিনের চোখ উচ্ছ্বাসে ভরা। উচ্ছ্বাস ঠিকরে বেরুচ্ছে। মনে হয় প্রতিবছর একটা গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান হলে খুব ভালো হতো! তারিনও অবশ্য রাখঢাক রাখলেন না। 'বোঝেনই তো। বিয়ে বা গায়ে হলুদ নিয়ে মেয়েদের আলাদা একটা ফ্যান্টাসি থাকে। তার উপর এটা একেবারে ব্যতিক্রমী আয়োজন'।

আয়োজনের অন্যতম অনুষঙ্গ শাড়ি। হলের সামনে শাড়ি কিনতে পাওয়া যায়। ট্রায়ালের জন্য তিনটা শাড়ি কেনা হলো। ঠিকঠাক মনে হলে আরও ছয়টা কেনা হবে। শাড়ি পছন্দ হল, কিন্তু ওই দোকানিকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! অতঃপর ভরসা ধানমন্ডি হকার্স। আগের শাড়ি তিনটি অর্ধেক দামে বিক্রি করে নতুন নয়টি শাড়ি কেনা হল। 'ফেক' নববধূদের জন্য হলুদ পাড়ের সবুজ শাড়ি আর 'রিয়েল' নববধূর জন্য সবুজ পাড়ের হলুদ শাড়ি। 'ও বলতে ভুলে গেছি। সব শাড়ি গিফট করেছে নার্গিস আপু', কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুললেন না এমফিল অধ্যয়নরত নুরুন্নাহার কেমি।

আয়োজন মোটেও সহজ ছিল না। কারো পরীক্ষা, কারো ক্লাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতকালীন ছুটি ঘনিয়ে আসছে। বড় কথা, নার্গিসের বিয়ের আগে তো গায়ে হলুদ করা চাই! বাজার করা হলো। তারপর? 'ভাববেন না শুধু শাড়ি পরে ফটোশ্যুট করার জন্য এই গায়ে হলুদ। আমরা পুরোপুরি রিয়েল গায়ে হলুদ করতে চাইছি। গায়ে হলুদে যেমন প্রতিবেশীরা ইনভাইটেড থাকে, আমরা তেমন এখানে ফ্লোরের সকল রুমের স্টুডেন্টদেরকে ইনভাইট করছি। তারা এসেছিল লাল শাড়ি অথবা থ্রি পিস পরে। আমাদের হলের বান্ধবীরা এসেছিল। শুধু ছেলেপক্ষের কাউকে ইনভাইট করতে পারি নাই। এই আর কি!' অনুষ্ঠানে কোনো কমতি ছিল না তা এভাবেই মনে করিয়ে দিলেন ইসলাম শিক্ষা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তনিমা মাজমাদার।

বর্ধিত-৬৩, এই ৯ শিক্ষার্থীর কক্ষ। রোকেয়া হলের এই কক্ষেই আয়োজিত হয় 'গণ গায়ে হলুদ'। হলুদের দিনও কম মজা হয় নি। দুপুরে শাড়ি পরে রিক্সায় চড়ে কার্জনে ছবি তুলতে গিয়েছিল। পরিকল্পনা মোতাবেক বিকেলের মধ্যে ছবি তোলা শেষ হবে। তারপর হলে ফিরে বাকি জোগাড়যন্ত্র- স্টেজ সাজানো, কক্ষে বিয়ে বাড়ির আবহ আনা, খাবারদাবার তৈরি করা। ওদিকে সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়, ছবি তোলা শেষ হয় না! দেখা গেল, রুমে এসে তারা পোশাক পরিবর্তন করার সময় পেল না। 'কী যে অবস্থা হইছিল বুঝাতে পারব না। একজন নববধূর পোশাকে রুম ঝাড়ু দিচ্ছে তো আরেক নববধূ রুম মুছতেছে! নিজেদের অবস্থা দেখে নিজেরাই হাসতেছি।' বলতে বলতে যেন কিছু সময়ের জন্য সেই সন্ধ্যায় ফিরে গেলেন ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আয়েশা সিদ্দিকী।

অনুষ্ঠানের প্রতিক্রিয়াও ছিল বেশ মজার। এই যেমন, রীমা খাতুন গায়ে হলুদের ছবি ফেসবুকে দিয়েছিল। তা দেখে বন্ধুরা বার্তা দেয়, 'দোস্ত, বিয়ে করলি। কিছুই জানলাম না।' রিমাও মজা নিতে ছাড়ে না- 'আসলে দোস্ত, হুট করে হয়ে গেল তো। তাই তোদেরকে জানাতে পারি নাই। কিছু মনে করিস না দোস্ত!'

৮৪৬৭ পঠিত ... ১৯:১৫, জানুয়ারি ১৮, ২০১৯

Top