বিজ্ঞাপনে সাহিত্যের ব্যবহার তথা 'বিজ্ঞাপনী সাহিত্য' : দেখুন ৫টি নমুনা

১৩১ পঠিত ... ১৮:২৯, জুন ১৮, ২০১৯

দিনদিন ব্যবসায়ের ক্রমোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে বিজ্ঞাপনের প্রচলন বাড়িয়া উঠিতেছে এবং সেই সঙ্গে একটি সমৃদ্ধিশালী এবং অতি বলবান বিজ্ঞাপনী-সাহিত্যেরও ক্রম-বিকাশ হইতেছে। এমন বিজ্ঞাপনও মাঝে মাঝে মাসিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিক, দৈনিক ইত্যাদি বিবিধ পত্রিকার বুকের উপর জাজ্বল্যমান দেখা যায়, যে তাহাতে চমৎকৃত না হইয়া থাকা যায় না এবং বারবার মনে হয় – নহি মোরা দীন, নহি মোরা হীন, -হতে পারি ক্ষীণ ইত্যাদি। বিলাতী  বিজ্ঞাপন বহরে এবং রঙচঙে বড় কিন্তু আমাদের দেশী বিজ্ঞাপনের মতো মনোহরণ এবং চমকপ্রদ হয় না। বিলাতী কাগজের বিজ্ঞাপন, সাধারণত লোকে বিজ্ঞাপনছাড়া কাগজের অন্যান্য লেখা পড়িয়া, পড়ে, কিন্তু আমাদের দেশের বিজ্ঞাপনের ভাষা এমনকি চমকদার যে বিজ্ঞাপনই সম্পূর্ণভাবে পাঠকের মনোহরণ করে। অন্য লেখা পড়িতে মন যেন আর চায় না। সেটা একদিক দিয়া অবশ্য ভালোই হয়। বিলাতী বিজ্ঞাপনকে আমরা এই একটি বিষয়ে বিষম পরাজিত করিয়াছি এবং তাহাতেই মনে হয় ‘Plassey is avenged’।  

বিজ্ঞাপন-বিষয়ক বিজ্ঞাপন না দিয়া এখন কতকগুলি চমকপ্রদ বিজ্ঞাপনের নমুনা দিব- মনোযোগের সহিত পঠিত হইলে সুখী হইবেন। যদি কাহারো ভালো না লাগে তবে পড়িবার দরকার নাই, কারণ তাহাতে সযত্ন এবং সকষ্ট-সংগৃহীত বিজ্ঞাপনের রস বিনষ্ট হইবার সম্ভাবনা।

 

১ নং

লোমহর্ষণ!   খুব কম দাম!! লোমহর্ষণ!!

কবিজগতের ভরাবাদর, অন্তঃসলিলা ফল্গুনদী,
ভাবজগতের বে অফ বিসকে, বাংলার বৈদাকুলপতি,
ছন্দরাজ্যের অঘটনঘটন পটীয়সী, মহাপ্রাণ

কেয়ারী রঞ্জনের

‘প্রণয়-দহন-জ্বালা-নিবারণী-কাব্য’’
বঙ্গের বিরহীকুল! আর ভয় নাই, এসো, একসঙ্গে এসো,
দৃঢ়পদে অগ্রসর হও, মা ভৈঃ মা ভৈঃ অর্থাৎ ভয় নাই, নাই,
বানী আসিয়াছে। কবি-বৈদ্য কেয়ারীর প্রেমজ্বালার
একমাত্র মলম ব্যবহার করিতে কৃতসঙ্কল্প হও।
হৃদয় জুড়াইবে, প্রাণ শীতল হইবে। খুব কম দাম, মাত্র
১৪ পয়সা। বিরহীকুলের বুকের দিকে চাহিয়াই আমরা
এত কম দামে এই অমূল্য কাবা-মলম বিতরণ করিতেছি।
রবীন্দ্রনাথ এই কেতাব সম্বন্ধে কি বলিয়াছেন শুনিতে চান?
তিনি বলেন, ‘কবি কেয়ারীর এই বইখানি আমি পড়ি নাই।‘
সব জায়গায় প্রাপ্তব্য।

 

২ নং

কিনিবেন না ---কিনিবেন না

বঙ্গ সাহিত্য-স্বরস্ততীর উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক এবং
একচ্ছত্রী-সম্রাজ্ঞী, উপন্যাস জগতের পাগলা ঘোড়া,
ভাবপ্রবাহের মিসিসিপি, প্রেমিক-হৃদয়ের সাহারা
শ্রীমতী ক্ষেমঙ্করী হাড়ের- ‘’হৃদয়-বিদারণ-প্রেম’’ ছাড়া
অন্য বই!!

এই মহাউপন্যাস সম্বন্ধে দার্শনিক হেমেন্দ্রলাল বলেন,
‘’আপনার বইটি কাল পাইয়াছি।‘’
বণিকরাজ রাজেন্দ্রনাথ বলেন,
‘’বইখানি শ্রীমতী ক্ষেমঙ্করী হাড়ের লেখা, ১৩৩০ সালে প্রকাশিত।‘’ এইরকম আরো অনেক সু-সমালোচনা আছে।

প্রথম সংস্করণ মাত্র ১০০ কপি ছাপা হইয়াছিল, সব বিক্রয় হইয়া যায় নাই, এখনো কিছু বাকি অতএব সত্বর হউন। একমাত্র বিক্রেতা সীতিকন্ঠ হাজরা, হোগল কুঁড়ে লেন।

 

৩ নং-

গুড়ুম! গুড়ুম!! গুড়ুম!!!

আবার গর্জিয়া উঠিল, সারা বাংলাদেশ কেরামতী সাহিত্য-মন্দিরের কামান-গর্জনে বিকম্পিত হইয়া উঠিল। ঐ দেখুন, পিলপিল করিয়া আবালবৃদ্ধবণিতা বাংলার সকল নরনারী কামান-গর্জনে মানুষ মারিবার জন্য নহে- বিলাতী হিংসা শ্রাপনেল নহে, ইহা তাপিত হৃদয়ে শান্তিবারি বরিষণকারী জলদ-গোলা!! বেদ-বিশারদ মহাপণ্ডিত প্যালারাম কাব্যতীর্থের ‘চঞ্চুবিক্রমিকা’ এই কামান!! ছেলেমেয়ে কিংবা যুবাবৃদ্ধকে উপহার দিবার এমন উপদেশপূর্ণ বই আর নাই। প্রসিদ্ধ সাপ্তাহিক ‘কবুতরের’ সম্পাদক এই পুস্তক পাঠক বলেন, ‘এই বইয়ের মধ্যে যুবক-যুবতীর চপল হাস্য-পরিহাস নাই, ঘটনা-বৈচিত্রের ম্যাজেন্টা রং নাই, বিরহী-বিরহিনীর চোখের জল নাই।‘’  তাহার উপর বইখানির দাম খুবই অল্প – মাত্র ছয় পয়সা।

 

৪ নং—

কেন?  কে?  কাহারা?  কোথায়?

জানিতে আপনার বড়ই ইচ্ছা হয় না? তবে শুনুন, আমরা চশমখোর ব্যবসায়ী নই – পরের দুঃখ বুক দিয়া অনুভব করিতে পারি তাই শান্তিপুর এবং ফরাশডাঙ্গা হইতে জরিপাড়ের ঠাসা বুনন অতি পাতলা ধুতি শাড়ি শস্তা দরে বিক্রয় করিতেছি। জোড়া ১৩ টাকা হইতে ১০০ পর্যন্ত; দরদস্তুর নাই অথচ আপনি ঠকিবেন না কারণ কাপড় চরকায় বোনা।– সেবক দরিদ্রবন্ধু খদ্দর ভান্ডার।

 

৫ নং –

বিজ্ঞাপনের ভড়ংএ ভুলিবেন না

যাহারা বিজ্ঞাপন দেয়, তাহারা লোক ঠকায়। আমরা নিজেদের সম্বন্ধে বেশী কিছু বলিতে চাই না, কিন্তু আমাদের ঔষধালয়ের দামোদর বটিকা সেবনে বাংলাদেশ, ভারতবর্ষ, এশিয়া, ইয়োরোপ, এক কথায় সমগ্র পৃথিবীর লোক শত শত ব্যাধি হইতে ত্রাণ পাইয়াছে। পায়ের হাজা হইতে আরম্ভ করিয়া কালাজ্বর, প্লীহা, যকৃত, যক্ষ্মা, নালি ঘা, কুষ্ঠ, চুল ওঠা, কার্যে অনিচ্ছা, পেট বেদনা, মাথাধরা, এমনকি দাদ, চুলকানি, হেঁটোয় বাত, বন্ধ্যাত্ব ইত্যাদি সব রকম ব্যাধিই আরোগ্য হয়। আমরা বিজ্ঞাপনের ভড়ং দেখাইতে চাই না, আত্মপ্রশংসাও চাহি না, তাহ হইলে এতদিনে ঘরে ঘরে আমাদের নাম উচ্চারিত হইত। কেবলমাত্র নিজেদের সম্বন্ধে নিখুঁত সত্যটুকু বলিতে চাই। ১৩ ঘন্টা সেবনে ফল পাইবেন। কোন রোগ না থাকিলেও খাইতে পারেন, রোগ হইতে বেশীক্ষণ লাগে না। এক বটিকার মূল্য মাত্র নয় পয়সা। ভজহরি ভৈষজ্যালয়। নয়নতলা।

 

কাপড় পরুন                কাপড় পরুন
এখনি কাপড় পরুন

(খাণ্ডব-বস্ত্রালয়ের, শস্তা দর, মাল ভাল)
উপরিউক্ত বিজ্ঞাপনটি একবার শিয়ালদহ স্টেশনে
দেখা গিয়াছিল।

 

[মৌলা দোপেঁয়াজি রচিত এই লেখাটি সজনীকান্ত দাশ সম্পাদিত শনিবারের চিঠি, ১ম বর্ষ/শ্রাবণ ১০/১৩৩১ -এ প্রকাশিত)] 

১৩১ পঠিত ... ১৮:২৯, জুন ১৮, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top