একটি একান্ত ঘরোয়া বাজেট

১৪৭ পঠিত ... ১২:৩৯, জুন ১৩, ২০১৯

আজ  পেশ করা হবে জাতীয় বাজেট। বাজেট অধিবেশন নিয়ে দেশজুড়ে বিশেষত মিডিয়ায় আর ফেসবুকে তোলপাড় চলছে সারাদিন। হিসেব করা হচ্ছে কোন খাতে বাজেট বাড়ল আর কোন খাতে কমল। টক শোতে বাজেট নিয়ে হাতাহাতি না হলেও গলা ফাটাফাটির অন্ত নেই। কিন্তু এসবের মধ্যে অত্যন্ত অনানুষ্ঠানিকভাবেই ঘরে ঘরে যে বসে বাজেট অধিবেশন, তার হদিশ অনেকেই রাখে না। বাজেট ও বাজেট আতঙ্ক নিয়ে একটি ঘরোয়া বাজেট eআরকির পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—

স্ত্রী: জনাব স্বামী, শুভেচ্ছা জানাই। আজ এই সুন্দর সন্ধ্যায় আপনি আমার বাজেট শোনার জন্য সময় দিয়েছেন দেখে আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি। না হলে এই সময়ে সাধারণত আপনি বাইরে বাইরে থাকতেই পছন্দ করেন। আপনাকে পাওয়া যায় টং দোকানে। আপনি তখন বর্তমান রাজনীতি আর ক্রিকেট নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করতে বিশেষ আনন্দ পান। আর যে-ই না ঘরে ঢোকেন তখনই আপনার মুখ হঠাৎ করেই বাংলার পাঁচের মতন হয়ে যায়। ভাবা যায় না যে-মানুষটা একটু আগে এত হাসছিল...

স্বামী: মাননীয় স্ত্রী, কাজের কথায় এলে খুশি হবো। টিভিতে বাংলাদেশ-ইংল্যান্ডের ম্যাচ চলছে। আপনি কথা শেষ করলে সেইটা দেখার ইচ্ছা রাখি!

স্ত্রী: ও! তার মানে আপনি এই ছাতার ম্যাচ দেখতে এখন গৃহে উপস্থিত আছেন? আমার বাজেট শোনার জন্য না?

স্বামী: তামিম পিটায়া হালুয়া বানায়ে দিচ্ছে ইংল্যান্ডকে… দয়া করে আপনার বাজেট পেশ করবেন কী?

স্ত্রী: হ্যাঁ করব। ঠিক আছে… আবারো আপনাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বাজেট শুরু করছি। প্রথমেই বলে নেয়া দরকার গত অর্থবছরে আমার দিক থেকে বাজেট ছিল অত্যন্ত কম।

স্বামী: এই কথায় আমার কিঞ্চিত ডাউট আছে মাননীয় স্ত্রী!

স্ত্রী: একটা কথা মনে রাখবেন, ক্রিকেটে যেমন বেনিফিট অব ডাউট সব সময় ব্যাটসম্যানের ফেভারে যায়, সংসারে তেমনি বেনিফিট অব ডাউট সব সময় স্ত্রীর পক্ষে যায়। অতএব ডাউট নিয়ে হাউকাউ না করে আমি যা বলছি শোনেন। এইবার এই ঘরোয়া বাজেটের প্রথম যে খাতে নজর দেয়া উচিত তা হলো মেক-আপ খাত। মেক-আপ খাতে গতবছর নজর না দেয়ায় আমার দুয়েকটা চুল দেখছি সাদা...

স্বামী: মাননীয় স্ত্রী, আপনার বয়স হয়েছে এই জন্যই...

 

 

স্ত্রী: চুপ থাকেন আপনি। একটা কথা কান খুলে শুনে রাখুন মাননীয় স্বামী… এই অর্থবছরে মেক-আপের জন্য বাজেটে অবশ্যই অবশ্যই গুরুত্ব বাড়াতে হবে। মাসে চার দিন চুল কাটাতে, প্রতিদিন ফেসিয়াল, ম্যানিকিউর আর পেডিকিওর, হাত-পায়ের নখের যত্ন, ভ্রু-চর্চা ইত্যাদির জন্য প্রতিমাসে ৫০ হাজার টাকা হিসেবে ১২ মাসে ৬ লাখ টাকার বরাদ্দ ধরা হয়েছে।

স্বামী: কী বলছেন মাননীয় স্ত্রী?

স্ত্রী: ঠিকই বলছি। প্রয়োজনে আপনার চা-সিগারেট ও আড্ডার টাকা কমিয়ে মেক-আপ বাজেটকে মেক-আপ করতে হবে।

স্বামী: কিন্তু?

স্ত্রী: রাবিশ, কিন্তু কিন্তু করবেন না! ঠিকমতো কথা শোনেন আগে। মেক-আপ বাজেটের পরেই যে বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হলো শপিং বাজেট। শপিং শুধুই কেনাকাটা নয়, শপিং হলো সামাজিক মেলামেশা, শপিং ঘোরাফেরা, শপিং হলো বিনোদন। তাই একটি মানুষের শপিং অধিকার হলো তার সবচেয়ে বড় অধিকার। এই অধিকারের জোরেই বলছি গত অর্থবছরে যেমন আমাকে শপিঙের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিল এই অর্থবছরেও যেন তেমনটা থাকে। মাসে অন্তত তিনটা জামদানি শাড়ি ঘরে আমদানি না হলে ফ্ল্যাটের অন্যান্য ভাবিদের কাছে মাথা হেট হয়ে যায়। পারলে তিনের অধিক শাড়ি আর গোটা সাতেক সালোয়ার কামিজ ও সে-সবের ম্যাচিং অর্নামেন্ট প্রতিমাসে কিনে রাখতেই হয়। এ ব্যাপারে আপনার বিশেষ সহযোগিতা কামনা করছি। আপনার যদি মনে হয় এই খাতে অধিক টাকা ব্যয় হচ্ছে ও ঘরের অন্য বাজেটের ওপর প্রভাব পরতে পারে তাহলে আপনার যাতায়াত খাতে যে বাজেট আছে সেখানে হাত দিন। সেই খরচটা কমিয়ে আনুন। প্রতিদিন যাতায়াত বাবদ কেন আপনার একশ বিশ টাকা তিরিশ পয়সা লাগবে এই মর্মে একটা মিনি বাজেট আপনি আমাকে পেশ করতে পারেন। মাননীয় স্বামী, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন?

স্বামী: জ্বি আমি শুনছি জনাবা। তবে তামিম বোধহয় সেঞ্চুরি থেকে আর কয়েকটা রান দূরে আমি কি যেতে পারি? তাছাড়া আমার গলাও শুকিয়ে কাঠ। আমি কি এক গ্লাস পানি পেতে পারি?

স্ত্রী: পানি ফ্রিজে আছে, আপনি উঠে গিয়ে নিয়ে আসতে পারেন, তবে এখনি পানি খাওয়া আপনার ঠিক হবে না। আপনাকে শোনানোর জন্য আরো কিছু বাজেট খাত রয়েছে আমার কাছে। আমার পরের বাজেট খাতটা অত্যন্ত গুরুতর। এ ব্যাপারে আগে কখনোই ঠিকমতো দৃষ্টি দেয়া হয় নি। ফলে এখন ভুগতে হচ্ছে।

স্বামী: কোন খাতের কথা বলছেন আপনি মাননীয়া?

স্ত্রী: পেট খাত।

স্বামী: মানে খাওয়া-দাওয়ার খাতের কথা বলছেন কি?

স্ত্রী: জ্বি না মাননীয় স্বামী। আপনার আইকিউ চিরজীবনই নিচের দিকেই থেকে গেল দেখে আমি খুব বেশি অবাক হচ্ছি না। আপনার আর উন্নতি হবার নয়। আমি পেট খাত মানে পোষাপ্রাণীর খাতের কথা বলছি। আমার গুগলু বিড়ালটার কিছুদিন থেকেই মন খারাপ থাকে। তার ক্র্যাশ কালি বিল্লিটা তাকে ছ্যাঁকা দিয়ে অন্য একটা বেড়ালের ঘরে নিয়মিত যাতায়াত করছে। ফলে গুগলুটার বিনোদনের বিশেষ অভাব দেখা যাচ্ছে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাকে কিছুদিন থাইল্যান্ড ঘুরিয়ে আনবো। আর আমি গেলে আমার জানের টুকরা বেবিডগটা তো যাবেই। সো, আমাদের তিনজনের সিঙ্গাপুর যাওয়ার ব্যবস্থাও আপনাকে করতে হবে। আর এই ব্যবস্থাটাকে নিয়মিত করে নিয়ে আসতে হবে। তিন মাসে অন্তত একবার পাঁচ ছয়দিনের জন্য আমার পেটগুলোর বিদেশভ্রমণ জরুরি। এই বিষয়ে মাননীয় স্বামী আপনার কোনো ধানাই-পানাই শুনতে আমি রাজি নই।

স্বামী: কিন্তু এত টাকা আমি কীভাবে...

স্ত্রী: সেইটা আপনার হেডেক মাননীয় স্বামী, আপনি আপনার হুদাহুদি বুড়িগঙ্গা ঘুরা কমিয়ে দিলেই এটা হওয়া সম্ভব! আর বাজেটের শেষ অংশ হিসেবে এখন আমি যে-খাতটির কথা বলব...

স্বামী: বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হয়ে যাচ্ছে তবু আপনার খাত এখনো শেষ হয়নি মাননীয়া? আমার গলা শুকিয়ে আসছে... আমার পানি খাওয়া অত্যন্ত দরকার!

স্ত্রী: ঠিক আছে, আপনাকে পানি খাওয়ার অনুমতি দেয়া হলো। কিন্তু পানি খেয়ে অবশ্যই আপনাকে বাপের বাড়ি ভ্রমণ বিষয়ক বাজেটটা শুনে পাশ করতে হবে। আমি ধরেই নিচ্ছি এতক্ষণ শোনা সমস্ত বাজেট আপনি পাশ করেছেন। যেহেতু মৌনতা সম্মতির লক্ষণ।

পুনশ্চ: স্বামী খুব দ্রুত গিয়ে ফ্রিজের দরজা খুলতে চাইলেন, কিন্তু কিছুতেই খুলতে পারলেন না। তিনি নানানভাবে চেষ্টা করতে থাকলেন। শেষে দরজা নিয়ে টানাহ্যাঁচরা শুরু করলেন। হঠাৎ দরজার হাতল খুলে ধপাস করে পরে গেলেন মেঝেতে। আর সাথে সাথে তার ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে দেখলেন খাট থেকে পড়ে গেছেন তিনি। স্ত্রী খাটের ওপর থেকে চিৎকার করে বললেন, কী হয়েছে? তুমি আমার আঁচল নিয়ে টানাটানি করছ কেন? স্বামী ঢোক গিলে বললেন, শোনো, আমাদের অর্থমন্ত্রীর মতো তুমিও এই অর্থবছরে কোনো অসম্ভব বাজেট দিয়ে দাও নি তো?

১৪৭ পঠিত ... ১২:৩৯, জুন ১৩, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top