তোমরা যারা মুড়ি মাখানোতে জিলাপি মেশাতে পছন্দ করো

১৮৩ পঠিত ... ১৭:০৫, মে ১২, ২০১৯

কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, এই দীর্ঘ জীবনে আমি সবচেয়ে বিচিত্র, সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয় কী দেখেছি। আমি এতটুকু দ্বিধা না করে বলব, সেটি হচ্ছে এদেশীয় কিছু অদ্ভুত খাদক। যারা ইফতারিতে ছোলা মুড়ি মাখানোয় জিলাপি দেয়। তার কারণ, যে বয়সটি হচ্ছে ভালো খাবারের স্বাদ নেয়ার বয়স, সেই বয়সে তারা এমন কিছু খাচ্ছে, যার মধ্যে স্বাদ বলে কিছু নেই। পুরোটাই বিস্বাদ। যে বয়সে একজন মানুষের চপ পিয়াজু আর ছোলা দিয়ে মুড়ি মাখানো খাওয়ার কথা, সেই বয়সে তারা অনুপ্রাণিত হয় মুড়ি মাখানোয় জিলাপির মতো একটা জিনিস দেয়ার জন্য। যে বয়সে তাদের ইফতারি শেষে তৃপ্তির ঢেকুর তোলার কথা, সেই বয়সে তারা যে শুধু এই অবিশ্বাস্য আনন্দ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করে রাখে তা নয়, তারা এগুলোকে ছোট করার চেষ্টা করে। যে বয়সে তাদের মনে মুড়ি আর ছোলার ভেতর সহজ ভালো লাগা ভালোবাসা জন্ম নেওয়ার কথা, সেই বয়সে তারা জিনিসটার মধ্যে জিলাপি ঢুকিয়ে সেই স্বাদটাকে অশ্রদ্ধা করতে শেখে—সে জন্য তারা কত দূর যেতে পারে, মুড়ি মাখানোয় জিলাপি না খাওয়াদের নিয়ে কতটা দুর্গন্ধময় ট্রল কিরতে পারর, সেটা আমি নিজের চোখে দেখেছি। সেই ভয়ংকর কাহিনি আমি কখনো কাউকে বলতেও পারব না!

যখন এই বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ ইফতারিতে ছোলা মুড়ি মাখানো খেয়ে পেট ভরাচ্ছে, তখন এর মধ্যে জিলাপি দেয়া একশ্রেণির তরুণকে ফেসবুকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে বাকিদের সঙ্গে তর্কযুদ্ধ করার জন্য। অনলাইনে ঢুকলেই দেখতে পাই, এখনো দেশের আনাচকানাচ থেকে কিছু খাদ্যমূর্খ তাদের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে যে, বড় ভাইয়েরা তাদের বুঝিয়েছে, মুড়ি আর ছোলা মাখানোর মধ্যে জিলাপি দিতে হবে, নিজের পাকস্থলী আর জিহবার ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করতে হবে। সেই সব বড় ভাইয়েরা কি তাদের প্রেমিকাদেরকেও মুড়ি মাখানোয় জিলাপি খাইয়েছে? আমি মোটামুটি নিশ্চিত, তাদের প্রেমিকারা ব্রেকাপ করে ফেলেছে, কিন্তু রাজি হয়নি। আমি আগেও দেখেছি, এই নেতারা যখন তাদের কর্মী বাহিনীকে বিস্বাদ খাবারের দিকে ঠেলে দেয়, তখন তাদের প্রেমিকারা শুধু ছোলা আর মুড়ি মাখানো খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে।

আমি অনেক চিন্তা করেছি, কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারিনি, কেমন করে বাংলাদেশের মতো খাদ্যপ্রেমী একটি দেশে মানুষ মুড়ি মাখানোয় জিলাপি দিতে পারে। আমার মনে আছে, আমি বহুকাল পরে যখন প্রথম এই দেশে ফিরে এসেছিলাম, তখন ইফতারে কয়েকজন লোকের ছোলামুড়িতে জিলাপি মাখানো দেখে একধরনের অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তখন লক্ষ করেছিলাম, তাদের মধ্যে একজন লোক তার হাতের জিলাপির ঠোঙ্গা দিয়ে নিজের মুখটি ঢেকে রেখেছে, যেন আমি তার মুখটা দেখতে না পারি। আমার সামনে এই পরিচয় দিতে তার লজ্জা কিন্তু এই খাবার না খেয়ে তার বের হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা নেই—এর চেয়ে দুঃখের ব্যাপার আর কী হতে পারে? 

একজন মানুষ কেমন করে ছোলা মুড়িতে জিলাপি মাখায়, তার একটি উত্তর অবশ্য আমি একবার খুঁজে পেয়েছিলাম। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র একবার আমাকে একটি এসএমএস করে জানিয়েছিল যে তার বাবা খাবারের স্বাদ বোঝে, সে নিজে কোনোদিন ছোলামুড়িতে জিলাপি দেয়নি এবং তার 'আমরা খাদ্যবলদ' নামের ফেসবুক পেজের এডিটর হওয়ার খুব ইচ্ছে। তার পেজের এডমিন মুড়ি মাখানোয় জিলাপি দেয় এবং তাকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে সে যদি ছোলা মুড়ির সাথে জিলাপি না খায়, তাহলে তাকে এডিটর হতে দেওয়া হবে না। সে জন্য সে মুড়ি মাখানোয় জিলাপি খাওয়া শুরু করেছে এবং এটি নিয়ে তার কোনো অহংকার নেই। সেই এসএমএসটিতে আমি একজন মেরুদণ্ডহীন অসহায় হতভাগা মানুষকে আবিষ্কার করেছিলাম। তার জন্য কোনো মমতা নয়, আমি করুণা অনুভব করেছিলাম। আমি ইচ্ছে করলেই সেই লোকটিকে খুঁজে বের করতে পারতাম, তার নীতিহীন পেজ এডমিনের পরিচয় জানতে পারতাম কিন্তু আমি তার কিছুই করিনি—আমার রুচি হয়নি।

আমার এই লেখাটি তোমরা যারা ছোলা-মুড়ি মাখানোয় জিলাপি খাও, তাদের জন্য। আমি জানি, এটি সম্পূর্ণ অর্থহীন একটি কাজ—আমার এই লেখাটি তোমাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলবে না এবং তোমরা যারা পড়ছ তারা আমার এই লেখায় বিভিন্ন অংশের বিরুদ্ধে এর মধ্যে নানা ধরনের যুক্তি দাঁড় করিয়েছ। শুধু তা-ই নয়, তোমাদের প্রিয় জায়গা— ফেসবুকে সম্ভবত এই লেখার বিরুদ্ধে বিশাল একটা প্রচারণা শুরু হবে। কিন্তু তবু আমার মনে হয়েছে, আমার এই কাজটুকু করা উচিত, তোমাদের কখনো যে সত্য কথাগুলো বলা হয়নি, আমার সেটা বলা উচিত।

আমি জানি, যদিও আমি এই লেখাটি লিখেছি যারা ছোলামুড়িতে জিলাপি খায় তাদের উদ্দেশে কিন্তু তারা আসলে আমার একটি কথাও বিশ্বাস করবে না। যদি বিশ্বাস করেও ফেলে, তার পরও তাদের কিছু করার থাকবে না। এ ধরনের খাবার যখন মানুষ খাওয়া শুরু করে, তখন অনেক স্বাদের লোভ দেখিয়ে তাদের খাওয়া শুরু করানো হয়। কিন্তু খাওয়ার পর যদি মোহভঙ্গও হয়, তবু তারা আর এই খাবার থেকে বের হতে পারে না। অভিশপ্ত প্রেতাত্মার মতো তাদের আজীবন ছোলামুড়িতে জিলাপি মাখিয়ে খেয়ে যেতে হয়।

যারা এখনো মুড়ি মাখানোয় জিলাপি খাওয়া শুরু করেনি, তারা হয়তো এই লেখাটি পড়ে একটুখানি ভাববে। যখন তাদেরকে কেউ এইধরনের খাবার খাওয়ার কথা বলবে, হয়তো তারা একটিবার চিন্তা করবে। আমাদের ন্যাচারাল স্বাদকে যে জিনিস টুঁটি চেপে হত্যা করতে চায়, আমি কেন সেই খাবার খাওয়া শুরু করব? ছোলামুড়িকে যখন ভালোবাসার কথা, তখন কেন আমি তার মধ্যে জিলাপি দেব?
জিলাপি না মাখিয়ে শুধু ছোলা মুড়ি খাওয়ার তীব্র আনন্দ যেসব মানুষেরা উপভোগ করেনি, যারা ভবিষ্যতেও কোনো দিন অনুভব করতে পারবে না, আমি সেসব হতভাগ্য মানুষের জন্য গভীর করুণা অনুভব করি। 

আপনারা চাইলে এই মানবতা বিরোধী এই খাদ্যচর্চার বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন--

১৮৩ পঠিত ... ১৭:০৫, মে ১২, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top