ফার্স্ট ইয়ার থেকে মাস্টার্সে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক দর্শনের বিবর্তন

১২৯০ পঠিত ... ২১:১১, মার্চ ১১, ২০১৯

প্রথম বর্ষ

প্রথম বর্ষে কিছু বুঝে উঠার আগেই শিক্ষার্থীরা রাজনীতির গ্যাড়াকলে পড়ে যায়। হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পলিটিক্যাল ব্যাকাপ নিয়ে উঠতে হয়। এই সময় তারা নিজেদের চরিত্রে থাকে না। বড় ভাইদের স্ক্রিপ্টে তাদের চলতে হয়। প্রথম বর্ষে রাজনৈতিক দর্শন একটাই, রাজনৈতিক বড় ভাইকে সকাল-বিকাল সালাম ঠুকতে হবে। এতে করে হলের সিট পাকাপোক্ত হয়।

গণরুমে থাকার কারণে সামষ্টিকভাবে বড় ভাই ছাড়া আর কোন রাজনীতির অস্তিত্ব থাকে না। এই পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা রোদ-ঝড়-বৃষ্টি যেখানেই যে থাকুক, ভাইয়ের আওয়াজ পেলে মিটিংয়ে চলে যেতে হয়। সেখানে শ্লোগান দেওয়াই তাদের মূল কাজ। স্লোগানের টেমপ্লেট হচ্ছে ‘অমুক হলের মাটি তমুকের ঘাটি’!

এ সময় কিছু মাস্টার্সের ভাইয়েরা পরামর্শ দেয়, 'এইসব রাজনীতি টাজনীতি করে কোন ফায়দা নাই। বুঝছ ছোট ভাই। ভার্সিটিতে আসছ। রিডিং রুমে যাও। নিয়মিত পড়ালেখা করো।' তবে এ ধরনের পরামর্শকে জুনিয়ররা একেবারেই গায়ে করে না।

অলংকরণ: ম্যাকবেথ নীল

 

দ্বিতীয় বর্ষ

দ্বিতীয় বর্ষে উঠতে উঠতে ছাত্রদের দুটো বড় পরিবর্তন হয়। গণরুম প্রস্থানের (কিছু দুর্ভাগা তখনো গণরুমে থেকে যায়) পাশাপাশি হলের রাজনীতি আরও কিছুটা বুঝে উঠতে পারে। প্রথম বর্ষে জানতে পারা প্রেসিডেন্ট গ্রুপ আর সেক্রেটারি গ্রুপের মাঝ থেকে লক্ষ-কোটি সাবগ্রুপ আবিষ্কৃত হয় এই বছরে।

এই বর্ষে শরীর এবং মেজাজ কিছুটা উত্তপ্ত হয়। সবচেয়ে বেশি সরকার বিরোধী পোস্ট কিংবা কথাবার্তা দেখা যায় এই বর্ষে। পাঁচ মিনিটের জ্যামে পড়লে পাঁচশ শব্দের সরকার বিরোধী পোস্ট লিখে ফেলার নজির দ্বিতীয় বর্ষেই স্থাপিত হয়। হলের লিফট (যদি থেকে থাকে) আসতে দেরি হলেও এরা বলে, ‘দেশে যে কী এক আজব সরকার! হলের লিফটাও ঠিকমত আসে না।’ 

 

তৃতীয় বর্ষ

তৃতীয় বর্ষে উঠতে উঠতে শিক্ষার্থীরা বুঝে যায়, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের ইশারা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। ততদিনে অনেকেই পলিটিকাল রেস থেকে ঝরে পড়ে কিংবা সরে যায়। তারা রিডিং রুমের পথ ধরে। যারা রেসে থেকে যায়, তারা নতুন অনুধাবনের ফলে চোখে একটি ফিল্টার প্রতিস্থাপন করে। ফলে সবসময়ই উন্নয়ন দেখতে পায়। এই পর্যায়ে ঘন্টা দুয়েকের জ্যামেও তাদের কিছু যায় আসে না। এটাকেও ভালো দিক হিসেবে উপস্থাপন করে। হলের লিফট যে চলছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে প্রতীয়মান হয়। আর লিফট না থাকলে সেটিকেও ছাত্রদের শারীরিক সুস্থতার জন্য বলেই বিবেচনা করা হয়।


চতুর্থ বর্ষ

চতুর্থ বর্ষে রাজনৈতিক দর্শন মোটাভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। কিছু শিক্ষার্থী আগের বছরে পলিটিকাল রেস থেকে সরে পড়া বন্ধুদের প্রদর্শিত পথ ধরে রিডিং রুমে নিজের ঠিকানা করে নেয়। চতুর্থ বর্ষে রিডিং রুমের পথে ছাত্রদের স্রোত সবচেয়ে তীব্র থাকে।

আর বাকিরা প্রবল গতিতে 'পলিটিকাল' হয়ে পড়ে। পলিটিকাল ভাইয়ের সাথে হ্যান্ডশেক করার জনা ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পলিটিকাল ভাইয়ের গাড়ির জানালা দিয়ে বের করা তিনটি আঙুলে নিজের হাতটি ছুঁয়ে দিতে পারলেই মিশন কমপ্লিট। এদের সামনে সরকারের যেকোনো মাত্রার সমালোচনা করলে ভস্ম হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে! উদাহারণস্বরূপ বলা যায়, ধরুন আপনি একটা ভূতের গল্প লিখেছেন। ‘গ্রামে সেদিন কারেন্ট নাই। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার।’

অমনি যেন বারুদে আগুন ধরে যাবে। কারেন্ট নাই মানে? লেখক কী বুঝতে চায়? এই সরকার নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে ব্যর্থ হয়েছে? সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার? লেখকের কুশপুত্তিলিকা দাহ কর!

মাস্টার্স

এই পর্যায়ের গল্পটা কিছুটা হৃদয় বিদারক। অধিকাংশই ব্যর্থ হয় পলিটিকাল ভাই হয়ে ওঠার মিশনে। তারা হতাশাগ্রস্থ হয়ে রিডিং রুম ও লাইব্রেরির পথ ধরে। পড়ালেখার পাশাপাশি তারা সমাজ সংস্কারেও মন দেয়। নিজেদের ঝুলি থেকে অভিজ্ঞতা বিতরণ করে বেড়ায়। জুনিয়রদের আলোর পথে নিয়ে আসার ব্যর্থ চেষ্টা করে কেটে যায় তাদের অবসর সময়।

অন্যদিকে যারা ভালো পদ পেয়ে যায়, তারা আগের বছরের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায় পুরোদমে। পদ-পদবী যারা পায় তারা থাকে সুখে, সংখ্যাটা খুবই কম। বাকিরা থাকে চূড়ান্ত হতাশ। সবাই ফিরে চলে রিডিং রুমে। জুনিয়রদের টিটকারি মূলক চাহনি সহ্য করতে হয়। কষ্ট আর ক্ষোভে কিছু নির্মম সত্যবচন বুক চিরে বেরিয়ে আসে। জুনিয়রদেরকে পরামর্শ দেয়, 'এইসব রাজনীতি টাজনীতি করে কোন ফায়দা নাই। বুঝছ ছোট ভাই। ভার্সিটিতে আসছ। রিডিং রুমে যাও। নিয়মিত পড়ালেখা কর। মা-বাবার পাশে দাড়াও। বাকিসব মিথ্যা। কেবলই ফক্কিকার!'

১২৯০ পঠিত ... ২১:১১, মার্চ ১১, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top