তিন বন্ধুর চোখে বাংলার পত্রিকা জগতের রথী-মহারথীদের শুরুর অজানা গল্প

২০০২ পঠিত ... ২১:০২, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৯

[নব্বইয়ের দশক। স্বরূপ সোহান, ওমর শরীফ ও সুমন পাটওয়ারী নামের তিন বন্ধু কাজ শুরু করেছেন তখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা ভোরের কাগজে, প্রদায়ক সাংবাদিক হিসেবে। সঞ্জীব চৌধুরী, আনিসুল হক, জয়া আহসান, তাজিন আহমেদের মতো তারকাদের সঙ্গে প্রথম দেখাতে তাদের কী উত্তেজনা! তারাও তখন কাজ করতেন একই পত্রিকায়। দেখতে দেখতেই তাদের সঙ্গে গড়ে উঠলো বন্ধুত্ব। এরপর কাজের সূত্রে সখ্যতা হলো আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, জুয়েল আইচসহ দেশের নামীদামী তারকাদের সঙ্গে। ১৯৯৮ সালের শেষের দিকে এসে ভোরের কাগজ ভেঙ্গে প্রকাশিত হলো প্রথম আলো। সে যাত্রাতেও সঙ্গী হলেন এই তিন বন্ধু। মাঝের এই বিশাল সময়ে ঘটেছে নানা মজার ঘটনা। সেই সব মজার ঘটনা নিয়ে তারা সম্প্রতি একটি বই লিখেছেন 'বাদামের খোসা' নামে। বর্ষাদুপুর থেকে প্রকাশিত এই 'বাদামের খোসা' পুস্তকটি পড়লে আপনি জানতে পারবেন 'লিটনের ফ্ল্যাট' জিনিসটা কোথা থেকে এলো, এরশাদ-বিদিশার বিয়েতে কী ঘটেছিল, অভির পিস্তল যেভাবে মডেল হলো, বাপ্পা মজুমদার তার গিটার টিউনিংয়ের যে রহস্য আজও উদ্ধার করতে পারেন নাই, নবনীতা চৌধুরীর বায়োলজি মুখস্ত করার কাহিনিসহ বাংলার রথী-মহারথীদের প্রায় অর্ধশত অজানা গল্প। সেসব থেকেই কিছু বাছাই ঘটনা প্রকাশিত হলো eআরকি পাঠকদের জন্য।--সম্পাদক]

 

চিড়া মিটিং

- পাত্তা পামু তো সুমন ?

এক রিকশায় তিনজন। আমি উপরে। আমার বাঁপাশে ওমর আর ডানে সুমন। বাংলামোটরের কাছাকাছি তখন। যাচ্ছি ভোরের কাগজ অফিসে। বাংলামোটরের ঠিক মোড়টায় অফিস। আজ বৃহস্পতিবার। ভোরের কাগজের অন্যতম জনপ্রিয় ফিচার পাতা মেলার মিটিং। কিসের মিটিং, কেন মিটিং, কারা থাকবে কিছুই জানি না। তাই সুমনকে ভয়ে ভয়েই জিজ্ঞেস করলাম। ছোটবেলা থেকেই বন্ধু সুমন বিশালদেহী। স্বাভাবিকভাবেই রিকশার আশি ভাগ জায়গাই তার। আর আমি আর ওমর কোনোরকমে বলতে গেলে রিকশায় ঝুলে আছি। ভ্রু কুঁচকে সুমন ঘাড়টা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালো। এরপর পাশে বসা ওমরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শোন মামা, ভোরের কাগজের চারতলায় ফ্লোর কামড়াইয়া পইড়া থাকুম। পাত্তা না দিয়া যাইবো কই?’ পাশে বসা ওমর মাথা নাড়ে। ‘হ, ঠিকই। সঞ্জীবদা তো কইছেই অ্যাসাইনমেন্ট দিবো। দেখি না আজকে গিয়া।’

সিঁড়ি দিয়ে চারতলায় উঠে মোটামুটি ধাক্কা খেলাম তিনজনই। সুমনের চেহারায় যদিও তার প্রকাশ নেই। ভাববাদী মানুষ সে। তবে আমার আর ওমরের চোয়াল ঝুলে গেল। পুরো চারতলায় যেনো বাজার। এটা কি অফিস, নাকি আড্ডার জায়গা?

এত মানুষ! চারতলায় ঢুকতেই শুধুমাত্র সম্পাদক মতিউর রহমানের (নামটা যদিও অনেক পরে জানতে পারি) ডানপাশের রুমটাই খালি। দরজা বন্ধ সেটার। কাঁচ দিয়ে ঘেরা রুমটায় কেউ নেই। অথচ বাইরে যেনো মচ্ছব বসেছে। হা হা হি হি চলছে। আচ্ছা, মিটিং কি শুরু হয়েছে? আমি, সুমন ও ওমর দাঁড়িয়ে। কার সঙ্গে আমরা কথা শুরু করবো, ভাবছি। সঞ্জীব চৌধুরীর টেবিল ঘিরে সবাই। সঞ্জীবদার টেবিলের পাশে একটা বড় ডাইনিং টেবিলের মতো। ডাইনিং টেবিল ঘিরে সবাই আর সঞ্জীবদা টেবিলের সামনে। সবাই সবার সঙ্গে কথা বলছে। এটাকেই কি মিটিং বলে! বুঝতে পারছি না। আমি এক কোণে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। সঞ্জীবদা টেবিলের একপাশে বসে নিচুগলায় কার সঙ্গে যেন কথা বলছেন। একবার মনে হচ্ছে মিটিং শুরু হয়েছে আর একবার মনে হচ্ছে শুরু হয়নি। এর মাঝেই একজনকে দেখলাম ধীর পায়ে হেঁটে এসে সঞ্জীবদার পাশে বসলেন। শান্ত সৌম্য ধীর-স্থির মানুষ বোঝাই যাচ্ছে। পাতলা একটা টি-শার্ট পড়া। বসেই সঞ্জীবদার দিকে মুচকি হেসে বললেন, ‘আজকে চিড়াভাজা নাই? চিড়াভাজা ছাড়া মিটিং কি শুরু হবে?’ বুঝলাম মিটিং আসলে শুরুই হয়নি। সবাই যে যার মতো গল্প করছে। এর মাঝেই চারটা বড় থালায় চিড়াভাজা চলে আসলো। বুঝলাম, এই সেই বিখ্যাত চিড়াভাজা যার অপেক্ষায় মিটিংয়ের এত দেরি। যে ভদ্রলোকটি চিড়াভাজার জন্যে হাপিত্যেস করছিলেন একটু আগে তাকে দেখা গেল গভীর মন দিয়ে গত সপ্তাহের মেলা পড়ছেন আর আনমনে চিড়া খুঁটে খুঁটে খাচ্ছেন। পাশ থেকে ওমর বলল, ‘চেনো তো স্বরূপ, আনিসুল হক, গদ্যকার্টুনের লেখক আনিসুল হক।’ আমি যারপর নাই বিস্মিত হলাম। আমার প্রিয় কলাম গদ্যকার্টুন। তার লেখার ভক্ত আমি। যা বুঝলাম, মিটিংটা উনিই শুরু করবেন। হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে টুশি ঢুকলো। সোজা এসে সঞ্জীবদাকে, ‘সঞ্জীবদা আমার পরের সংখ্যার লেখা রেডি। অক্ষয়ের নতুন মুভি নিয়ে। বক্স অফিস হিট। টাইমস অব ইন্ডিয়া তাই তো বলল। বাই দ্য ওয়ে গত সপ্তাহের প্রধান রচনা কিন্তু হিট! সবাই ভালো বলেছে। আজকের মিটিংয়ে তুষার ভাইই হিরো।’ টুশি যার দিকে তাকিয়ে কথাটা বললো, বুঝলাম উনিই তুষার আব্দুল্লাহ্। মেলার বিখ্যাত লেখক। চিড়া খুঁটা বাদ দিয়ে আনিসুল হক এবার মাথা তুললেন। সঞ্জীবদাকে, ‘সঞ্জীবদা আমাদের পরের সপ্তাহের তারকা ইন্টারভিউ কার?’ সঞ্জীবদা চশমাপড়া এক  তরুণকে উদ্দেশ্য করে, ‘দিদার বিপাশাকে পাওয়া গেল?’ বুঝলাম ইনি দিদার চৌধুরী। মেলার আরেক জনপ্রিয় লেখক। আর এভাবেই একে একে অদ্ভূতভাবে অ্যাসাইনমেন্ট ভাগ হতে থাকলো। জমে গেল মিটিং। মিটিংয়েই পরিচিত নামগুলোর মুখ দেখলাম। দেখলাম সাগর সারোয়ারকে। দেখলাম সুপণ রায়কে। আর এভাবেই পরিচয় হল তুষার ভাই, সাগর ভাই, দিদার ভাই আর সুপণ’দার সঙ্গে। সেই মধ্য নব্বইয়ের এক দুপুরে মেলার মিটিং দিয়ে শুরু তাদের সঙ্গে আমাদের সখ্য। যারা মেলায় ডাকসাইটে লেখক তখন। সংশয় ছিলো, এত রথী-মহারথীদের ভিড়ে আমরা কি পারবো?

না আমাদের নিরাশ হতে হয়নি। ওই মিটিংয়েই সুমন মেলায় বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের রিপোটিংয়ের দায়িত্ব পায়। ওমর পায় লাইফ স্টাইল, আর আমি? একটু পরে বলি। সবে তো শুরু হলো আমাদের আনন্দ যাত্রা। 

 

হঅলিক্রসনীতু

ততদিনে আমি, ওমর, সুমন মেলায় জাঁকিয়ে বসেছি। শুধু মেলা কেন, পাঁচ-এর পাতা, রংধনু, বিজ্ঞানের পাতাসহ প্রায় সবগুলো পাতাতেই আমাদের বিচরণ। কারণ ছিল। আমাদের অগ্রজরা যারা ছিলেন, তুষার আব্দুল্লাহ, দিদার চৌধুরী, সাগর সারোয়ার তখন প্রদায়কের কাজ ছেড়ে ভিন্ন ভিন্ন পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে যোগ দিয়েছেন। সুপণ রায় ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে ভোরের কাগজে দুর্দান্ত সব রিপোর্টিং করছেন। আর তাই ওই সময়টায় আমাদের জন্য ছিলো একটা বড় সুযোগ। যেটা আমি, ওমর আর সুমন খপ করে ধরে ফেলেছি। প্রথমসারিতে তখন আমরা। আরো একজন ছিলেন। শামীম শাহেদ।

আমাদের শামীম ভাই তখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে চাকরি করতেন। খুব অল্প সময়ে তিনি মেলায় হিরো লেখক বনে যান। মেলায় নিয়মিত লেখক হয়ে উঠেন তিনি। অনেকগুলো অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেন। চলচ্চিত্র বিট করতেন জুটন চৌধুরী এবং কামরুজ্জামান বাবু। ঢাকাই ছবির নারী-নক্ষত্র সম্পর্কে তাদের অগাধ জ্ঞান। সুপণদাও কিন্তু অনেকগুলো ভালো ভালো চলচ্চিত্র রিপোর্টিং করেছেন। আমাদের মধ্যে সবচাইতে কমবয়সী হিসেবে মেলার মিটিংয়ে ঐ সময়ে যোগ দিল নওরোজ ইমতিয়াজ আর নবনীতা চৌধুরী। নওরোজ লেখা শুরু করলো আনন্দ রনি নামে। খুবই সুপাঠ্য ছিলো সে লেখা। আর নবনীতা? নবনীতাকে আমি বিশেষ করে চিনতাম ভোরের কাগজে দেখা হওয়ার আগেই। আমার কাজিন সাদাত পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল নবনীতার সঙ্গে। তখন সে মনে হয় এসএসসি দিয়েছে। তুখোড় ছাত্রী। হলিক্রসে পড়ে। অসাধারণ তার গানের গলা। নবনীতার বড় বোন নিরুপমা আমাদের সমসাময়িক। নিরুপমা নিয়মিত আমাদের মেলা’র মিটিংয়ে আসতো। নিরুপমা যখন মাথা ঝাকিয়ে গল্প শুরু করতো , তখন সবাই ওকে ঘিরে গোল হয়ে বসে থাকতো। আর হাঁ করে তাকিয়ে থাকতো ওর দিকে। ও ছিলো পুরাই কথার রেলগাড়ি।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, নবনীতা প্রতিদিন সোজা স্কুল থেকে ভোরের কাগজে চলে আসতো। সঞ্জীবদাকে নীতু ডাকতো সঞ্জীব কাকু বলে। মেলার মিটিংয়ে নীতুর উপস্থিতি আমরা টের পেতাম তার উচ্ছ্বলতায়। সবচাইতে কমন দৃশ্য ছিলো, স্কুল থেকে ফিরে আসা নবনীতা সঞ্জীবদার টেবিলে পা ঝুলিয়ে বসে ব্যাগ থেকে বের করতো মোটা বায়োলজি বই। তারপর চিৎকার করে শুরু করতো বায়োলজি মুখস্থ করা। সে এক দৃশ্য। মাথার দুই বেনী ঝুলিয়ে আমাদের নীতু পড়া মুখস্থ করছে। আমি প্রায়ই বলতাম, ‘‘আসছে আমাদের হঅলিক্রসের ছাত্রী।’’ আমার ইংরেজি ভুল উচ্চারণ নীতু একদমই সহ্য করতে পারতো না। আমার দিকে চোখ রাঙিয়ে বলতো, “স্বরূপ ভাই আমার স্কুলের নাম ভুল উচ্চারণে করবেন না। হঅলিক্রস না, বলেন, হোলিক্রস।’’ আমি আবার চেষ্টা করতাম। আবার বলতাম, “হঅলিক্রস।’’ রাগের চোটে ভাষা হারিয়ে ফেলতো নীতু। ওমর আরো রাগানোর জন্য আমার মতো করেই বলতো, ‘‘হঅলিক্রস নীতু।’’ আর তার রাগ দেখে কে? সঞ্জীবদা আমাদের এই ঝগড়া দেখতেন আর মিটিমিটি হাসতেন।

নবনীতা চৌধুরীর আজ আমাদের দেশের জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক। অথচ আমাদের তিনজনের কাছে সে বায়োলজি মুখস্থ করা ছোট্ট নীতুই রয়ে গেল।

 

মুড়িভর্তা এবং একজন কানিজ সুবর্ণা

সারা শহর ছেয়ে গেছে পোস্টারে। যেদিকে তাকাই খালি একজনের পোস্টার। কানিজ সুবর্ণা। হালের সেনসেশনাল গায়িকা। ঢাকায় নতুন গায়িকা নিয়ে এরকম পোস্টার প্রচারণা আগে কখনোই দেখিনি। রাস্তায় চলতে ফিরতে খালি মুগ্ধ হয়ে পোস্টার দেখি। ইশ্, যদি পরিচয় থাকতো? আব্দার করলাম সঞ্জীবদাকে। একটাই উপায়। মেলা। সঞ্জীবদাকে বলতেই তিনি বললেন, 'ডাক, ডাক। চারতলায় ডাক। মেলায় তারকা আলাপ কর।'

কে যোগাযোগ করেছিল মনে নেই। তবে কানিজ সুবর্ণা ভোরের কাগজ অফিসে আসবেন, কথা দিলেন। পোস্টারের সেই লাস্যময়ীকে কাছ থেকে দেখবো ভেবেই আমরা বেশ উত্তেজিত। অপেক্ষায় আমি, সুমন, ওমর, সঞ্জীবদা। ঠিক তখনই পেস্টিং বিভাগের বাবু ভাইকে দেখা গেল চারতলায়। পেস্টিং বিভাগ তিনতলায়। কিন্তু বাবু ভাইকে বিকেল বেলায় চারতলায় দেখা যাওয়া মানেই আমাদের মুখ চাওয়া-চাইয়ি হাসি। কারণ আজ বাবু ভাইয়ের হাতের স্পেশাল মুড়ি ভর্তা হবে। প্রায় বিকেলেই আমরা বাবু ভাইকে ধরতাম। বাবু ভাই মুড়ি মাখাতেন। মুড়ি মাখানোকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতেন তিনি। এই জিনিস যারা না খেয়েছে, তারা বুঝবে না যে কি সেই অমৃত। এক মুড়ির সঙ্গে যে কতকিছু থাকতো। আর থাকতো সঞ্জীবদার গান। আমরা মুঠো মুঠো মুড়ি খেতাম আর মুগ্ধ হয়ে শুনতাম সঞ্জীবদার গান। আহা। “তুমি আমার বাহান্ন তাস”, “দোলো ভাটিয়ালী”, “সাদা ময়লা”, “চোখটা এত পোড়ায় কেন?” গানগুলো দলছুট জন্মের আগেই সঞ্জীবদা আমাদের আসর জমিয়ে শোনাতেন। সঙ্গে থাকতো বাবু ভাইয়ের শাহী মুড়ি ভর্তা। তাই আজকেও যখন বাবু ভাইকে চারতলায় দেখা গেল, তার মানে আয়োজন আছে। সত্যিই তাই। বিকেল চারটা নাগাদ বিশাল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে বাবু ভাই নেমে পড়লেন মুড়ি মাখানোতে। সঞ্জীবদার পাশে বিশাল বড় ডাইনিং টেবিলে পুরনো কাগজ বিছিয়ে শুরু হল মুড়ি মাখানো। বাবু ভাই আমার আর সুমনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বুঝছেন সুমন ভাই আজকেরটা কিন্তু সেইরকম।” বিকালের দিকে ফিচার বিভাগে খুব একটা মানুষ থাকে না। তারপরও যারা আছে সবাই মুড়ির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সবাই মুড়িভক্ষণে ব্য¯ত আর আহা উহু চলছে। ঠিক সেই সময়ে আমাদের তখনকার ক্র্যাশ কানিজ সুবর্ণা সঞ্জীবদার সামনে এসে বললেন, “আমি কানিজ, আমাকে ডাকা হয়েছিলো।” সঞ্জীবদা আমাদের সঙ্গে মুড়ি খাচ্ছিলেন। কানিজের দিকে তাকিয়ে বসতে না বলে সরাসরি বললেন, ‘‘আসেন মুড়ি খাই।’’ কানিজের চেহারা হয়েছিলো দেখার মতো। পুরাই হতভম্ব। এরকম উপস্থিতিতে প্রথমেই যে কেউ বলতে পারে আসেন মুড়ি খাই, সেটা উনি কল্পনাও করেননি। জমকালো সাজে কানিজকে লাগছিল অপরূপ। আমি একটু সরে এসে কানিজকে জায়গা করে দিলাম। বললাম, ‘‘আসেন, আসেন।’’ একটু ইতস্তত করে কানিজ অল্প করে মুড়ি মুখে তুলে নিলেন। কিন্তু বাবু ভাইয়ের এই ক্যারিশমাটিক মুড়ি একবার মুখে দিলে দিতে হবে শতবার টাইপ। তাই আবার। এবং আবার। খেয়েই যাচ্ছেন কানিজ সুবর্ণা। আর গল্পে মেতে উঠেছেন আমাদের সঙ্গে। হঠাৎ কানিজ সুবর্ণা হা করে পানি পানি বলে চিৎকার শুরু করে দিলেন। হুড়মুড় করে পানি আনা হলো। কিন্তু বিধি বাম। পানি খেয়েও তার ঝাল কমে না। এমন ঝাল যে, এক পর্যায়ে চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি  পড়া শুরু হলো। বসে পড়লেন কানিজ। সঞ্জীবদা, আমি, সুমন, গিয়াস ভাই, ওমর সবাই কানিজকে ঘিরে ধরে আছি। সহকারী ফরিদ ভাই পানির জগ হাতে দাঁড়িয়ে। আর কানিজ পানি খেয়েই যাচ্ছেন। লাভ হচ্ছে না। চোখের পানিও বন্ধ হচ্ছে না। কোথায় আজকে এই জনপ্রিয় সেনসেশনাল সুন্দরী গায়িকার ইন্টারভিউ হবে, তা না, গায়িকার কান্নাই আমরা থামাতে পারছি না। সে এক দৃশ্য। গায়িকার মেকআপ তখন চোখের জলে একাকার। ফোটোসেশনের কি হবে? অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছি আমরা।

এর মধ্যেই বাবু ভাই একটু নিচু গলায় বললেন, “কখনো বোম্বাই মরিচ দেই না, আজকে একটু দিয়েছিলাম আর কি।” হো হো করে সবাই হেসে উঠলো। আর কানিজের চোখে তখনও জল আর ঠোঁটে হাসি। 

 

ঢাকার নাইট ক্লাব

-স্বরূপ আমি কনফার্ম আপনিই পারবেন।

ফিচার সম্পাদক আনিসুল হকের কেন মনে হল ঢাকায় নাইট ক্লাব নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট আমি করতে পারবো কে জানে? কিন্তু অ্যাসাইনমেন্ট তো শিরোধার্য। ভোরের কাগজের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘অবসর’ সবে দুটি সংখ্যা বেরিয়েছি। আনিসুল হক অবসর ম্যাগজিনের মূল স্রষ্টা। শুধু অবসরই না, মেলারও আইডিয়া ওনারই ছিলো। দুটি সংখ্যা অবসর বেরুনোর পর বেশ পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠছে ম্যাগাজিনটি। কারণ দেশে তখন কোনো বাংলা পত্রিকারই এরকম সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন নেই। তাই প্রকাশনা জগতে এটা একেবারেই নতুন। সম্পাদনার দায়িত্বে তখন মুনির রানা ভাই। আর তখনই আমার ঘাড়ে চাপলো ঢাকার নাইট ক্লাব নিয়ে লেখার। প্রচ্ছদ কাহিনী হবে। আমি কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকলাম। কোথা থেকে শুরু করবো? আমি তখন পত্রিকার কাজের বাইরে টুকটাক মডেলিং করি। র‌্যাম্পেও হেঁটেছি বেশ কয়েকবার। কিভাবে র‌্যাম্পে হাঁটতে হয় তার কিছুটা প্রশিক্ষণও আছে। আর সেই সুবাদে বেশ ক’জন র‌্যাম্প মডেলের সঙ্গে আমার ওঠা-বাসা। ভাবলাম এরাই আমার সোর্স।

মধ্য নব্বইতে ঢাকায় নাইট ক্লাবে কারা যায় বা কয়টা আছে সেটার খবরই বা কে রাখে? হাতে আছে মোটে পাঁচ দিন। শুরু করলাম র‌্যাম্প মডেলদের ফোন দেয়া। আর পাঁচ তারকা হোটেলগুলোতে খোঁজ নেয়া। কিন্তু বিশেষ লাভ হলো না। পাঁচ তারকা হোটেলগুলোতে ডিস্কো থেক খুবই বোরিং। স্যাক্সোফোন আর পিয়ানোর টুংটাংয়ে জোড়ায় জোড়ায় নাচানাচি। গেলাম এবং দেখে খুবই বিরক্ত হলাম। নাইট ক্লাবের যে উদ্দামতা, সেটা একেবারেই নেই। খুবই বোরিং। এই অভিজ্ঞতায় কিছুই লেখা হবে না। ঢাকায় তখন ডিজে পার্টি শুরুই হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, খুবই ব্যক্তিগত উদ্যোগে কারো কারো বাসায় উদ্দাম কিছু ডিজে হয়, তাও সেটা অভিজাত এলাকায়। পরিচিত না থাকলে প্রবেশ নিষেধ। আর এইসব হাউজ পার্টি দিয়ে আমার লেখার মূল স্টোরিটাই কেঁচে যাবে। এর মধ্যেই সুমন আমাকে বলল, ‘‘তুই নাসিম ভাইকে ধর।’’ নাসিম ভাই মানে নাসিম আলী খান। জনপ্রিয় গায়ক। সোলস ব্যান্ড নিয়ে তিনি তখন চট্টগ্রামেই থাকেন। আগেই জানতাম, নাসিম ভাই চরম স্টাইলিশ মানুষ, যাকে বলে একেবারে পার্টিবয়। এবং সেটা তিনি প্রায় তার ছোটবেলা থেকেই। ফোন দিলাম চট্টগ্রামে। নাসিম ভাই বললেন, ‘‘আমি ঢাকায় আসছি পরশু দিন। তোমার অফিসে আসবো।’’ নাসিম ভাই ভোরের কাগজ অফিসে এলেন। অনেকক্ষণ আড্ডা হল তার সঙ্গে। পুরো চট্টগ্রামের নাইট ক্লাব, ডিজে সম্পর্কে নোট নিলাম। উনি কিছু রেফারেন্স দিলেন ঢাকারও। আর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ উপকার করলেন ঢাকা এবং চট্টগ্রামের নাইট ক্লাবগুলোর কিছু ছবি দিয়ে। যাক তাও কিছু তথ্য হাতে এল।

এরপর শাওন আপাকে ধরলাম। শাওন আপা বলল, ‘‘তুই শম্পা আপার কাছে যা। আমার বন্ধু বর্ণার বড় বোন। উনি তোকে সাহায্য করতে পারবে।’’ শম্পা আপা কিভাবে সাহয্য করবে, কিছুই না বুঝে দিলাম ফোন। শম্পা আপা মোটামুটি বোমা ফাটালেন। উনার কাছেই জানলাম,  ঢাকায় বেশ কিছুদিন হলো একটা নাইট ক্লাব হয়েছে। নাম ‘ক্লাব ট্রাম্পস’। উনি আরো বললেন, দিশার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। দিশার কাছে ফোন দিয়ে আরো বেশকিছু তথ্য পেলাম। কিন্তু ক্লাব ট্রাম্পসে কিভাবে যাবো? সাহায্য করলো বন্ধু মডেল সামরীন। সামরীনের কাছে নম্বর পেলাম বান্টি ইসলামের। ওই সময়ের বিখ্যাত ভিডিও ক্যাসেটের দোকান ভিডিও কানেকশনের মালিক বান্টি ইসলাম ক্লাব ট্রাম্পসের অন্যতম স্বত্বাধিকারী। ফোন দিলাম বান্টি ভাইকে। সময় দিলেন সাক্ষাতের। বাসা উত্তরায়। এক সকালে আমি আর ওমর শরীফ উত্তরায় গেলাম তার সঙ্গে দেখা করতে। বিশাল বাড়ি। জমকালো ড্রইং রুম। ড্রইংরুম ভর্তি শুধু চকলেট আর চকলেট। আমি আর ওমর পুরাই টাশকি। এতো চকলেট। বান্টি ভাই পরিচয়ের পরই বললেন, ‘‘এই চকলেট তো তোমাদের জন্যই, খাও খাও।’’ খুবই বিস্ময় নিয়ে সেই চকলেট আমরা মুখে পুরেছিলাম। যাই হোক, দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দিয়ে ক্লাব ট্রাম্পস সম্পর্কে যা জানলাম, তা হল সদস্য ছাড়া এই নাইট ক্লাবে কেউ ঢুকতে পারে না। গভীর রাত পর্যন্ত চলে পার্টি। আর থার্সডে নাইট থাকে স্পেশাল। ঐ দিনের পার্টি থাকে বেশি উদ্দামতায় ভরপুর। আমি বান্টি ভাইকে বললাম, ‘‘আমরা থার্সডে নাইটেই ক্লাব ট্রাম্পসে যেতে চাই।’’ বান্টি ইসলাম, রাজি হলেন। আমি আর ওমর ফটোগ্রাফার আনিসকে নিয়ে গেলাম ক্লাব ট্রাম্পসে। বনানী কামাল আতার্তুকে। সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। ক্লাবের ম্যানেজার একটাও ছবি তুলতে দিলেন না। নিয়ম নেই। আনিস শুধু ফাঁকা ডান্স ফ্লোরের ছবি তুলে নিয়ে চলে আসলো। ওই রাতের পর আমি বহুবার ক্লাব ট্রাম্পসে গিয়েছি। কিন্তু প্রথমদিনের বিস্ময় আমার আজও কাটেনি। এরপর ঢাকার আরেক নাইটক্লাব ক্লাব ম্যারিনোতেও গিয়েছি। সব মিলিয়ে স্টোরি সাজালাম। জমা দিলাম। কভার স্টোরি হলো অবসরে। ছাপা হওয়ার পর চরম হিট। যে দিন প্রকাশিত হয় সেদিন অজস্র ফোন পেয়েছি। তখন তো আর মোবাইল ফেসবুক ছিল না। সবাই ল্যান্ডফোনে ফোন করে করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এত বছর পর ভাবি, জীবনে এরপর বিদেশে কত কত নাইটক্লাব, পাবে গিয়েছি। উদ্দামতা দেখেছি। কিন্তু সেই সময়ের ক্লাব ট্রাম্পসের প্রথম অভিজ্ঞতা আজও আমার কাছে অন্যরকম।

দুঃখ একটাই আজ আর ক্লাব ট্রাম্পস নেই।

 

সাইবার ক্যাফে এ্যাট ডলসে ভিটা

তিনি অনেক চেষ্টা করছেন। আমি হা করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে। বোঝার চেষ্টা করছি। প্রায় আধাঘন্টা হয়ে গেছে। মাথামুন্ডু কিছুৃই বুঝছি না। গতকাল রাতে আমি এই অ্যাসাইনমেন্টটা পেয়েছি। ৫-এর পাতায় যাবে। যথারীতি আনিসুল হক নিজে দিয়েছেন অ্যাসাইনমেন্টটি। বনানী কামাল আতাতুর্কে এখন বসে আছি। সাইবার ক্যাফে এ্যাট ডলসে ভিটায়। আমার সামনে এটির কর্ণধার আক্কু চৌধুরী। আমার সঙ্গে ওমরও আছে। আমার ধারণা সেও বুঝতে পারছে না। আক্কু চৌধুরী বলছেন, ‘ঢাকায় এটাই প্রথম সাইবার ক্যাফে।’ বিদেশে নাকি অনেক আছে। কিন্তু আমি আসলে বুঝতেই পারছি না জিনিসটা কি? ধৈর্য্যরে বাধ ভেঙে আমি অবশেষে বললাম, ‘আচ্ছা আক্কু ভাই, এটা কি নতুন ধরনের রেস্টুরেন্ট।’ আক্কু চৌধুরী হতাশ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এতক্ষণ বোঝানোর পর আমি যে সব বুঝে ফেলেছি তার প্রমাণ আমার এই প্রশ্ন। উনি ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। 

অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলললেন, ‘আপনারা কফি খাবেন?’ আমি আর ওমর এক সঙ্গে মাথা নাড়লাম। গরম ধোয়া ওঠা কফি চলে এলো মগে। আমি মগে চুমুক দিতে যাব এমন সময় আক্কু চৌধুরী বললেন, ‘কি করছেন স্বরূপ?’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কেনো আক্কু ভাই, কফি খাচ্ছি।’

আক্কু ভাই বললেন, ‘এখানে কত কম্পিউটার, দেখেছেন।’

- হুম, দেখছি তো আক্কুভাই।

- সবগুলো কম্পিউটারে ইন্টারনেট আছে। আপনি ইচ্ছে করলে মেইল চেক করতে পারেন, বললেন তিনি।

অলংকরণ: আরিফ ইকবাল

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘তাই নাকি, কই দেখি তো।’ বলে উঠতে যাব তখনই তিনি বললেন, ‘এই যে কফি হাতে মেইল চেক করছেন, তাতে কি হলো সাইবার আর কফি মিলে সাইবার ক্যাফে। ঢাকায় এটাই প্রথম সাইবার ক্যাফে। বুঝলেন, নাকি তাও বুঝেননি।’ আসলেই লজ্জা পেলাম এবার। একেবারে হাতে কলমে দেখিয়ে দেওয়া যাকে বলে। ’৯৬ সালে শুরু হওয়া প্রথম সাইবার ক্যাফে এ্যাট ডলসে ভিটা নিয়ে এরপরের দিন লিখলাম ভোরের কাগজে। 

তখনো কি জানতাম কিছুদিন পরেই ঢাকা ব্যাঙের ছাতার মতো ছেঁয়ে যাবে সাইবার ক্যাফেতে।

 

চির কুমারদের পাল্লায়

অলংকরণ: আরিফ ইকবাল

সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান মুকুল ভাই ডেকেছেন। আব্দুল কাইয়ুম মানে মুকুল ভাই কেন আমাকে ডাকবেন বুঝতে পরলাম না। কিছুটা অবাক হয়েই গেলাম তার কক্ষে। কাঁচ দিয়ে ঘেরা ওই রুমে মুকুল ভাই ছাড়াও সাজ্জাদ ভাই, আনিস ভাই আর মশি ভাই বসতেন। মুকুল ভাই আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, ‘স্বরূপ ফয়েজ ভাইকে চেনো তো? ফয়েজ আহমদ। বয়স হয়ে গেছে তো। লিখতে পারেন না। উনার বাসায় যাও। উনি কি বলেন দেখো। তারপর লিখে দিবা তুমি। অনুলিখন আর কি। পারবা তো।’ আমি দেখলাম এডিটরিয়াল পেজে কাজ করার এই তো সুযোগ। বললাম, ‘অবশ্যই মুকুল ভাই। ঠিকানা দেন।’

ফয়েজ আহমদ থাকেন ইস্কাটনে । বিশিষ্ট ছড়াকার, সাংবাদিক, কলামিস্ট। থাকেন ভাইয়ের সঙ্গে। চিরকুমার। ঠিকানা নিয়ে গেলাম। ফয়েজ সাহেবের বয়স হয়ে গেছে। ব্যাচেলরের রুম যা হয় আর কি। অগোছালো। ঠিকমতো কানে শুনেন না। পরিচয় দেয়ার পর বসতে বললেন। তারপর প্রায় দীর্ঘ দুই ঘন্টা প্যাচাল শুনলাম। ধৈর্য্য নিয়ে লিখলাম। পুরাটা আবার তাকে পড়ে শোনালাম। উনার পছন্দ হলো। পরের দিন সম্পাদকীয়তে উনার কলাম ছাপা হলো। আর আমি ফেঁসে গেলাম। এই অকৃতদার বুড়োর পাল্লায় পড়ে মাসে অন্তত চারটি সন্ধ্যা আমার মাটি। নিয়মিত লেখা নিতে যেতাম তাঁর বাসায়। আর মুকুল ভাইও আমাকে দিয়েই করাতেন এই কাজ। ভালোই চলছিল। বাড়তি টাকা আসছিল পকেটে।

আবার একদিন মুকুল ভাইয়ের ডাক। বললেন, ‘ফয়েজ ভাই তো আছেই, তুমি একটু এখন থেকে মনিরুজ্জামান মিঞার বাসায়ও যাবা। ফয়েজ ভাইয়ের মতোই লেখা নিয়ে আসবা।’ মনিরুজ্জামান মিঞা মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য। ধানমন্ডিতে থাকেন। আশ্চর্যজনকভাবে উনিও চিরকুমার। গেলাম উনার বাসায়। মনিরুজ্জামান সাহেব অবশ্য ফয়েজ সাহেবের মতো অতো বুড়ো নন। তাঁর লেখা নেয়া বেশ সহজ। বাড়িতে তিনি একাই থাকেন। বিশাল বড় ফ্ল্যাট। কাজের লোক আছে একজন। তিনি নিয়মিত লেখা শুরু করলেন। আবার আমার মাসে আরো চারটি সন্ধ্যা মাটি। অবশ্য টাকার কথা চিন্তা করে তখন এই দুই চিরকুমারের সঙ্গ বেশ লাগছিলো। এরপর আবার আরেক সন্ধ্যায় মুকুল ভাই ধরলেন আমাকে। বললেন, ‘স্বরূপ আর একজনের কাছে যে যেতে হয়। বিশিষ্ট ফটোগ্রাফার নওয়াজেশ আহমেদ।’ এবার গ্রীন রোড। আর এবার আমি পুরাই টাশকি। কারণ নওয়াজেশ আহমেদও অকৃতদার। থাকেন বোনের সঙ্গে। তিনি খুবই প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর একজন মানুষ। আড্ডা দিতেন আমার সঙ্গে। অনেক বিষয়ে। তিনিও লেখা শুরু করলেন নিয়মিত।

আর আমি? এই তিন চিরকুমারের পাল্লায় পরে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, বিয়ে করবো। ভাগ্যিস উনারা এসেছিলেন আমার জীবনে।

 

অভির পিস্তল

অলংকরণ: আরিফ ইকবাল

- কমরেড কই দেখি।

ইরাজ ভাই ড্রয়ার খুলে বের করলেন। টেবিলে চকচকে কালো জিনিসটার দিকে আমি, ওমর, সুমন নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছি। কি সুন্দর! আবার কি ভয়ংকর! একটু দূরের টেবিল থেকে সম্পাদক মাহফুজউল্লাহ্ হৈহৈ করে উঠলেন। ‘ইরাজ নাড়াচাড়া কইরো না। ড্রয়ারে ঢুকাও।’ ইরাজ ভাই হাসলেন। ‘ধুর মাহফুজ ভাই, কিছু হবে না। সেফটি ক্যাচ অন অছে।’ আমি পিস্তলটা হাতে নিলাম। কি মসৃণ। ইরাজ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আচ্ছা কমরেড, এটা কি নিয়মিত পলিশ করা হয়। এত মসৃণ আর চকচকে।’ ইরাজ ভাই তার গোফের ফাঁক দিয়ে হাসলেন। বললেন, ‘অবশ্যই। যার জিনিস তিনি এটা অত্যন্ত যত্নে রাখেন।’ এটা কার জিনিস ততক্ষণে আমাদের জানা হয়ে গেছে। সাতসকালে আমরা তিনজন সাপ্তাহিক অন্বেষার অফিসে ছুটে এসেছি শুধু এই পিস্তলটা দেখবো বলে। যেনতেন পিস্তল নয় এটি, ওয়ালথার এপিপিকে। অত্যন্ত দামী ব্র্যান্ডের পিস্তল। অত্যন্ত আধুনিক। তার চাইতেও বড় কথা পিস্তলটি গোলাম ফারুক অভির। লাইসেন্স করা এই পিস্তল অভি নিজে বহন করেন। গতকাল বিকেলে অভির সহকারী গুড্ডু ইরাজ ভাইকে পিস্তলটি দিয়ে গেছে। তখন থেকেই পিস্তলটি কমরেডের জিম্মায়। আর কিছুক্ষণ পরই ফটোগ্রাফার বিপ্লব জাফর পিস্তলটির ফটোশ্যুট করবেন। আগেই জানতাম, ইরাজ ভাই অন্বেষার পরবর্তী সংখ্যার প্রচ্ছদ কাহিনী করছেন ঢাকার সন্ত্রাস নিয়ে। সেই সংখ্যায় প্রচ্ছদ ছবি যাবে অভির এই বিখ্যাত পিস্তলের। ইরাজ আহমেদ কোনো আর্টিফিশিয়াল পিস্তলের ছবি ব্যবহার করতে চাননি তার প্রচ্ছদ ছবিতে। আর তাই তার পুরনো বন্ধু একসময়ের ডাকসাইটে ছাত্রনেতা গোলাম ফারুক অভিকে ফোন করেছিলেন। আর বলেছিলেন তার পিস্তলটি পাঠানোর জন্য। প্রচ্ছদ ছবির জন্য। অভিও সানন্দে রাজি হয়ে তার সহকারীকে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আর বিখ্যাত অভির সেই পিস্তল দেখতেই আমরা তিনজন ছুটে এসেছি কমরেডের কাছে।

’৯৮র সেই সকালে আমরা অভির পিস্তলের ফটোসেশন দেখলাম। একটি পিস্তল কিভাবে একজন আবেদনময়ী মডেলের চাইতেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে তাই দেখলাম মুগ্ধতা নিয়ে। অভির পিস্তল বলেই হয়তো।

 

ঢাকায় ফোন সেক্স 

- কলি আপা একটা মারাত্মক স্টোরি আছে হাতে, করবেন?

- কি স্টোরি?

- ফোনে বলা যাবে না। আপনি অফিসে আছেন তো? আসতেছি তাইলে। 

ফোনটা রেখেই ভাবলাম অনেক দিন ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট করি না। আর যেটা করতে যাচ্ছি সেটা মোটেই কোনো দৈনিকে যাওয়ার মতো স্টোরি না। আর তাই আবিদা নাসরীন কলি আপাকে ফোন দিয়েছিলাম। কলি আপা যদি অন্বেষায় রিপোর্টটা করতে বলেন তাহলে নেমে পড়বো। মনে কিছুটা আশংকা নিয়ে দুপুরের দিকে গেলাম ধানমন্ডিতে অন্বেষার অফিসে। কলি আপা আগে থেকেই আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আমি গিয়ে বসতেই চা চলে আসলো। কলি আপা আমার দিকে প্রশ্নভরা চোখ দিয়ে তাকিয়ে আছেন। আমি কিছুটা গলা নামিয়ে বললাম, ‘কলি আপা আমার রিপোর্টটার নাম, ঢাকায় ফোনসেক্স।’ কলি আপা আমার দিকে তাকিয়ে পুরাই জমে গেলেন। ঝাড়া ত্রিশ সেকেন্ড পরে তার মুখ দিয়ে একটা শব্দ বের হল, ‘মানে?’ আমি বললাম, ‘কলি আপা আমার কাছে তথ্য আছে ঢাকায় এখনকার তরুণ-তরুণীদের অন্যতম প্রধান বিনোদন হলো ফোনসেক্স। আপনি আমাকে শুধু বলেন, আপনি স্টোরিটা ছাপবেন, আমি সব ইনফরমেশন নিয়ে বসে আছি।’ কলি আপা আবারও কিছুক্ষণ চুপ। তারপর ধীর গলায় বললেন, ‘স্বরূপ যদি তথ্য-প্রমাণ ঠিক থাকে তবে তোমার স্টোরি নিয়ে আমি কভার করবো। প্রচ্ছদে যাবে।’ আমি শুধু বলেছিলাম, ‘এটা কভার স্টোরিই হবে কলি আপা।’ 

’৯৮ সালের সেই দুপুরে আমি অন্বেষা অফিস থেকে বেরিয়ে বেল টাওয়ারের নিচে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। পকেটে কতগুলো টুকরো কাগজ। অবশ্যই ল্যান্ডফোন নম্বর। মোবাইল ফোন বলে কিছুই তখন ছিলো না। আমার সোর্স বলে দিয়েছিলো, এই ফোন নম্বরগুলোই দিবে আমাকে সমাধানের পথ। এই ফোনসেক্সের নেটওয়ার্কের জালে ঢুকতে এই নম্বরগুলো আমাকে সাহায্য করবে। আমি ঢুকলাম। জালে জড়ালাম। বেরিয়ে এলো চরম উত্তেজনাকর নানা তথ্য। এই নেটওয়ার্ক তখন ঢাকার ক্যাফেগুলোকে টার্গেট করতো। সব ক্যাফেগুলোয় চরকির মতো ঘোরা শুরু করলাম। সোবহানবাগ হটহাট ছিলো কেন্দ্রবিন্দু। টেবিলে, বাথরুমে শুধু ল্যান্ডফোন নম্বর। বেশিরভাগই ভুয়া নম্বর। কিন্তু সেগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকতো নেটওয়ার্ক। এরকম আরো কয়েকটা ক্যাফে ছিল। বিগবাইট, হার্টথ্রব, লাবাম্বা, জেমস কিচেন, আড়ং ক্যাফে সব চষে ফেললাম। আবিষ্কার করলাম ’৯০ দশকের ঢাকায় তরুণ-তরুণীদের বিনোদনের এই বিচিত্র মাধ্যম। অবদমিত কামনার বিকল্প উপায় এই ফোনযৌনতা কি নিছকই ফান নাকি ভালোবাসাও আছে। 

অনেকগুলো ইন্টারভিউ করলাম। বেশ কয়েকজন তরুণ-তরুণী অকপটে স্বীকার করলেন, জাস্ট ফান। আবার পেয়ে গেলাম নিছক ফানের জন্য ফোনসেক্স করেও সিরিয়াস সম্পর্কে জড়িয়ে গেছেন এমন কয়েকজনকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন ছাত্রও পেয়েছি যিনি ফোন বুথে গভীর রাতে কয়েন দিয়ে ফোনযৌনতা উপভোগ করেছেন। আবার এমন তরুণীদলও মিলেছে, যারা ছাত্রী হোস্টেল নিবাসী। হোস্টেলের সুপারের রুম থেকে স্লট বাই স্লট এই সুখ উপভোগ করতেন তারা। তবে সবচাইতে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেলাম অনুসন্ধানীর শেষ প্রান্তে। জানলাম, ঢাকায় ফোনসেক্সের বাণিজ্যিক হটলাইন শুরু হতে যাচ্ছে। সোর্সের কাছ থেকে নম্বর পেয়ে গেলাম বনানী কামাল আতাতুর্কে সেই অফিসে। তথ্য ছিলো ওই অফিস থেকেই আন্তর্জাতিক পেমেন্ট হটলাইন শুরু হবে কয়েকদিনের মধ্যে। অফিসটি আদতে একটি ট্রাভেল এজেন্সি। ম্যানেজার সাহেবকে যখন প্রশ্ন করলাম, তিনি কিছুটা অবাক হলেন। তারপর শুধু জানতে চাইলেন, ‘এই তথ্যটি আমাকে কে দিয়েছে?’ আমি তথ্যদাতার নাম না বলাতে তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করলেন। এরকম কোনো ব্যবসা নাকি তাদের জানা নেই। অনেকটা নিরাশ হয়েই ফিরতে হয়েছিলো। কিন্তু আমার সোর্স মিথ্যা তথ্য দেয়নি। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম এই আন্তর্জাতিক হটলাইন ব্যবসার লাইসেন্সই নাকি সরকার অনুমোদন করেনি। যদিও তারা যন্ত্রপাতি এনে পুরোপুরিই প্রস্তুত ছিলো।

দীর্ঘ ১৫ দিনের অনুসন্ধানীতে আমার তথ্য যা বেরিয়ে এলো তা ছিলো একেবারে নির্ভুল। রিপোর্ট লিখলাম সূত্রসহ। জমা দিলাম কলি আপার কাছে। কলি আপা পুরো রিপোর্ট পড়ে বললেন, ‘মারাত্মক স্টোরি স্বরূপ।’ আর কি! ছাপা হলো কভার স্টোরি অন্বেষায়, ‘ঢাকায় ফোনসেক্স।’ বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গেই সব সংখ্যা মুহূর্তেই শেষ। আমার কাছে ফোনের পর ফোন। কলি আপারও একই অবস্থা। হট কেকের মত বিক্রি হল ঢাকায় ফোনসেক্স। 

আজ এত বছর পর ভাবি, এখনকার ভিডিও কলের যুগে ফোনসেক্সের বিনোদন কতটা হাস্যকর ছিল।

 

আইয়ূব বাচ্চু অ্যান্ড এলআরবি

অলংকরণ: আরিফ ইকবাল

স্কুল জীবন থেকে যে ব্যান্ডের গান শুনে এত বছর পার করে আসলাম, যে মানুষটার গান জীবনের বাঁকে বাঁকে ছুঁয়ে গেল, সেই মানুষটা চলে গেলেন ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর।  সেদিন মনে পড়ছিল বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার দিন। আর সেই সুযোগটাও এসেছিল ভোরের কাগজে কাজের সুবাদে।

সুমন পাটওয়ারী আইয়ূব বাচ্চুর সাক্ষাৎকার নেবে। সেই সময় তো আর মোবাইল ফোনের প্রচলন শুরু হয়নি। তাই হুট করে ফোন দিয়ে কথা বলার বিষয়টাও ছিল না। আবার সবার বাসাতেও ল্যান্ড ফোন ছিল না। কারণ এই ল্যান্ড ফোনের সংযোগ পেতে নানান কাহিনি করতে হতো। উৎকোচ ছাড়া অসম্ভব ছিল ল্যান্ড ফোনের মালিক হওয়া।

সুমন পাটোয়ারীর বাসাতেও ল্যান্ড ফোন নেই, আমার বাসাতেও নেই। 

আইয়ূব বাচ্চুকে ধরতে হলে তার বাসায় সকাল ১০টার আগে ফোন দিতে হবে। না হলে ফোনে লেগে যাবে অ্যান্সারিং মেশিন। তাই বাচ্চু ভাইকে ধরতে সকাল ৯টার সময় সুমন চলে গেল এক ল্যান্ডফোনধারী বন্ধুর বাসায়। সাত সকালে ফোন দিয়ে পাওয়াও গেল তাকে। সময় নির্ধারীত হল ওই দিনই বেলা ১১টায়। স্থান হাতিরপুলের সাউন্ড গার্ডেন।

চোখের সামনে আইয়ূব বাচ্চুকে দেখে আমি মোটামুটি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। স্টুডিও’র ওয়েটিং রুমে বসে চলছে কথোপকথন। প্রশ্ন সাক্ষাৎকার যা করার সুমন করে চলেছে। সে কথা বলার সময় একটু তোতলায়, আমি খালি শুনতেছি ‘তো তো ... বাচ্চু ভাই... আ আ আপনারা যখন ওই কাজটা করলেন...’ আমার কথাবার্তায় মন নেই। আমি মন ভরে শুধু দেখছি বাচ্চু ভাইকে।

মানুষটার মধ্যে ‘অহমিকা’, ‘পার্টমারা’, ‘অহংবোধ’ কিচ্ছু নেই। কোনো ফর্মালিটিজ নাই। কথা বলতে বলতেই আপন হয়ে গেলাম। তখন এলআরবি’র ‘স্বপ্ন’ অ্যালবামের কাজ চলছে। এক ফাঁকে বাচ্চু ভাই আমাদের স্টুডিওর ভেতর নিয়ে গেলেন। অ্যালবামের গানগুলো একটু একটু করে শোনালেন।

জীবনের প্রথম কোনো সাউন্ড রেকর্ডিং স্টুডিওতে ঢুকলাম। তাও আবার এলআরবি’র কাজ চলাকালে। তাদেরই অপ্রকাশিত গান শুনলাম। সেদিন কিবোর্ডিস্ট টুটুল এবং ড্রামার রিয়াদও ছিলেন। মনে বার বার একটাই কথা বেজে চলেছে, বাংলাদেশের তরুণ সমাজ যে অ্যালবামের অপেক্ষায় আছে, সেই অ্যালবামের গান আমরা শুনে এসেছি সবার আগে।

কীভাবে কীভাবে জানি আইয়ূব বাচ্চু এবং এলআরবি’র সঙ্গে আমরা ঘনিষ্ট হয়ে গেলাম। সুমন তো এখনও বলে, ‘সেই সময় বাচ্চু ভাই আমাদের পাত্তা না দিলে, আমি আজকের সুমন পাটওয়ারী হতেই পারতাম না।’

বাচ্চু ভাই আমাদের পছন্দ করলেন বললে ভুল হবে, তিনি আমাদের উপর ভরসা করাও শুরু করলেন। ‘স্বপ্ন’ অ্যালবামের প্রকাশনা উৎসব, ক্যাসেট বিভিন্ন পত্রিকার অফিসে বিলানো থেকে শুরু করে অনেক কাজই আমি আর সুমন মিলে করলাম।

প্রথমে ক্যাসেট-ই প্রকাশিত হয়েছিল। পরে বের হয় সিডি।

তখনও মগবাজারে নিজস্ব স্টুডিও ‘এবি কিচেন’ গড়েননি আইয়ূব বাচ্চু; শুধু ব্যান্ডের প্র্যাকটিস হত সেখানে। গান রেকর্ডের জন্য সাউন্ড গার্ডেন। যাতায়াত বাড়লো সেখানে। ফলে অনেক ব্যান্ড তারকাদের সঙ্গেই আমাদের যোগাযোগ বাড়তে থাকলো। বিশেষ করে সুমনের।

একদিন দুপুরে এলআরবি’র প্র্যাকটিস প্যাডে গিয়ে দেখি, কিসের প্র্যাকটিস কিসের কি, ব্যান্ডের সব সদস্য আরাম করে শুয়ে আছে। এসির হালকা ঠা-া বাতাস আর কার্পেটের মোলায়েম পরশে সবারই ঘুমঘুম ভাব। ব্যাপার কী?

তখনও কি বোর্ডিস্ট ছিলেন এসআই টুটুল। বললেন, ‘বিরিয়ানি খেয়ে এমন আলসেমি ধরেছেরে।’ আমার পেটে তখন ছুঁচোর নাচন। সুমনেরও তাই।

বাচ্চু ভাই হাত নেড়ে ডেকে বললেন, “আয় আয় তোরাও শুয়ে থাক।” আমার মুখ থেকে তখন ফসকে বেরিয়ে আসে ‘আমরা তো বিরিয়ানি খাইলাম না, ঘুম ঘুম ভাবও আসে নাই।’

বলতে খালি বাকি, বাচ্চু ভাই কেয়ার টেকার কুদ্দুসকে দিয়ে আরও দু প্যাকেট বিরিয়ানি আনিয়ে আমাদের পেটপূজার সুযোগ করে দিল। তবে সেদিন ঘুম আর হয়নি। তুমুল আড্ডা দিয়ে ফিরে এসেছিলাম। 

সাউন্ড গার্ডেনের সেই দিনগুলোতেই চোখের সামনে দেখলাম, আইয়ূব বাচ্চু কীভাবে জেমসকে টেনে তুললেন। এখন হয়ত অনেকেই ব্যাপারটা বিশ্বাস করবেন না।

আইয়ূব বাচ্চুর তুমুল জনপ্রিতার সময়, ক্যাসেটের এক পিঠে আইয়ূব বাচ্চু আরেক পিঠে জেমসের গান নিয়ে অ্যালবাম প্রকাশিত হল। পাশাপাশি একসঙ্গে বসে আড্ডা, খাওয়া কত্ত কিছু।

সেই সময় কী কারণে যেন কনসার্টের আয়োজন করা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে এমনি কথায় কথায় বললেন, ‘কনসার্ট করতে না দিলে আত্মহত্যা করবো।’

সেই কথা ধরে সুমন দিলো নিউজ করে। পরে বাচ্চু ভাই বলেছিল, “নিউজ তো করে দিলি, এখন যদি কনসার্ট না হয়!’

তবে কনসার্ট শেষ পর্যন্ত হয়েছিল। আমরা সব্বাই কনসার্ট দেখবো। বাচ্চু ভাই টিকিট দেবেন বলে সন্ধ্যার পরে সাউন্ড গার্ডেন  যেতে বললেন। বাসা থেকে কাছে বলে আমিই গেলাম। পৌঁছে দেখি বাচ্চু আর জেমস সাউন্ড গার্ডেনের ম্যানেজার পরিমল দা’র ঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছেন।

বসে থাকতে থাকতে এক সময় আয়োজকরা এসে টিকিট দিয়ে গেল। এবার হল বিপত্তি।

বাচ্চু ভাই সুমন উচ্চারণ করতেন অনেকটা সুপ উচ্চারণ করতে গিয়ে যেভাবে বলি আমরা সেভাবে,  ‘হেই স্যুউম্যান’। আমাকে নাম ধরে ডাকার প্রয়োজন পড়েনি খুব একটা, কথাবার্তার সময় ‘তুই কেমন আছিস’- এভাবেই চলে আসছিল।

তবে এবার তো আমাকে ডাকতে হবে, টিকিট দিতে। আমি রিসিপশনে বসে শুনতে থাকলাম বাচ্চু আর জেমস দুজনেই আমার নাম নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন। জেমস তো বলেই বসল ‘কী জানি নাম বাড়া, মনে তো পড়ছে না।’

বাচ্চু ভাই ডেকে উঠলেন, ‘ওই হুমায়ূন’। আমি মনে মনে হেসে দিলাম, কাছে গিয়ে বললাম ‘বস আমার নাম তো ওমর।’

বাচ্চু ভাই হেসে বললেন, ‘য়্যাহ ওমর, তুই কোমর সোজা করি কথা বল।’ কথায় কথায় কৌতুক করা বাচ্চু ভাইয়ের স্বভাব ছিল। ‘তো কয়টা টিকিট লাগবে তোর?’

আমি তখন মনে মনে হিসাবে ব্যস্ত, ভোরের কাগজে নওরোজ টওরোজরা আর ওদিকে পিংকু, ছুট্টি, সুমন-টুমন মিলায় .. হুহ ‘বাচ্চু ভাই বিশটার মতো’। শুনে তো তিনি থ, ‘কি বলিস বিশটা? দিছেই তো ত্রিশটা টিকিট। এক কাজ কর বারোটা নিয়ে যা। আর বাকিদের ঢুকাতে চাইলে ফোন দিস।’

সেই কনসার্ট ছাড়াও আইয়ূব বাচ্চু অ্যান্ড এলআরবি’র বহু কনসার্ট দেখেছি, কোনো সময় তুষার ভাইয়ের কল্যাণে ক্লোজআপ আনপ্লাগড বা জুকবক্স কনসার্টে কখনও বাচ্চুভাইয়ের সঙ্গে সহযাত্রী হয়ে।

 

গাড়ি চলে না

অলংকরণ: আরিফ ইকবাল

এসএসসি পরীক্ষার পর গিটার শেখা শুরু করেছিলাম, শখেই। নেশা থেকে পেশাদার বাজিয়ে হওয়া হয়ে ওঠেনি আর। তবে যেখানে  সেখানে গিটার পেলে টুংটাং করার অভ্যাসটা হয়েছিল।

তারিখটা মনে নেই। তবে সেদিন কোনো কাজ না থাকায় বসে বসে পত্রিকা পড়ছিলাম ভোরের কাগজের সেই ডাইনিং টেবিলটার সামনে বসে। একসময় নজর গেল একটা গিটার রওশন ভাইয়ের টেবিলের সামনে হেলান দিয়ে রাখা। কার না কার গিটার? তবে লোভটা সামলাতে পালাম না। উঠে গিয়ে গিটারটা নিয়ে পাশের একটা চেয়ারে বসে পড়লাম।

ধরেই বুঝলাম টিউন করা নেই। তারগুলো ঢিল ঢিল করছে। শখ যখন চেপেছে, কি আর করা, গিটারটা টিউন করে বাজালাম কিছুক্ষণ। তারপর মনে হল, যার গিটার সে দেখলে মাইন্ড করতে পারে, তাই তাড়াতাড়ি গিটারটা একইভাবে রেখে ফিরে এলাম ডাইনিং টেবিলে। তবে গিটারের টিউনটা ছেড়ে দিয়ে আসতে ভুলে গেলাম।

কিছুক্ষণ পরে দেখি হ্যাংলা মতো একটা অল্প বয়স্ক ছেলে এসে গিটারটা তুলে হাঁটা দিতে যাবে, এমন সময় কিছুক্ষণ অবাক হয়ে গিটারটা দেখলো, তারপর আশপাশে তাকালো। মনে মনে হাসলাম আমি। বুঝলাম ওই ছেলেটারই গিটার আর টিউন করা অবস্থায় পেয়ে সে একটু অবাকই হয়েছে। কারণ সে তো আর টিউন করা অবস্থায় রেখে যায়নি।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দেখি সঞ্জীব দা এসে তাকে নিয়ে বের হয়ে গেল অফিস থেকে।

বেশ কটাদিন পর, ইত্যাদি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে দলছুটের ‘গাড়ি চলেনা’ গানটা প্রচারিত হল। সঞ্জীব দা’র ব্যান্ড; সেই গান মিস দেওয়ার তো কোনো মানেই হয় না। গানটা দেখতে গিয়ে তো,‘টিনের চালে কাক আমি তো অবাক’ অবস্থা! ওই সেই হ্যাংলা ছেলেটা, যার গিটারটা নিয়ে টুংটাং করেছিলাম; সেও তাইলে দাদার ব্যান্ডের সদস্য।

তারপর বহুদিন কেটে গেছে, একদিন আবিষ্কার করলাম ওই হ্যাংলা ছেলেটা ছিল বাপ্পা মজুমদার। আজ তার অনেক নামডাক। অথচ সেদিন আমি তারে পাত্তাই দেই নাই। 

 

টাইটানিক

বিশ্বসাগর পারি দিয়ে হলিউডের সারা জাগানো চলচ্চিত্র টাইটানিক ঢাকার মধুমিতা হলে ভিড়েছে। ডলবি ডিজিটাল সারাউন্ড সাউন্ড সিস্টেম এবং সিলভার স্ক্রিনের যাদু একমাত্র এই হলে গেলেই পাওয়া যাবে। তাই ১৯৯৭ সালে ভোরের কাগজের দিনগুলোতে টাইটানিক দেখতে একদিন আমরা রওনা দিলাম মতিঝিলে মধুমিতা হলে।

সঞ্জীবদার সঙ্গে আমরা প্রদায়ক বাহিনী। মানে আমি, সুমন, স্বরূপ, নবনীতা চৌধুরী, সুমনের বোন রত্না আপা, শামীম শাহেদ আর টুশি।

সিনেমা চলছে, রোজ-জ্যাকের প্রেম কাহিনি আর জেমস ক্যামেরনের মুভি ম্যাজিক দেখে আমরা মুগ্ধ হচ্ছি। কিন্তু সঞ্জীব দা’র এসবে কোনো খেয়াল নেই। একটা করে সিন যায়, আর তিনি মজার সব মন্তব্য করতে থাকেন। সিনেমা দেখবো নাকি হাসতে হাসতে  পেটের ব্যথা ভুলবো- এই হল অবস্থা।

রোজ যখন জ্যাক জ্যাক করে চিৎকার করে, দাদাও চিকন কণ্ঠে জ্যাক জ্যাক বলে ডেকে ওঠেন। রোজকে ডাকা শুরু করলেন, ‘ও আমার গুলাপ ফুল’ বলে।

কেট উন্সলেটের নগ্ন বক্ষা দৃশ্য যখন আসলো তখন দেখি এদেশের সেন্সর বোর্ড পুরো দৃশ্যটা না ফেলে শুধু কেটের বক্ষের উপর কালি লেপে দিয়েছে। দাগটা আবার নড়াচড়া করছে দ্রুত। শুধু উন্মুক্ত বক্ষের কিয়দাংশ দেখা যাচ্ছে।

এই দেখে সঞ্জীব দা বলে উঠলেন, “বক্ষবন্ধনীও ঠিক মতো পরাতে পারলি না।” শুনে তো আমি খ্যা খ্যা করে হাসতেছি।

শেষ দৃশ্য চলে এসেছে, জ্যাক মারা যাচ্ছে, রোজ জ্যাকের হাত ধরে রেখেছে। প্রেমিক প্রেমিকার বিচ্ছেদ হচ্ছে মৃত্যু দিয়ে। আমাদের মনেও আবেগ জেগে উঠেছে। এরমধ্যে খেয়াল হল, সঞ্জীব দা অনেক্ষণ ধরে চুপচাপ। তার বিতলা মার্কা কথাগুলো শুনছি না। তার দিকে তাকিয়ে দেখি, ওমা সঞ্জীব দা’র দুচোখ বেয়ে পানি গড়াচ্ছে। শিশুর মতো কাঁদছেন তিনি।

হায়রে টাইটানিক ডুবলো আটলান্টিকে আর নোনা সাগরের ফোঁটা গড়ায় সঞ্জীব দা’র গালে।  

 

এরশাদ বিদিশা

ধানম-িতে বিদিশার একটা পোশাকের দোকান ছিল ‘বুটিক ইসাবেল’। বিদিশা মানে হু.মু. এরশাদ খ্যাত বিদিশা আরকি। তখন তিনি এরশাদের জন্য নয়, স্বনামেই খ্যাত। তার ফ্যাশন হাউজটার জন্য।  সে কারণে ফ্যাশন ভিত্তিক খবর করতে গিয়ে বিদিশার সঙ্গে আমাদেরও ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

পল্লব ভাইয়ের কল্যাণে ২০০১ সালের দিকে বাংলাদেশ ইনফো ডটকম নামের একটা প্রতিষ্ঠানে পার্ট টাইম চাকরি হলো আমার আর সুমনের। বনানীর কাকলিতে অফিস।

বাংলাদেশ ইনফো ডটকম মনে হয় এদেশের প্রথম অনলাইন ভিত্তিক নিউজ পোর্টাল ছিলো। তবে তাদের কোনো রিপোর্টার ছিলো না। বিভিন্ন পত্রিকার খবর থেকে নির্বাচিত খবর সংগ্রহ করে আপ করতো। আর আমি ও সুমন দুটো বিভাগ দেখভাল করতাম, যেখানে সংগীত, ফ্যাশন, লাইফস্টাইল বিষয়ক প্রতিবেদন যেতো।

যা হোক, এই চাকরির সুবাদে অনলাইনে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়ে গেলো। আমরা সকালে সেখানে যাই বিকালে চলে আসি প্রথম আলো’তে। প্রতিদিন প্রথম আলো’তে না গেলে আমাদের যেন পেটের ভাত হজম হতো না। আবার কোনো দিন চলে যেতাম কোনো বন্ধুর বাসায় আড্ডা দিতে।

এভাবেই চলছিল। স্বরূপ তখন লেখালিখি ছেড়ে ব্যাংকে চাকরি করা শুরু করেছে। তাই সুমনের সঙ্গেই যোগাযোগটা বেশি ছিলো। পাশাপাশি নওরোজ ইমতিয়াজ, শিমু নাসের, মুসা ইব্রাহিম, কাজী ফাহিম আহমেদ, পান্থ রহমান, মঈনুল হক রোজ, সৌরভ সাখাওয়াত আর পল্লব ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা জমতো।

একদিন সুমন বললো, “আজকে বিদিশা আপার বাসায় দাওয়াত। যাবি নাকি?”

সেদিন আবার স্বরূপের বাসাতেও আমাদের সবার আড্ডা দেওয়ার কথা। সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না- যাব কি যাব না বিদিশার বাসায়।

তবে বিকালের দিকে বিদিশার আরও দুই সাংবাদিক বন্ধু আমাদের মোটামুটি জোর করেই নিয়ে গেলো সেই অনুষ্ঠানে।

বারিধারার ওই বাড়িতে ঢোকার সময় খেয়াল করলাম নাম ফলকে বাড়ির নাম লেখা আছে ‘প্রেসিডেন্ট পার্ক’। তখনও বুঝিনি কিসের মধ্যে পড়তে যাচ্ছি।

ফ্ল্যাটে ঢোকার পর ওই দুই বন্ধু আমাদের সঙ্গে বিদিশার সাক্ষাৎ করিয়ে দিলো। খেয়াল করলাম সাংবাদিকের চাইতে আত্মিয় স্বজনের সমাগম বেশি। তাদের মধ্যে একজনকে ড্রইং রুমে বসে থাকতে দেখে তো আমার আর সুমনের চোখ ছানাবড়া।

কি কা- বসে আছেন স্বয়ং এরশাদ! ভাবলাম বিদিশার হয়ত কোনো ভাবে পরিচিত।

একটু পর ড্রইং রুমে সবাইকে ডাকা হলো। বিদিশার ছেলের জন্মদিনের কেক কাটা হবে। তখন ভাবছি বিদিশার ছেলে আসলো কোত্থেকে। এরই মধ্যে দেখি বিদিশার কোল থেকে ছেলেকে কোলে তুলে নিচ্ছেন এরশাদ।

তারপর বললেন, “আজ আমাদের ছেলের জন্মদিন। আমাদের সংসারের জন্য দোয়া করবেন।”

কি সাংঘাতিক, আমি আর সুমন তখন বুঝতে পারলাম এটা তো শুধু জন্মদিনের অনুষ্ঠান না। এরশাদ বিদিশারে বিয়ে করেছেন, সেটা জানাল তারা। আর যে ফ্ল্যাটে দাঁড়ায় আছি সেটা আসলে এরশাদের ফ্ল্যাট।

ওদিকে এরশাদ ছেলেকে কোলে নিয়ে বিদিশাসহ কেক কাটছেন। আমি আর সুমন মুখ চাওয়া চাওয়ি করি! এ কই আইসা পড়লাম আমরা!

সেখান থেকে তখন ভাগতে পারলে বাঁচি। কারণ মাথায় ঘুরছে স্বরূপের বাসায় গিয়ে আড্ডা মারার চিন্তা। কোনো রকমে চারটা কাচ্চি বিরিয়ানি মুখে দিয়ে আমরা বের হয়ে আসলাম।

সেই দুই বন্ধু তাদের গাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সময় বললো, “প্রথম আলো তো মনে হয় এরকম নিউজ করে না, তাই না।”

আমরাও মাথা নাড়লাম, “মনে হয় না।”

পরদিন সকালে বনানীর অফিসে যাওয়ার সময় পত্রিকার স্ট্যান্ডে দেখলাম সবগুলো পত্রিকার প্রথম পাতায় বিদিশা-এরশাদের বিয়ের খবর। প্রথম আলোতেও আছে খবরটা। তবে আমরা চর্ম চক্ষে যা দেখেছিলাম সেভাবে আসেনি।

তখন টনক নড়লো, ইশ এই অনুষ্ঠানে আমরাও তো ছিলাম। নিউজটা করতে পারলে নিজেদের নামে প্রথম আলোর প্রথম পাতায় নিউজ হতো। সেদিন আসলে বুঝেছিলাম ফিচারে কাজ করে, দৈনিক খবরের গুরুত্ব বোঝার ক্ষমতা আমাদের সেভাবে গড়ে ওঠেনি। উঠলে, স্বরূপের বাসায় না গিয়ে আগে সোজা প্রথম আলো যেতাম।

সেদিন বিকালে প্রথম আলো অফিসে গিয়ে কাহিনি বলতেই মোটামুটি হুলহুস্থুল পড়লো। স্বশরীরে উপস্থিত থেকেও কেনো নিউজ করলাম না। যা হোক... সেই বিয়ের ঘোষণা অনুষ্ঠানের একটা রম্য লেখা লিখে শেষ পর্যন্ত নিজেদের ইজ্জ্বত বাঁচিয়েছিলাম।

 

বন্ধ দরজা

অনেকক্ষণ ধরে বেল বাজাচ্ছি কিন্তু দরজা খুলাবার নাম নেই। অথচ বাসার ভেতরে লোকজনের হাঁটাহাঁটি ঠিকই টের পাচ্ছি। মেজাজটা কেমন লাগে। অথচ এমন কথা ছিলো না। তিনি রাজী হয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু এখন আবার কেন বেঁকে বসেছেন, মাবুদই জানেন। আমাদের দুজনেরই বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে গেছে। দু’জন মানে আমি আর বিখ্যাত ফটোগ্রাফার নাসির আলী মামুন।

প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা বের হবে। সেখানে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী ফিরোজা বেগমের একটি সাক্ষাৎকার যাবে। আমাকে যখন বলা হলো আমাকে তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে হবে, আমি বেশ দাঁত কেলিয়ে রাজী হলাম। কারণ তখন অবধি আমি জানতাম না, কী বিষ আমি হাসিমুখে পান করছি।

আমার ধারণা ছিলো, বিনয়ের সঙ্গে তাঁকে একটা ফোন করবো। আর তিনি প্রথম আলোর নাম শুনে রাজী হয়ে যাবেন। এরপর ইন্টারভিউটি নিয়ে হেলতে দুলতে বাড়ি যাবো। সব মিলিয়ে ঘন্টা দুয়েকের কাজ। কিন্তু মানুষ ভাবে এক হয় আরেক। আমার ক্ষেত্রে হলো ভেবেছি এক হলো কয়েকশ গুণ বেশি।

ধীরে ধীরে ফিরোজা বেগমের সাক্ষাৎকার নেয়া নিয়ে যেসব ভয়াবহ কথা জানতে পেলাম তাতে আমার শুধু রাতের ঘুম না দিনের ঘুমও হারাম হয়ে গেলো। সবশেষে বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেলাম, তিনি গত ২০ বছর ধরে কোন পত্রিকাতেই কোন ইন্টারভিউ দেননি।

খবরটা শোনেই গলা শুকিয়ে গেলো। হাতি ঘোড়া গেলো তল, সুমন বলে কতো জল। কিন্তু জনাব আমি কম না, আমি ফাল হয়ে ঢুকে সুই হয়ে বেরুতে জানি। চেপে ধরলাম ফিরোজা বেগমের ছেলে বাংলাদেশের ব্যান্ডে সঙ্গীতের আরেক দিকপাল মাইলসের শাফিন ভাইকে। আমার মতো মোটা মানুষের চাপ শাফিন ভাই সহ্য করতে পারলেন না। তার মাকে তিনি রাজী করিয়ে ফেললেন।

এক শুক্রবার সকালে বললেন ইন্ধিরা রোডের কালিন্দী অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে তার বাসায় যেতে। ফিরোজা বেগমও ওই একই কমপ্লেক্সেই থাকেন তবে ভিন্ন ফ্ল্যাটে। গেলাম আমি আর ছবিয়াল নাসির আলী মামুন ভাই। শাফিন ভাই আমাদের তার মায়ের ফ্ল্যাটে যেতে বললেন, তার কথামতো গিয়ে প্রথমে বেল বাজালাম। উঁহু সাড়া নেই। এরপর দরজায় মৃদু নক। তাও নট দরজা খোলাখুলি। বাকি রইলো দরজা ভাঙা। সঙ্গে যন্ত্রপাতি নেই, তা না হলে তাও একটা ট্রাই দিতাম।

মামুন ভাই বিরস বদনে বললেন, সুমন গতিক তো সুবিধার না। কি করা যায়? আমি মামুন ভাইকে অভয় দিয়ে বললাম, দাঁড়ান জীবনের শেষ চেষ্টা। আমি আবার গেলাম শাফিন ভাইয়ের বাসায়। এবার দ্বিগুন চাপ দিলাম। কাজ হলো এবার। শাফিন ভাইও ফোন তুলে তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানালেন, রাস্তা পরিষ্কার। এবার যাও।

সত্যিই এবার দরজা খুললো। আমাদের বসতেও দিলো। এরপর এলেন তিনি। সৌম্য চেহারার ভীষণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন অভিজাত নারী। তাকে প্রথম দেখলে যে কথাগুলো মনে আসে তাইই লিখলাম আমি। শুরু হলো সাক্ষাৎকার প্রথমে খুব ভাব গম্ভীর এরপর আস্তে আস্তে সহজ হতে লাগলেন। বাড়তে লাগলো সময়।

দশ মিনিটের জন্যে সময় চেয়ে পেলাম তিন ঘন্টা। নাসির ভাই তুললেন, তার মনের মতো দারুণ কিছু ছবি। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ দিনটি আমার সাংবাদিকতা জীবনের একটি স্মরণীয় দিন।

উমম্, একটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন লেখাটা শুরু করেছিলাম বাচ্চু ভাইকে দিয়ে, তিনি এখন আর আমাদের মাঝে নেই। এরপর লিখলাম টুশিকে সঙ্গে নিয়ে সেই টুশিও নেই। এখন লিখলাম ফিরোজা বেগমকে নিয়ে, গুণী এই শিল্পীও আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সবগুলো লেখার শেষই মন খারাপ করা।

তাই ঠিক করেছি মৃত কথাদের তোলা থাক এবার জীবিতদের নিয়ে লিখি। যদিও এক সেকেন্ডের নাই ভরসা, বই বেরুতে বেরুতে কী হয় তা  স্রষ্টাই ভালো জানেন।

অলংকরণ: আরিফ ইকবাল

 

[তিন বন্ধুর এমন অতীত খুঁড়ে আনা আরও অর্ধশতাধিক গল্প পড়তে সংগ্রহ করতে পারেন বর্ষাদুপুর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত 'বাদামের খোসা'। ঘরে বসে পেতে অর্ডার করুন অনলাইনে।]   

২০০২ পঠিত ... ২১:০২, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top