সুপারম্যান ঠিক করলো, একদিন সে গৃহিণীর সব কাজ করবে, তারপর?

১১৩৫৩ পঠিত ... ১৪:৩৪, মার্চ ০৮, ২০১৭


মনোয়ারা বেগম রুটি বেলছিলেন। স্বামীর অফিস দশটায়, এখনই উঠে পড়বেন ঘুম থেকে। তার আগেই নাস্তা রেডি করতে হবে, কাপড়-চোপড় ইস্ত্রি করতে হবে, পল্টুকে ওঠাতে হবে, পল্টুকে ব্রাশ করানো, খাওয়ানো... কত কাজ...!

মনোয়ারা একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বেলনের গতি বাড়ালেন। ঠিক সেসময় রান্নাঘরের সামনের জানালার ওপর কী যেন এসে ধাক্কা খেল। চিল টিল নাকি?

অলংকরণ: ইশমাম
মনোয়ারা আঁতকে উঠলেন। চিল ঈগল কোথায়, জলজ্যান্ত মানুষ! রান্নাঘরের জানালার গ্রিলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে, বোঝা যাচ্ছে। সে দ্রুত টাল সামলে উঠলো। আরে অদ্ভুত তো, এই ব্যাটা কি পাইপ ধরে উঠে এসেছে? নাকি উড়ে এসেছে? এগুলো কী ধরণের বেয়াদবি? পোষাকও কেমন উদ্ভট! নীল রঙের স্কিন টাইট জামা, বুকের কাছে বড় করে লেখা ‘এস’! এস আবার কী? প্রেমিকার নামের আদ্যক্ষর?

গলায় ওড়নার মত লাল কাপড় বাঁধা, তাও সেটা পেছন দিকে ঝুলছে। আর ইয়ে, বাকি সবকিছু নাহয় মেনে নেয়া গেল, তাই বলে আন্ডারওয়্যার...

উদ্ভট পোশাক পরা ভদ্রলোক (নাকি অভদ্রলোক!) লজ্জিত মুখে বললেন, ‘ইয়ে, আপা, মাফ করবেন! নাকে বড্ড লেগেছে... এই নতুন কস্টিউমটা ভালো হয় নাই। দর্জি মাপে ভুল করছে। লাল কাপড়টা পুরা বেসাইজ বানাইছে... হুটহাট তারের সঙ্গে বেঁধে হুমড়ি খেয়ে পড়ি... এই যে, এইমাত্রও... এই এলাকায় ভালো কোনো দর্জি আছে?’

মনোয়ারা বিরক্ত গলায় বললেন, ‘আপনি জানালায় কী করছেন! অদ্ভুত বেয়াদব তো... তার মধ্যে আবার খাজুরে আলাপ লাগিয়েছে... সরেন, সরেন আপনি জানালা থেকে... পল্টুর আব্বা...’

‘আপা, ভুল বুঝবেন না। আপনি আমাকে চিনতে পারেন নাই, বুঝছি। সুপারম্যান ইদানিং আসলে কেউ দেখে না, সবাই ব্যাটম্যান আয়রনম্যানের দিকে ঝুঁকছে... আমি সুপারম্যান। এই যে, এই যে দেখেন ‘S’। সুপারম্যানের এস।

মনোয়ারা সুপারম্যানের কথায় বিশেষ পাত্তা দিলেন না। আপাতত তিনি এই নষ্ট হওয়া পাঁচ মিনিট নিয়ে বেশি চিন্তিত।

‘আচ্ছা, বুঝলাম। আপনি সুপারম্যান, মানে গল্প মুভি কার্টুনের আসল সুপারম্যানই। যাই হোক... কী চান? আমার তাড়া আছে, প্লিজ, দ্রুত বিদায় হোন!’
‘আপা, আমি আসলে নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানাইতে আসলাম।’
‘কী?’
‘নারী দিবসের শুভেচ্ছা, আপা। আমি আজকে ভেবে দেখলাম, এই যে আমি সুপারম্যান, উইম্যানদের প্রতি তো আমার একটা দায়িত্ব আছে। তাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে উইম্যানদের নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানায়ে আসি!’

‘অ।’ মনোয়ারা নারী দিবসের শুভেচ্ছা প্রাপ্তি বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ বোধ করলেন না।

সুপারম্যান রান্নাঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখলো। রান্নাঘর মনে হয় সে জীবনে খুব বেশি দেখে নি। রান্নাঘরে ম্যানরাই উঁকি দেয় না, সে তো সুপারম্যান! তাকে নিশ্চয়ই দেশ জাতি উদ্ধার করে বেড়াতে হয়। রান্নাঘরে ঢোকা তো দেশ জাতি উদ্ধারের মধ্যে পড়ে না।

মনোয়ারা এবার বিরক্তই হলেন, ‘আপনার শুভেচ্ছা জানানো শেষ হয়েছে?’
‘হ্যাঁ? ও, হ্যাঁ আপা, শেষ। আপনাকে ব্যস্ত মনে হচ্ছে খুব। কী এমন কাজ, বলেন তো। আমি তো উঁকিঝুঁকি মেরে তেমন কাজের কিছু পাইলাম না। আপনি এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন?’

‘আপনি তো সুপারম্যান, আপনার কাছে খুব কঠিন কিছু হওয়ার কথা না নিশ্চয়ই। যদি এতই সহজ মনে হয়, আপনি দুয়েকটা কাজ করে দিয়ে যান। নাইলে ফোটেন, প্লিজ। শুভেচ্ছা টুভেচ্ছায় কিছু হয় না ভাই। পারলে কাজে হেল্প করেন, না হলে সময় নষ্ট করবেন না।

সুপারম্যানের সম্ভবত এই কথা বেশ প্রেস্টিজে লেগে গেল! সুপারম্যানের জন্য এইগুলা কোনো কাজ? রুটি বানানো, থালাবাসন ধোয়া... হাবিজাবি আরও কী সব, ধুর! কোনো ব্যাপার হইল! সুপারম্যান বাস ট্রেন থামায় দেয়... কী কয় এই মহিলা?

‘দুই একটা না আপা। আমি আজকে আপনার সব কাজ করে দিতেছি। এইটাই আমার নারী দিবসের কর্মসূচি হোক, মন্দ কী! দাঁড়ান, আমি আসতেছি।’

এই বলে সুপারম্যান জানালার গ্রিল খুলতে উদ্যত হলো। মনোয়ারা চেঁচিয়ে উঠলেন, 'আরে, দাঁড়ান, কী করছেন এইসব, নামেন তো, আপনি নামেন। ভদ্রভাবে দরজা দিয়ে ঢোকেন। বিল্ডিংয়ের নিচে নেমে লিফট দিয়ে উপরে উঠে আসেন, লিফটের ৬।'


সুপারম্যান রুটি গোল করার চেষ্টা করছে। কিছুতেই গোল হচ্ছে না! গোল হওয়া পরের বিষয়, কিছুই হচ্ছে না। পুরো আটার দলা বেলনের সঙ্গে লেপটে যাচ্ছে। এই কাজ কেউ করে কীভাবে।

অলংকরণ: ইশমাম
মনোয়ারা সুপারম্যানকে রুটি বানানোর কাজ দিয়ে স্বামীকে ঘুম থেকে তুলে তার কাপড়চোপড় ইস্ত্রি করে সব কিছু রেডি করে ঠিক করে দিয়ে আসলেন। এসে দেখলেন, সুপারম্যান পনেরো মিনিট চেষ্টা করে একটা রুটি বানানো দুরের কথা, বেলতেও পারে নি। এদিকে পুরো রান্না ঘর আটা ছিটিয়ে একাকার অবস্থা, নিজেও গায়ে মেখে ভরিয়ে ফেলেছে।

মনোয়ারা রুটি বানানোর দায়িত্ব নিজেই নিলেন। পল্টুর বাবা খেতে বসবেন এখনই, তার সময় নেই, অফিসে দেরি হয়ে যাবে। মনোয়ারা পাঁচ মিনিটের মধ্যে রুটি বানিয়ে শেষ করলেন। এই সময়ের মধ্যে সুপারম্যানকে তিনি শুধু সবজির তরকারিটা খুন্তি দিয়ে নাড়তে বলেছিলেন। রুটি বানানো শেষ করে তিনি দেখলেন, সুপারম্যান তা করতে গিয়েই তার ‘লাল ওড়নার’ কোনায় আগুন ধরিয়ে ফেলেছে। এরপর ফু দিয়ে সেই আগুন নেভাতে গিয়ে চুলা সুদ্ধ নিভে গেছে। আশেপাশের কয় বাসার চুলা নিভে গেছে কে জানে!


মনোয়ারা স্বামীকে নাস্তা খাওয়ালেন। ততক্ষণে সুপারম্যানকে গতরাতের কিছু এঁটো থালাবাসন ধুয়ে দেয়ার কাজ দিয়ে গেলেন। স্বামী অফিসের জন্য বেরোনোর পর মনোয়ারা রান্নাঘরে গিয়ে দেখলেন, সুপারম্যান সাহেব তার ‘সুনিপুণ দক্ষতায়’ পুরো রান্নাঘর পানিতে ভাসিয়ে ফেলেছে। থালা ধুয়েছে মোট দেড়টা। দুটা প্লেট, একটা হাফপ্লেট!

মনোয়ারা সুপারম্যানকে নতুন কাজ দিলেন। তিনি থালাবাসন ধুয়ে ঠিকঠাক করে নেবেন, ততক্ষণে সুপারম্যান পল্টুকে ঘুম থেকে তুলে ব্রাশ করিয়ে মুখ ধুইয়ে খাবার টেবিল পর্যন্ত নিয়ে আসুক। তাতেও কাজ কম এগোবে না। বাচ্চারা তো সুপার-ব্যাট-স্পাইডার এসব ম্যানদের পছন্দই করে। তাদের পছন্দের উইম্যান অবশ্য একটাই- মা!

পল্টুকে সামলাতে গিয়ে সুপারম্যান বুঝতে পারল, কবি কেন বলে গেছেন, ‘বাচ্চা ভয়ংকর কাচ্চা ভয়ংকর!’ পল্টু একবার তার নাক ধরে টান দেয়, আরেকবার গালে ঠাস ঠাস থাপ্পড় লাথি মারে, আরেকবার কান ধরে, আরেকবার চুল ধরে টান দেয়। সুপারম্যানের দু চোখে পানি চলে এল। হায় রে, এই দিনও দেখা লাগলো! বড় বড় গুন্ডা মাস্তান সাইজ হয়ে গেল সুপারম্যানের হাতে, কিন্তু এই আড়াই বছরের দেড় ফুট বাচ্চা কিছুতেই ঠাণ্ডা হয় না! চোখ গরম করে তাকালেও বিপদ, সঙ্গে সঙ্গে ভ্যাঁ করে কেঁদে ওঠে!

অলংকরণ: ইশমাম
বাচ্চার কান্না শুনে মনোয়ারা বেগম ঘরে এসে দেখলেন, পল্টু সুপারম্যানকে ঘোড়া বানিয়ে তার পিঠের ওপর বসে আছে। পাশে পেস্টের টিউব টুথব্রাশ এসব ছড়ানো, ছিটানো। মনোয়ারা মেজাজ তুঙ্গে উঠে গেল!

‘একটা বাচ্চা সামলানো হয় না আপনাকে দিয়ে? কিসের সুপারম্যান আপনি?'
সুপারম্যান মুখ কাচুমাচু করে বললো, ‘আপা, আপনার পিচ্চি ডেঞ্জারাস!’


পুরো ঘরে পেস্ট ছড়ানো ছিটানো। মনোয়ারা সুপারম্যানকে ঘর মোছার দায়িত্ব দিয়ে পল্টুর দায়িত্ব নিজে নিয়ে নিলেন। বিশ মিনিটের মধ্যে পল্টুকে খাইয়ে দাইয়ে স্কুলের জন্য রেডি করে নিজেও রেডি হয়ে ঘরে এসে মনোয়ারা দেখলেন, সুপারম্যান ঘর মোছার বালতি নিয়ে মেঝের ওপর পড়ে আছে। ঘরের দুই স্কয়ারফিটও মোছা হয়নি!

‘আপা, সরি, একটু রেস্ট নিলাম। মাজা তো ব্যথা হইয়া গেল ঘর একটু মুইছাই... কাজটা কঠিন আছে।’
‘আপনার জন্য তো কোনো সহজ কাজই খুঁজে পেলাম না! আপনি পারেনটা কী বলেন তো?’

সুপারম্যান হতাশ গলায় বললো, ‘দেখেন আপা, আমি একজন সুপারহিরো। আমি উড়তে পারি!’
‘সেটা তেলাপোকাও পারে।’

সুপারম্যানের প্রেস্টিজ সদ্য ছ্যাকা খাওয়া প্রেমিকের মনের মত চুরমার হয়ে গেল। ‘আপা, আমার অনেক শক্তি!’
‘অনেক শক্তি গণ্ডারেরও আছে! আপনাকে তবু ধন্যবাদ। তবু হেল্প করতে চেয়েছেন, এজন্য। যে কোনো ম্যান এতটুকু হেল্প করতে চাইলেও সবকিছু একটু হলেও সহজ হত। যদিও, আমাদের হেল্পের দরকার নেই।’

সুপারম্যান ব্যাপারটা বুঝলো না বোধহয়। সে উঠে দাড়াতে দাঁড়াতে বললো, ‘আপা, কিছু বললেন?’
মনোয়ারা বেগম বললেন, ‘না, কিছু বলি নি। আমি অফিসে যাব, পল্টুকেও যাওয়ার পথে স্কুলে দিয়ে যাব। আমরা বের হই তাহলে?’

সুপারম্যান ভাবতে থাকলো, এই মহিলা প্রতিদিন সকালে এত কাজ করে, এরপর আবার অফিসেও যায়? তার নিজের কাজগুলো কখন করে? কীভাবে করে? একবার ভাবলো বলবে, আপা, লাস্ট একটা হেল্প করি, পল্টুরে আমি স্কুলে দিয়া আসি। উড়ায় নিয়ে গেলাম, জ্যাম ট্যামের কাহিনী নাই!

ভাবলেও সে কিছু বললো না। থাকুক! বেশি রিস্ক হয়ে যায়... আপার বাচ্চা বড় ডেঞ্জারাস!

১১৩৫৩ পঠিত ... ১৪:৩৪, মার্চ ০৮, ২০১৭

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top