হলুদ হিমু হলুদ রিকশা : একটি পরাবাস্তব প‍্যারডি

৮৫৩৬পঠিত ...১৯:২৩, আগস্ট ১২, ২০১৬


গ্রাফিকস : সবাক
আমি হিমু। আমি একটি রিক্সা। আমার হুডের রঙ হলুদ। হলুদ হচ্ছে বৈরাগ্যের রঙ, আগুনের রঙ।

আমি জন্ম থেকে হিমু না। অন্য আট দশটি রিক্সার মতোই ছিলো আমার জীবন। ছিলো নানা রঙের আকিবুকি দিয়ে তৈরি হুড, সিটের নিচে ছিল বাক্স। হঠাৎ একদিন আমাকে আমার বাবা ডেকে পাঠালেন। গাঢ় গলায় বললেন, 'ঢাকা শহরে এভাবে ট্যা ট্যা করে ঘুরা বাদ। আমার স্কুলে ভর্তি হ।'

আমি চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞেস করলাম, 'ঘটনা কী? তুমি স্কুল খুললে কবে?'
বাবা বললেন, 'এইটা মহারিক্সা বানানোর স্কুল। তুই একমাত্র ছাত্র। বেশি বুঝার দরকার নাই। কালকে থেকে ক্লাস শুরু।'

বাবার স্কুলে অনেকদিন ট্রেনিং চলল। ট্রেনিং শেষে আমাকে একজন সফল হিমু ঘোষণা করে গুলশান এলাকায় ছেড়ে দেয়া হলো। পেছনে লিখে দেয়া হলো 'হিমালয় পরিবহন'। সিটের নিচের বাক্সটি সরিয়ে ফেলা হলো। বাবার কঠিন আদেশ--'হিমুদের বাক্স থাকতে নেই। হিমুরা হবে বাক্সহীন।'

২.
আমার আরেকটু পরিচয় দেয়া দরকার।

আমার এক খালা আছেন। নাম মাজেদা পরিবহন, উনি একটি সিএনজি। খুবই ভয়াবহ টাইপ মহিলা সিএনজি। খালুর নাম আরেফিন। উনি আবার পাজেরো, ৯৮ মডেল ২০০৪ রেজিস্ট্রেশন। ভয়াবহ বদরাগী টাইপের গাড়ি। ইংরেজি ছাড়া কথা বলেন না। মাসের প্রথম ও শেষ মঙ্গলবার তিনি সারা বিকাল মদ খেয়ে রাতে ঘুরতে বের হোন। মাজেদা খালা ভয়ে ভয়ে থাকেন খালু এক্সিডেন্ট করে ফেলেন কিনা। বেশিরভাগ রাতে খালুকে খোঁজে বের করে করার দায়িত্ব আমাকেই নিতে হয়।

আমি গভীর রাতে খুঁজতে বের হই। খালা একটু পরপর ফোন করে বলেন, 'ঐ গাধা, তোর খালুকে পাওয়া গেলো? না পাওয়া গেলে তোর হিমুগিরি ছুটায়ে দেবো।'

তাদের ভালোবাসা দেখে আমার চোখে পানি এসে যায়। কিন্তু বাবার কঠিন আদেশ, হিমুদের কাঁদা যাবেনা। আবেগের প্রকাশ কদর্য। বাবা বলেছেন, 'প্রিয় হিমালয় পরিবহন, আবেগ টাবেটের মতো ফালতু বিষয়কে পাত্তা দিও না। মনে রাখিও, তুমি হিমু, একজন মহারিক্সা, অন্য রিক্সা হইতে তুমি আলাদা...।'


৩.
আজ মঙ্গলবার। খালু আবার মদ খেয়েছেন এবং হারিয়ে গেছেন। খালা ফোনে কঠিন আদেশ দিয়েছেন, খালুকে আমার খুঁজে বের করতেই হবে।'

এই মুহূর্তে আমি আছি বনানী এলাকায়। রূপা এই এলাকাতেই থাকে। রূপাও একটি রিক্সা। নীল হুড পরলে রূপাকে অন্য গ্রহের রিক্সা মনে হয়। আজ উথালপাতাল জোছনা। রূপা কী আজ নীল হুড পরেছে? একবার খোঁজ নেয়া যায়।

কলিং বেল চাপার পর রূপা নিজেই দরজা খুললো। আমাকে দেখে চমকে উঠলো না একদমই! উল্টো আমিই চমকে উঠলাম। রূপার গায়ে নীল হুড। রূপা কি জানতো আমি আসবো? কী জানি! প্রকৃতির রহস্য বুঝার চেষ্টা করে লাভ নেই। শেক্সপিয়ার বলে গেছেন, 'দেয়ার আর মেনি থিংস ইন হ্যাভেন এন্ড আর্থ...।'

গ্রাফিকস : মাহাতাব রশীদ
আমি খুব ঠান্ডা গলায় বললাম, 'রূপা, আমার খালুকে খুঁজে পাচ্ছি না, তিনি খুব রাগী পাজেরো। নাইনটি এইট মডেল। তিনি কি তোমাদের এখানে উঠেছেন?'

রূপা উত্তর দিলো, 'মাঝরাতে এসব না করলে হয় না? আমি খুব সাধারণ রিক্সা হিমু, তোমার মতো মহারিক্সা না। এসব মহারিক্সাগিরি আমার সাথে করবেনা।' রূপা আমার হাতে একটি বেল ধরিয়ে দিলো। বলল, 'তোমার জন্য এই বেলটা কিনেছি। হ্যান্ডেলে লাগিয়ে নিও। কখন কোন যায়গায় এক্সিডেন্ট করে বসো ঠিক নেই।'

রূপা দরজা বন্ধ করে দিলো। আমি বেলটা হাতে নিলাম। সুন্দর শব্দ হয়... টিং টিং টিং...। কিছুক্ষণ বেল বাজিয়ে বেলটা ফেলে দিলাম। বাবার উপদেশের কথা মনে আসছে, 'হিমালয়, তুমি বেল লাগাইয়ো না। বেল লাগাইবে সাধারণ রিক্সা। তুমি তো সাধারণ রিক্সা না। তুমি হচ্ছো হিমু, হিমালয় পরিবহন।'

৪.
খালুর দেখা পেলাম ধানমন্ডিতে। স্টার কাবাবের সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন। একটা চাকা পাংচার হয়ে আছে। মুখ দিয়ে ভুরভুর করে মদের গন্ধ আসছে। জড়ানো কণ্ঠে রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা আবৃত্তি করছেন,

A voice said, Look me in the stars
And tell me truly, men of earth,
If all the soul-and-body scars
Were not too much to pay for birth...

আমি খালুর কাছে গেলাম। ঠিক এমন মুহূর্তে র‍্যাটের হাতে ধরা পড়লাম। র‍্যাট আমাদের দুজনকেই ধরে ফেললো। অভিযোগ গুরুতর। খালু সাহেব মাতাল, এদিকে আমার হ্যান্ডেলে নাই বেল, সিটের নিচে নাই বাক্স! তার উপর ব্যাচেলার রিক্সা! 

রেকার লাগিয়ে আমাদেরকে তুলে নেয়া হলো। খালু সাহেব নতুন কবিতা শুরু করলেন। উনাকে আজকে রবার্ট ফ্রস্টে ধরেছে।

Once when the snow of the year was beginning to fall,
We stopped by a mountain pasture to say 'Whose colt?'
A little Morgan had one forefoot on the wall,
The other curled at his breast. He dipped his head
And snorted at us. And then he had to bolt.

৫.
আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতিতভাবে প্রমানিত হয়েছে। আমি একটি নাশকতাকারী রিক্সা। এই বুড়া পাজেরো আমার বস। আজ রাতেই আমাদেরকে সাইজ করা হবে। অস্ত্র উদ্ধারে যাওয়ার জন‍্য সবকিছু রেডি। এখন আমাদের জন‍্য আরও কিছু রিক্সা আর পাজেরো ওৎ পেতে না থাকলেই হয়। 

আমাদেরকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে যাওয়া হচ্ছে গুলশান থেকে একটু দূরের একটি খোলা মাঠে। আমাদেরকে সঙ্গে র‍্যাটের যারা আছে তাদের দিকে তাকালাম। একজনের চেহারা অবিকল বাদলের মতো!

রাত দুইটা। আমাদেরকে ছেড়ে দেয়া হলো। হঠাৎ কোথা থেকে জানি ওৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা চলে এলো। আমরা দৌড় দিলাম। খালু পাজেরো বলে একটু জোরে ছুটছেন। আমি রিক্সা, জোরে ছুটতে পারছিনা। তার উপর র‍্যাট ভাইরা গতকাল এক চাকার পাম ছেড়ে দিয়েছেন।

চারিদিকে উথালপাথাল জোসনা। খালু সাহেবের আবৃত্তি কানে আসছে--

I dream upon the opposing lights of the hour,
Preventing shadow until the moon prevail;
I dream upon the nighthawks peopling heaven,
Or plunging headlong with fierce twang afar...

আমি পেছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম, বাদল চেহারার যুবক চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। হলুদ রঙের চাঁদ, একদম আমার হুডের মতো। কোথা থেকে জানি ভেসে এলো মন উথাল পাথাল করা গানের সুর। একদম অবিকল রূপার গলার মতো। ...ও দয়াল, চান্নি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়....

৮৫৩৬পঠিত ...১৯:২৩, আগস্ট ১২, ২০১৬

আরও

পাঠকের মন্তব্য ( ১ )

 

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
    আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

    আইডিয়া

    রম্য

    সঙবাদ

    সাক্ষাৎকারকি

    স্যাটায়ার

    Bikroy
    Bdjobs
    rokomari ad
    
    Top