মীনা যেভাবে গ্রামের মাতবর শফিকুল ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী বদলে দিলো

২০৯২ পঠিত ... ২০:১৪, জানুয়ারি ১২, ২০১৯

বাংলাদেশের দক্ষিণে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা এক গ্রাম তেঁতুলিয়া। সেখানেই মীনা থাকে মা-বাবা, ভাই-বোন আর টিয়াপাখি মিঠুকে নিয়ে। মীনা এখন আর সেই ছোট্টটি নেই। প্রাইমারি স্কুল, হাইস্কুল, কলেজ শেষ করে এখন ভার্সিটিতে উঠে যাবে। রাজু শহরে ভার্সিটিতে পড়ছে। একেবারে বিটিভির বিকালের সুখী পরিবারের মত জীবন কাটছে তাদের।

তেঁতুলিয়া গ্রামটি হাটলাখি ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় গ্রাম। গ্রাম জুড়েই তেঁতুল গাছ। গ্রামের ঠিক মাঝে একটা বিরাট তেঁতুল বাগানও আছে। এর পাশেই মাতব্বর শফিকুল ইসলামের বাড়ি। বাগানটাও তার। তেঁতুল তার প্রিয় ফল। প্রতিদিন নিয়ম করে গাছে ঝুলে থাকা তেঁতুল দেখে শিহরিত হয়ে তিনি ঘর থেকে বের হন। ঘরের দরজাতেই এক সুবিশাল তেঁতুল গাছ। লোকেমুখে শোনা যায়, সেখানে একটা ভূতও থাকে। যদিও মাতব্বর শফিকুল এসব কেয়ার করেন না। উনার কথা, ‘তেঁতুলের লাইগা এইটুক ডর আমি পাইতেই পারি।’

এক বিকেলে হাটলাখি ইউনিয়নের মাতব্বর সাহেব যাচ্ছিলেন মীনাদের বাড়ির পাশ দিয়ে। অনেকক্ষণ হেঁটেছেন, তাই পিপাশা পেয়ে গেছে। বাড়ির বাইরে থেকে গলা খাঁকারি দিয়ে ঢুকে পড়লেন উঠোনে। মীনার মা-বাবা বারান্দায় বসেছিলেন। মাতব্বর সাহেব তাদের বাড়ি এসেছেন দেখে যারপরনাই আনন্দিত হয়ে গেলেন তারা। এ যেনো গরীবের বাড়িতে হাতির পাড়া। মাতব্বর শফিকুল ইসলামকে পানি, চা-বিস্কুট সবই খেতে দেওয়া হলো। খেতে খেতে মাতব্বর সাহেব কথা বলছিলেন মীনার বাবার সাথে।

‘কী খবর? তোমাগো বড় মাইয়াটা, মীনা না কী যেন নাম, কই? দেখতেছি না যে।’

‘অয় তো পাশের বাড়ি গেছে পড়তে!’

‘পড়তে গেছে মানে? এত বড় মাইয়ার আবার পড়ালেখা কী! কী কইতেছ তুমি এইগুলা?’

‘হ, মীনা তো কলেজ পাশ কইরা ফেলছে। এখন ভার্সিটির লাইগা পড়তেছে।’

‘ভার্সিটি! বিয়া না দিয়া তোমরা ওরে ভার্সিটিতে পাঠাইতেছ?’

‘মাতব্বর সাব, আমাগো মীনা কিন্তু পড়ালেখায় অনেক ভালো করতেছে।’ পাশ থেকে বলে ওঠেন মীনার মা।

‘মাইয়ারা আবার ভালো পড়ালেখা করতে পারে নাকি! অংকই তো পারে না। অংকরে বলে মাদার অফ অল পড়ালেখা।’

‘কিন্তু মাতব্বর সাব...’ বলার চেষ্টা করেন মীনার বাবা

‘আরে রাখো। রাজুরে ভার্সিটি পড়তে পাঠাইছ, সেইটা ঠিক আছে। পোলা মানুষ অনেক পড়ব। তোমাগো দেখভাল করব। মাইয়ারে পড়ায়া কী হইব? শেষে বিয়া দিয়া দিতে হইব।’

তখনই ঘরে ঢুকলো মীনা।

‘তা ঘরে দেখি ক্রিকেট খেলার জিনিস। রাজু মনে হয় অনেক বড় ক্রিকেটার হইছে শহরে!’

‘না চাচা, ঐগুলা আমার!’

‘ছি ছি! মাইয়া মানুষ ক্রিকেটও খেলে! মীনার বাপ, কী দেখতাছি তোমার ঘরে আইসা।’

‘ক্যান, মাতব্বর সাব, মীনা কত ভালো ক্রিকেট খেলে। ওদের কলেজে মাইয়াগো একটা ক্রিকেট দল আছে। মীনা সেইটার ক্যাপ্টেন ছিল।’

‘কই একটা মেয়ে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়বে, তা না তোমরা তারে পাঠাইতেছ ভার্সিটি। মেয়ে আবার ক্রিকেট খেলে!’

ক্লাস ফাইভের কথা শুনে সমস্বরে হেসে ওঠে ঘরের সকলে। মীনার টিয়াপাখি মিঠুর হাসিটা একটু জোরেই হয়ে গিয়েছিল। মীনা বলে ‘মিঠুই তো ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত স্কুলে গেছে। চাচা আপনে এইগুলা কী বলেন?’ 

এই পর্যায়ে রেগেমেগে বেরিয়ে আসেন মাতব্বর শফিকুল। গজগজ করতে হেঁটে যেতে থাকেন বাড়ির দিকে। গ্রামে এতকিছু হয়ে যাচ্ছে, অথচ তিনি কিছুই জানলেন না। কোন অন্ধকারে পড়ে ছিলেন তিনি এতদিন।

এসব ভাবতে ভাবতেই হোঁচট খেলেন মাটিতে পড়ে থাকা একটা তেঁতুলের ডালে। খেপে গিয়ে সেটায় লাথি মারতে গিয়ে আবার ব্যথা পেলেন পায়ে। কিছু ঠিক করে দেখতে পারছেন না। সবকিছুই ঘোলাটে। সময়ের হিসাবটা যেন এলোমেলো ঠেকছে। এত গাঢ় অন্ধকার কেন? এটা তো অমাবস্যার সময়ও না।

'মাতবর চাচা, কী হইছে আপনার?’ বলে উঠল একটি মেয়ের কণ্ঠ।

‘কে? কে কথা বলে?’ চমকে গিয়ে সামনে তাকালেন শফিকুল ইসলাম। দেখলেন আলো হাতে কে যেন হেঁটে আসে।

‘চাচা, আমি মীনা!’

‘ও মীনা, তুই? তোর হাতে দেখি লাইট আছে। আজকাল বড্ড অন্ধকার দেখি রাইত হইলেই। আজকে যে কী হইল?’

‘চলেন আপনারে আগাইয়া দেই! আপনি চোখের ডাক্তার দেখান। আমার এক আপা আছে, শহরে। খুব বড় চোখের ডাক্তার। আমি আপনারে নিয়া যামু নে।’

 একটা মেয়ে শহরের বড় ডাক্তার! এসবে অবাক হয়ে শফিকুল ইসলাম ভাবতে থাকেন। পৃথিবীটা কোথায় চলে গেছে। আর তিনি পড়ে আছেন কোন অন্ধকারে। মীনার দেখানো আলোয় পথ চলতে চলতে বলে ওঠেন, ‘তুমি তো আমারে বদলায়া দিছো মীনা!’

২০৯২ পঠিত ... ২০:১৪, জানুয়ারি ১২, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top