হলুদ হিমু নীল আর্জেন্টিনা

৩৬৩৭পঠিত ...২১:১৮, মে ২৫, ২০১৮

হিমু অনেকক্ষণ ধরে মিসির আলির দিকে তাকিয়ে আছে। পেনাল্টি কিক নেয়ার সময় মেসি যেভাবে সূক্ষ্ম চোখে গোলের দিকে তাকায় ঠিক সেভাবে।

টেবিলের এক পাশে দুটো কাঠের চেয়ারের একটায় হিমু বসে আছে। অন্য পাশে গদিওয়ালা চেয়ারে মিসির আলি।

মিসির আলি 'জাস্ট আ মিনিট' বলে প্রায় বিশ মিনিট ধরে গভীর মনোযোগে ডায়রিতে কি যেন লিখছেন। ক্রমাগত কলম দিয়ে কাটাকুটি করছেন। হিমুর হলুদ পাঞ্জাবি আজ একটু বেশিই চকচক করছে। মিসির আলির অবশ্য সেদিকে খেয়াল নেই। হিমু হালকা কাশি দিতেই মিসির আলি তাকালেন।

অলংকরণ: মাহাতাব রশীদ

কোনো সমস্যা?

জি না। একটা প্রশ্ন নিয়ে এসেছিলাম।

বাইরে তোমার জন্য কেউ অপেক্ষা করছে?

জি। বুঝলেন কিভাবে?

তোমার ভেতরে অস্থিরতা লক্ষ্য করছি। প্রেমিকাকে দাঁড় করিয়ে এসেছো কেন?

ও আমার প্রেমিকা না। জাস্ট ফ্রেন্ড। ওর নাম রুপা। আগে 'ভাইয়া' ডাকতো। এখন কিছুই ডাকে না।

সরি। বয়স হয়েছে। আজকাল লজিক তেমন কাজ করছে না। রোজা আছো?

জি না।

ইয়াং ম্যান, রোজা থাকো না কেন? এটা প্রমাণিত যে, রোজা রাখলে অনেক ফিজিক্যাল এ্যাডভান্টেজেস পাওয়া যায়।

এ্যাডভান্টেজ দরকার নেই। একটা প্রশ্নের উত্তর দরকার।

'ওকে, জাস্ট আ মিনিট' বলেই আবারো মিসির আলি ডায়রিতে মনোযোগ দিলেন।

পাঁচ মিনিটের মাথায় হিমু বলে উঠলো,  আমি কি প্রশ্নটা করব?

মিসির আলি ডায়রি বন্ধ করলেন। বড় নি:শ্বাস ছেড়ে বললেন, 'বলো। রোজা আছি। দ্রুত বলবে।'

'মানুষ আর্জেন্টিনাকে কেন সাপোর্ট করে? এটা কি শুধুই আবেগ? নাকি এর কোন লজিক্যাল ব্যাখ্যা আছে?' হিমু এক নিঃশ্বাসে প্রশ্নটা করলো।

তুমি কি ব্রাজিলের সাপোর্টার?

জি না।

সরি। তোমার গায়ে হলুদ পাঞ্জাবি দেখে ভাবলাম তুমি ব্রাজিলের সাপোর্টার। আগের মতো লজিকগুলো কাজ করছে না। বয়স হয়েছে।

'আমার প্রশ্নের উত্তরটা দিলে উপকৃত হতাম।' হিমু কিঞ্চিৎ বিরক্ত মুখে বলল। ওর এখন মনে হচ্ছে, রূপার কথায় এই বুড়োর বাসায় আসা উচিত হয়নি। কথায় কথায় অনুমান করা জ্ঞানী মানুষের কাজ নয়।

মিসির আলি এবার ডায়রিটা হিমুর সামনে খুলে রাখলেন। রেখে বললেন, তোমার জন্য রূপা মেয়েটা কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে জানো?

এক ঘন্টা।

তোমার ফিরে যাওয়ার কথা কত মিনিটের মধ্যে?

পনেরো।

রূপা কেন অপেক্ষা করছে জানো?

জানি না। এই ব্যাপারে ভাবিনি।

কারণ, রূপা বিশ্বাস করে তুমি ফিরে আসবে। তুমি আজ সারাদিন এখানে বসে থাকলেও রুপা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকবে। এটার নাম ভালবাসা।

-নাহ। আপনি ভুল বললেন। রূপা আমার জাস্ট ফ্রেন্ড। এর মধ্যে প্রেম ভালবাসা নেই।

আচ্ছা। তুমি বিকেল পর্যন্ত এখানে বসে থাকো। একটা এক্সপেরিমেন্ট হয়ে যাক। সাহস আছে?

অলংকরণ: মাহাতাব রশীদ

হিমুর হঠাৎ জিদ চেপে গেলো। এই বুড়োটা নিজেকে সঠিক প্রমাণ করতে চাচ্ছে। হিমু ঠান্ডা গলায় বলল, আচ্ছা। বসলাম। কিন্তু আপনি আমার উত্তরটা এখনো দিলেন না।

ধৈর্য ধরো। বিকেলেই তোমার প্রশ্নের উত্তর পাবে। তুমি কি চা খাবে? হিমু 'হ্যাঁ' সূচক মাথা নাড়লো। মিসির আলি কিচেনের দিকে গেলেন।

হিমু এবার মিসির আলির ডায়রিটার দিকে তাকালো। সেখানে ফুটবল বিশ্বকাপের দলগুলো নিয়ে একটা জটিল হিসাব করা হয়েছে। ফাইনাল পর্যন্ত হিসাব কমপ্লিট। বিশ্বকাপ কোন দেশ পাবে সেটাও লেখা আছে। তবে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল কোনো দেশই চ্যাম্পিয়ন নয়। হিমুর বিরক্তি বাড়লো।

'এই নাও চা।' মিসির আলি চা এগিয়ে দিলেন।

হিমু চায়ে চুমুক দিতেই বাইরে দমকা হাওয়া শুরু হল। এরপরেই তুমুল বৃষ্টি। মিসির আলি নিজের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, ‘বৃষ্টি এখন আর আমাকে মুগ্ধ করে না। বয়স হয়েছে।’

হিমু চায়ের কাপ নিয়ে বারান্দায় এলো। দোতলার বারান্দা থেকে রূপাকে দেখা যাচ্ছে। রূপা দাঁড়িয়ে আছে। ওড়না দিয়ে ব্যাগ ঢেকে রেখেছে। বৃষ্টিতে ভিজে রুপার জুবুথুবু অবস্থা। কিন্তু মেয়েটার কোন বিকার নেই। হিমু অবাক হল। রূপার তো চলে যাওয়ার কথা ছিলো। রাগী রাগী কন্ঠে রূপা বলেছিলো, ' উত্তরটা জেনেই চলে আসবেন। আপনি বেশি দেরি করলে কিন্তু আমি বাসায় চলে যাবো'। তাহলে এই মেয়ে যাচ্ছেনা কেন?

বৃষ্টি থেমে রোদ উঠেছে। ম্রিয়মান রোদে রুপার জামা শুকাচ্ছে না। ঠান্ডা বাতাস ছেড়েছে। রূপা তিরতির করে কাঁপছে। কাঁপলে একটা মেয়েকে এতো অসম্ভব সুন্দর লাগে! হিমু মুগ্ধ হল। অথচ জগতের কোনো কিছুতেই হিমুর মুগ্ধ হওয়ার কথা নয়। তবে কি হিমুরও বয়স হয়ে যাচ্ছে!

মিসির আলি হিমুর পাশে এসে দাঁড়ালেন। তারপর রুমাল দিয়ে চশমার গ্লাস মুছতে মুছতে বললেন, হিমু সাহেব! মেয়েটাকে অসম্ভব স্নিগ্ধ লাগছে। তাই না?

আপনি উত্তরটা বলুন। ওর ঠান্ডা লেগে যাবে। আমার যাওয়া উচিত।

আচ্ছা, বলি। এখানে রূপা আর্জেন্টিনার সাপোর্টার আর তুমি আর্জেন্টিনা দল। ও তোমাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। ফলে ও নির্দ্বিধায় তোমার ফিরে আসার অপেক্ষা করছে।

'ঝেড়ে কাশুন' হিমুর কন্ঠে বিরক্তি।

রূপা বিশ্বাস করে তুমি একদিন ফিরবে। আর তুমি তোমার ভক্তের ভালবাসা দেখে মুগ্ধ হচ্ছ। ভিজে জুবুথুবু একটা মেয়েকে কখনোই অতটা সুন্দর লাগেনা। ওর চুলগুলো লেপেটে আছে। অথচ তোমার চোখে রূপা এখন অপরূপ সুন্দর।

আপনি বলতে চাচ্ছেন রূপা এখন সুন্দর না?

শোনো, আর্জেন্টিনা দলও তাদের জুবুথুবু ভক্তদের দেখে প্রতিনিয়িত এমন মুগ্ধ হয়। আসলে 'বিশ্বাস' জিনিসটাই সুন্দর। আর এই বিশ্বাস আসে ভালোবাসা থেকে।

তাহলে আপনি বলছেন, ‘ভালোবাসাটাই এখানে লজিক?’

মিসির আলি হাসলেন। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, তোমার উচিত এখন রূপার কাছে যাওয়া। ওকে বাসায় পৌছে দিয়ে আসো।

হিমু বলল, আপনার বাসার পেছনের দরজাটা কোন দিকে? আমি রূপার সামনে যেতে চাই না।

মিসির আলি বিস্মিত হয়ে বললেন, পেছনের দরজা এদিকে। কিন্তু কেন? এটা তো কোন লজিকের মধ্যে পড়ে না।

'আমি ভালোবাসার খুব কাছে যেতে চাইনা। আর মিসির আলি সাহেব, আপনি সিগারেট ফেলুন। রোজা আছেন।'  মিসির আলি অবাক চোখে হাতের সিগারেটের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। এটা তিনি কখন ধরালেন! আসলেই বয়স হচ্ছে। হিমু সিড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নেমে গেলো। 

হিমু আর্জেন্টিনার মতো কথা দিয়েও কথা রাখলো না। রূপা এখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। যেমন অপেক্ষায় আছে আর্জেন্টিনার ভক্তরা...

৩৬৩৭পঠিত ...২১:১৮, মে ২৫, ২০১৮

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
    আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

    আইডিয়া

    রম্য

    সঙবাদ

    সাক্ষাৎকারকি

    স্যাটায়ার

    
    Top