ইস্ট পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় এক ঘুম ভাঙ্গা সকালে

১৭২০পঠিত ...১৩:২৬, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৮

জানালার ফাঁক গলে আসা রোদের একটুখানি আচে হঠাৎ ঘুম ভাঙল শায়লার। কয়টা বাজে? আজ একুশে ফেব্রুয়ারি তো! সকাল সকাল শহিদ মিনারে যেতে হবে, রোদ উঠে গেলে তো সর্বনাশ! দুপুরে ছায়ানটে একটা প্রোগ্রামে গান গাইতে হবে, টিএসসিতে অনুষ্ঠান আছে সন্ধ্যায়। দেরি হলে পুরো দিনের শিডিউল এলোমেলো হয়ে যাবে।

অলংকরণ: সালমান সাকিব

শায়লা দেরি না করে উঠে পড়ল। বাথরুমে যেতে হলে টিভি রুমের সামনে দিয়ে যেতে হয়। টিভি রুমের সামনে আসতেই দেখে বৃদ্ধ করে এক লোক বসে আছেন সোফায়। বসার ভঙ্গীতে কোনো জড়তা নেই, মনে হচ্ছে কত বছর ধরে এখানেই থাকেন। শায়লা ভালো করে খেয়াল করল। অনেকটা দাদুর মতো দেখতে। দেয়ালে দাদুর ছবি টাঙানো বড় করে, সেটার সাথে মিলিয়ে নিতে শায়লা দেয়ালে যেখানে ছবি সেখানে তাকাল। কই, ছবি তো নেই! অদ্ভুত ব্যাপার। বৃদ্ধ লোকটা এবার কথা বললেন 'ক্যায়া ঢুন্ড রাহে হো বেটি?'

শায়লা চমকে তাকাল। বৃদ্ধ হিন্দি-উর্দু কিছু একটা বলছে মনে হয়। বৃদ্ধের হাতে পত্রিকা। পত্রিকার কিছু পাতা সামনে টেবিলের ওপর রাখা। শায়লার চোখ পড়ল পত্রিকার দিকে। পত্রিকায় আরবি ধরনের কী যেন অক্ষর। উর্দু না? হ্যাঁ, তাই তো। শায়লা চিৎকার করল, 'মা! এসব কী?'

শায়লার মা জাহানারা বেগম ট্রেতে দু কাপ চা নিয়ে রান্নাঘর থেকে ডাইনিংয়ে এলেন। মা অন্যদিনের মতো শাড়ি পরেননি, পরনে অনেকটা বোরখার মতো দেখতে ম্যাক্সি টাইপের কিছু। কী ব্যাপার কে জানে। তাঁর আচরণও চূড়ান্ত স্বাভাবিক। শান্ত ভাবে রান্নাঘর থেকে ড্রয়িং রুমে এসে চায়ের ট্রে বৃদ্ধ লোকটার সামনে থাকা টেবিলে রাখতে রাখতে মা বললেন, 'ক্যায়া তাকলিফ হ্যায় শায়লা? দাদু নে কুচ কাহা?'

শায়লার মাথা ঘুরছে। কী সমস্যা সবার! কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে, অবশ্যই হয়েছে। শায়লা দৌড় দিয়ে বাথরুমে ঢুকে চোখে মুখে পানি দিল। বের হয়ে কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে শহিদ মিনারে কী হচ্ছে কোন চ্যানেল দেখাচ্ছে কি না দেখতে টিভি অন করল।

একের পর এক চ্যানেল পাল্টালো সে। টিভিতে কোন বাংলা চ্যানেল নেই। কোথাও কোন বাংলা নেই। সব উর্দু।

শায়লা বিটিভি খুঁজে বের করার চেষ্টা করল, বিটিভি ০ নাম্বার চ্যানেলে থাকার কথা। বিটিভি বলে কোনো চ্যানেল নেই। ০ নাম্বারে চ্যানেল আছে, কিন্তু বিটিভি নেই। ইপিটিভি নামে একটা চ্যানেল দেখা যাচ্ছে। ইপিটিভি মানে কী? তবে কি... ইস্ট পাকিস্তান টেলিভিশন? কী করে সম্ভব? শিউরে উঠল শায়লা।

শায়লা টিভি বন্ধ করে ঘরের চারিদিকে তাকাল। ঘরের দেয়ালে দুটো ক্যালেন্ডার ছিল, একটা বাংলা আরেকটা ইংরেজি বছরের। দেয়ালে এখন শুধু একটা ক্যালেন্ডার, ইংরেজিটা আছে শুধু। বাংলাটা নেই। শায়লা বইয়ের শেলফের দিকে তাকাল। বইগুলো ঠিক আছে, কিন্তু সব অক্ষর উর্দু। বাংলা নেই, কোথাও নেই। টেক্সট বই, ডিকশনারি, দুদিন আগে পেপারের সাথে দেওয়া বিজ্ঞাপনী লিফলেটেও উর্দু। সমস্যাটা কী, কী হচ্ছে! কোথাও কোনো একটা সমস্যা হয়েছে, বিশ্রী কোনো সমস্যা।

শায়লা খুব দ্রুত শাড়ি পরে বের হয়ে গেল। বের হওয়ার সময় মা ওই অদ্ভুত ভাষায় কী যেন জিজ্ঞেস করলেন, শায়লা জবাব দিল না। বৃদ্ধ লোকটাও তাকিয়ে ছিল ফ্যালফ্যাল করে। ওই লোকটাই কি দাদু? না, তা কী করে হয়। দাদু তো সেই বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনে শহিদ হয়েছেন। বাংলা ভাষার জন্য শহিদ হয়েছেন তার দাদু, কী বিরাট সেই গর্ব! উর্দু নাকি প্রচণ্ড অপছন্দ করতেন দাদু।

কোথাও নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হচ্ছে।

শায়লা রিকশাওয়ালাকে ডাকল। রিকশাওয়ালা মনে হল শুনতে পেল না ঠিকমতো। অথবা শুনেও থামল না। কী বিপদে পড়া গেল! অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটছে আজ। রাস্তা এত খালি কেন কে জানে।

বেশ কিছু লোক আছে, বেশিরভাগই কেমন জোব্বা পরা টুপি পরা বয়স্ক টাইপ লোক। লোকগুলো তাকাচ্ছেও কেমন যেন উৎসুক চোখে, যেন কোনদিন শাড়ি পরে কাউকে কোথাও যেতে দেখেনি।

আজকে হয়েছেটা কী এই শহরে!

আরেকটা রিকশা আসছে। শায়লা কিছু বলার আগেই রিকশাওয়ালা তার সামনে রিকশা থামিয়ে পরিষ্কার উর্দুতে জিজ্ঞেস করল, 'কাহা জানা হ্যায় বেহেনজি!'

শায়লা অবাক চোখে তাকাল। কী হয়েছে আজ ঢাকার!

 

২.

ঢাকা মেডিকেলের সামনে পৌঁছে রিকশাভাড়া দিতে পার্স খুলে টাকা বের করার সময় শায়লার চোখে আতঙ্ক আর বিস্ময় বেড়ে গেল বহুগুণে। প্রতিটা নোট অন্যরকম, উর্দু ভাষায় কী হাবিজাবি লেখা। সেখানে টুপি পরা এক লোকের ছবি। জিন্নাহ না? জিন্নাহই তো! কী সর্বনাশ! শায়লা একইরকম দেখতে দুটো নোট ধরিয়ে দিল রিকশাওয়ালাকে। শায়লা হেঁটে গেল শহিদ মিনারের দিকে। পুরো জায়গাটা খাঁ খাঁ করছে, কোনো মানুষ নেই রাস্তায়।

শায়লা ঢাকা মেডিকেলের পাশে কোনো মিনার খুঁজে পেল না। সেই একই জায়গায় দেয়াল দিয়ে ঘেরা কোনো এক বহুতল ভবন মাথা উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শায়লার চিৎকার করতে ইচ্ছা হলো, কিন্তু আতঙ্কে জিহ্বা জমে গিয়েছিল প্রায়। শায়লা হেঁটে গেল দোয়েল চত্বর হয়ে টিএসসির দিকে। পথে কোনো বাংলা একাডেমি পেল না। টিএসসি বলেও নেই কিছু, ভবনটা আছে শুধু। রাজু ভাস্কর্য নেই, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা নেই। পুরো রাস্তাঘাট মরুভূমির মতো ফাঁকা। শায়লা কলাভবনের দিকে ছুটে গেল। হ্যাঁ, অপরাজেয় বাংলা বলেও কিছু নেই। কলাভবনের নকশাটা বদলে গেছে। ওপরের দিকে কেমন গম্বুজের মতো। কী ভয়ঙ্কর!

অলংকরণ: সালমান সাকিব

শায়লা আবারও রিকশা নিল ধানমন্ডির দিকে। যাওয়ার পথে চারুকলা যেখানটায় ছিল সেখানে আরও একটা গম্বুজের মতো দালান দেখতে পেল। রাস্তায় কোথাও কোনো বাংলা অক্ষর নেই। এক বর্ণ বাংলাও নেই কোথাও। যেন কখনও বাংলা বলে কিছু ছিল না কোথাও। একটা হলেও বাংলা শব্দ দেখা বা শোনার জন্য উন্মাদের মতো ঘুরতে লাগল শায়লা। রিকশা নিয়ে পুরো ধানমন্ডি ঘুরল, কোথাও ছায়ানট বলে কিছ নেই। কখনও যেন ছিলও না।

কোথাও রবীন্দ্রনাথ নেই, অ আ ক খ নেই। নেই চন্দ্রবিন্দু, অনুস্বার, বিসর্গ, কিচ্ছু নেই! রাস্তায় কোনো রমণী নেই, নেই লাল-সাদা শাড়ি, আলতা কিংবা চুড়ির টকটকে লাল। প্রাণ নেই, উচ্ছ্বলতা নেই কোনো। পুরো শহর মনে হচ্ছে মৃত। পাশেই একটা দালানে উড়ছে চাঁদ-তারা আঁকা সবুজ এক পতাকা।

শায়লা উন্মাদের মতো রাস্তার ওপরেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।

 

৩.

শায়লা ঘুম ঘুম চোখে চোখ মেলে তাকাল। বোঝার চেষ্টা করল সে কোথায় আছে। রাস্তায় অবশ্যই নয়, নিজের বিছানাতেই আছে এটুকু সে নির্দ্বিধায় বুঝতে পারল। শায়লা উঠে বসল চটজলদি, একবার দেখে নিল নিজের ঘরের প্রতিটা কোন। হ্যাঁ, ওই তো, দেয়ালে দুটো ক্যালেন্ডারই আছে।

বইয়ের শেলফে জীবনানন্দের কবিতা সমগ্রটা দেখা যাচ্ছে দিব্যি। আহ, কি সুন্দর বাংলা অক্ষর। কে যেন এত সকালেই গান বাজিয়ে চলেছে, 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।' কি মিষ্টি একেকটা ধ্বনি! পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ভাষা কী? অবশ্যই তো! কি বাজে দুঃস্বপ্নটাই না ছিল। বাংলা ছাড়া এই জগত কি অসুন্দর!

শায়লার মা জাহানারা বেগম ঘরে উঁকি দিয়ে একদফা বলে গেলেন, 'জলদি ওঠ! তোর বাবা তো কখন থেকে ডাকছে। শহিদ মিনারে যাবি না?'

১৭২০পঠিত ...১৩:২৬, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৮

আরও

 
 

পাঠকের মন্তব্য

 

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
    আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

    আইডিয়া

    রম্য

    সঙবাদ

    সাক্ষাৎকারকি

    স্যাটায়ার

    
    Top