ফেসবুকে যেভাবে নতুন মন্ত্রীদের অভিনন্দন বার্তা জানাবেন

১৮৭৫ পঠিত ... ১৭:৩৬, জানুয়ারি ০৭, ২০১৯

আপনাকে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের অভিনন্দন জানাতে হবে; অন্যদিকে গত দশ বছর অবিরাম অভিনন্দন জানিয়ে শুভেচ্ছা অভিধানের সব শব্দমালার ফুল শুকিয়ে গেছে। একই শব্দ, একই বাক্য বারবার ব্যবহার করে নতুন মন্ত্রীর দৃষ্টি-আকর্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অভিনন্দন জানানোর শিল্পটি হয়ে উঠেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। যারা ভালো অভিনন্দনপত্র লিখে দিত; তারা ব্যস্ত নিজেদের অভিনন্দন পত্র লিখতে। এ অবস্থায় হতাশ হয়ে বসে থাকার কারণ নেই। eআরকি নিয়ে এলো অভিনন্দন-বার্তার উচ্চনম্বরের সিঁড়ি।

অলংকরণ: ইশমাম

'অভিনন্দন-শিল্প' জগতের প্রাচীনতম শিল্প। পালযুগ, সেনযুগ, মুঘলযুগ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিযুগ, বৃটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশ কালের নানা ক্ষমতা পরিবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণগুলোতে রাজা-বাদশাহ-ভাইসরয়-গভর্ণর-সেনাপ্রধান-প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী-অমাত্যবর্গকে অভিনন্দন জানানোর দৌড়ে যারা টিকে গেছে, জীবনে তারাই সফল হয়েছে। কাজেই অভিনন্দন-পর্বটিকে মোটেই খাটো করে দেখার উপায় নেই।

প্রাচীনকালে এমনকি নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণার আগে পর্যন্ত যে অভিনন্দন-বার্তাগুলো লেখা হয়েছে; সেগুলো বহু ব্যবহারে জীর্ণ বিশেষণের পাল্লায় পড়ে আজ তৈল-বার্তা বলে নিন্দিত। এমন একটা অবস্থা তৈরি হয়েছে; অভিধানে অভিনন্দন-বার্তার সমার্থক শব্দ হিসেবে 'তেল' শব্দটি জনমনে জায়গা করে নিয়েছে। তাই অভিনন্দন জানানোর ক্ষেত্রে পুরোনো বিশেষণগুলো বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে। আর সমস্যাটা সেখানেই। সময় কম, সবাই নেমে পড়েছে অভিনন্দন জানানোর দৌঁড়ে।

অভিনন্দন বার্তা লেখার ক্ষেত্রে পারসোনাল টাচ দেয়া পদ্ধতিটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। একটি প্রচলিত অভিনন্দন বার্তা হয় এরকম--

'মাননীয় "অমুক ভাই", আপনার সঙ্গে প্রথম দেখায় আপনার চোখে দিন বদলের অগ্নিগোলক দেখেছিলাম। ঐদিনই বাদ দিয়েছিলাম সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনা। যার দেশেই এমন সৎ ও কর্মঠ নেতা রয়েছেন, সে দেশ ভূলোক-দ্যুলোক-গোলক ভেদিয়া সর্বশ্রেষ্ঠ দেশ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে; তা নিয়ে সন্দেহ ছিল না এতোটুকু। আমি তাকে বলেছিলাম, ভাই আপনারে ছাইড়া কোথাও যাবো না আমি। আমারে কাজ দেন! আমাকে বিমুখ করেননি তিনি। ভরসা দিয়েছেন; ভরসাই সব; ভরসাটা থাকলে সব হয়। গত পাঁচ বছরের চেষ্টায় একটা উদ্যোগ দাঁড় করিয়েছি; মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি।'

উপরের এই অভিনন্দন বার্তার সমস্যা হচ্ছে, গল্প 'অমুক ভাই'কে ফেলে নিজের সাফল্যে এসে পড়েছে। কিন্তু বুঝে দেখুন, এটা অমুক ভাইয়ের জন্য লেখা অভিনন্দনপত্র। এই গল্পের নায়ক তিনি। সুতরাং এ গল্পে আমি-টামি ছেড়ে উনার মাহাত্ম্য বর্ণনায় মন দিতে হবে।

সুতরাং লিখুন এভাবে--

'আমাদের গ্রামের এক মলিন চায়ের স্টলে মানুষের মাঝে নিজেকে বিলীন করে দিয়ে বসেছিলেন তিনি। বড় মানুষ হলে তার মাঝে উদারতা থাকে; সাদাসিধে মন থাকে; তা বুঝতে এতোটুকু অসুবিধা হয়নি। অত্যন্ত মেধাবী মানুষ। আর উনি বললেন, মাত্র ১৪৯ টাকা নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলাম; তখন আমার আর কিছুই ছিলো না; ভালো কিছু করার ইচ্ছাটা ছাড়া। এই ইচ্ছাটাই আসল। ইচ্ছা থাকলে দারিদ্র্য কেন, নির্বাচন জয় করা যায়। নেপোলিয়ান বোনাপার্টকে এক জ্যোতিষী বলেছিলেন, আপনার হাতের রেখায় বিশ্বজয় দেখছি না। নেপোলিয়ান চাকু দিয়ে নিজের হাতের রেখা এঁকে বলেছিলেন, দেখি এবার আমার বিশ্বজয় ঠেকায় কে!
সেইদিন বুঝেছিলাম, "অমুক ভাই" থেমে থাকার পাত্র নন। আজ অনেকেই বিস্মিত হলেও; আমি বিস্মিত নই এতোটুকু। আমি জানতাম, "অমুক ভাই" এর অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে কোনকিছুই অসম্ভব নয়। দীর্ঘজীবী হোন অমুক ভাই; দেশবদলের স্বপ্নের সোনালী সৈনিক হয়ে উঠুন। আপনার হাতেই নিরাপদ জন্মভূমি।'

 

আর একটি স্টাইল খুবই কার্যকর অভিনন্দন জানানোর ক্ষেত্রে। মনে রাখবেন, মানুষ তার বড় সাফল্যের দিনে একটু ঘোরলাগা ভালোলাগার মাঝে থাকে। এদিন তার নিজের বাবা-মা'র কথা খুব মনে পড়ে। সুতরাং অভিনন্দন বার্তায় 'অমুক ভাই/বোন'-এর বাবা-মায়ের সুকৃতির বয়ান থাকা চাই। কারণ মনে রাখতে হবে, তারা না থাকলে সফল মানুষটি পৃথিবীতে আসতেই পারতেন না। কাজেই আজকের এই কৃতিত্ব মূলত তাদের। কাজেই খোঁজ নিন উনার বাবা-মা সম্পর্কে। আপনার দরকার শুধু নাম দুটি। বাকি গল্প আপনি লিখবেন।

'রত্নগর্ভা (মায়ের নাম) দেশরত্নের সেবায় সঁপে দিয়েছিলেন তার ছেলে/মেয়েটিকে। ছেলে/মেয়েটি নিরাশ করেনি তার মা'কে। আর তার সৎ বাবাটি (নামসহ) এলাকায় পরোপকারী মানুষ হিসেবে পরিচিত। একজন বলছিল, এমন ফেরেশতার মতো মানুষ দেখিনি। কোনদিন ফজরের ওয়াক্তের নামাজে তাকে অনুপস্থিত দেখেনি মানুষ। মানুষের যে কোন বিপদে-আপদে তাকে পাশে পেয়েছে সবাই। তাদের সন্তান এলাকার-দেশের-দশের মুখ উজ্জ্বল করবে একদিন; এতো সবাই জানতেন। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানেন কোত্থেকে হীরার টুকরা খুঁজে বের করতে হবে। গোটা বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিস্ময় এই হীরার খনি। অমুক ভাইয়ের হীরণ্ময় সাফল্যের প্রত্যাশা রইলো।'

অমুক ভাই বা তমুক ভাই পারিবারিক রাজনীতির সফল ঘোড়সওয়ার হলে; পরিবারের রাজনৈতিক ত্যাগের ইতিহাস আপনার অভিনন্দন বার্তায় যুক্ত করুন। ত্যাগের ইতিহাস খুঁজে না পেলেও হতাশ হবেন না। জীবন যাপন মানেই ত্যাগ-সাধন।

সবচেয়ে ট্রেন্ডি অভিনন্দন বার্তা হচ্ছে; উনি যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন; এই ক্ষেত্রে উনার দক্ষতার বয়ান হাজির করা। অর্থমন্ত্রী হলে আগে অনেক অর্থ নাড়াচাড়া করে অভ্যাস আছে, তথ্যমন্ত্রী হলে আগে অনেক তথ্য টানা-হ্যাচড়া করে অভ্যস্ত তিনি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলে পুলিশদের আনন্দে রাখতে পটু তিনি এসব তথ্য অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু সবশেষে এটা অবশ্যই থাকতে হবে, 'সুযোগ্য প্রধানমন্ত্রী তার সঠিক মূল্যায়ন করেছেন।' যাকেই অভিনন্দন জানান না কেনো; প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানানোর সাগরে মেলাতে হবে তাকে। কারণ সব নদীই শেষ পর্যন্ত সাগরে গিয়ে পড়ে।

১৮৭৫ পঠিত ... ১৭:৩৬, জানুয়ারি ০৭, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top