ইশতেহার বাস্তবায়িত হলে যেমন হবে ২০২২ সালের বাংলাদেশ

১২২১০ পঠিত ... ০৪:২৪, জানুয়ারি ০৬, ২০১৯

তারেক থাকে মিরপুর দশে। তারেকের বাসার সামনেই মেট্রো রেল। মিরপুর দশ থেকে কমলাপুর রেল স্টেশনে যেতে তার সময় লাগে সব মিলিয়ে আট মিনিট। বাস বা সিএনজিতে গেলে সময় সামান্য বাড়ে। দশ থেকে বারো মিনিট লাগে।

রাস্তায় কোনো জ্যাম নাই। তারেক মুরব্বিদের মুখে শুনেছে, এক কালে নাকি ঢাকার রাস্তায় জ্যাম বলে একটা অদ্ভুত জিনিস ছিলো। মহাজোট উন্নয়ন জাদুঘরে গিয়ে গত মাসেই জ্যামের ছবি আর ভিডিও দেখে এসেছে ও। জাদুঘরে জ্যামের পাশেই লোডশেডিং। লোডশেডিংয়ের পাশের স্টলে বিএনপি-জামাত জোট।

তারেক রেডি হয়ে বাসা থেকে বের হয়ে মেট্রোরেলে উঠলো।

এখন ২০২২ সাল। চারিদিকে বইছে উন্নয়নের জোয়ার। গুগলে সিঙ্গাপুর লিখে সার্চ দিলে আগে ঢাকার ছবি আসে। কয়েকদিন আগে তারেক পত্রিকায় দেখেছে আমেরিকার নির্বাচনে রিপাবলিকান দল ইশতেহার দিয়েছে, জিতলে নিউইয়র্ককে দ্বিতীয় ঢাকা হিসাবে গড়ে তোলা হবে। স্বাস্থ্যখাত এতোই উন্নত হয়েছে যে মানুষ এখন ইচ্ছা করেও অসুস্থ হতে পারছে না। দেশের মানুষের গড় আয়ু ১৪৬ বছর।গত সপ্তাহেই ইউনেস্কো ঢাকা শহরকে সবচাইতে উন্নত ও পরিচ্ছন্ন শহরের তালিকায় প্রথম স্থান দিয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে আছে চিটাগাং, তৃতীয় স্থানে যৌথভাবে বরিশাল আর নোয়াখালী। পঞ্চম স্থানে কুমিল্লা, ষষ্ঠ স্থানে নারায়ণগঞ্জ। সপ্তম স্থানে গিয়ে ভিয়েনা।

এসব ভাবতে ভাবতেই তারেক কমলাপুর রেল স্টেশনে পৌছে গেলো। আজ লেগেছে সাড়ে সাত মিনিট। সাতক্ষীরার ট্রেন ছাড়ার কথা আটটায়। কিন্তু সাড়ে সাতটাতেই ছেড়ে দিয়েছে। এখন লেট তো করেই না, বরং ট্রেনগুলো সময়ের আগেই ছেড়ে দেয়। অবশ্য এতে সমস্যা নেই। বুলেট ট্রেন তো, সাতক্ষীরায় গিয়ে যাত্রী রেখে আবার ফিরে আসতে পারে মাত্র কুড়ি মিনিটেই।

সাতটা পঞ্চাশের ট্রেনে চড়ে বসলো তারেক। ট্রেন ছুটছে তীব্র গতিতে। বুলেট ট্রেন বলে কথা। মাত্র পাচ মিনিটেই ঢাকা পার হয়ে পদ্মা সেতুর উপর চলে আসলো। এটা তিন নাম্বার সেতু। পদ্মা নদীর উপর মোট তেরটা সেতু তৈরি করা হয়েছে। ট্রেনের জানালা দিয়ে মুখ বাড়ালো তারেক। অপরূপ দৃশ্য। দুই চোখ ভরে উপভোগ করতে লাগলো।

তারেকের সাতক্ষীরা গমনের পেছনে আছে একটা গোপন কারণ। সে কিছু টাকা কোনো দরিদ্র মানুষকে দান করতে চায়। কিন্তু গত তিন বছর তন্নতন্ন করে খুঁজেও সে দেশে কোনো গরীব পায়নি। তারপর গতকাল গোপন সূত্রে খবর পেয়েছে সাতক্ষীরাতে একজন গরীবের সন্ধান পাওয়া গেছে। নিউজটা খুবই গোপন রাখা হয়েছে কারণ সরকার খবর পেলেই মুহুর্তের মধ্যে ঐ লোককে বড়লোক বানিয়ে দিবে। এর আগে দুইবার এমন হয়েছে তারিকের সাথে। খবর পেয়ে টাকা নিয়ে দান করতে গিয়ে দেখে সরকার অলরেডি চাকরিবাকরি গাড়ি-বাড়ি দিয়ে দিয়েছে লোকটাকে। এবার তাই কারো সাথেই তারেক খবরটা শেয়ার করেনি।

অলংকরণ: আদিব রেজা রঙ্গন

সাতক্ষীরা গিয়ে লোকটাকে খুঁজে পেতে বেশ সময় লাগলো। তারেক তার সামনে গিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো, খাবার আছে?
লোকটা ইশারায় জানালো, 'হ্যাঁ আছে।'
তারেক আবারো ইশারায় জানতে চাইলো, 'বাড়ি আছে?'
লোকটা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
তারেক ইশারা করলো আবার, 'গাড়ি আছে?'
লোকটা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
আবারো ইশারা, 'হেলিকপ্টার আছে?'
লোকটা এপাশ ওপাশ মাথা নাড়লো, না সূচক।

ইয়েস, খুশি হলো তারেক। লোকটা আসলেই অনেক গরীব। কর্তৃপক্ষ ঘরে ঘরে হেলিকপ্টার প্রদান প্রকল্প চালু করেছে গত মাসে, এই লোক কোনোভাবে বাদ পড়ে গেছে। ও দ্রুত পকেট থেকে দশ কোটি টাকার দানের চেকটা বের করে দিয়ে হাত নেড়ে ইশারায় জানালো, 'একটা হেলিকপ্টার কিনে নিও।'

লোকটা খুশি হয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।

দান করা তো হলো, এবার বাসায় ফিরতে হবে। এবার আর ট্রেনে না, বিমানে যাবে ও। সাতক্ষীরা বিমানবন্দরে গেলো সেই উদ্দেশ্যেই। এখন প্রতি জেলাতেই কমপক্ষে তিন-চারটা করে বিমান বন্দর আছে।

এয়ারপোর্টে ঢুকতেই রিসেপশনের সুন্দরী মহিলা ইশারায় জানতে চাইলো, 'কোন জায়গা?' তারেকও ইশারায় জানালো, 'ঢাকা।'

এখন এই একটা অদ্ভুত জিনিস হয়েছে। সারা বাংলাদেশের কেউ কথা বলতে পারে না। সবাই সবকিছু শুনতে পারে, দেখতে পারে কিন্তু মুখে কিছু বলা যায় না। এটাকে অবশ্য উন্নয়নের সাইড ইফেক্ট হিসাবেই মেনে নিয়েছে সবাই।

আর কয়েকদিন পরই ১২তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তারেক এবারই প্রথমবার ভোটার হয়েছে। কিন্তু ভোট দেয়া নিয়ে এখন আর চিন্তা করা লাগে না। এমনকি শিশু মায়ের পেটে থাকতেই আলট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে তার সারাজীবনের ভোট নিয়ে নেয়া হয়। শুধু শুধু ঝামেলা করে লাভ কী?

তারেকের হঠাৎ করে কেন জানি মন খারাপ হলো। কোনো কারণ নেই হুদাই মন খারাপ। ফেসবুকে লগইন করে স্ট্যাটাস লিখলো, 'আমার অনেক মন খারাপ।'

স্ট্যাটাস অ্যাপ্রুভ হলো না। অটোমেটিক ডিলিট হয়ে গেলো। রাগ হলো তারেকের। লিখলো, 'ধুর বা*, মেজাজ খারাপ।'
পোস্ট করার সাথে সাথে এটাও ডিলিট হয়ে গেলো। অ্যাপ্রুভ হলো না।

কেন্দ্রীয় আইটি বিভাগের দায়িত্ব, ফেসবুকের সব পোস্ট রিভিউ করে অ্যাপ্রুভ করা। তারাই ডিলিট করেছে হয়তো। তারেকের খেয়াল হলো, জনসাধারণের একটা মাত্র পোস্টই অ্যাপ্রুভ করা হয়। তারেক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পোস্টটা করেই ফেললো। লিখলো, 'আলহামদুলিল্লাহ ফর এভ্রিথিং।'

সাথে সাথে অ্যাপ্রুভ হলো। এক মিনিট হওয়ার আগেই লাভ আর ওয়াও রিয়্যাক্ট। কোনো হাহা নাই। হাহা রিয়্যাক্ট ব্যান করে দেয়া হয়েছে ফেসবুক থেকে। স্যাড আর অ্যাংরিও ব্যান করা হয়েছে। যেই দেশে কোনো দুঃখ নেই, রাগ নেই, ক্ষোভ নেই, সেখানে এসব রিঅ্যাক্ট কেন থাকবে?

অনেক রিঅ্যাকশন পড়েছে, কিন্তু কেউ কোনো কমেন্ট করেনি। এই দেশে এখন কেউ কিছু লেখেও না। বেশ তো আছি, এত লেখালেখির কী দরকার!

১২২১০ পঠিত ... ০৪:২৪, জানুয়ারি ০৬, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top