ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থা : জেনে নিন এই আত্মঘাতী গেমটির সঙ্গে ব্লু হোয়েলের মিল-অমিল

৫২১ পঠিত ... ২১:৪১, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৮

ব্লু হোয়েলের কথা নিশ্চয়ই পাঠকেরা এতদিনে ভুলে যাননি! আবিষ্কৃত হয়েছে বহুল আলোচিত সেই 'মরণ' খেলার সেকেন্ড ভার্সন। যে খেলার নাম 'ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থা।' এই মরণ খেলার কবলে পড়ে অকালেই ঝরে যাচ্ছে বহু তাজা প্রাণ।

এই খেলার একটি স্টেজেই ছয় তলা ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তরুণ হোসেন। আত্মহত্যা করেছেন মহসীনা মেধা নামে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক ছাত্রী। এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্টের পর আত্মহত্যা করেছে নাটোরের প্রবাল কুমার সরকার। এইসসসি পরীক্ষার পর আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে মানিকগঞ্জের মিতু আক্তার। এই উদাহরণ প্রতি বছর বাড়ছে শত শত থেকে হাজার হাজার। সর্বশেষ সংস্করন ভিখারুন্নেসা স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণীর ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী।

কি এমন এই খেলা ‘ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থা’, যা প্রতিবছর এত এত শিক্ষার্থীর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে! কোথায় এর উৎপত্তি? কীভাবে এই গেমে ঘটছে মৃত্যুর ঘটনা? আসুন জেনে নিই এই ভয়ংকর গেইম সম্পর্কে!

ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থা কী?

ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থা একেবারে বাংলাদেশি প্রযুক্তিতে তৈরি একটি ভয়ংকর মরণ খেলা। দেশের সকল ছাত্রছাত্রীকে এই গেমের কিউরেটররা জোর করে গেমে ঢুকতে বাধ্য করেন। জানা যায়, ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থা গেমে ১০টি ধাপ রয়েছে। ১০ টি ধাপ পার হওয়ার জন্য একজন ছাত্রকে ২৫ বছর সময় দেয়া হয়।

ধাপগুলো হলো-
১. ভালো কেজি স্কুলে ভর্তি।
২. পিএসসি।
৩. ভালো হাইস্কুলে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন।
৪. জেএসসি।
৫. এসএসসি।
৬. ভালো কলেজে চান্স পাওয়া।
৭. এইসএসসি।
৮. ভার্সিটি এডমিশন।
৯. সেমিস্টার ফাইনাল।
১০. বিসিএস।

এই গেমে কোনো কম ডিফিকাল্টি লেভেলের অপশন নেই, গেমের একেবারে শুরু থেকেই ধাপগুলোকে অনেক কঠিন করা হয়েছে। তবে যত দিন যায় পরের ধাপগুলো আরো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এর প্রতিটি ধাপ একাধিক কিউরেটর দ্বারা চালিত হয়। কিউরেটরদের নির্দেশ ও খুশি অনুযায়ী গেমের এক একটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। কিউরেটর হিসাবে এই গেমে থাকে শিক্ষার্থীর বাবা মা, পাশের বাসার আন্টি আঙ্কেল, আত্মীয়স্বজন ও স্কুল-কলেজ-ভার্সিটির শিক্ষকরা। গেমটির বিভিন্ন ধাপে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চ্যালেঞ্জ এমন- অবশ্যই যেকোনো মূল্যে এ প্লাস ও গোল্ডেন এ প্লাস
পাওয়া', পাশের বাসার অমুকের ছেলে বা মেয়ের থেকে ভালো ফলাফল করা, সারা দিনরাত বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকা, মানসম্মত স্কুল কলেজ ভার্সিটিতে যেকোনো মূল্যে চান্স পাওয়া, বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরি পাওয়া ইত্যাদি। প্রতিটা চ্যালেঞ্জ জয়ের পর কিউরেটদেরকে মিষ্টি খাওয়াতে হয়। আর কোনোভাবে একটা চ্যালেঞ্জও যদি পরিপূর্ণ করা সম্ভব না হয় তবে গেমের নিয়ম অনুযায়ী কিউরেটররা নানা ধরনের শারিরীক ও মানসিক অত্যাচারের মধ্যে দিয়ে শিক্ষার্থীর উপর চাপ সৃষ্টি করে তাকে আত্মহননের পথে ঠেলে দেয়।

 

ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থায় আসক্তদের চিনবেন যেভাবে

যেসব কিশোর-কিশোরী ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থা গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছে তারা সাধারণভাবে সবসময় হীনমন্যতায় ভোগে। স্বাভাবিক আচরণ তাদের মধ্যে দেখা যায় না। দিনের বেশিরভাগ সময় তারা কাটিয়ে দেয় স্যোশাল মিডিয়ায়। তারা সবসময় নানান দুশ্চিন্তায় থাকে, অকারণেই চুপচাপ বসে থাকতেও দেখা যায়। নিজেদেরকে আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীদের থেকে লুকিয়ে রাখে। কিউরেটরদের উদ্দেশ করে বিষোদগার করতে থাকে। তার মধ্যে কিউরেটররা ভুল ধারণা সৃষ্টি করে দেয় যে তাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। সে সেটা বিশ্বাস করে হতাশায় আক্রান্ত হয় এবং সবশেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

 

এই গেম থেকে বাঁচার উপায়

এই গেম যেহেতু বাংলাদেশ পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই ইন্সটল করে নিয়েছে, সেহেতু এ থেকে বাঁচার উপায় নেই বললেই চলে। গেম আনইন্সটল করার পরিবর্তে বিভিন্ন সময় শিক্ষামন্ত্রীসহ শিক্ষাব্যবস্থার নীতি-নির্ধারক কর্তাব্যক্তিরা এই গেম আপডেট দেয়ার কাজে নিয়োজিত। তার ওপর দিনদিন কিউরেটররা তাদের অধীনস্থ শিক্ষার্থীদের এই গেম খেলিয়ে বিমল আনন্দ লাভ করে থাকে। সুতরাং এই ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থা নামের মরনখেলা থেকে বাঁচতে হলে খুব দ্রুত আমাদের সবার এগিয়ে আসতে হবে। নিজ নিজ জায়গা থেকে কিছু করতে হবে। অন্যথায় বছরের পর বছর এই
গেমের বলি হয়ে প্রাণ দেবে হাজার হাজার শিক্ষার্থী।


ব্লু হোয়েল গেম ও ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থার পার্থক্য

১. ব্লু হোয়েল গেম রাশিয়ার তৈরি, এবং ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থা একদম পিওর দেশি প্রোডাক্ট।
২. ব্লু হোয়েল গেমে কেউ ইচ্ছা হলে ঢুকতে বা ইচ্ছা না হলে না ঢুকে থাকতে পারতো। কিন্তু ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থায় এই সিস্টেম নেই। দেশে জন্ম নেয়া প্রতিটা ছেলে মেয়েকে বাধ্যতামূলকভাবে এর মধ্যে ঢুকতে হয়।
৩. ব্লু হোয়েল গেমসে কিউরেটররা হতো আমাদের অপরিচিত কিছু মানুষ আর ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থার কিউরেটররা আমাদের খুব আপন। তারা আমাদের বাবা মা, প্রতিবেশি, আত্মীয় ও শিক্ষক।
৪. ব্লু হোয়েল গেম থেকে বাঁচার জন্য সবাই আমাদের সতর্ক করতো, সাহায্য করতো। কিন্তু ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বাঁচতে কেউ হেল্প করে না, বরং সবাই বিরুদ্ধে চলে গিয়ে গেমটি খেলতে বাধ্য করে।
৫. ব্লু হোয়েল একটা অনলাইন গেম। অন্যদিকে ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থা অফলাইনে পুরো ছাত্রজীবন ধরে খেলে যেতে হয়।
৬. ব্লু হোয়েল গেম থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিস্টেম ছিল। কিন্তু এই ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বের হওয়ার কোনো সিস্টেম নেই।
৭. ব্লু হোয়েল গেম আপডেট হয় না, কিন্তু ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থা নিয়মিত আমাদের শিক্ষামন্ত্রী ও কর্তাব্যক্তিদের দ্বারা আপডেট করা হয়।
৮. ব্লু হোয়েল গেমে একজন আত্মহত্যা করলে আশেপাশের সবাই সতর্ক হতো। কিন্তু ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থায় একজন আত্মহত্যা করলে অন্যরা সতর্ক তো হয়ই না, উল্টো আরো অনেক শিক্ষার্থীকে একই পথে ঠেলে দেয়া হয়।
৯. ব্লু হোয়েল গেমের কিউরেটরা গেমারদের সরাসরি শত্রু। কিন্তু ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থার কিউরেটররা 'যা করছে ভালোর জন্য করছে' এমন দাবি করে।
১০. ব্লু হোয়েল গেম বিলুপ্ত হয়ে গেলেও ব্লু হোয়েল শিক্ষাব্যবস্থা সগর্বে সারা বাংলাদেশে একযোগে চলছে।

৫২১ পঠিত ... ২১:৪১, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৮

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top