গণপরিবহনশ্রমিক প্রজাতন্ত্রী পোড়ামবিলল্যান্ড

১১৪২ পঠিত ... ২০:৪৩, অক্টোবর ২৯, ২০১৮

কার্ল মার্কসের কাছে তার বন্ধু এঙ্গেলস ফোন করে খুশীর সংবাদ দেন।--চলো একটি দেশ থেকে ঘুরে আসি; যেখানে শ্রমিক রাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

মার্কস সংশয় প্রকাশ করেন, ঠিক বলছো তো এঙ্গেলস; নাকি গিয়ে দেখবো মাও সে তুং-এর মতো নিষ্ঠুরতা; স্ট্যালিনের মতো একনায়কবাজি; শ্রমিকরাজের কথা বলে কম ফোর টোয়েন্টিগিরি তো দেখলাম না। শেষ পর্যন্ত মুনাফা গিয়ে পৌঁছে পুঁজিপতির ট্যাঁকে।

এঙ্গেলস নিশ্চিত করেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাতেই শ্রমিকরাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; আমি নিশ্চিত।

লন্ডনে গণপরিবহনশ্রমিক প্রজাতন্ত্রী পোড়ামবিলল্যান্ড দূতাবাসে ভিসার জন্য আবেদনপত্র জমা দিতে গেলে ভিসা অফিসার দেখা যায় মুখে পোড়ামবিল মেখে বসে আছেন। মার্কস-এঙ্গেলস অবাক হন। 

ভিসা অফিসার জানান, এই পোড়ামবিল আসলে আমাদের ডেভেলপমেন্ট ফেস্টিভ্যালের আনন্দের রঙ। ঘাবড়াবেন না। তবে মার্কস সাহেব, আপনার ব্যাংক একাউন্ট ডিটেইল দেখে ভয় হয়, এতো উন্নত দেশে গিয়ে আপনি আর ফিরবেন কিনা! আজকাল টাকার লোভে অনেকেই পোড়ামবিলল্যান্ডে অবৈধভাবে থেকে যেতে চেষ্টা করে। আসলে আমাদের ব্র্যান্ডভ্যালু অনেক বেড়ে যাওয়াতেই এই প্রবণতা বাড়ছে আপনাদের মতো গরীব শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে।

শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ লেখক ও দার্শনিক বিবেচনায় ভিসা পেয়ে যান; মার্কস ও এঙ্গেলস। 

পোড়ামবিলল্যান্ডে প্লেন পৌঁছানোর পর মার্কস লক্ষ্য করেন; বিমানবন্দরটি মূলত একটি মাজার। এঙ্গেলস বলেন, এরা প্রাচ্যের মাজার সংস্কৃতির সঙ্গে ওয়েস্টমিনস্টার সিস্টেমের মিশেলে এক অনন্য শ্রমিকরাজ উপহার দিয়েছে। 

মুখে পোড়ামবিল মাখা এক গম্ভীর পুলিশ এসে জিজ্ঞেস করে, অই শ্বেতীরা, মাদকদ্রব্য আছে নাকি তগো কাছে! চুল-দাড়ি দেইখা তো সন্ত্রাসী মনে হয়। 

চেকিং সেরে বিমানবন্দরের বাইরে বেরিয়ে মার্কস দেখেন, অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আহাজারি করছে; শ্রমিকেরা অচল করে রেখেছে দেশ; গণপরিবহন চলছে না। 

মার্কস অবাক হন, কী অসীম ক্ষমতা এখানে শ্রমিকের হাতের মুঠোয়! 

এঙ্গেলস কোনমতে একটা ট্যাক্সি ঠিক করেন। দুজনে শহরের দিকে এগুতেই লক্ষ্য করে, মানুষ ময়লার গাড়িতে করে অফিসে যাচ্ছে। 

ড্রাইভার সাহেব জানান, দেশে যাই হোক; জিডিপি গ্রোথ ঠিক রাখতে দরকার পড়লে ময়লার গাড়িতে চড়ে সবাই কাজ করতে যায়। 

ট্যাক্সির গতি একটু কমতেই, কোত্থেকে কিছু লোক এসে ট্যাক্সি ড্রাইভারের মুখে পোড়া মবিল লাগিয়ে দেয়; তারা মার্কস-এঙ্গেলসের দিকে তাকাতেই ট্যাক্সি ড্রাইভার বলে, উনারা পুতুল হুজুরের লোক; উনাদের মাফ কইরা দ্যান। 

লোকগুলো চলে গেলে; মার্কস জিজ্ঞেস করেন, পুতুল হুজুর কে! 

ড্রাইভার উত্তর দেন, ঈশ্বরের ঘনিষ্ট লোক; বড় বড় লোকেরা বড় বড় বিপদে তার দোয়া নিতে যায়। 

কার্টুন: সাদাত

এঙ্গেলস লক্ষ্য করেন, কিছু লোক স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের বাস থামিয়ে তাদের স্কুলড্রেসে-মুখে পোড়া মবিল লাগিয়ে দিচ্ছে। 

ট্যাক্সি ড্রাইভার বলেন, এই ছাত্র-ছাত্রীরা গণপরিবহন শ্রমিক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলো। তাই এদের ওপর অনেক রাগ হরতালী শ্রমিকদের। এই ছাত্র-ছাত্রীদের কারণেই, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য গণপরিবহন চালকের শাস্তি বাড়ছে! কিন্তু শ্রমিকদের দাবী, গণপরিবহন চালানোর লাইসেন্স মানেই; মানুষ মারার লাইসেন্স। গণপরিবহন শ্রমিক প্রজাতন্ত্রী  পোড়ামবিলল্যান্ডে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা তাদের দায়িত্ব। 

মার্কস-এঙ্গেলস লক্ষ্য করেন এম্বুলেন্স আটকে রেখেছে ধর্মঘটীরা; ছবি তুলতে গেলে সাংবাদিকদের ক্যামেরা কেড়ে নিচ্ছে তারা। 

মার্কস জিজ্ঞেস করেন, এতো শক্তিশালী শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা কারা। এতো শক্তি শ্রমিকেরা পায় কোথায়। 

ট্যাক্সি ড্রাইভার উত্তর দেন, যিনি গণপরিবহনের মালিক; তিনিই শ্রমিক নেতা। খুব পাওয়ারফুল লোকজন। সবাই অত্যন্ত সমীহ করে এই "যিনি মালিক-তিনিই শ্রমিক নেতা"দের। আর খুব গভীর আর রহস্যময় এক ঘটনা ঘটে এখানে---যারা এই শ্রমিক ইউনিয়নের বাইরের ছাত্র-সাধারণ মানুষ; তারা ধর্মঘট করলে তাদের ভক্তরা আকুল হইয়া অস্ত্র হাতে অল্পপোশাকে হামলায় নাইমা পড়ে। কিন্তু এই গণপরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের ধর্মঘট হলে বাঘ মামারাও বিলাই হইয়া ঘুরে। 

হোটেলে পৌঁছে লবির টিভিতে মার্কস লক্ষ্য করেন, শ্রমিকেরা একটি এম্বুলেন্সকে আটকে দেয়ায় একটি সাত দিনের শিশু মারা গেছে। বিষণ্ণ হন মার্কস। এমন সময় একজন সাংবাদিক এগিয়ে এসে একটা গোলাপ ফুল এগিয়ে দিয়ে বলেন; পৃথিবীর সব ফুলই সুন্দর; কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর ফুল হচ্ছে গোলাপ। আমাদের ঈশ্বরের আশীর্বাদ নিন। 

আরেকজন সাংবাদিক আসে, তার মুখে পোড়ামবিল মাখা। সে জানায়, হোটেলের বলরুমে উন্নয়ন মেলা হচ্ছে; সেইখানে ড্রেসকোডে লেখা ছিলো; মুখে পোড়ামবিল মেখে আসতে হবে। আপনারা যেতে চাইলেও মুখে এই কালি মাখতে হবে; এ হচ্ছে আপনাদের শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আমাদের উন্নয়নমুখর প্রতিবাদ। 

কার্ল মার্কস পোড়ামবিল মাখতে রাজি না হলে; সাংবাদিক তাকে দেশের শত্রু ও ষড়যন্ত্রকারী বলে অভিহিত করে। 

কার্টুন: শিশির ভট্টাচার্য্য

এমন সময় উন্নয়ন মেলায় যোগ দিতে আসেন যিনি মালিক-তিনিই শ্রমিক নেতা। কিছু লোক শ্লোগান দেয়, শ্রমিক রাজার আগমন; শুভেচ্ছা-স্বাগতম। রিপোর্টাররা তাকে প্রশ্ন করে গণপরিবহন শ্রমিক ধর্মঘট অবসানে আপনি নিষ্ক্রিয় কেন! 

যিনি মালিক-তিনিই শ্রমিক নেতা মন্তব্য করেন, আমি হাসলে দোষ; গম্ভীর হইয়া থাকলে দোষ; কথা বললে দোষ; মুখে ঢিলা-কুলুপ আঁটলেও দোষ! আপনারা ফটোশপ কইরা আমার মুখে যখন তখন চুন-কালি দিয়া দেন; এখন বুঝেন মুখে পোড়ামবিল মাখাইলে কেমন গর্ব লাগে!

১১৪২ পঠিত ... ২০:৪৩, অক্টোবর ২৯, ২০১৮

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top