চরমপত্রের যে পর্বটি এম আর আখতার মুকুলের জন্মদিনে প্রচারিত হয়েছিল

১০১৮ পঠিত ... ২১:৪৪, আগস্ট ০৯, ২০১৮

ট্রিকস করছে। সেনাপতি ইয়াহিয়া আবার ট্রিকস করছে। ইসলামাবাদ থাইক্যা জঙ্গী সরকারের জব্বর ট্রিকস করণের খবর আইছে। আঃ হাঃ আগেই যদি আপনারা হাইস্যা দেন তয় তো’ হেগো এই কারবারডা ঠিক মতন গুছাইয়া কইতে পারুম না- সব কিন্তুক গুলাইয়া ফালামু। রোগীর মরণের আগে যেমতে একটার পর একটা উপসর্গ দেখা দেয়- এই যেমন ধরেন যাই-ই খাইতাছে, তাই-ই Return মানে কিনা ফেরৎ আইতাছে- নাড়ীর আওয়াজ উল্ডা-পাল্ডা হইতাছে, কিংবা ধরেন হেই জিনিষ অক্করে বন্ধ হইয়া গেছে- তখন ডাক্তারে কি করে? আস্তে কইর‍্যা ব্যাগ বন্ধ কইর‍্যা আত্মীয়স্বজনরে ডাকতে কয়। এর মানে বুঝছেন? হইয়া গেছে- শেষ দমডা ছাড়নের টাইম হইয়া গেছে। এইটারেই Gentlemanরা ডাক্তরের জওয়াব কয়, এলায় বুঝছেন।

ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকারের অহন হেই টাইম আইস্যা গেছে। ইরান থাইক্যা চাচাতো ভাই, সৌদী আরব থাইক্যা খালু, বাহরায়েন থাইক্যা হাউড়ী, কুয়েত থাইক্যা ফুপা, টার্কি থাইক্যা ভায়রা, জর্দান থাইক্যা শালী আর ওয়াশিংটন থাইক্যা শ্যামু চাচা ছাড়াও পুবের থনে নতুন মামু আইস্যা ব্যাডার মাথার কাছে খাড়াইয়া হাওয়া দিতাছে। ডাক্তার কইছে, সাড়ে চাইর মাস ধইর‍্যা বহুত ইঞ্জিশন-ফিঞ্জিশন আর দাওয়াই করছি- কিন্তু কোনোডাই কামে আইলো না। এই বিমারের লগে ভিয়েতনাম আর কম্বোডিয়ার বিমারের খুবই মিল দেখতে পাইতাছি। আমাগো ডাক্তারি কেয়াবে এইডার আর কোনো ওষুধ নাইক্যা। একমাত্র উপায় ট্রিকস। আমার পেসেন্ট ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার- এর মইদ্দে বহুত ট্রিকস করছে।

পয়লা শেখ মুজিবরের বাবা-সোনামনি মানে কিনা ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ডাক দিলো- কাম হইলো না। হেরপর বেশুমার বাঙালি মার্ডার কইরা বাহাত্তর ঘন্টার মাইদ্দে কারবার খতম করতে চাইলো- কিন্তু কেস কাঁচা হইয়া গেলগা- হেগো আশি হাজার মছুয়া সোলজার আইস্যা বাংলাদেশের ক্যাঁদো আর প্যাঁকের মাইদ্দে হান্দাইয়া গেল। এইবার হারু পাট্টির নেতা হরিবল হোক, খান সবুর, খাজা খয়ের, মাহমুদ আলী, আজম-ফরিদ, ফকাগো লইয়্যা খুবই ফাল পাড়ালো- হেগো চাচা আর মামুরা পর্যন্ত হাইস্যা দিলো। লগে লগে আলহাজ্ব জহির উদ্দিনরে ময়দানে নামাইলো- ব্যাডায় কি খুশি? ১৬৭ডা আওয়ামী লীগ মেম্বারের দশটা জোগাড় করতেই হাজী সা’বের কাপড় বাসন্তী রং হইলো। ৯৬৭ টাকার টিকিট কিনন্যা পি.আই.এ. বিমানে বেগম আখতার সোলেমানরে করাচীর থনে ঢাকায় পাড়াইলো। বেগম হাসেবা ঢাকায় বাকরখানি খাইয়া অক্করে লন্ডনে পাড়ি জমাইলেন। আচ্ছা দেখাইতাছি, কইয়া, সেনাপতি ইয়াহিয়া সা’ব সব চৌদ্দ বছরের ফাঁসি দিলো আর সম্পত্তি নিলাম করলো। লগে লগে খোদ ঢাকা টাউনেই বিচ্চুগো কারবার শুরু হইলো। গাবুর মাইরের চোটে কুষ্টিয়া-যশোর রাজশাহী-চাপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর-রংপুর, সিলেট-ময়মনসিংহ আর কুমিল্লা নোয়াখালীর বিরাট এলাকার থনে মুছয়াগুলা ভাগোয়াট হইলো।

ইয়াহিয়া-হামিদ-টিক্কার দল আবার ট্রিকস করলো। বাঙালি রিফিউজি ফেরৎ আননের লাইগ্যা Reception centre খুইল্যা বইলো। রেডিও রিপোর্টার , টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যান, এ.পি.পি.-র সংবাদদাতারা সব তীর্থের কাউয়ার মতো Reception centre-এ বইস্যা মাছি মাইর‍্যা পাহাড় কইরা ফেলাইলো। হ্যাষে দেহে কি, পাঁচটা হেই জিনিষ আইস্যা হাজির হইলো। লগে লগে বাংলাদেশের গেরামের মাইদ্দে জ্যান্ত মানুষ ধইর‍্যা Reception centre-এ আননের লাইগ্যা ছ্যাল-কুৎ-কুৎ ছ্যাল-কুৎ-কুৎ- মানে কিনা হা-ডু-ডু খেলা শুরু হইলো। এই খেইলের মাইদ্দেও যখন হাইর‍্যা গেল, তখন কিছু শিক কাবাব খাওয়াইন্যা মানুষরে ধুতি পরাইয়া Reception centre-এ আইন্যা ফডো তুললো। নাহ্‌ এইডাও কোনো কামে আইলো না-এলায় করি কি? প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খানরে দিয়া ইন্ডিয়া আর বাংলাদেশে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক বহাবার প্রস্তাব দিলো। যদি ইন্ডিয়া টোপটা গেলে। এক ঝাপটে সদরুদ্দিন সা’বে কইলো, ‘বাংলাদেশে শরণার্থীরা ফেরত গেলে হেগো লাইফের Risk নিতে পারি না।’ এর পর ২৮শে জুনের বেতার বক্তৃতা মাঠে মারা গেল।

এইবার খান সাহেব তার রক্তমাখা হাত দুইটা গামছা দিয়া মুইছ্যা ইন্ডিয়ার লগে বাতচিত্‌ করণের প্রস্তাব দিলো। ক্যামন বুঝতাছন হেগো ট্রিক্‌স-এর মাইর প্যাঁচ? লড়াই হইতাছে জঙ্গী সরকার আর বাংলাদেশের মাইদ্দে কিন্তুক মওলবী সা’ব আলাপ করতে চান শ্রীমতি ইন্ডিয়া গান্ধীর লগে। যদি রাজী হয় তয়তো লগে লগে চিল্লাইতে শুরু করবাম, এইডা তো ইন্ডিয়া আর পাকিস্তানের ব্যাপার। কিন্তুক শ্রীমতী ইন্ডিয়া ‘নো’ কওনের গতিকে ব্যাডায় কি রাগ? বাংলাদেশের কেইসটা ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের ব্যাপার বইল্যা প্রমাণ করণের লাইগ্যা সেনাপতি ইয়াহিয়া আবার ট্রিক্‌স কইরা কইলো, ‘আমি কিন্তু ইন্ডিয়ার লগে লড়াই করমু, আমার লগে মামু আছে।’

‘ঢাল নাই, তলোয়ার নাই, নিধিরাম সর্দার।’ কিন্তুক চোটপাট আর ট্রিক্‌সের অস্ত নাইক্যা। বাইছ্যা বাইছ্যা বাঙালি দালাল সম্রাট হরিবল হক, চুষ-পাজামা মাহমুদ আলো, বজ্জাত হোসেন আর মোহর আলীকে ফরিনে পাডাইলো। লন্ডনে নয়া History হইলো। হেইখানে ২৫ হাজার লোক জঙ্গী সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাইলো। লগে লগে পিন্ডির থনে অর্ডার আইলো রেডিওর Propaganda-র মাইদ্দে কইয়া দাও ‘বাঙালি রিফিউজিরা খুবই কষ্ট পাইতাছে।’ রিফিউজিরা কইলো মরণ ভালো না কষ্ট ভালো। আবার রেডিও গায়েবী আওয়াজ চিল্লাইয়া উঠলো, ‘দুশমনগো মাইদ্দে Division হইছে।’

বকশি বাজারের ছক্কু মিয়ার থনে শুরু কইর‍্যা দিনাজপুরের গুদরি বাজারের সের কাটু মোহাম্মদ পর্যন্ত হাইস্যা ফেলাইলো। এরপর যখন ইসলামাবাদে রিপোর্ট আইলো যে, বাংলাদেশের হানাদার সোলজারগো বাংকারগুলা পানিতে ভইর‍্যা পুকুর হইছে, আর যেগুলা ভিতরে আছিলো হেইগুলাও ভিজা বুট আর কাপড় লইয়া উপরে উঠতে পারতাছে না। আর তখন ঘলঘলাইয়া বন্যার পানি কেবল বাংলাদেশে আইতে শুরু করছে- তখন হেরা মরণ কামড় দিয়া লাস্ট চান্সিংডা করছুইন। হাতের কাছে থাউক আর না থাউক ১৬৭ জন আওয়ামী লীগ মেম্বারের ৭৯ জনের ইলেকশন কেনচেলের অর্ডার দিলো- এই সব জায়গায় উপ-নির্বাচন হইবো। আর ৮৮ জনের নাম ঘোষণা করে বলেছেন, ‘এদের মেম্বারশিপ বহাল রইলো।’ কি রকম ব্যাডা একখান। যেমন লাগে এই অর্ডারেই ১৬৭ জনের মাইদ্দে দুইডা ভাগ হইয়া গেল আর কি? 

এরেই কয় বুদ্ধির ঢেঁকি। What is called ঢেঁকি? Two man থাপুর ধুপুর One man clearing, that is called ঢেঁকী। ক্যামন বুঝতাছেন? হেগো ট্রিক্‌সডা কোন স্টেজে যাইয়া হাজির হইছে। সেনাপতি ইয়াহিয়ার এই order-এর চোটে অক্করে ৮৮ জন আওয়ামী লীগের মেম্বার মুক্ত এলাকার থনে দৌড়াইয়া যাইয়া হেগো কোলে বইবো আর কি? কেইসটা খেয়াল কইরেন। এখনো কিন্তু মওলবী সা’বের পার্লামেন্টের পয়লা সেশনডাই হয় নাইক্যা। এই সেশনে বহনের আগেই ব্যাডায় দশ লাখ মানুষ Marder করছে। সেশন বইলে না জানি কি হইতো? কিন্তু বাঙালিগো একতার চোটে মরণ হেচকি উডাইতাছে। চিল্লাইয়া কইতাছে, ‘আজিমপুরও চিনি- নামাজ ঘরও চিনি।’ খালি বিচ্চুগো মাইরের চোটে অহন অক্করে ছেরাবেরা হইয়া গেছেগা। হেইর লাইগ্যাই কইছিলাম হইয়া গেছে- হেগো শেষ দমডা ছাড়নের টাইমে হইয়া গেছে। এইডারেই Gentleman বা ডাক্তরের জওয়াব কয়- এলায় বুঝছেন?

[১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত। পরবর্তী সময়ে লেখক এম আর আখতার মুকুলের চরমপত্র বইয়ে লেখাটি সংকলিত হয়।]

১০১৮ পঠিত ... ২১:৪৪, আগস্ট ০৯, ২০১৮

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top