জনসেবায় জ্বলে উঠছে দাতব্য সংস্থা 'টাইম মেশিন লীগ'

১৫৪৪পঠিত ...২৩:৫১, জুলাই ০৮, ২০১৮

বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল। প্রযুক্তি ক্ষেত্রে আমাদের উন্নয়ন যেন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। উন্নয়নের সেই ধারাতেই টাইম মেশিন লীগ নামে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

এর সদস্যরা প্রত্যেকেই এক একটি স্বপ্রণোদিত স্বয়ংসম্পূর্ণ টাইমমেশিন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কোথাও সরকারের সমালোচনা হলেই অটোমেটিক টাইম মেশিন লীগের সদর দপ্তরের মাস্টার কন্ট্রোল রুমে লাল বাতি জলে ওঠে।

আজিজ সুপার মার্কেটের একটি বইয়ের শো রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছিলো একদল ব্লগার।

তাদের একজন আক্ষেপ করে বলে, লেখালিখির স্বাধীনতা নেই। সরকারের খারাপ কাজের সমালোচনা করলে পুলিশ ৫৭ ধারায় গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে। আর ধর্ম নিয়ে রাজনীতির সমালোচনা করলেই ধর্মের ঠিকাদার ও হেফাজত কারীরা চাপাতি দিয়ে হত্যা করবে।

ঠিক এ সময় আড্ডায় অনুপ্রবেশ করে টাইম মেশিন লীগের গজব তারিখ। সে অট্টহাসি হেসে বলে, তারিখ খুব গুরুত্বপূর্ণ। তারিখ ভুলতে নেই। চলুন আপনাদের বিএনপি আমলের ২১ অগাস্টের গ্রেনেড হামলার দিনে নিয়ে যাই। দেখবেন কী নৃশংস ছিলো ওরা। গজব মোবাইল ফোনে ২১ অগাস্টের গ্রেনেড এটাকের ফুটেজ চালিয়ে উপস্থিত সবাইকে দেখায়। গজব বলে, দেখুন কেমন গজব নেমে এসেছিলো দেশের মানুষের জীবনে। ১৭ অগাস্টের ৬৩ জেলায় বোমা হামলার ফুটেজও আছে। কাজেই উত্তেজিত না হয়ে ভরসা লীগে যোগ দিন।

নাসির নগর বাজারে বসে এক ভদ্রলোক উপস্থিত অন্যদের বলে, আমাদের সনাতন ধর্মীদের জীবনের দুঃখ কষ্টের কোন বিহিত দেখিনা। প্রতিদিন ভয়ে ভয়ে বাঁচি। এ আমলে ভেবেছিলাম একটু স্বস্তি মিলবে। কিন্তু হলো আর কই!

হাতে একটি ফাইল নিয়ে হাজির হয়ে যায় টাইম মেশিন লীগের মুন্সীজী। মুন্সী তার ফাইল থেকে ২০০১ সালে নির্বাচনে জেতার পর বিএনপির সমর্থকদের হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের খবরের পেপার কাটিং আর ছবি দেখিয়ে বলে, ভুলে যাবেন না ভাই ভুলে যাবেন না। এই যে দেখুন বিএনপি কতো ভয়ংকর ছিলো।  আর একটা কথা বলি, বামাতিদের বাধায় রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে না ওঠায় নাসিরনগরে ফকফকে আলো ছিলো না বলেই লীগে অনুপ্রবেশকারী জামাত-শিবির হিন্দুপাড়ায় হামলা করতে পেরেছে। দোষ যদি দিতেই হয় বামাতিদের দিন। সরকারকে নয়।

ফার্মার্স ব্যাংক ভরাডুবিতে চাকরি হারানো একটি পরিবারের লোক বসে আক্ষেপ করছে, এতো প্রিয় সরকারের প্রিয় মানুষের তৈরি ব্যাংক এভাবে আমাদের পথে বসাবে তা বুঝিনি আগে। টাইম মেশিন লীগের উপদেষ্টা ইতিহাসবিদ সালমান এফ তাসির এসে একগাদা ইতিহাসের বই সবার হাতে হাতে দিয়ে বলেন, এসব ছোটখাট বিষয়ে মায়াকান্না করে শত্রুর হাতে অস্ত্র তুলে দেবেন না; স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি সুযোগের অপেক্ষায় আছে। স্বাধীনতার স্বপক্ষের সরকার না থাকলে পরাজিত শক্তি দেশটাকে গন্ধমাদন পর্বতের মতো তুলে পাকিস্তানে নিয়ে যাবে। সত্যিই আপনাদের মতো অনিচ্ছুক জনতাকে স্বাধীনতা এনে দেয়াটাই আমাদের ভুল হয়েছে।

সাংবাদিক সাগর-রুনির ছেলে মেঘ বাবা-মার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছিলো। তার বিষণ্ণ মুখ আর চোখের নীচে গড়িয়ে পড়া অশ্রু দেখে এসে পড়ে টাইম মেশিন লীগের গব্বরদা। গব্বরদা মেঘকে আদর করে বলে, বাবা চলো তোমাকে রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে নিয়ে যাই। দেখবে পাকিস্তানের ঘাতকেরা কীভাবে হত্যা করেছিলো বুদ্ধিজীবীদের। সেইসব সূর্যসন্তানেরা জীবন দিয়েছিলেন বলেই তুমি আজ স্বাধীন দেশের গর্বিত নাগরিক। আর তোমার বাবা-মার জীবন; এ হচ্ছে উন্নয়নের জন্য বলিদান। এসো তোমার মন ভালো করে দিই বাবা; বলেই গব্বরদা মোবাইল ফোনে ড মাহফুজের দেশের গান চালু করে দেন। স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়িয়ে ড মাহফুজ দেশ বন্দনা করছেন।

ক্রসফায়ারে ‘মাদক সম্রাট’ বলে মেরে ফেলা এক নির্দোষ মানুষের পরিবার বসে আহাজারি করছিলো। হাজির হয়ে যায় টাইম মেশিন লীগের ক্ষুদ্র সাইদুল। সে বিরক্ত হয়ে বলে, আপনারা কোন খোঁজ রাখেন না; আপনাদের পরিবারের সদস্য মাদক সম্রাটই ছিলো। আমাদের র‍্যাব কখনো ভুল মানুষের সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধ করে না।

এবার ক্ষুদ্র সাইদুল একটি ফাইল বের করে বিএনপি আমলের ক্রসফায়ারের খবরের পেপার কাটিং দেখায়। দেখুন দেখুন সে সময় আমাদের র‍্যাবের চেয়ে বেশি লাশ ফেলেছে বিএনপির র‍্যাব।

কোটাসংস্কার আন্দোলনে জাতীয় শহীদ মিনারের সামনে লাঞ্ছিত এক নারী সংবাদ সম্মেলনে বলে, আমাকে ওরা যখন সিএনজিতে তুললো তখন মনে হচ্ছিলো জাহান্নামে আছি। থানায় যখন গেলাম তখন সেটা ছিলো দ্বিতীয় জাহান্নাম।

টাইম মেশিন লীগের হাছান মকসুদ এসে ধর্ম-যাজকের মতো স্মিত হেসে বলে, এতো সহজেই একাত্তরের বিভীষিকার কথা ভুলে গেলে বোন। মোবাইল ফোনে একাত্তরের নির্যাতিতা নারীদের ফুটেজ দেখিয়ে বলে, বোন এতো তুচ্ছ বিষয়ে আমাদের সোনার ছেলেদের সমালোচনা করে শত্রুর হাতে অস্ত্র তুলে দিওনা। চারিদিকে শত্রু। তাই তুমি দেশপ্রেমিক নীরবতা লীগে যোগ দাও। এ সময় শহীদ মিনারে ছাত্রদের ওপর ছাত্রলীগের নৃশংস নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শী কুকুর এসে অশ্রুসিক্ত চোখে হাছান মকসুদের দিকে তাকিয়ে থাকে। আরেকটি মেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বলে, ভাইয়া এই কুকুরটিকে দেখুন; আমরা ওর মতো বিবেকসম্পন্ন হতে চাই; কিন্তু আপনার মতো ধামাচাপাজীবী হতে চাই না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হাতুড়ি লীগের ছেলেরা লাঠি ও হাতুড়ি দিয়ে হাড় ভেঙ্গে দেয়া তরিকুলকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তারবাবু  রিলিজ করে দেবার পর তার বন্ধুরা তরিকুলকে আরেকটি ক্লিনিকে  নিয়ে গিয়ে আক্ষেপ করে, যুদ্ধাবস্থাতেও পৃথিবীর কোন দেশের হাসপাতাল এরকম আহত রোগীকে বের করে দেয়না।

টাইম মেশিন লীগের হিরক বাল্টন সেখানে হাজির হয়ে বলে, খামোশ। তোরা সব কয়টা জামাত-শিবির রাজাকারের বাচ্চা। বাল্টন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা সময়ে ছাত্রশিবিরের নির্যাতনের ছবি দেখিয়ে বলে, তরা রগ কাইটা দিবি আর আমরা হাতুড়ি ব্যবহার করতে পারুম না ক্যারে!

একটা ছেলে এসে চেপে ধরে বাল্টনকে, আমার সঙ্গে এক্ষুণি আপনাকে আমার গ্রামের বাড়িতে যেতে হবে। আমার পরিবারে মুক্তিযোদ্ধা আছে; মুক্তিযুদ্ধে শহীদের কবর আছে; বাড়ির দালানে এখনো পাকিস্তানের মিলিটারির দেয়া আগুনের দাগ লেগে আছে। তারপর আপনার সঙ্গে আপনার গ্রামের বাড়িতে যাবো। আপনার পরিবারের মুক্তিযোদ্ধা-শহীদ দেখাতে হবে আজ; আজ আর কোন ছাড়াছাড়ি নাই।

টাইম মেশিন লীগের মাস্টার কন্ট্রোলরুমের লাল বাতিটা বার বার জ্বলতে আর নিভতে নিভতে ফটাস করে বিস্ফোরণ ঘটায়।

১৫৪৪পঠিত ...২৩:৫১, জুলাই ০৮, ২০১৮

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
    আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

    আইডিয়া

    গল্প

    রম্য

    সঙবাদ

    সাক্ষাৎকারকি

    
    Top