ক্রসফায়ারের দিনগুলিতে বন বাবুর বৈঠকখানা

২৬০৬পঠিত ...০৪:২৬, জুন ০৪, ২০১৮

অনেক দিন পর একটা ফ্যামিলি রিইউনিয়ন। সবাই একসঙ্গে হবার একটা বিরাট সুযোগ। খালি হয়ে পড়ে থাকা বাড়িটা আজ গম গম করছে। বিধবা বড় মেয়েটা একাই থাকে এখানে। তার একমাত্র কন্যা সুনয়না এমেরিকায় ডাক্তারি পড়ে। সে-ও এসেছে।

সাবেক বন কর্মকর্তার আলিশান বাড়িটিতে আজ অনেক দিন পর যেন জীবনের মুখরতা। বাড়িজুড়ে সুন্দরবনের সেরা কাঠের তৈরি আসবাব। বন বাবু খুলনা পোস্টিং-এর সময় খুব শখ করে এই আসবাবগুলো বানিয়েছিলেন। দেয়ালে সুন্দরবনের হরিণের নয়নাভিরাম মুখাবয়ব মমি করে রাখা; আরো আছে হাতির দাঁত; বাওয়ালিদের ছবি--সামনে হ্যাট পরে বনবাবু চেয়ারে বসে।

অলংকরণ: সামির

বড় মেয়ের ঘরের নাতনি সুনয়না বলে, ‘ওয়াও... নানুভাই কতো হ্যান্ডসাম ছিলো। কী একযটিক কালেকশান তার।’

বড় আপা বলে, আজই মনে হয় প্রথম দেখছো!

--সে তোমার ডিসপ্লে করার গুনে মা।

--শুধু নানাভাইয়ের একযটিক কালেকশানই দেখলে, লাইব্রেরিটা দেখলে না; আর গানের কী বিশাল এলপি কালেকশান।

সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিলো, হঠাতই অস্ট্রেলিয়া থেকে বেড়াতে আসা দুলাভাই বলে বসে, ‘আই ওয়ান্ট টু কনগ্রাচুলেট দিস গভমেন্ট। অনলি ক্রসফায়ার ক্যান ফিক্স দিস রটেন সোসাইটি।’

অস্ট্রেলিয়া আপা বলে, রাখো তো পলিটিক্সের কথা; এই বস্তি কোনদিনই ঠিক হবে না!

অস্ট্রেলিয়া দুলাভাই বলে, তোমাদের এই এলিট মিডল ক্লাসের ‘আই হেট পলিটিক্স’ এটিচ্যুডের জন্যই দেশের আজ এ অবস্থা।

শ্যালিকা মৌটুসি বলে, ঠিক বলেছেন দুলাভাই। উই হ্যাভ টু টেক রেসপনসিবিলিটিজ। আসলে এই এলিট মিডলক্লাসটা হলো সুশীল; এরা কোন দায়িত্বও নেবে না; শুধু সমালোচনা করার বেলায় আছে। আই সাপোর্ট দিস ক্রস ফায়ার।

মৌটুসির বর বলে, তাই বলে তুমি বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সাপোর্ট করবে!

--হ্যাঁ করবো; কারণ আমি দেশটাকে ভালোবাসি।

--তোমার এরকম এথিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড বিয়ের আগে তো বুঝিনি।

দেশের মানুষকে যে ভালোবাসে না; চায় তাদের পাখির মতো গুলি করে মারা হোক; সে দেশকে ভালোবাসবে কীভাবে।

অস্ট্রেলিয়া দুলাভাই হস্তক্ষেপ করে, শোন সেজান; রাখোতো তোমার ঊনবিংশ শতকের আবেগ। লুক এট লি ক্যুয়ান; উনি নিষ্ঠুর হয়েছিলো জন্য সিঙ্গাপুর আজ সুন্দর।

--লী কুয়ান দুর্নীতি বন্ধের জন্য কঠোর আইন করেছিলো। ক্রসফায়ারের মাধ্যমে সমাজের কোনো সংস্কারই করেনি।

অস্ট্রেলিয়া দুলাভাই বলে, ‘ঠিক আছে; তাহলে মাওসেতুং এর কথা বলো। উনি ক্রসফায়ারের মাধ্যমেই আজকের চীনের ভিত্তি তৈরি করেছেন।’

--চীনের যে সমাজ; সেটাকে কী খুব নরমাল মনে হয়! মাও সে তুং তো খুনাখুনির মধ্যে দিয়ে একটা অস্বাভাবিক সমাজ তৈরি করেছে। অস্ট্রেলিয়ায় যে বাক-স্বাধীনতা ও স্বাভাবিক জীবন আছে; চীনে তার কিছুই নেই। আপনি অস্ট্রেলিয়া ফেলে চীনে গিয়ে থাকতে চাইবেন কী! একদলীয় শাসন ব্যবস্থা একটা চিরস্থায়ী স্বৈরশাসন। একবিংশের মানুষ হয়ে সেই জীবন মেনে নেওয়া অসম্ভব।

হঠাতই সাদা বাঁধানো দাঁত বের করে হাসতে হাসতে আসে মেঝ মেয়ের জামাই; খুব রসিক মানুষ! মেঝ মেয়ে লন্ডনে গেছে; মেঝ মেয়ের ঘরের নাতনি সন্তান সম্ভবা; তাই ধাত্রী হিসেবে ছুটে যেতে হয়েছে তাকে। মেঝ দুলাভাই আমোদের স্বরে বলে,

-- তা কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে! মাও সে তুং-এর নাম শুনলাম মনে হয়। আই লাভ হিম। আমার তো ক্রসফায়ারকে মাওসেতুং-এর কালচারাল রেভোলিউশানের মতো মনে হয়। হ্যাটস অফ টু বুবু।

লিভিং রুমে একটা নীরবতা নেমে আসে। সুনয়না তার খালুকে জিজ্ঞেস করে, ‘খালু টেন ইয়ারস টেনিওরের শেষ প্রান্তে এসে আপনাদের এই মাদক সমস্যাটা চোখে পড়লো কেন!’

--প্রায়োরিটি থাকে মা প্রায়োরিটি থাকে; ওয়ার ক্রিমিনালদের ট্রায়ালটা করতে গিয়ে উই হ্যাড টু ফেইস নিউমেরাস কন্সপিরেসিজ।

অলংকরণ: সামির

অর্থনীতিকে মজবুত করার চ্যালেঞ্জটাই বা কম কীসের! পদ্মা সেতু তৈরী হচ্ছে সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থায়নে; সবশেষে মহাশূণ্যে স্যাটেলাইট উড়িয়ে তারপর আমরা ওয়ার অন ড্রাগস-এ এলাম।

--ইলেকশানের আগে আগে এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কিলিং অপোজিশানের ওপরে চড়াও হবার একটা টার্গেট রেখেছে; এমন লিখেছে ডেইলি টেলিগ্রাফ।

--কী বলবো সুনয়না; আমাদের এনিমিরা সারাবিশ্বে সক্রিয়; সেই একাত্তরের পরাজিত শক্তি।

--খালু একাত্তরের পরাজিত শক্তি ৪৭ বছর ধরে প্রতিশোধের জন্য ঘুরছে; আজো তারা আপনার কাছে ফ্যাক্টর; এই ঘোস্ট স্টোরিটা কী আর বিক্রি হবে!

ঘেমে ওঠে ভদ্রলোক। যে মেয়ে এমেরিকার বাফেলোতে মেডিসিন-এ পড়ছে; তাকে তো আর দেশের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ছেলে-মেয়েদের মতো পট করে 'শিবির' বলে দেয়া যায় না। সুতরাং কবি নীরব হয়ে যান।

ভদ্রলোকের ছেলে রনি চোখ লাল করে ঠিক এ সময় অকুস্থলে প্রবেশ করে। সবাই রনির দিকে তাকায়। সে ভদ্রলোককে বলে, ‘বাবা তোমার কাছে ফাইভ কে হবে?’

আজকাল ছেলের মুখে 'বাবা' ডাক শুনলেই ভদ্রলোকের ভয় লাগে। সুনয়না রনিকে জিজ্ঞেস করে, তোমার শরীর কী খারাপ করছে; তোমার শরীর অমন শেইক করছে কেন!

ভদ্রলোক বলে, ও কিছু না। ওয়ালেট থেকে পাঁচ হাজার টাকার একটা নোট বের করে দেয়। মনে মনে চায়; রনি এক্ষুণি বিদায় হোক। বড় খালা জিজ্ঞেস করে, কীরে রনি খেয়ে যাবি না!

কথা শেষ করার আগে রনি উধাও হয়ে যায়।

অস্ট্রেলিয়ার দুলাভাই আবার শুরু করে, যাই বলো মাদকটা একটা গুরুতর সমস্যা; ব্যাপারটাকে হালকাভাবে নেবার উপায় নেই।

ম্যাডামভক্ত ছোট মামা সোফায় চুপচাপ বসে ছিলো। বুবুভক্ত ক্ষমতাসীন জামাইয়ের সামনে আজকাল তিনি চুপচাপই থাকেন। তবু কী মনে করে একবার শুধু বলে, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দিয়ে ম্যাডামও অপরাধী-সন্ত্রাসী নির্মূলের চেষ্টা করেছিলেন। লাভ তো হয়নি কিছুই। সাময়িক স্বস্তির জন্য ক্রসফায়ারে আমি তো কোন লাভই দেখিনা।

বুবুভক্ত হাসতে হাসতে বলে, মামু আপনাদের মুখে মানবতার কথা শুনলে বড্ড হাসি পায়। মনে হয়, এ কী কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে!

সেজান বলে, দুলাভাই ছোট মামাদের ভুল থেকে আপনারাও কিন্তু শিক্ষা নিতে পারতেন।

বুবুভক্ত চটে যায়, কীসের ভুল; আমাদের বুবু নির্ভুল; উনার কোন ভুল হইতে পারে না। তুমি কী উনার চেয়ে দেশটাকে বেশি ভালোবাসো। খবরদার সুশীলদের মতো কথা বলবা না।

বড় আপা বলে, ‘এই এসো তোমরা খেয়ে নাও।’

টেবিলে আঠারো ঊনিশ পদের তরকারি। অস্ট্রেলিয়া দুলাভাই সশব্দে খেতে খেতে বলে, এই খাওন দ্যাখলে মনে হয়; সব কিছু ছাইড়া দিয়া দ্যাশে চইলা আসি।

সেজান টেবিলের দিকে তাকিয়ে ভাবে সে কী ভুল দেখছে! সুনয়না কেবল ভেজিটেবল দিয়ে পোলাও খাচ্ছে। সে কোনো গোশতের টুকরা নিচ্ছে না কেন!

সেজান সুনয়নাকে জিজ্ঞেস করে, ‘মাংস খাও না যে, ভেজিটেরিয়ান হয়ে গেলে নাকি!’

আমিও ভাবছিলাম, আপনাকে ঠিক এই প্রশ্নটাই করবো।

তারপর দুজন চুপচাপ খেতে খেতে ম্যাডামভক্ত ছোট মামার দিকে তাকিয়ে দেখে, সে যেন মানুষের কানের কারি খাচ্ছে; বুবুভক্ত দুলাভাই খাচ্ছে মানুষের চোখ ভাজা; আর অস্ট্রেলিয়া দুলাভাই খাচ্ছে, মানুষের পায়ের নেহারি।

অলংকরণ: সামির

২৬০৬পঠিত ...০৪:২৬, জুন ০৪, ২০১৮

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
    আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

    আইডিয়া

    গল্প

    রম্য

    সঙবাদ

    সাক্ষাৎকারকি

    
    Top