হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা যেভাবে বাংলাদেশের মাদক ব্যবসায়ী দূরীকরণে ব্যর্থ হলেন

১৮০৬পঠিত ...০১:৩২, মে ২৮, ২০১৮

এক পৃথিবীতে ছিল এক দেশ, নাম বললে চাকরি থাকবে না। সেই দেশে ছিল কয়েক কোটি সমস্যা। তবে যে সমস্যাগুলো শেকড় গজিয়ে একেবারে বটবৃক্ষ হয়ে উঠেছিলো, তার মধ্যে একটি ছিল মাদক! মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্মে প্রশাসনের ঘুম হারাম হয়ে গেলো। অথচ এই মাদক ব্যবসায়ীদের কারণে ইয়াবার মতো বিপদজনক ও ক্ষতিকর নেশায় স্বেচ্ছায় নিজের ঘুম হারাম করছিলো সম্ভাবনাময় তরুণেরা।

মাদক ব্যবসায়ীদের কী করে দমন করা যায়, সে নিয়ে প্রশাসন একেবারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে চলে গেলো। ঠিক সে সময়, দেশটির কালো পোশাকধারী আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যালয়ে হাজির হলেন একজন বাঁশিওয়ালা। তার কাঁধে বিশাল এক ঝোলা, নানান রকম বাঁশিতে ভর্তি।

অলংকরণ: সালমান সাকিব শাহরিয়ার

গেটে এক কর্মকর্তা তাকে আটকালেন।

-আরে, কই যান আপনি?

-জি, আমি মহাপরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে চাই।

-কী চান?

-আমি দেশ থেকে মাদক ব্যাবসায়ীদের নির্মূল করতে পারি। সে ব্যাপারে কথা বলতে চাই।

-কী? নেশা করোস নাকি ব্যাটা? এই, এই পোলার ব্যাগ চেক কর তো।

বাহিনীর একজন সদস্য তাঁর কাঁধ থেকে ব্যাগটি টেনে নিলেন।

-ব্যাগে কী?

-বাঁশি।

-দেখেই বুঝছিলাম তুই যে বাঁশি-টাশি খাস। ব্যাগে দ্যাখ তো ট্যাবলেট-টুবলেটও আছে কিনা...

-এইটা খাওয়ার না, বাজানোর বাঁশি।

-কোনটা কোন বাঁশি আমাদের বুঝতে দে। এই এরে ভেতরে নিয়া যা তো, ব্যাগ ভালোমতো চেক কর...

বাঁশিওয়ালাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। কোথা থেকে এসেছে, কী চায়, নানান রকম জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। জানা গেলো, সে হ্যামেলিন থেকে এসেছে।

বাঁশিওয়ালার ব্যাগ জব্দ করে তাকে মহাপরিচালকের সঙ্গে কিছুক্ষণের জন্য দেখা করার অনুমতি দেয়া হলো।

মহাপরিচালক আরো কয়েকজন অফিসারের সঙ্গে বসে শহরের ম্যাপ খুলে বিভিন্ন জায়গা লাল কালিতে দাগাচ্ছিলেন। সম্ভবত এগুলোই মাদক ব্যবসায়ীদের আখড়া। বাঁশিওয়ালাকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর রুমে ঢুকলেন ওই কর্মকর্তা।

-স্যার, এই পোলায় কী কয় দেখেন। সে নাকি হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা, বাঁশি বাজায়া শহর থেকে মাদক ব্যাবসায়ী তাড়াবে।

মহাপরিচালক ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত বাঁশিওয়ালাকে দেখলেন। তারপর হো হো করে কিছুক্ষণ হাসার পর বললেন, ‘গাঁজা কি আজকে বেশি খায়া ফেলছো?’

বাঁশিওয়ালা গম্ভীর গলায় বললো, ‘আপনাদের বদি ভাইয়ের মতো আমিও নেশা করি না। জীবনে সিগারেট তো দূরের কথা, এক কাপ চা-ও খাইনি।’

মহাপরিচালক একবার গলা খাকারি দিয়ে বললেন, ‘চাও কী?’

-বাঁশি বাজিয়ে শহর থেকে মাদক ব্যবসায়ীদের নিয়ে যেতে চাই।

-কেন? তোমার সমস্যাটা কী হইতেছে?

-এই শহরে থাকলে তারা বন্দুকযুদ্ধে মারা যাবে। আমি বাঁশি বাজিয়ে তাদের অন্য শহরে নিয়ে যেতে চাই। এখানে তারা নিরাপদ না।

মহাপরিচালক উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘ওদের আবার কিসের নিরাপত্তা? ওরা কি ভালো মানুষ? ওরা মাদক বেচে, যেগুলা দেশরে নষ্ট করতেছে। ওদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নাই।’

হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা শান্ত গলায় বললো, ‘বেঁচে থাকার অধিকার কার আছে কার নেই, এটা ঠিক করার অধিকার আমাদের কারও নেই স্যার। যে বেঁচে আছে, বেঁচে থাকার অধিকার আছে বলেই বেঁচে আছে।’

কর্মকর্তা একবার মহাপরিচালকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘স্যার বলেন, এইটারেও মাদক ব্যবসায়ী বানায় দিই।’

মহাপরিচালক কিছুক্ষণ চুপ থেকে এরপর বললেন, ‘না। ও যা করতে চায় করুক। তুমি বাঁশি বাজায়ে যা করতে চাও করো। কিন্তু কাজটার বদলে চাও কী?

হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালাও কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। কিছুক্ষণ ভেবে এরপর বললো, ‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সবরকম ছোটবড় আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারে। এ দেশের আরও অনেক সমস্যা আছে যেগুলো আইনের প্রয়োগ আর বাস্তবায়নের অভাবে সমাধান হচ্ছে না, সেগুলো সমাধান করতে হবে।’

কর্মকর্তা আবারও মহাপরিচালকের দিকে তাকালেন। সম্ভবত আগের কথাটাই আবার বলতে চাইলেন, স্যার হ্যাঁ সূচক ইশারা করলেই ঘটনা ঘটে যাবে।  

মহাপরিচালক একবার বাঁশিওয়ালার চোখ বাঁকিয়ে তাকালেন। এরপর বললেন, ‘আচ্ছা সব করা হবে। তুমি বাঁশি বাজায়ে হোক বাঁশ দিয়ে হোক যেভাবে পারো মাদক ব্যবসায়ীদের নির্মূল করো, তাদের দেশ থেকে যেখানে খুশি নিয়া যাও। বাকিটা আমরা দেখতেছি।’

বাঁশিওয়ালা অবিশ্বাসের চোখে একবার তাকালো। এরপর আরও শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো, ‘সত্যি তো? হ্যামেলিনের মেয়র কিন্তু কাজ শেষে তার কথা রাখেনি।’

-এইটা তো হ্যামেলিন না। তুমি কাজ শেষ করো, আমরা আছি।

হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা তাঁর ঝোলা ফেরত নিয়ে বের হয়ে গেলো। বের হওয়ার আগে সঙ্গে নিলো মাদক ব্যবসায়ীদের এলাকা চিহ্নিত ম্যাপ।

২.

হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালাকে এরপর আর কখনো দেখা যায়নি। তবে অনেকে বলে, ঝোলাভর্তি বাঁশি নিয়ে যে মাদক ব্যবসায়ী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে, সে নাকি অনেকটা তার মতোই দেখতে। তার কাছে পাওয়া গেছে মাদক ব্যবসায়ীদের এলাকা চিহ্নিত ম্যাপসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলামত। 

১৮০৬পঠিত ...০১:৩২, মে ২৮, ২০১৮

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
    আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

    আইডিয়া

    গল্প

    রম্য

    সঙবাদ

    সাক্ষাৎকারকি

    
    Top