অরিত্রীর গল্পটা যেভাবে শেষ হতে পারত

৪১৯২ পঠিত ... ১৬:৩২, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৮

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণীর ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, স্কুলে অপমানের জের ধরে সে আত্মহত্যা করেছে।

স্কুলে পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষক অরিত্রীর কাছে মোবাইল ফোন পায়। মোবাইলে নকল করছে, এমন অভিযোগে অরিত্রীকে সোমবার তার বাবা-মাকে নিয়ে স্কুলে যেতে বলা হয়। অরিত্রীর বাবা-মা অরিত্রীকে নিয়ে স্কুলে যান।কিন্তু ভাইস প্রিন্সিপাল তাঁদের অপমান করে কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। মেয়ের টিসি নিয়ে যেতেও বলা হয়।দিলীপ অধিকারী (অরিত্রীর বাবা) বলেন, এরপর তিনি প্রিন্সিপালের কক্ষে যান। যেখানে স্কুল পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যও ছিলেন। প্রিন্সিপালও ভাইস প্রিন্সিপালের মতো আচরণ করেন (প্রথম আলো)।

অরিত্রী এরপর দ্রুত প্রিন্সিপালের কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়। পরে স্ত্রীসহ অরিত্রীর বাবা বাড়ি গিয়ে দেখেন, অরিত্রী তার কক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়নায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় ঝুলছে।

অরিত্রীর গল্পটা যেভাবে শেষ হয়েছে, এভাবে কি তা শেষ হওয়ার কথা ছিল? কোনো গল্পেরই এমন পরিণতি আমরা চাই না। গল্পটি কি অন্যরকম হতে পারত না?

অরিত্রীর গল্পের আমরা তিন ধরণের ‘শেষ’ ভেবেছি। প্রিয় পাঠক, একটু ভেবে দেখুন, গল্পটা এই তিনটির কোনো একভাবে শেষ হওয়াটা খুব কি কঠিন ছিল?

১#

অরিত্রী প্রিন্সিপালের রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রিন্সিপালের রুমের ভেতরে বসে আছেন অরিত্রীর বাবা-মা। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম অরিত্রীর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলছেন। ম্যাডাম নিশ্চয়ই বাবা-মাকে অনেক বকছেন। রুমে ঢোকার সময়ও বাবা-মা কাঁদছিলেন। অরিত্রীর খুব কষ্ট হচ্ছে, প্রচন্ড লজ্জা লাগছে। মনে হচ্ছে, কোথাও পালিয়ে যেতে পারলে ভালো হতো। ম্যাডাম কি সত্যিই টিসি দিয়ে দেবেন? বাবা-মা খুব কষ্ট পাবেন তাহলে। অরিত্রী নিজেকে নিয়ে ভাবছে না। শুধু বাবা-মায়ের জন্য তার খুব কষ্ট লাগছে! মনে হচ্ছে, এরপর আর বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না। এমন লজ্জা নিয়ে সে কীভাবে বেঁচে থাকবে?

অরিত্রী এসব ভাবতে ভাবতেই অরিত্রীর বাবা-মা রুম থেকে বেরোলেন। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম অরিত্রীকে ভেতরে ডাকছেন। অরিত্রী খুব ভয় পেলো। বাবাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘বাবা, তোমাকে কি ম্যাডাম বকা দিয়েছে?’

বাবা অরিত্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘না মা। ম্যাডাম তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান। তোমার সমস্যার কথা ম্যাডামকে খুলে বলবে, কিছু লুকোবে না।’

অরিত্রী ভীত পায়ে রুমে ঢুকলো, মাথা নিচু করে দাঁড়ালো ম্যাডামের টেবিলের সামনে। ম্যাডাম তাকে শান্ত গলায় বসতে বললেন।

অরিত্রী ভাবছিলো, ম্যাডাম তার সঙ্গে খুব দুর্ব্যবহার করবেন। লজ্জায় দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিলো তার। অথচ কী আশ্চর্য! ম্যাডাম অরিত্রীর সমস্যার কথা জানতে চাইলেন। পরীক্ষার হলে মোবাইল নিয়ে আসাটা কেন অনুচিত, সেটা বুঝিয়ে বললেন। একজন শিক্ষার্থীকে মোবাইল ফোন আনতে দেয়া হলে তো সবাইকেই দিতে হয়!

ম্যাডাম অরিত্রীর লেখাপড়ার খোঁজখবর নিলেন। লেখাপড়ায় কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা, কোনো ক্লাসে বা কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা বোধ হয় কিনা, তা জানতে চাইলেন। পড়ালেখার অতিরিক্ত চাপের কারণে সে ভেঙে পড়ছে কিনা, তাও খোলাখুলি আলাপ করলেন অরিত্রীর সঙ্গে।

অরিত্রীকে ম্যাডামের রুম থেকে বের হওয়ার সময় তবু একবার ভীত গলায় জিজ্ঞেস বললো, ‘ম্যাডাম, আমাকে আপনি টিসি দেবেন না তো? আমার বাবা-মা খুব কষ্ট পাবে।’

প্রিন্সিপাল ম্যাডাম হেসে বললেন, ‘তুমি তো এখনো অনেক ছোট। তোমাদের ভুল-ত্রুটি থাকবে, তাই তো স্বাভাবিক। তোমরা ভুল করলে আমরা শোধরানোর চেষ্টা করবো, তোমাকে সঠিক ব্যাপারটা শেখাতে চেষ্টা করবো। টিসি দেয়া তো কোনো সমাধান না। তুমি এতসব না মেনে নিয়মকানুন মেনে চলতে চেষ্টা করো, আর লেখাপড়াটা মন দিয়ে করো। তোমার যে পরীক্ষাটা বাতিল হয়েছে, তুমি অন্যসব পরীক্ষার শেষে আলাদাভাবে সেই পরীক্ষাটা দিতে পারবে। আমি নিজে তোমার পরীক্ষা নেবো। ঠিক আছে?’

অরিত্রী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। তার এখন আর ভয় লাগছে না।

রুমের বাইরে বাবা-মা দাঁড়িয়ে আছেন। অরিত্রী রুম থেকে বের হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘বাবা, আমার কালকেও একটা পরীক্ষা আছে। চলো বাসায় যাই, অনেক পড়তে হবে।’

 

২#

 

অরিত্রী দৌড়ে স্কুল থেকে বের হয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রিকশা নিলো।

বাবা-মা হয়তো এখনো প্রিন্সিপালের রুমে বসে আছে। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম বাবা-মায়ের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছেন। যাচ্ছেতাই বলেছেন। বাবা হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়েছে, ম্যাডামের পায়েও ধরতে চেয়েছে। ম্যাডাম তবু বাবাকে অপমান করলেন।

প্রচন্ড লজ্জা, ক্ষোভ, অভিমানে অরিত্রীর পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে কাউকে আর কখনো যেন নিজের চেহারাটা না দেখাতে হয়। বাবা-মায়ের কত স্বপ্ন ছিল অরিত্রীকে নিয়ে। আজ তার জন্য বাবা-মাকে এতকিছু সহ্য করতে হলো?

অরিত্রী আর সহ্য করতে পারছে না। তার প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে! অরিত্রী রিকশায় বসেই সিদ্ধান্ত নিলো, এই জীবন সে আর রাখবে না। কখনো আর কেউ যেন তার দেখা না পায়।

অরিত্রী ঘরে ঢুকেই আত্মহত্যার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো। হাতে একেবারেই সময় নেই, বাবা-মা ফিরে আসার আগেই যা করার করে ফেলতে হবে। প্রথমে বাবা-মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে সে একটা ছোট্ট চিঠি লিখলো। বাবা-মাকে জানালো, সে তাদের যোগ্য মেয়ে হতে পারেনি।

ওড়নাটা ফ্যানের সাথে পেচিয়ে যখন সে গলায় ফাঁসটা নিতেই যাচ্ছে, তখনই বেজে উঠলো কলিংবেল। অরিত্রী দ্রুত ফ্যানের সাথে প্যাচানো ওড়না খুলে ফেললো। বাবা-মা কি চলে এলো? ধুর, চিঠিটা লিখতে গিয়েই দেরি হয়ে গেছে!

অরিত্রী দরজা খুললো। অরিত্রীর বাবা ঘরে ঢুকেই তাকে জড়িয়ে ধরলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘আমরা তোর টিচারের সাথে কথা বলেছি মা। তারা প্রথমে রাগারাগি করলেও পরে তোর সমস্যাটা বুঝতে পেরেছেন। তোকে উনারা টিসি দেবেন না।’

অরিত্রী খুব কাঁদতে শুরু করলো। অরিত্রীর মা বললেন, ‘উনারা আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন মা। তুই আর রাগ করিস না। স্কুলের একজন ম্যাডাম তোর কাউন্সিলিং করবে, তোর যা কিছু সমস্যা আছে তাকে মন খুলে বলবি। যদি লেখাপড়ার চাপ অনেক বেশি মনে হয়, আমাদেরকে বলবি। আমাদের কাছে লেখাপড়া আর ডিগ্রীর চাইতে আমাদের মেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কান্নাকাটি করিস না।’

অরিত্রী হাতমুখ ধুয়ে তার রুমে ফেরত গেলো। চিঠিটা কোথায় রেখেছে মনে পড়ছে না। দ্রুত খুঁজে বের করে টয়লেটে ফ্ল্যাশ করে ফেলতে হবে। ওই চিঠি যেন কখনো বাবা-মাকে পড়তে না হয়।

 

৩#

 

প্রিন্সিপাল ম্যাডাম বাবার সঙ্গে খুব বাজে ব্যবহার করেছেন।

অরিত্রীর খুব কান্না পাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আর কোনো কারণ নেই তার। যেই বাবা-মা সারাটা জীবন এত যত্ন করে তাকে বড় করলেন, আজ তার জন্য বাবা-মাকে এমন লজ্জা পেতে হলো? অরিত্রী সিদ্ধান্ত নিলো, এই জীবন সে আর রাখবে না।

বাবা-মা ম্যাডামের রুমে থাকতে থাকতেই তাকে বাসায় ফিরে গিয়ে যা ঘটানোর ঘটিয়ে ফেলতে হবে। বাবা-মায়ের এই অপমানের প্রতিশোধ সে নেবেই, নিজের জীবন দিয়ে হলেও নেবে। এই সমাজে বেঁচে থাকতে কেউ কাউকে বোঝে না, আত্মহত্যা করলে এরপর সবাই ঠিকই বোঝে। এটাই একমাত্র সমাধান।

অরিত্রী চোখ বন্ধ করে তার স্বপ্নগুলোর কথা একবার ভাবতে চেষ্টা করলো। সেই ছোটবেলা থেকেই অরিত্রী অনেক বড় আর্টিস্ট হতে চেয়েছে। ভ্যান গগের মতো বড় আর্টিস্ট। কী অদ্ভুত ব্যাপার, ভ্যান গগও ভীষণ অপমান আর হতাশায় আত্মহত্যা করেছিলেন! অথচ আর মাত্র কয়েকটা দিন বাঁচলেই তিনি দেখতে পেতেন, গোটা পৃথিবীতে তার রঙ-তুলির জয়জয়কার।

অরিত্রী যখন প্রিন্সিপালের রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে এসব ভাবছিলো, ঠিক তখনই অরিত্রীর বাবা থমথমে মুখে প্রিন্সিপাল ম্যাডামের রুম থেকে বের হয়ে আসলেন।

অরিত্রী কান্না জড়ানো কাঁপা গলায় বাবাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘বাবা, ওরা কি আমাকে সত্যিই টিসি দিয়ে দেবে?’

বাবা অরিত্রীর মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘না মা। আমিই ওদের এই স্কুল থেকে তোমার জন্য টিসি নিয়ে নিয়েছি। যে স্কুলের কাছে আমার মেয়ের জীবনের চেয়ে নিয়মকানুন বেশি জরুরি, সেখানে আমি আমার মেয়েকে পড়াবো না।’

অরিত্রীকে নিয়ে তার বাবা-মা বাড়ি ফিরলেন। কদিন বাদেই অরিত্রীকে অন্য একটি স্কুলে ভর্তি করালেন। প্রচলিত অর্থে খুব ‘বড়’ স্কুল নয়, বিশেষ নামকরাও নয়। কিন্তু স্কুলের শিক্ষকরা আন্তরিক, এই ব্যাপারটি অরিত্রীর বাবার ভালো লেগেছে। তার কাছে এখন স্কুলের ‘জিপিএ-৫’ সংখ্যা এবং খ্যাতির চাইতে শিক্ষকদের আচরণ ও শিক্ষার্থীদের জীবন গড়ার প্রতি তাদের নিষ্ঠাটাই বড়।

নতুন স্কুলে পড়াশোনা, কোচিং আর প্রাইভেট পড়ার চাপ কমে যাওয়ায় সে মন দিয়ে ছবি আঁকার জন্য প্রচুর সময় পেলো। স্কুল-কলেজ পার করে ভার্সিটিতে যখন পড়ছে, ততদিনেই দেশের নানান এক্সিবিশনে শোভা পাচ্ছে অরিত্রীর আঁকা ছবি।

তারও বছর দশেক পরের কথা। অরিত্রী তখন দেশের নামকরা একজন আর্টিস্ট। হুট করে অরিত্রীর ফোনে নিজের পুরোনো স্কুল থেকে একটা কল আসলো। কল করেছেন সেই পুরোনো স্কুলের নতুন প্রিন্সিপাল। তারা চান, একজন সফল শিক্ষার্থী হিসেবে অরিত্রী এবং তার বাবা-মা স্কুলের শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের উদ্দেশে অনুপ্রেরণামূলক কিছু বলুক।

অরিত্রী অনেক বছর ধরে এই দিনটার অপেক্ষা করেছে। সে জানে, সে শিক্ষার্থীদেরকে কী বলবে। ড্রয়ার থেকে কাগজ বের করে সে তার বক্তব্যের মূল শিরোনামটা লিখলো, ‘আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়।’

 

আরও পড়ুন:

৪১৯২ পঠিত ... ১৬:৩২, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৮

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top