বিসিএস কর্মকর্তার মায়ের সাথে ঘটে যাওয়া প্রকৃত ঘটনা

২১৭১পঠিত ...১৪:০০, এপ্রিল ০৩, ২০১৮

গতকাল রাত থেকে একটি হৃদয়স্পর্শী খবর প্রকাশিত হতে থাকে বিভিন্ন ওয়েবপোর্টালে। একজন বিধবা অসহায় মায়ের দুঃখের কাহিনী। এই মায়ের ছেলে বিসিএস কর্মকর্তা এবং পুত্রবধূ ‘ম্যাজিস্ট্রেট’। অথচ দজ্জাল পুত্রবধূর চাপে পড়ে নিজের বৃদ্ধা মাকে ছেলে রেখে এসেছে রেলস্টেশনে। ছেলে মায়ের কাছে রেখে আসে একটি মর্মস্পর্শী চিঠি। এই ঘটনাটি গত ফেব্রুয়ারি মাসের।

 

ছবিটি 'শাটারস্টক' নামে একটি ছবি ও ভিডিও বিপনন সংস্থার স্টক থেকে নেওয়া। বাংলাদেশের কোন রেলস্টেশনের ছবি নয় এটি।

 

সবগুলো পোর্টালেই বৃদ্ধা মহিলা এবং ঐ চিঠির ছবিও দেয়া হয়। তবে পুরো ঘটনার আসল সূত্র কোন সাংবাদিক খুঁজে বের করেননি। ব্যারিস্টার এস এম ইকবাল চৌধুরী নামের একজন আইনজীবী গত ২৯ মার্চ ফেসবুকে ঐ চিঠির ছবি পোষ্ট করে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেই স্ট্যাটাসে তিনি বলেন,

“কয়েকদিন পর্যন্ত শারীরিক অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। ব্লাডপ্রেসার ডিস্টার্ব করছে। আর বন্ধুরা বলে, আমার মাথার মাদারবোর্ড নাকি কাজ করছে না- হা হা হা। তারপরও রেলস্টেশন গিয়ে দু'জন হাঁটাহাঁটি করছি। কারণ আমাদের একজন সিনিয়র কলিগকে রিসিভ করতে অর্থাৎ ট্রেনেরঅপেক্ষায়।কিছুক্ষণ পর একটি জায়গায় বসে আছেন এক বৃদ্ধা, যার বয়স সত্তর।’

তিনি একজন মা। মায়ের মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে- ‘খোকা কোথায় গেলি বাবা’। মায়ের কাছে জানতে চেয়েছি, খোকা কে?

তিনি বললেন,আমার একমাত্র ধন (ছেলে)। তার সঙ্গে একটা ছোট ব্যাগ আছে। আমরা তার অনুমতি নিয়ে ব্যাগের বাহ্যিক পকেটে হাত প্রবেশ করালাম যাতে কোনো ফোন নম্বর পাওয়া যায় কিনা। একটি চিঠি পেয়েছি তাতে কী লেখা ছিল নিম্নে সন্নিবেশিত।

ততক্ষণে ট্রেন উপস্থিত আর অতিথিসহ সিদ্ধান্ত নিলাম মাকে কোনো বৃদ্ধাশ্রমে ভর্তি করিয়ে দেয়ার। স্টেশন মাস্টারের রুমে প্রবেশ করে নিজেদের পরিচয় দিলে তিনি যথার্থ সম্মান দেন। পরে আমরা মায়ের দুর্ঘটনার কথা বলাতে তিনি মাকে নিজ চেয়ারে বসালেন।

মায়ের সন্তান একজন বিসিএস কর্মকর্তা। লোকের বাড়িতে কাজ করে আর রাতে কাপড় সেলাই করে বিসিএস ক্যাডারকে পড়িয়েছেন। আমি চেয়েছিলাম, সেই বদমাশ ছেলের নামসহ বিস্তারিত তুলে ধরতে। কিন্তু মায়ের অনুরোধ যাতে তা না করি। মায়ের মতে, সন্তান ও বৌমা ম্যাজিস্ট্রেট আর তাদের সামাজিক মর্যাদা আছে। হায়রে মা...সন্তানের সম্মান মায়ের কাছে কতো মূল্য আর কুলাঙ্গারের কাছে মা কতো 'বিপদ'!!

মায়ের বর্তমান ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম। তাকে বৃদ্ধাশ্রমে ভর্তি করার সময় অভিভাবকের কলামে আমার নাম লিখাতে পেরে গর্বিত।

একদিন বৃদ্ধাশ্রম থেকে ফোন আসলে রিসিভ করি। অপর প্রান্তে মায়ের কণ্ঠে- ‘খোকা, আমার মন ভালো নেই, যদি পারো একটু দেখতে এসো।’

ছুটে গেলাম জননীর কাছে। খোকা হয়ে তখন দেখি মাকে ডাক্তার অবজারভেশনে রেখেছেন। মায়ের কপালে হাত রাখতেই তিনি চোখ খুলে মুচকি হেসে পানি চাইলেন এবং আমি তাকে পানি খাওয়াই।

তিনি বলেন, খোকা বেঁচে থাকবি সিংহ হয়ে। একদিন মা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে জান্নাতগামী হলেন।

গতমাসে ঘটনাটি ঘটলেও আজ (২৯ মার্চ) এ বিষয়ে লিখছি কারণ চোখের ঝর্ণাপ্রবাহ লেখার ক্ষমতাকে প্লাবিত করে যার ফলে বারবার বাধা পাচ্ছিলাম। কোনো মায়ের পরিণতি যেন এমন না হয়।”

যুগান্তর, কালের কণ্ঠ থেকে শুরু করে চেনা অচেনা সব পোর্টাল এই হাতে লেখা চিঠির ছবি আর স্ট্যাটাসকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিবাদী কণ্ঠে এ ঘটনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। কোন এক অনলাইন পোর্টালে বৃদ্ধার ছবিও দেয়া হয়। এরপরসবগুলো পোর্টালে ঐ একই ছবি ব্যবহার করা হয় এবং একই প্যাটার্নের লেখাও দেয়া হয়।

কিন্তু ফেসবুকের অতি অনুসন্ধিৎসু কিছু মানুষ পুরো ঘটনাটি একটু খতিয়ে দেখতে যেয়ে প্রথমে আবিস্কার করে, যে বৃদ্ধার ছবি সবগুলো পোর্টালে ‘অসহায় বিধবা মা’ বলে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে সেটি আসলে আরো তিন বছর আগের একটি ছবি। ভারতের বৃন্দাবনের এক আশ্রমের একজন মহিলার সাক্ষাৎকারের ভিডিও থেকে ছবিটি নেয়া হয়েছিল।

ছবিটির আসল অস্তিত্ব প্রকাশ হয়ে গেলে তারপর অনেকে ঘটনার সত্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলতে থাকে। তখন কালের কণ্ঠ এবং আরো কয়েকটি পোর্টাল খবরটি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলে। আর যুগান্তর ছবিটির ক্যাপশনে লিখে দেয় ‘প্রতীকী ছবি’। এই মুহূর্তে না থাকলেও, গতকাল রাতেও যুগান্তরে 'খবর'টি ছিল।

চিঠিতে ব্যাকরণগত কিছু ভুল এবং অতি নাটকীয়তা দেখে পুরো বিষয়টি নিয়েই আমাদের সন্দেহ হতে থাকে। একজন প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন ভুল সত্যিতে আশা করা যায় না। এছাড়াও নিজেকে সরকারি কর্মকর্তা বলে পরিচয় দিলেও স্ত্রীকে আলাদা করে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বলার কী আছে ঠিক স্পষ্ট হচ্ছিল না। ম্যাজিস্ট্রেট নিজেও তো সরকারি কর্মকর্তা, বিসিএস দিয়েই ম্যাজিস্ট্রেট হতে হয়। চিঠি পড়ে মনে হচ্ছিল যে, তিনি আগেই বুঝতে পারছিলেন ফেসবুকে এই চিঠি ভাইরাল হবে। তাই সবার বুঝবার সুবিধার্থে নিজের জীবনকাহিনী আর স্ত্রীর পেশা সম্পর্কে খানিকটা বলে নিয়েছেন।

ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে eআরকির বিশেষ অনুসন্ধানী দল আরও খতিয়ে দেখতে চায়। তখন সেই আইনজীবীর ফেসবুক আইডি খুঁজতে যেয়ে আমরা আবিস্কার করি যে, তার প্রোফাইল ফেসবুকে আর নেই। তারপর যখন আমরা অনিশ্চিত হয়ে পড়ি সত্যিই এই নামের কোন ফেসবুক আইডি ছিল কি না! তখন আরও গভীরে খোঁড়াখুঁড়ির পর ঐ ব্যারিস্টারের ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা একজন ফেসবুক বন্ধুর স্ট্যাটাস খুঁজে পাই।

ফারাহ জাবিন শাম্মি ঐ স্ট্যাটাসটির স্ক্রিনশট দিয়ে জানান যে, তিনিও খুঁজে পাচ্ছেন না ইকবাল চৌধুরীর আইডি। এমন একটি খবর শেয়ার করার পরে সেটি যখন বিভিন্ন নিউজ পোর্টালের মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় তখনই ব্যারিস্টার সাহেব আইডি ডিএক্টিভ করে ফেলায় তিনিও ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

এই ঘটনার কোন সত্যতা এখনো পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি। অবস্থাদৃষ্টে এই উপসংহারে আসা যায় যে, পুরো ঘটনাটি ইকবাল চৌধুরীর মস্তিষ্কপ্রসূত একটি গল্প।

কেবল মাত্র ফেসবুকের একটি নাটকীয় স্ট্যাটাস দেখে, কোনরকম কোন যাচাই-বাছাই না করে সেটিকে খবর বানিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে উপস্থাপন করা ঠিক কেমন, সে বিষয়ে আমরা এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি। একইসাথে আবেগী সব হেডিং দিয়ে মুখরোচক ‘খবর’ বানাবার (হ্যা, খবর তারা বানিয়েই থাকেন) তালে থাকায় সবাই ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ভুলেই যায়।

২১৭১পঠিত ...১৪:০০, এপ্রিল ০৩, ২০১৮

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
    আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

    আইডিয়া

    কৌতুক

    রম্য

    সঙবাদ

    স্যাটায়ার

    evolution22
    
    Top