আমরা যেভাবে একটি 'নন এসি' বিমানে সেদ্ধ হলাম

৪১৭৮ পঠিত ... ১৮:০১, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৭

আমি একজন দুস্থ সাংবাদিক। তাই প্লেনে খুব একটা চড়া হয় না। বিধিবাম এই অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর দুইবার যে এয়ারলাইনসে চড়লাম তার নাম রিজেন্ট এয়ারলাইন্স! এবার শুনুন সদ্য সমাপ্ত ভ্রমণ থেকে ফিরে আসার গল্প।

প্লেনে উঠেই মনে হলো কোনো এক মরুর দেশে চলে এসেছি। যে দেশে দিনের চব্বিশ ঘন্টাই বইতে থাকে লু হাওয়া। তখনই মনে পড়লো এর আগেরবার একই বিমানে কক্সবাজারে যাবার সময়ও এই ঘটনাই ঘটেছিল। বিমান আকাশে ওড়ার আগ পর্যন্ত এসি ছাড়া হয় না। সেবার না হয় একা ছিলাম--সহ্য করেছি! কিন্তু এবার তো বাচ্চা আছে সাথে। আর সে খেপে গেলে পুরো প্লেন মাথায় তুলে নেবে! তাই সিটে বসার একটু পরে একজন এয়ার হোস্টেজকে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনারা এসি ছাড়েননি?'

উনার চেহারা দেখে মনে হলো আমি উনার বিসিএস ভাইবার শিক্ষক। খুবই সাবধানে উত্তর দিলেন, 'ভিতরে অনেক বয়ষ্ক মানুষ আছেন তো, তাই ভেতরটা একটু ওয়ার্ম করা হচ্ছে!'

আমার মেজাজ টং করে সপ্তমে উঠে গেল। কারণ আমি জানি এটা তাদের আসল কারণ না। তারা প্লেন না ওড়া পর্যন্ত এসি ছাড়বে না।

সঙ্গে সভ্য স্বামী থাকায় ক্ষানিকক্ষণ চুপ থাকলাম। পনেরো মিনিটের মতো গেল। এসির কোন নাম গন্ধ নাই। প্লেন তো বদ্ধ জিনিস। ভেতরে বাতাস চলাচলের কোনো ব্যবস্থা নেই। যাত্রীদের নিঃশ্বাসের গুমোট গরমে সহ্য করতে না পেরে আরেকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, 'এসি ছাড়ছেন না কেন?'

: ম্যাডাম সবার বোর্ডিং শেষ হলে আমাদের এসি ছাড়ার নিয়ম। তা না হলে এসির উপর চাপ পড়ে!

আমার মেজাজ আরেকটু গরম হলো। কারণ জানি এটাও 'কারণ' না।

ত্রিশ মিনিটের বেশি হয়ে গেল, জাতীয়-বিজাতীয় 'বাস' এবং সাফোকেশনে অবস্থা খারাপ! সবাই ফোঁসফোঁস করছে। আবার সেই ছেলেটিকে ডাকলাম। জিজ্ঞেস করলাম, 'ভাই কী সমস্যা বলা যাবে?'

: ম্যাডাম একটু প্রবলেম হয়েছে ইঞ্জিনে তাই এখন এসি ছাড়া যাচ্ছে না। ফ্লাই করলে এসি ছাড়া হবে!

: আমি শিওর আপনারা অন্যান্য দেশের উড়োজাহাজে উঠেছেন। কখনো কি দেখেছেন ফ্লাই করার পর এসি ছাড়া হয়?

: জি না ম্যাডাম। আসলে আমাদের ইঞ্জিনে সমস্যার কারণে...ফ্লাই না করলে...!

: আপনারা কী টিকেটের টাকা থেকে এসির বিল কেটে রাখেন?

: ইয়ে মানে না ম্যাডাম! আমাদের ফ্লাইং স্টার্ট হলেই...!

: আপনাদের ফ্লাইংয়ের শিডিউল টাইম তো পার হয়ে গেছে। পরের শিডিউল পেয়েছেন?

: জি আমি জানাচ্ছি!

: আর কখন জানাবেন?

: এই যে এখনি!

এবার প্রায় পঞ্চাশ মিনিট শেষে একজন এলেন এবং সবাইকে পদার্থ বিজ্ঞান বোঝালেন--কেন ফ্লাই করার আগে এসি ছাড়া ঠিক নয়, প্রেসার ও কমপ্রেশারের পার্থক্যও কি। কোনটা কীভাবে কাজ করে এই নিয়েই লেকচার ঝাড়লেন। উনাকে ডাকলাম।

: ভাই আপনাদের ইঞ্জিনের যে সমস্যা তা আগে বুঝেননি?

: না ম্যাডাম, ফাইনাল চেক করার সময় এটা ধরা পড়েছে।

: আচ্ছা এই ফ্লাইটে না হয় ইঞ্জিনে সমস্যা কিন্তু আপনাদের সকল ফ্লাইটেই তো ফ্লাই করার আগ পর্যন্ত এসি ছাড়া হয় না। সেগুলোতেও কি ইঞ্জিনে সমস্যা থাকে? 

: জি ম্যাডাম মানে ইয়ে ম্যাডাম!

: আর যদি তাই হয় আপনার কলিগরা একেক সময় একেক কথা বলছেন কেন? উড়োজাহাজে কোনও সমস্যা হলে যাত্রী হিসেবে আমাদের জানার অধিকার আছে!

: জি অবশ্যই, উনারা কেন এমন বলেছেন আমি জানি না।

: তাহলে জানুন, আর সবাই মিটিং করে কী বলবেন সেটা ঠিক করুন প্লিজ!

অতঃপর তাহারা একঘণ্টা সেই আগুন গরম চুলায় বসিয়ে রেখে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে উড্ডয়নের পথে যাত্রা শুরু করলেন!

আমি তো গরীব তাই খুব বেশি দামী ফ্লাইটে উঠি না। কিন্তু কম দামী ফ্লাইটে উঠলে এমন অসহনীয় সার্ভিস সহ্য করতে হবে সেটা কেমন কথা। এয়ার এশিয়াসহ পৃথিবীর তাবত বাজেট এয়ারলাইন্স থেকেও নিশ্চয়ই রিজেন্ট কিছু শিখতে পারে। বা তারা ওয়েবসাইটে বড় বড় করে লিখে দিতে পারে--'ফ্লাই করার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত এসি ছাড়া হবে না--নিজ উদ্যোগে এয়ারফ্রেশনারসহ আসনগ্রহণ করুন!'

আর নিতান্তই তারা এসি না ছেড়ে খরচ বাঁচাতে চাইলে তাদের বিমানে জানালা খোলার ব্যবস্থা করে সবাইকে হাতপাখা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। সেটা রিজেন্ট কোম্পানির পাশাপাশি এর যাত্রীদের জন্যও ভালো হবে। কারণ সার্ভিস দিতে গিয়ে কেউ যদি অসৎ হয় তার পতন সুনিশ্চিৎ! আর মধ্য আকাশ থেকেই রিজেন্টের সেই পতন শুরু হলে সেটা যাত্রীদের প্রাণ নিয়েও টান দিতে পারে।

[eআরকির বক্তব্য: রিজেন্ট এয়ারওয়েজের বিরুদ্ধে একই ধরনের অসংখ্য অভিযোগ সোশ্যাল মিডিয়ায় কয়েকদিন পর পরই প্রকাশিত হয়। এরপরও রিজেন্ট কর্তৃপক্ষের এই বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য একজন যাত্রীর অভিজ্ঞতা এখানে প্রকাশিত হলো।]

৪১৭৮ পঠিত ... ১৮:০১, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৭

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top