লুকিং ফর শত্রু'জ সাধারণ ক্ষমা : একান্ত সাক্ষাৎকারে বাবর

১০৫৪ পঠিত ... ১৬:৪১, অক্টোবর ১২, ২০১৮

কাশিমপুর কারাগারের মূল ফটকে যখন আমরা পৌছুলাম তখন ঘূর্ণিঝড় তিতলির আগমনী বার্তায় পুরো আকাশটা অন্ধকার হয়ে এসেছে। সেই অন্ধকারেই জেল সুপারের পারমিশন নিতে গেলাম। eআরকি থেকে এসেছি শুনে তিনি খুশি হলেন। বললেন, 'ফাঁসির আগে একটু ইয়ার্কি মশকরার দরকার আছে। এতে মৃত্যু সহজ হয়।'

পারমিশন নিয়ে আমরা গিয়ে দাঁড়ালাম আরেক অন্ধকারের সামনে। কনডেম সেলের অন্ধকার। ভেতরে উঁকি দিতে একটা মিষ্টি আতরের গন্ধ নাঁকে এসে লাগলো। অন্ধকার ভেদ করে দেখলাম, বসে আছেন সফেদ পাঞ্জাবিতে লুৎফুজ্জামান বাবর। কে বলবে এই লোকটাই এক সময়কার দোর্দোন্ড প্রতাপশালী মন্ত্রী!  পাকা দাঁড়িতে তাকে পীর-এ কামেল কাশিমপুরী মনে হচ্ছে। তার গা থেকে ভুর ভুর করে আতরের ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে পুরো সেলের মধ্যে। এক অতিপ্রাকৃত রহস্যময়তা চারিদিকে।

আমাদের দেখতেই মিষ্টি হেসে বাবর বললেন, 'ফাঁসি কি আজকেই? রেডি হয়ে নিবো? ' 

বুঝলাম আমাদের তিনি জল্লাদ শ্রেণীর লোক ভেবেছেন। নিজেরদের পরিচয় দিতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবর বললেন, 'আসো। তবে বসার জায়গা নেই। এটাই আমার ড্রয়িং রুম এটাই আমার বেড রুম।' 

'কেমন আছেন' জিজ্ঞেস করে আর সার্কাজম করলাম না। পরিবেশ হালকা করার জন্য জিজ্ঞেস করলাম,  'আতরের প্রতি আপনার ফ্যাসিনেশন আছে মনে হচ্ছে.. '  

- হ্যাঁ। এই ঘ্রাণের কারনেই এখনো বেঁচে আছি। নাহলে ১১ টা বছর এই জেলখানায় বাঁচতে পারতাম না। 

- চুলে তো জেল দিতেন এক সময়.. 

- সবই বয়সের দোষ। তখন বয়স কম ছিলো। আসলে আতর আর চুলের জেল দুইটাই আমার পছন্দের জিনিস। জেল দিলে ওযু হয় না। এইজন্য বাদ দিয়েছি। 

জায়নামায দেখে বললাম, নামায কালাম আগেও করতেন? নাকি জেলে এসেই...

- প্রতিটা খারাপ জিনিসের একটা ভাল দিক আছে। জেল খানাটা খারাপ। কিন্তু এইখানে এসেই সবাই ধর্মকর্মে মন দেয়। 

- আল্লাহ বাঁচাবে এই আশা করছেন? 

- দোয়া ইউনূসের নাম শুনেছো? ইউনূস নবী কঠিন বিপদের সময় পড়েছিলেন। সেই দোয়াটাই পড়ি সবসময়। ফাঁসির রায় এর আগেও পড়েছি। কাজ হয়নি। তবে এখনো আশা করি কাজ হবে। 

- ১০ই অক্টোবর আপনার জন্মদিন ছিলো। কেমন কাটলো দিনটা? উইশ করেছে কেউ?

- (হাসতে হাসতে) হ্যাঁ! জজ সাহেব উইশ করলেন। গিফট হিসেবে দিয়েছেন মৃত্যুদন্ড।

- এই দিনটার কথা কখনো ভেবেছিলেন? 

- শোনো ছোকরা, মদের বারের মধ্যে কেউ বাইরের দুনিয়ার কথা ভাবে না..

- নিজের দোষটা স্বীকার করছেন তাহলে? 

- নাহ। দোষটা আমার না। এটা ছিলো বাতাসের দোষ! 

- বাতাস? কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন নাকি? 

- (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) তখন ওটাই ছিলো সংস্কার। হাওয়া-বাতাসের সাথে সম্পর্ক ভাল রাখাটাই ছিলো সংস্কার। 

- হেয়ালি করছেন। যদি একটু বুঝিয়ে বলতেন। 

- বাতাস বাড়ির কথা ভুলেই গেছো তোমরা। দ্য মাইটি 'হাওয়া ভবন'! হাওয়া বদল না করাটাই ছিলো আমার জীবনের বড় ভুল।

- ভুল শুধরানোর চেষ্টা করেছেন কখনো? 

- করে লাভ নেই আর। এখন আমরা অন্য কিছু খুঁজছি। আগে শত্রুরা পালাতো, এখন তো বন্ধুরাই পালিয়েছে। তাই লুকিং ফর শত্রু'জ সাধারণ ক্ষমা।

- আপনার বন্ধু তারেক রহমানের কথা কী বলবেন? সে তো বেঁচে গেলো...

- হি ওয়াজ আ রিয়েল মোটিভেটর। আমাকে প্রচন্ড উৎসাহ দিতো। আই মিসড হিম ডিউরিং দ্য ফাঁসির রায়। 

- আপনি তো খুব আমোদপ্রিয় মানুষ ছিলেন। এখন আপনার বিনোদনের মাধ্যম কোনটা? 

- গান শুনি। একটা গানই বারবার শুনি। বলেই তিনি গুনগুন করে গাইলেন, 'আমি তো মরে যাবো, চলে যাবো, রেখে যাবো সবই। আছোসনি কেউ সংগের সাথী, সংগে আমার যাবি...' 

 

বাবর গান করছেন। পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। তাকে থামিয়ে ট্রাডিশনাল প্রশ্নটাই করলাম শেষে, 

- আপনার শেষ ইচ্ছাটা যদি বলতেন..

- মানুষের ইচ্ছার কোন শেষ নাই। আগে ইচ্ছা করত চুলে জেল দিতে, এখন ইচ্ছা করে আতর দিতে। 

- তবুও যদি বলতেন..

- আরেকবার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হইতে চাই। পারবে এই ইচ্ছা পূরণ করতে? 

 

কি আর বলব! এই ইচ্ছার কোন সংজ্ঞা হয় না।

আমরা কনডেম সেল থেকে নির্বাক হয়ে বের হলাম। তিতলি ততক্ষণে গাড় অন্ধকারে ছেয়ে ফেলেছে আকাশ। পেছনে কনডেম সেলের অন্ধকার থেকে লুৎফুজ্জামান বাবরের ভারি কন্ঠ ভেসে আসছে। 

তিনি আবৃত্তি করছেন, 'আমার গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে...'

১০৫৪ পঠিত ... ১৬:৪১, অক্টোবর ১২, ২০১৮

আরও

 
 

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top