জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের প্রতি একজন কম সিজিপিএ-ধারী বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ার 'ডিমোটিভেশনাল স্পিচ'

২৪৪১পঠিত ...০৬:৫০, মে ০৮, ২০১৮

প্রকাশিত হয়েছে এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট। যারা এ প্লাস পেয়েছো, তারা হয়তো অনেক খুশি, যারা পাওনি, তারা কবিগুরুর পরামর্শ মতো হয়তো যাচ্ছ না ঘরের বাইরে! কিন্তু আজ আমি তোমাদের ভার্সিটির বড় ভাই তোমাদের বলতে চাই, এই যে তুমি এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেলে, জীবনে বিরাট বড় একটা ভুল হয়ে গেলো! এই একটি, শুধু এই একটি দুর্ঘটনার জন্যই জীবনের প্রতিটি ধাপে ধাপে তোমাকে পস্তাতে হবে। কী দরকার ছিল এসবের বল তো ভাইয়েরা... বেশ তো ছিলি তোরা! শিক্ষাজীবনের খালে এ প্লাস যেন এক কুমির!

এই কুমির আমি আমার জীবনেও এনেছিলাম। এই যে তুমি জিপিএ-৫ পেলে, এইবার বুঝবে কত জিপিএ-৫ তে কত প্যারা। মাথায় কিছু ঢুকছে না নিশ্চয়ই? ওয়েল। পুরো ব্যাপারটা আমি তোমাদের দশ মিনিটে শর্টলি ডেস্ক্রাইব করছি।

ক্লাস নাইন টেনে কিছু হলেও খেলাধুলা করেছ। নিজেকে কিছুটা হলেও সময় দিয়েছ। এখন ওসব শুধুই স্বপ্ন ব্রো! তুমি এখন শুধু তোমার না। তুমি ইতোমধ্যে ভাগ হয়ে গেছো। তুমি এখন এই দেশ সমাজ আর দেশের শিক্ষাপদ্ধতির একটি উপাদান। পরিবারের সবার স্বপ্ন না পূরণ হওয়ার হতাশা এখন তোমার উপর দিয়ে যাবে! সবাি জীবনে যা হতে পারেনি, তোমাকে সে সব বানানোর প্রতিযোগিতা শুরু করবে। মাঝে ঢুকে গেছে। খোঁজ নিয়ে দেখতে পারো, তোমার কোনো আত্মীয়ের হয়তো এমনও স্বপ্ন আছে যে তুমি বুয়েট থেকে বিবিএ কমপ্লিট করবে। এসএসসিতে যেহেতু এ প্লাস পেয়েছো, নিশ্চয়ই বুঝে গেছো ইটস কোয়াইট ইমপসিবল।

প্রথমেই তোমাকে পরিবার ও সমাজের সবার পছন্দের মানে সামাজিকভাবে স্বীকৃত ‘ভালো কলেজ’-এ ভর্তি হতে হবে। এ প্লাস পাওয়ার পরও ভালো কলেজে না পড়াটা এ প্লাস মিস করার চাইতেও বড় সামাজিক অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। ভর্তি যদি হয়েও যাও, তবু রক্ষা নেই। কলেজের প্রথম দিন থেকে তোমাকে পরিবার, স্কুল, শিক্ষক বারবার মনে করিয়ে দেবে তোমার অন্যায়ের কথা, এ প্লাস পাওয়ার অন্যায়ে তোমার উপর আরোপ করা হবে এইচএসসিতেও এ প্লাস পাওয়ার বাধ্যবাধকতা। এইচএসসিতে এ প্লাস না পাইলে এসএসসির এ প্লাসের কোনো দাম নাই, এটিও তোমাকে দ্রুতই জানানো হবে। আতংক সৃষ্টির জন্য তোমার কানে বাজানো হবে কিছু সম্ভাব্য খারাপ পরিস্থিতির ভাঙা রেকর্ড- ‘এবার এ প্লাস না পাইলে মানুষ বলবে ছেলেটা এসএসসিতে এ প্লাস পাইছে, ইন্টারে পায় নাই... তার মানে এসএসসিতে ভুলে পাইছে। এক্সিডেন্টাল এ প্লাস ছিল...’

এক্সিডেন্টাল এ প্লাস বলে কিছু নেই, এ প্লাস পাওয়াই যে একটা এক্সিডেন্ট! এ প্লাস পাওয়াটা যে সত্যিই দুর্ঘটনা, তা তুমি বুঝতে পারবে আরো বেশ কিছু পরিস্থিতিতে পড়ার পর। যেমন ধরা যাক, কেউ তোমাকে জিজ্ঞেস করলো জাকারবার্গের নানার তৃতীয় বউয়ের দ্বিতীয় সন্তানের নাম কী। পারলে না। ভদ্রভাষায় টিটকারি করে বলবে, ‘তুমি না এ প্লাস পাইছিলা?’ কেউ কেউ ডিরেক্ট বলবে, ‘আজকাল পোলাপাইন এ প্লাস কেমনে পায় কী জানি! কিচ্ছু পারে না!’ টিভি চ্যানেলওয়ালারাও যদি হুট করে তোমাকে বইমেলায় বা টিএসসিতে সামনে পায়, তাহলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিবসের তাৎপর্য না জানা মানেই যে এ প্লাস সহীহ না হওয়া, সেটাও তুমি জানতে পারবে!

ইতোমধ্যে তোমার এইচএসসি পরীক্ষা চলে আসবে। হয়তো এবারও তুমি ‘এ প্লাস না পেলে রিকশা কিনে দেওয়া’র হুমকির সম্মুখীন হবে। এক্ষেত্রে তুমি যদি সেই দফায় এ প্লাস না পাও, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। আরামসে নিশ্চিন্তে কোনো সামাজিক প্রত্যাশা ছাড়াই মনের আনন্দে রিকশা চালাতে পারবে। কিন্তু আবারও যদি তুমি ভুলেও এ প্লাস পেয়ে যাও, তাহলে আরেকবার বিরাট ভুল করলে। এবার তুমি বুঝতে পারবে, খেলা তো এখনো শুরুই হয় না ব্রো!

এসএসসি, এইসএসসি-দুইটাতেই এ প্লাস পাইলা। তো কী হয়েছে? এই বৃহৎ পৃথিবীতে তুমি যে মাত্র ক্ষুদ্র একটি প্রাণী, তা ভার্সিটির কোচিংয়ের ওরিয়েন্টশন ক্লাসে বুঝিয়ে দেওয়া হবে! এবার তোমাকে সারাদিন নানান শিট এবং ‘বুয়েট/মেডিকেল/পাবলিক ভার্সিটি’তে পড়তেই হবে সেই প্রত্যাশার চাপ নিয়ে ছুটে বেড়াতে হবে। আবারও তোমাকে উপলব্ধি করতে হবে, এসব জায়গায় চান্স না পেলে জীবন বৃথা। এ প্লাস না পাইলে জীবন বৃথা বটে, তবে এ প্লাসজনিত সামাজিক স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে মিল রেখে ভার্সিটিতে চান্স না পেলে এ প্লাস পাওয়ার পরেও যে জীবন বৃথা হতে পারে, তা তুমি সে সময় টের পাবে!

বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি চান্স না পাও, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। প্রত্যাশার বোঝা আপাতত নামিয়ে রাখতে পারলে। যদি চান্স পেয়েই যাও, তাহলে আবিষ্কার করবে এতদিন পর্যন্ত তোমাকে বেশ কিছু মিথ্যা বলা হয়েছে। যেমন- ‘ভার্সিটিতে উঠে কোন পড়ালেখা করতে হয় না। খালি ঘোরাঘুরি আর আড্ডা’, ‘ভার্সিটিতে উঠলে আর প্যাড়া নাই’ ইত্যাদি!

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আরও কী কী ‘প্যাড়া’ অপেক্ষা করছে, তা বলে তোমাকে হতাশ করতে চাই না। শুধু বলতে চাই, জিপিএ-৫ একটি অভিশাপ। এ পাপ তুমি খন্ডাতে পারবে না! তুমি যখন ফেল করার কোর্সগুলোর রিটেস্ট দিচ্ছো, তখন দেখবে তোমার জিপিএ-৫ না পাওয়া বন্ধুটি এক বাচ্চার বাবা... রিকশা চালিয়ে সুখে-শান্তিতে সংসার করছে।

ভার্সিটি লাইফ পর্যন্ত শেষ করলাম, চাকরির ধাপে আর গেলাম না। সেই সিক্স ডিজিট প্যাড়ার কথা এখনই জানলে হয়তো বেশি হতাশ হতে পারো। তবে এতকিছু শুনেও যদি হতাশ না হয়ে থাকো, তবে কিংবদন্তিদের বলা একটি কথা অবশ্যই মাথায় রাখবে- ‘জিপিএ-৫ দিয়ে আর কী হবে, একদিন তো মরেই যাবো!’

২৪৪১পঠিত ...০৬:৫০, মে ০৮, ২০১৮

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
    আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

    কৌতুক

    গল্প

    রম্য

    সঙবাদ

    সাক্ষাৎকারকি

    স্যাটায়ার

    evolution22
    
    Top